Tuesday, August 10, 2010

রামাদানে জন্মদিন


আমার বয়স তখন সাত বা আট। তখন মাত্র বাংলাদেশে জন্মদিনের অনুষ্ঠান করার চল শুরু হয়েছে। সেবারে আমার জন্মদিন পড়ল রোজার মধ্যে। আমি ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লাম। সারাবছর সব বন্ধুদের জন্মদিনের দাওয়াত খেয়েছি আর আমার বেলা এসে খাওয়াতে পারবনা!

বাবা তখন বিদেশে। আর আমরা আমার ছোটভাইয়ের জন্ম উপলক্ষ্যে দেশে আসার পর মগবাজারে দাদার বাসায় আছি। কি আর করা? শেষমেশ মা’র সাথেই আলাপ করলাম।

মা বল্ল, “তোমার বার্থডের জন্য আমার একটা বাজেট আছে। তবে আমি তোমাকে তিনটা চয়েস দেব। এর মধ্যে তোমার যেটা পছন্দ হবে, সেটাই তুমি পাবে”।
“কি কি?”, বললাম আমি।
“এক, তুমি তোমার সব বন্ধুদের দাওয়াত করে খাওয়াতে পারো কিন্তু কেউ কোন গিফট আনতে পারবেনা। দুই, তুমি যে সবসময় বই বই কর, ঐ টাকা দিয়ে তুমি তোমার পছন্দমত বই কিনতে পারো। তিন, রেললাইনের ধারে যে বস্তি আছে, ওখানকার বাচ্চাদের জন্য ঈদের জামা কিনে দিতে পারো”।
“ঠিক আছে। আমি একটু চিন্তা করে দেখি”।

চিন্তা করতে বসে দেখি আমার ছোট্ট মাথায় কিছুতেই হিসাব মেলেনা। গিফটের ব্যাপারে আমার কোন মাথাব্যাথা ছিলোনা, কিন্তু সবার বাসায় খেয়ে এসেছি, তাদের খাওয়ানোটা একটা দায়িত্ব, এই নিয়ে একটু দুশ্চিন্তা ছিল। কিছুক্ষণ ভাবার পর এই বিষয়ে একটা সিদ্ধান্তে এলাম। যাদের খাওয়াবো তারা সবাই বড়লোক, তারা প্রতিদিনই ভালো খায়। তাছাড়া তাদের তো সারাবছরই খাওয়ানো হয় নানান সময়। সুতরাং তাদের খাওয়ালে বা না খাওয়ালে তেমন কিছু আসবে যাবেনা। একবার জন্মদিন বাদ গেলে এটা তেমন কোন বিরাট ব্যাপার হবেনা। একটা অপশন বাদ দিতে পেরে উৎফুল্ল বোধ করতে শুরু করলাম যে আমি এখন সিদ্ধান্তের অনেক কাছাকাছি।

কিন্তু বাকী দু’টো চয়েস নিয়ে ভাবতে গিয়ে মুষড়ে পড়লাম – কোনটা রাখি আর কোনটা বাদ দেই!

আমি প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া-আসার পথে মগবাজারের মোড়ে নতুন লাইব্রেরীটার দিকে হাভাতের মত তাকিয়ে থাকতাম। প্রতিবছর বইমেলা থেকে বই কেনা হত। আমার দাদার ভাইবোন আমাকে বই দিয়ে ভাসিয়ে দিত। তারপরও মনে হত ঐ লাইব্রেরীতে না জানি কি কি বই আছে! একটা বই নিয়ে আমি পড়ে থাকতাম দিনের পর দিন। পৃথিবীর সবকিছু ভুলে গিয়ে এক কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতাম যেখানে কোন দুঃখ কষ্ট আমাকে স্পর্শ করতে পারতনা। তাই বই কেনার লোভটা ছিল সংযমাতিত।

আবার মগবাজার রেললাইনের ধারে এখন যেখানে বিরাট একটা প্রাইভেট হাসপাতাল সেখানে তখন একটা বিরাট বস্তি ছিলো। আমাদের কলোনীর ভেতর ফেরীওয়ালা বা বস্তির লোকজনের প্রবেশ ছিলোনা। কিন্তু আমাদের বাউন্ডারীর পেছনে যে বাসা ছিলো সে বাসায় অনায়াসে বস্তির লোকজন ভিক্ষা চাইতে আসতে পারত। তাদের শরীরে হাড়চামড়া ছাড়া মাংস থাকত কদাচিৎ। পরনের কাপড় শতছিন্ন। মাথায় তেলের অভাবে চুল হয়ে যেত লালচে জটযুক্ত। আমি আমার টিফিনের টাকা থেকে তাদের টাকা পয়সা ছুঁড়ে দিতাম। শেষ হয়ে গেলে মা আবার টাকা দিত। কিন্তু দু’টো ঘটনা আমার খুব মনে গেঁথে গিয়েছিল।

আমার বয়স যখন ছয়, তখন একবার একটা লোক পেছনের বাসায় এসে ভীষন করুণভাবে ভিক্ষা চাইতে শুরু করল। বেচারাকে ওরা রুটি দিলো, তরকারী দিলো শেষপর্যন্ত তার কান্নাকাটিতে বিরক্ত হয়ে ঝাঁটার বাড়িও দিলো। কিন্তু বেচারা বার বার বলতে লাগল, “আমাকে একটা লুঙ্গি দেন মা!” লোকটার পরনে ছিলো একটা শতছিন্ন ছালা। বাবা বিদেশে, আমি জানিনা বাসায় আদৌ বাবার কোন লুঙ্গি আছে কি’না। নানীকে জিজ্ঞেস করলাম। নানীও বলতে পারলোনা। মা তখন বাজারে। আমি বারবার তাকে জানালা দিয়ে বলতে লাগলাম, “আপনি একটু অপেক্ষা করেন। আমার মা বাজার থেকে এলে আমি মা’কে বলব আপনাকে একটা লুঙ্গি দিতে”। লোকটা কি ভাবল কে জানে, হয়ত ভাবল একটা বাচ্চা জানালা দিয়ে হাঁক দিয়ে বলেছে আর কি! আমি বারবার আমার রুমের জানালা আর বাসার দরজার মধ্যে ছুটোছুটি করতে লাগলাম, যদি মা চলে আসে! কিন্তু আমার শত অনুনয় বিনয় উপেক্ষা করে লোকটা চলে গেল। তার প্রায় পনেরো বিশ মিনিট পর মা বাসায় এলো। আমার চোখমুখ বিশুষ্ক দেখে জিজ্ঞেস করল, “কি ব্যাপার?” আমার হৃদয় তখন ছিন্নবিচ্ছিন্ন রক্তাক্ত। কথা বলতে গেলে চোখে পানি চলে আসবে তাই চুপ করে রইলাম। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমি ঐ কষ্ট ভুলতে পারিনা – একটা লোক একটা লুঙ্গি চেয়েছিলো তার লজ্জা ঢাকার জন্য, খাবার পেয়েও কেঁদেছিল, “খাবার চাইনা, একটা লুঙ্গি দাও মা” – অথচ আমি তাকে কোন সাহায্য করতে পারিনি।

আরেকবার আমার নানার মৃত্যুবার্ষিকীতে আমার মা বস্তির লোকজনকে গরুর মাংস দিয়ে আলু রান্না করে ভাত খাইয়েছিল। কলোনীর ভেতরে বস্তির লোকজনের প্রবেশ নিষেধ। তাই গেটের কাছে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হোল। ছোটবেলা থেকেই আমার মানুষের খাওয়া দেখতে খুব ভালো লাগে। তাই মা’কে বহুকষ্টে রাজী করে আমিও গিয়ে দারোয়ান ভাইদের সাথে গেটে দাঁড়ালাম। সবাই বসে খেতে শুরু করল। খাচ্ছে, নিচ্ছে, খাওয়া শেষ করে চলে যাচ্ছে। যখন প্রায় সবার খাওয়া শেষ, তখন একজন বৃদ্ধ এলেন। লোকটা লুঙ্গি পাঞ্জাবী পরা, ঘাড়ে একটা গামছা। প্রথমে আমি খেয়াল করিনি, পরে হঠাৎ চোখে পড়ল ওনার প্লেটে শুধু আলু, কোন মাংস নেই। আমি দারোয়ান ভাইকে বললাম, “ওনাকে মাংস দেন, ওনার প্লেটে সব আলু”। দারোয়ান ভাই বললেন, “আমি দিতে গেছিলাম, কিন্তু উনি শুধু আলু ছাড়া আর কিছু নিচ্ছেন না”। আমার কথাটা পুরাপুরি বিশ্বাস হোলনা। তাই আমি ওনার কাছে গেলাম জিজ্ঞেস করতে, “আপনি মাংস নিচ্ছেন না কেন?” কিন্তু আমি কিছু বলার আগেই উনি বললেন, “মা আমাকে কয়টা কাঁচামরিচ দেবে?” আমাদের বাসা ছিল গেট থেকে অনেক দূরে। যে বুয়া পানি দিতে এসেছিলেন তাঁকে বললাম, “তাড়াতাড়ি বাসা থেকে কয়টা কাঁচামরিচ নিয়ে আসেন”। উনি বললেন, “আমি আবার এতদূর যাব আসব?” আমি ক্ষেপে গিয়ে বললাম, “ঠিক আছে, আমিই যাচ্ছি”। মা বকা দেবে ভেবে বুয়াই তাড়াতাড়ি কাঁচামরিচ নিয়ে এলো। আমি মরিচ নিয়ে ওনার কাছে গিয়ে বললাম, “কাঁচামরিচের সাথে কয়েটা টুকরা মাংস খান”। উনি স্বাভাবিকভাবেই বললেন, “মা রে, আমি বস্তিতে থাকি, কিন্ত আমার ভিক্ষার অভ্যাস নাই। আজ ক’দিন কোথাও কাজ না পেয়ে লজ্জাশরম বাদ দিয়ে খেতে এসেছি। মাংস খেয়েছি সেই কবে আমার মনেও নাই। তাই এখন আর মাংস খেলে হজম হয়না”। আমার মনে হোল কষ্টে আমার হৃৎপিন্ডটা যেন দোফালা হয়ে গেল। আমি কোন কথা না বলে এক দৌড়ে বাসায় চলে এলাম। আমার বিছানা আর জানালার মাঝখানে জায়গাটায় লুকিয়ে গেলাম যেন কেউ আমাকে দেখতে না পায়। আমার শুধু মনে হচ্ছিলো, আমরা কত খাবার ফেলে দেই আর কতলোক না খেতে খেতে খাবার পেলেও আর খেতে পারেনা! আমি যদি কাঁদতে পারতাম তাহলে সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত আমি লোকটার জন্য কাঁদতে থাকতাম – এত কষ্ট সেদিন আমার ছোট্ট বুকটায় জমা হয়েছিল।

সিদ্ধান্ত নিলাম, বইয়ের মায়া ছাড়তে হবে। মন শক্ত করে মা’কে গিয়ে বললাম, “বস্তির ছেলেমেয়েদের ঈদের জামা দিলে আমি সবচেয়ে খুশী হব”।

পরদিনই মা হোসেন ভাইয়াকে নিয়ে গিয়ে বাজার থেকে এক বস্তা জামাকাপড় নিয়ে এলো। লালনীল, চকমকে ঝকঝকে, ছোটবড়, ফ্রক শার্ট। হোসেন ভাইয়া আমার ছোটবেলা থেকে আমাদের বাসায় কাজ করে। ওর একমাত্র কাজ ছিল আমাকে ক্ষেপানো। তাই ও যখন বল্ল, “এখানে সব না, আরো কাপড় আসছে”, আমি ভাবলাম ও আবার আমার সাথে ফাজলামী করছে। কিন্তু প্রায় পনেরো বিশ মিনিট পর দেখলাম অনেক অনেক কাপড়সহ একটা ঠেলাগাড়ী আমাদের বাসার সামনে এসে দাঁড়ালো, তখন তো আমি খুশীতে দিশাহারা! হোসেন ভাইয়া আর বুয়ার সাথে আমিও দো’তলায় কাপড় ওঠাতে চাইলাম। মা বল্ল, “ওগুলো সব বস্তা করে বাঁধা, এত ওজন তুমি আলগাতে পারবেনা। সব তোলা হলে আমি তোমাকে দেখাব”। আস্তে আস্তে আমার রুমের অর্ধেকটাই ভরে উঠলো নানান রঙের নানান ধরণের কাপড়ে।

সব কাপড় একত্রিত হওয়ার পর মহা উৎসাহে মা, নানী আর আমি মিলে এগুলো খুলে ছেলেদের কাপড়, মেয়েদের কাপড়, বড় কাপড়, ছোট কাপড় সব আলাদা করলাম। এগুলো নিয়ে আমার জল্পনা কল্পনার অন্ত নেই! এগুলো কবে দেয়া হবে, কিভাবে দেয়া হবে, দুষ্ট বাচ্চাদের দেয়া হবে কি’না। মা বল্ল, “রোজা শুরু হলে যখন ওরা ইফতার নিতে আসবে তখন প্রতিদিন ইফতারের প্যাকেটের সাথে ওদের কাপড় ছুঁড়ে দেয়া হবে। অন্যরা খবর পেয়ে আসবে। এভাবে রোজার ভেতরেই সবাইকে কাপড় দেয়া হয়ে যাবে। আমি মহা উৎসাহে রোজার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।

আমি রোজা রাখা শুরু করেছি ছ’বছর বয়স থেকে। তখন মা নানী সেহরীতে ডাকতে চাইতনা। আমি কান্নাকাটি করতাম, রাগ করতাম। কখনো আধাদিন রোজা রাখার পর চালাকি করে রোজা ভাঙ্গিয়ে দিত। শেষমেশ পাশের বাসার মিষ্টিদাদু, যিনি আমাকে নামাজ শিখিয়েছেন, আমার পক্ষে এলেন। মা’কে বোঝালেন, “একটা রোজা রাখতে দাও। ওর শখটা পূরণ হোক”। প্রথম যেদিন রোজা রাখলাম আমার স্ফূর্তি দেখে কে? খেলতে খেলতে টেরই পেলাম না দিন কোনদিক দিয়ে গেল! মিষ্টিদাদু খবর দিলেন, প্রথম রোজা রাখার উপহার হিসেবে ওনার বাসায় ইফতারের দাওয়াত। উনি আমাকে খুব আদর করতেন। ওনার ফ্রিজে আমার জন্য সবসময় ফিরনী করা থকত, বড় বড় বয়মে গুড় আর তেঁতুল। এইসব লোভ দেখিয়ে উনি আমাকে নামাজ শেখাতেন! তাই জানতাম ইফতারের দাওয়াত ভালোই হবে। কিন্তু ওনার বাসায় গিয়ে তো আমার চক্ষু চড়কগাছ! টেবিল ভর্তি করে ফেলেছেন উনি বুট পেয়াজু হালিম মিষ্টি পিঠা কেক বানিয়ে! জীবনের প্রথম রোজা সার্থক করে খেলাম। নিজেকে এত স্পেশাল মনে হোল যে তার পর থেকে রোজা রাখা আমার জীবনের লক্ষ্যে রূপান্তরিত হয়ে গেল!

সেবারও খুব উৎসাহ নিয়ে ইফতারের অপেক্ষা করতে শুরু করলাম। ইফতারের সময় ওরা দল বেঁধে আসত ইফতার নিতে। মা ওদের সাইজ দেখে কাপড় ঠিক করে দিত। তারপর আমরা ইফতার আর কাপড় একসাথে প্যাকেট করে ছুঁড়ে দিতাম। একেকদিন একেক গ্রুপ আসত। অনেক ছেলেমেয়েদের দেখলাম যারা আগে কোনদিন আসেনি। ইফতারের সাথে কাপড় পেয়ে প্রথমে ওরা খুব অবাক হয়ে যেত। তারপর যখন ওরা বুঝতে পারত এটা নতুন কাপড় আর কাপড়টা ওদের, ওদের মুখটা খুশীতে জ্বলে উঠত। ওদের মুখের হাসি দেখে আমার প্রাণ জুড়িয়ে যেত। ওরা কোনদিন ধন্যবাদ বা থ্যাংক ইউ বলতে শেখেনি, কিন্তু ওদের চেহারার ঝলকানি অনেক বিরস থ্যাংক ইউর চেয়ে অনেক মুল্যবান ছিল কারণ এতে ছিল অন্তর থেকে কৃতজ্ঞতার ছোঁয়া।

এভাবেই চলছিল রোজার সুন্দর দিনগুলো। একসপ্তাহ বা দু’সপ্তাহ পর একদিন মা হুড়োহুড়ি করে আমাকে রেডি করে বাইরে নিয়ে চল্ল। কিছুতেই বলবেনা কোথায় যাচ্ছি। গেটের কাছে গিয়ে দেখি রিক্সাও নিলোনা। হাঁটতে হাঁটতে আমার বুক ধকধক করতে শুরু করল। তারপর দেখি সত্যি সত্যিই আমরা লাইব্রেরীতে ঢুকলাম! প্রথমে আমি খুব ভদ্রভাবে মা’কে বললাম, “আমি কয়টা বই কিনতে পারব?” মা যখন বল্ল, “তোমার ইচ্ছামত”, আমি সম্পূর্ণ পাগল হয়ে গেলাম! আমি জীবনে অনেক বই কিনেছি। কিন্তু সেদিন যে বইগুলো কিনেছিলাম আমার আজও তাদের নাম মনে আছে। যা কখনো কল্পনাও করিনি তা পেলে কেমন লাগে তা সেদিনই বুঝেছিলাম।

রোজার তৃতীয় সপ্তাহে আমার জন্মদিন ছিলো। সেদিন দেখি মা অনেক রান্না করতে শুরু করল। আমি বারবার গিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করছি, “এত রান্না করছ কেন, কেউ আসবে?” মা বলছে, “আজকে তোমার জন্য স্পেশাল রান্না, তুমি যা যা খেতে পছন্দ কর”। কিন্তু পরিমাণ দেখে আমার কেমন যেন খটকা লাগছে! বিকেলে আমি ঘুমাচ্ছি। নানী এসে বল্ল, “ওঠো, তোমার বন্ধুরা এসেছে!” আমি ভাবলাম ওরা হয়ত খেলতে এসেছে। সবাই মিলে খেলতে খেলতে দেখি মাগরিবের আজান দিয়ে দিল। ভাবলাম, এখন কি হবে? এতগুলো ছেলেমেয়ের ইফিতারের কথা তো মা’কে বলা হয়নি! দেখি মা সবাইকে ইফতারের প্লেট দিতে লাগল। আমি তো হতবাক! কিছুক্ষণ পর শবনম মুশতারী আন্টির মেয়ে টোরী বল্ল, “আন্টিই তো আমাদের দাওয়াত দিয়েছেন, তাই তো আমরা সেজেগুজে বিকেলেই চলে এসেছি!” কি মজা!

চতুর্থ সপ্তাহে বাবা ছুটিতে এলো। আমার তো সেদিনই ঈদ! তার ওপর বাবা আমার পছন্দে সন্তুষ্ট হয়ে সেবারের মত একটা নিয়ম ভঙ্গ করল। বাবা সবসময় বলত, “আমরা তো সারাবছরই ভালো জামাজুতা কিনি। ঈদের সময় নিজেদের জন্য কিনতে হয়না। এ’সময় তাদের দিতে হয় যারা সারাবছর কিনতে পারেনা। সেসব আত্মীয়স্বজনকে দিতে হয় যারা আমাদের কাছে থাকে সবসময়”। সেবার বাবা আমার জন্য ভারী সুন্দর একটা ঈদের জামা এনেছিলো আবুধাবী থেকে। বুঝে নিলাম আমি সবার কথা ভেবেছি দেখে আল্লাহ আমার জন্য খুশীর পাত্র পরিপূরণ করে দিয়েছেন!

কিন্তু সবচেয়ে ভালোটা তখনো বাকী ছিল।

আমি বরাবরই ঘুমকাতুরে ছিলাম। ঈদের দিন মা আমাকে ডাকতে ডাকতে বিরক্ত হয়ে ডাকাই বন্ধ করে দিয়েছে। ন’টার সময় নানী এসে বল্ল, “তাড়াতাড়ি ওঠো, জানালা দিয়ে দেখ!” ভাবলাম নানী আমাকে ওঠানোর জন্য চালাকি করছে। কিন্তু বাইরে অনেক শব্দ হচ্ছে। কৌতুহলী হয়ে, অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিছানা ছেড়ে জানালার দিকে এগিয়ে গেলাম। তখনো চোখে ঠিকমত দেখতে পাচ্ছিনা। লালনীল, সবুজ, হলুদ, কমলা, গোলাপী অনেক রঙের মেলা দেখতে পাচ্ছি। প্রত্যেকটা রঙের মাঝখানে একটা করে ছোট্ট মাথা! আমাকে জানালায় দেখামাত্র কোরাস শুরু হোল, “ঈদ মুবারক!” ঘুম ছুটে গেল। দেখি বস্তির সব ছেলেমেয়েরা ঈদে নতুন জামা পরে বাউন্ডারীর বাইরে এসেছে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে। মনে হোল ঈদ আসলেই ভারী সুন্দর একটা দিন। চোখ মুছে বললাম, “ঈদ মুবারক!”

2 comments:

  1. পড়তে পড়তে শেষ পর্যন্ত এসে কী কমেন্ট করবো আর ভাষা খুঁজে পাচ্ছিনা... বই আর অন্য যেকোনো পছন্দের মাঝখানে বইয়ের মায়া ছাড়তে গিয়ে আপনার নিশ্চয়ই কষ্ট হয়েছিলো ম্যাডাম :( তবে মনে হচ্ছে সে ঈদটা আপনার জীবনের অন্যতম সেরা একটা ঈদ ছিলো! :)

    ReplyDelete
  2. চোখ ভিজে গিয়েছে আপু ঃ')

    ReplyDelete