Monday, July 26, 2010

বিয়ে না হলে নাইবা হোল!

আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন আমাদের কাছে বিয়ে মানেই ছিলো শামিয়ানা টাঙ্গানো বিয়েবাড়ী, লাল শাড়ীপরা কাঁদো কাঁদো বৌ, লজ্জা লজ্জা চেহারা করে বসে থাকা বর, মজার মজার খাবার আর ছুটাছুটি করার অবাধ স্বাধীনতা। কিন্তু বড় হতে হতে, বড়দের অদ্ভুত আচরণ দেখতে দেখতে, পৃথিবীটা একটু একটু করে বিস্বাদ লাগতে লাগতে একসময় মনে হোল এখানে কোনকিছুই যেমন দেখতে আসলে তেমন নয়। ছোটবেলায় বিয়েটাকে যেমন সহজ আর সুন্দর একটা জিনিস মনে হত, বড় হয়ে দেখি এটা অনেকের কাছে একটা ভালো ব্যাবসা আর তখন বিয়ের ওপর থেকে আস্থাই উঠে গেল। আমার self realization খুব ভালো। তাই আমার জন্য যখন প্রস্তাব আসতে শুরু করল তখন আমি চিন্তা করতে শুরু করলাম ওরা কেন আমার ব্যাপারে আগ্রহী হবে? আমি একজন ছাত্রী মাত্র যার এখনো কোন যোগ্যতা সৃষ্টি হয়নি, দেখতেও ভালো না, কোন কাজকর্ম পারিনা – তাহলে ওরা কি দেখে আমার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করছে? আমাকে দেখে নিশ্চয়ই নয়!

সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম বিয়ে করবনা। বাবার সাথে আলাপ করলাম। বললাম, “যে টাকাটা তুমি আরেকটা ছেলেকে দেবে কষ্ট করে আমার সাথে থাকার জন্য, সেটা দিয়ে আমাকে একটা ফ্ল্যাট আর একটা দোকান কিনে দাও। আরেকজনকে কষ্ট দিয়ে লাভ কি? আমি নিজেই এই দিয়ে চলতে পারব”।

যখন সেই আমিই একটা বিয়ের প্রস্তাবে রাজী হয়ে গেলাম তখন সবাই খুব অবাক হয়ে গেল। পরে ওরা বুঝতে পারল যখন দেখা গেল সেই ভদ্রলোক শুধু এই বলেই ক্ষান্ত দেননি যে “আমি কিছু চাইনা”। অনেক ছেলেই বলে, “আমি কিছুই চাইনা, দোয়াই কাম্য”। যারা কিছু চায় তাদের চাহিদা তো পূরণ করা যায়। কিন্তু যারা কিছু চায়না তারা দেখা যায় যাই দেয়া হয় নিতে থাকে, কখনো বলেনা যে, “ব্যাস, এতেই চলবে”। কিন্তু উনি না নিয়ে প্রমান করলেন যে উনি আসলেই কিছু চাননা।

আর তাই আমার পরিচিতাদের দেখে আমার খুব কষ্ট লাগে যখন দেখি তারা বিয়ের ব্যাপারে এত অন্ধভাবে এগিয়ে যায় যে তাদের লক্ষ্যবস্তু ছাড়া আর কিছুই তাদের নজরে আসেনা।

আমাদের এক বান্ধবী, অসম্ভব সুন্দরী, বহু প্রস্তাব বেছেবেছে পরে এক ইউনিভার্সিটির লেকচারারের প্রস্তাব ওর পছন্দ হোল। আমরা সবাই ওর জন্য উৎফুল্ল। কিন্তু ক’দিন পর শুনলাম ওর বাবা ওনার একমাত্র প্রপার্টিটা বিক্রি করে মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন। আমরা সবাই ওকে বল্লাম, “তুমি তো ছেলের সাথে কথা বল, ঘুরতে যাও, কথায় কথায় একদিন তাকে বল যে কিভাবে তোমার বাবা তোমাকে বিয়ে দিচ্ছেন। ওনার প্রপার্টিতে তো তোমার ভাইদেরও হক আছে। তুমি কেন নিজের স্বার্থে তাদের বঞ্চিত করবে? তুমি তাকে বোঝাও যে তুমি একজন চাকুরীজিবী মেয়ে, নিজেই ভালো ইনকাম কর, উনি একজন শিক্ষিত লোক, ভালো চাকরী করেন। তোমার বাবার ব্যাপারে কন্সিডার করলে আল্লাহ তোমাদের বরকত দেবেন।” সে ভীষণ গাল ফুলিয়ে অভিমান করে বল্ল, “আমি এখন কিছুই বলবনা, বিয়ের পর আমি সব বলব”। আমরা সবাই হতবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। বিয়ের পর বললে কি লাভ হবে? ওর বাবার প্রপার্টি কি ফেরত আসবে না ওরা যা যা নিয়েছে তা ফিরিয়ে দেবে!

আরেক বান্ধবীর বিয়ে হয়েছিলো জয়েন্ট ফ্যামিলিতে। সে একদিন অহংকার করে বোঝাচ্ছিলো ওর বিয়ের সময় ওর বাবামা কিছুই দেয়নি। কিন্তু যখন কয়েকবছর পর ও শ্বশুরবাড়ী থেকে আলাদা হয়ে গেল তখন ওঁরা ওর বাসার ফার্নিচার থেকে শুরু করে সমস্ত কিছু দিয়েছেন। আমি আমার স্বল্পমস্তিষ্কে বুঝতে পারলাম না এর মাধ্যমে ওর বাবামা কি বোঝালেন? ওঁরা কি বোঝালেন যে শ্বশুরবাড়ী থেকে মেয়ে আলাদা হয়ে যাওয়ায় ওঁরা কতখানি খুশী হয়েছেন? নাকি চাকুরীজিবী মেয়ে আর জামাইকে তেলা মাথায় তেল দিয়ে ওঁরা প্রমান করলেন ওঁদের কত টাকা আছে?

আমার এক ভাই আমাকে এক বিয়ের কাহিনী শুনিয়েছিল। অভিভূত হয়ে গেছিলাম। এক বৌদ্ধ বিয়েতে দাওয়াত খেতে গিয়ে সে দেখল বরপক্ষ আর কণে পক্ষের মধ্যে তুমুল বিতর্ক চলছে। ঘটনা কি? বিতর্কের বিষয় হোল কতটুকু নগদ দেয়া হবে আর কতটুকু পরে দিলেও বরপক্ষ কন্সিডার করবে। বর নিজেও রয়েছে তার্কিকদের মধ্যে। কণে অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে আছে তার বাবার লাঞ্ছনা আর গ্লানির দৃশ্যের প্রতি। অনেকক্ষণ পর ঠিক হোল যেভাবেই হোক অর্ধেক টাকা দেয়া হলে বিয়ে হবে নতুবা নয়। বাবা ভাবছেন কি করে এই অনুষ্ঠানের মধ্যেই উনি টাকা সংগ্রহ করবেন। বর গিয়ে কণেকে বল্ল, “আমি দয়া করে তোমাকে বিয়ে করতে রাজী হলাম”। সবাই স্তম্ভিত হয়ে শুনলো, কণে বল্ল, “আমি রাজী হলাম না”। মেয়ের বাবাসহ সবাই কণেকে বোঝাতে চেষ্টা করল যে এই বিয়ে ভেঙ্গে গেলে হয়ত মেয়ের বদনাম হয়ে যাবে, আর কখনো বিয়ে হবেনা। কিন্তু মেয়ে বল্ল, “বিয়ে না হলে নাইবা হোল। বিয়ে হতেই হবে বলে তো কোন কথা নেই। ওঁরা বিয়ের আসরেই এরকম আচরণ করছেন, বিয়ের পর কেমন আচরণ করবেন?” বরপক্ষের লোকজন হম্বিতম্বি করে চলে গেল কিন্তু মেয়ে কিছুতেই রাজী হলোনা। মেয়ের বাবা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন, কণেপক্ষের লোকজন বিমর্ষ। এমনসময় আমন্ত্রিতদের মধ্যে একজন ছেলে এসে বল্ল, “আমার খুব একটা টাকাপয়সা নেই, কিন্তু লেখাপড়া জানি, একটা ছোটখাট চাকরী আছে। আপনাদের যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আমি বিনা যৌতুকে ওকে বিয়ে করতে চাই”। বিয়ে হয়ে গেল! আমরা আল্লাহর উপর বিশ্বাসের কথা বলি কিন্তু কার্যত এতটুকু বিশ্বাসের পরিচয় আমরা অনেকেই দিতে পারিনা। পারলে হয়ত আমাদের জীবনগুলো অন্যরকম হত।

আমাদের বিয়ের পর আমাদের অনেক বন্ধুবান্ধব অনুপ্রাণিত হয়ে যৌতুকবিহীন বিয়ে করলেন। তাদের মধ্যে এক ভাইয়ের কাহিনী খুব মজার। উনি গোঁড়া থেকে বলে আসছেন উনি ওনার শ্বশুরকে বলেছেন উনি যৌতুক নেবেন না আর ওনার বন্ধু আমাদের বলে চলেছেন, “আপনারা ওর কথা বিশ্বাস করবেন না”। বিয়ের দিন গিয়ে দেখি ওনার শ্বশুর ওনার চাহিদার তালিকায় অতিষ্ঠ হয়ে সব দিয়েছেন। কমিউনিটি সেন্টারে পুরুষ আর মহিলাদের খাবারের জায়গার ঠিক মধ্যখানে বিশাল জায়গা জুড়ে গাড়ি থেকে শুরু করে ছুরি বটি পর্যন্ত যা যা দিয়েছেন সব সাজিয়ে রেখে দিয়েছেন যেন সবাই বুঝতে পারে ছেলে কিরকম যৌতুকবিহীন বিবাহ করছে! বর লজ্জায় মাথাই তুলতে পারলোনা সম্পূর্ণ বিয়েতে!

ছেলেমেয়েদের বিয়েতে বাবামা খুশী হয়ে কিছু দিলে তাতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু অনেক ছেলেমেয়েরাই আশু আনন্দের ঝোঁকে ভুলে যায় তাদের বাবামা’র সামর্থ্যের কথা, তাদের খুশীর কথা ভেবে মুখ বুজে অনেক দুঃখ কষ্ট চেপে যাওয়ার কথা। সারাজীবন পেলেপুষে, লেখাপড়া শিখিয়ে বড় করার পর এই কি হওয়া উচিত তাদের প্রতিদান? মানলাম অনেকের বাবামা সামর্থ্যবান। কিন্তু তারা তাদের ছেলেমেয়ের বিয়েতে যা করতে পারছেন তা অনেকেই তাদের সন্তানদের জন্য করতে পারেন না। তখন তা পরিবারের অবুঝ সদস্যদের জন্য মর্মবেদনা আর অসহায় দায়িত্বশীলদের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর তার চেয়েও যারা দরিদ্র তারা যৌতুকের জন্য হয় মেয়ে বিয়ে দিতে পারেন না, নয় যৌতুকের ওয়াদা পূরন করতে গিয়ে ধারকর্জ করে দেউলিয়া হন, নতুবা তাদের মেয়েরা কষ্ট পেতে থাকে এই ওয়াদা পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত আর কপাল খারাপ হলে ঘরে আসে মেয়ের লাশ অথবা তার আত্মহত্যার খবর। ভালো করে ভেবে দেখলে বোঝা যায়, এর দায়ভার আমাদের। আমরা আমাদের অর্থসম্পদের জৌলুস দেখাতে গিয়ে অনেক অনেক মানুষকে হতাশা, গ্লানি এমনকি মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছি। আমরা যদি আমাদের সন্তানদের শুধু ভালোবেসেই কিছু দেই, তাহলে লোকের জানার দরকার কি আমরা কি দিচ্ছি বা আদৌ দিচ্ছি? আর সব ভালোবাসা বিয়ের দিনই দিয়ে দিতে হবে বলে কি কোন কথা আছে? তার শ্বশুরবাড়ীর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, তার সুবিধা অসুবিধা দেখা, তার যেকোন প্রয়োজনে হাত বাড়িয়ে দেয়া, এভাবে কি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটানো যায়না?

এর উল্টোটাও আমাদের সমাজে খুব কমন। ইসলামে তো যৌতুকপ্রথা নেইই, তবুও এর কথা সব বিয়েতেই একটা প্রধান আলোচ্য বিষয়। কিন্তু মোহরানা নির্ধারণ করার সময়ও ছেলের সামর্থ্যের প্রতি দৃষ্টি রেখে ঠিক করা হয়না। ফলে কার্যত খুব কম মেয়েই তাদের মোহরানা বুঝে পায়। অথচ রাসুল (সা) বলেছেন, অল্প মোহরানার বিয়েই অধিক বরকতপূর্ণ! মোহরানা যথা সম্ভব দ্রুত আদায় করার মধ্যেই মেয়ের সম্মান।

আমাদের এক ভাইইয়ের কাহিনী শুনে খুব ভালো লেগেছিল। শুনলাম বিয়ের আসরে বসে পকেট থেকে ৫০,০০০ টাকা বের করে তিনি বললেন, “আমি এতটুকুই মোহরানা দিতে পারব, এখন আপনারা মেয়ে দিতে রাজী থাকলে দেন, নইলে আমি চলি”। কণেপক্ষ আর কি বলবে? একসাথে মোহরানা আদায়ে ওনার বিয়ে হয়ে গেল!

আমার এক বান্ধবীর বাসায় গিয়ে আমার খুব ভালো লাগত। প্রথম যেদিন ওনার বাসায় গেলাম, উনি বললেন, “আমার বাসায় কোন দু’টা জিনিস একরকম দেখবেন না। আমরা বিয়ের পর একটা পাটি কিনে জীবন শুরু করেছিলাম। তারপর যখন যেভাবে প্রয়োজন হয়েছে, সামর্থ্যমত কিনেছি। আজ আমরা দুজনেই অনেক ভালো চাকরী করি, আলহামদুলিল্লাহ। আমাদের এখন যা ইচ্ছা তাই কেনার সামর্থ্য আছে। কিন্তু আমার ঘরের প্রতিটি জিনিসের সাথে অর্জনের যে সুখ আর মর্যাদা জড়িয়ে আছে তার সাথে কি কোন কিছুর তুলনা হয়?” ওনার ঘরে ঢুকলেই যে শান্তির পরশ পাওয়া যায় সেটা আরো অতুলনীয়।

আমাদের বিয়েতে কোন গান বাজনা লাইটিং হয়নি, আমরা চাইনি। কারণ এসব দিয়ে আমাদের বৈবাহিক জীবনে সুখ নিশ্চিত করা যাবেনা। কিন্তু ঐ টাকাটা দিয়ে একটা গরীব মেয়ের বিয়ে দেয়া যায়। আর তার বরকতের ছোঁয়া আমাদের জীবনে আনন্দ বয়ে আনতে পারে।

জীবনে অনেকসময় অল্প ছাড় দিলে আরো অনেক ভালো কিছু পাওয়া যায়। প্রতিদিন দু’জনে মিলে তিল তিল করে একটা সংসার গড়ে তোলার, সমস্ত সুখদুঃখ ভাগ করে নেয়ার যে আনন্দ, দু’জনের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার যে সুযোগ, রেডিমেড সংসারে তার স্থান কোথায়? যে বিয়ে পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ আর দায়িত্বের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত আর যে বিয়ে লোভ আর ভীতির ওপর স্থাপিত, দু’টোর মধ্যে কি কোন তুলনা হয়?

আমাদের বাবামা তখনই সঠিক পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ পাবেন যখন আমরা তাদের সাহস দেব ধৈর্য্ আর স্থিরতার সাথে, “বিয়ে না হলে নাইবা হোল, বিয়ে হতেই হবে বলে তো কোন কথা নেই।” আর বিয়ে হলে যেন সম্মানের সাথে হয়। এতটুকু আত্মসম্মান কি আমরা অর্জন করতে পারিনা?

3 comments:

  1. গুরুত্বপূর্ণ একটা লেখা। আমার ব্লগস্পটে কমেন্ট আকারে শেয়ার করলাম।... বিয়ে এখন আসলেই আর 'বিয়ে' নেই; হয়ে গেছে পাত্র এবং পাত্রী পক্ষের ব্যবসায়িক লেনাদেনা। দু'পক্ষই তাই ঝানু লোক নিয়ে আসে বিয়ের আসরে, লেনা-দেনার মধ্যে যেনো জিততে পারে! দুঃখজনক।

    ReplyDelete
  2. চমৎকার লেখা। এবং দারুণ অভিজ্ঞতা।

    ফেসবুকে শেয়ার করলাম।

    ReplyDelete