Tuesday, February 19, 2013

বাবামায়ের তিনটি দায়িত্ব


১


 আমরা, আই আই ইউ সি মহিলা ক্যাম্পাসের সহকর্মীরা, প্রায়ই আসা যাওয়ার পথে নীচতলায় অফিসে বসে কিছুক্ষণ গপ্পসপ্প করতাম- ক্যাম্পাসের খোঁজখবর নিতাম, পরস্পরের সাথে কুশল বিনিময় করতাম। একদিন বাসায় ফেরার পথে অফিসে গেলাম। দেখি ফারহানা ছাড়া আর কেউ রুমে নেই। আমাকে দেখেই ফারহানা বলল, ‘আপা, আপনাকেই খুঁজছিলাম!’

'কি সৌভাগ্য আমার! বললাম, ‘কি করতে পারি আপনার জন্য?’

ফারহানা বলল, ‘আপা, আমি একটা বিয়েতে দাওয়াত পেয়েছি, পাত্রীর নাম কি আপনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারবেন না!’

ফারহানার মেলামেশার পরিধি কল্পনাতীত। তবু আমি খুব কনফিডেন্সের সাথে উত্তর দিলাম, ‘আজকালকার বাবামায়েরা নামের ব্যাপারে অনেক উদার। মন্টি, মিন্টু, মন্টু, পিন্টু, আপেল, ডালিম, কমলা, আঙ্গুর কিছু একটা রেখেই কাজ সেরে ফেলেন। সুতরাং, আমি এখন আর কোন নাম শুনেই আশ্চর্য হইনা’।

ফারহানাও সমান কনফিডেন্সের সাথে উত্তর দিল, ‘কিন্তু এই নাম শুনে আপনি অবশ্যই আশ্চর্য হবেন বাবামা কি করে সন্তানের এই নাম রাখতে পারেন’।

আমি কৌতুহলী হয়ে নাম জিজ্ঞেস করলাম। ফারহানার উত্তর শুনে আমার কান, গাল, গলা পর্যন্ত লাল হয়ে উঠল। আমি বললাম, ‘অসম্ভব, হতেই পারেনা!’

ফারহানা বলল, ‘আমি জানতাম আপনি এই কথা বলবেন, তাই আপনাকে প্রমাণ দেয়ার জন্য আমি বিয়ের কার্ড নিয়ে এসেছি। এই দেখেন...’

পরিষ্কার দেখতে পেলাম ছাপার অক্ষরে লেখা, পাত্রীর নাম- ‘পেন্টি বেগম’।

 
 
২


  কিছু মানবসন্তানের অমানুষসুলভ আচরনে স্তম্ভিত হয়ে হাফিজ সাহেব আর আমি আলোচনা করছিলাম, এমন গণহারে দানব পয়দা হবার রহস্য কি?

আমি আমার ধারণা শেয়ার করলাম, ‘দেখেন, আল্লাহ বাবামাকে সন্তানের প্রতি দায়িত্ব দিয়েছেন তিনটিঃ সন্তানের ভাল নাম রাখা, তাকে ইসলামি শিক্ষা দেয়া এবং উপযুক্ত বয়সে বিয়ে দেয়া। আমাদের বাবামায়েরা এর একটিও করেন না। তাহলে তাদের সন্তানরা ‘মানুষ’ হবে কি করে?’

উনি বললেন, ‘কি বল? আমি তো দেখি আজকালকার বাবামায়েরা বাচ্চারা ছোট থাকতে শুধু বাচ্চার পেছনে খাওয়া নিয়ে দৌড়ায় আর বাচ্চা একটু বড় হলে বাচ্চাকে নিয়ে কোচিং সেন্টারে দৌড়ায়। আমাদের বাবামায়েরা কি এসব ব্যাপারে এত সচেতন ছিলেন? আমরাই বা কি এইসব বিষয়ে ভাবিত? অথচ তুমি বলছ ওরা কিছু করেন না?!’

আমি বললাম, ‘শোনেন, আপনি ফরজ নামাজ বাদ দিয়ে অনেক অনেক অনেক নফল নামাজ পড়লেন, আপনার কি ফরজ আদায় হবে?’

'মানে?’

'আল্লাহ যে তিনটি দায়িত্ব বাবামায়ের ওপর ফরজ করেছেন তার বাইরে কোনকিছু করার জন্য বাবামা বাধ্য নন। একজন মা তাঁর সন্তানকে দুধ দিতে বাধ্য নন, একজন বাবা তাঁর সন্তানকে মাস্টার্স পিএইচডি করাতে বাধ্য নন ইত্যাদি। কিন্তু প্রায় সকল বাবামাই এসব করে থাকেন, এর সবই সন্তানদের প্রতি তাদের ইহসান। কিন্তু তারা যদি মূল তিনটি দায়িত্ব পালন না করেন তাহলে কি নফল দিয়ে ফরজের স্থান পূরণ হবে? এটা এমন ব্যাপার যেন আপনি দরজা, জানালা, দেয়াল, ছাদ সবই তৈরী করলেন কিন্তু পিলার দিতে ভুলে গেলেন’।

'বুঝলাম’।

'যেমন ধরেন, বাবামার প্রথম দায়িত্ব সন্তানের সুন্দর নাম রাখা। কারণ কি? কারণ, একটি সুন্দর নাম মানুষের চরিত্রের ওপর একটি পজিটিভ প্রভাব রাখতে পারে। ধরুন,আমার নাম। আমি ছিলাম অসম্ভব মুখচোরা, অলস, অসামাজিক, বইপোকা। কিন্তু আমার নামের কারণে আমার শিক্ষকরা তাগাদা দিতেন, ‘তুমি যদি উদাহরণ স্থাপন না কর তাহলে অন্যরা তোমাকে অনুসরন করবে কি করে?’ ‘পথপ্রদর্শক’ নামের কারণে শেষমেশ আমাকে বাধ্য হয়েই মাঠে নামতে হোল। স্পোর্টস, বিতর্ক, বক্তৃতা, লেখালেখি সব শুরু করি তাঁদের চাপাচাপিতে। সেক্ষেত্রে একজন মেয়ের নাম যদি হয় বিউটি বা সমার্থক কিছু, সে কি উন্নত ব্যাক্তিচরিত্র গঠন কিংবা আত্মিক উন্নয়নের প্রতি আকৃষ্ট হবে, নাকি বাইরের সৌন্দর্য্য বিকশিত করার প্রতি যত্নশীল হবে? আমাদের বাবামায়েরা সন্তান হবার পর নাম খোঁজেন আনকমন। আনকমন খুঁজতে খুঁজতে এমন সব বিদ্ঘুটে নাম বের করেন যার অর্থও তাদের সঠিকভাবে জানা নেই। তাই যে উদ্দেশ্যে উত্তম নাম রাখতে বলা হয়েছে তা সফল হয়না। তদুপরি, বহু খুঁজেপেতে একটি আনকমন নাম রাখার পর তারা তাকে একটি ডাকনাম দেন। ভাল নামটির অস্তিত্ব রয়ে যায় শুধু স্কুলের খাতায় আর পরীক্ষার ফর্মে। আপনিই বলুন, একটি ছেলের নাম যদি হয় মন্টু, তাহলে তার চরিত্রের ওপর এই নামের কি কি পজিটিভ প্রভাব থাকতে পারে?’

'এই জন্যই বুঝি তুমি বাচ্চাদের নাম রাখার ব্যাপারে এত চিন্তা গবেষণা করেছিলে?’

'তা আর করলাম কই? তখন যদি আজকের মত জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা থাকত তাহলে আমার মেয়ের নাম হত নুসাইবা আর ছেলের নাম হত হামজা’।

'হা হা হা। রাদিয়া আর রিহাম খুব একটা খারাপ না। নামের ব্যাপারটা এখন আমার কাছে মোটামুটি ক্লিয়ার। তারপর বল’।

'বাবামার দ্বিতীয় দায়িত্ব সন্তানকে ইসলামি শিক্ষা দেয়া। কোথাও কিন্তু বলেনি ছেলেমেয়েকে স্কুল কলেজে না পাঠালে, মাস্টার্স পিএইচডি না করালে বাবামাকে দায়ী করা হবে। কিন্ত নৈতিক শিক্ষার ব্যাপারে বাবামা জবাবদিহি করতে বাধ্য হবেন। আমার মনে হয় এর মূল কারণ, কোন ব্যাক্তির যদি তার সৃষ্টিকর্তা এবং প্রভুর ব্যাপারে সম্যক ধারণা থাকে, তার যদি জবাবদিহিতার ভয় থাকে, সে যদি জানে সে কোন অন্যায় করে কোনভাবেই পার পাবেনা- সেই ব্যাক্তি কোনদিন কোন গর্হিত অন্যায় করতে পারবেনা, স্বভাবদোষে টুকটাক অন্যায় করলেও তার লক্ষ্য থাকবে যথাসম্ভব দ্রুত নিজেকে পরিমার্জন করা। এভাবে একজন মানুষের প্রতিটি দিন হবে গতকালের চেয়ে আগামীকাল উন্নততর মানুষ হবার প্রয়াস। এই কাজ কি ডাক্তারী, ইঞ্জিনিয়ারিং, বাংলা কিংবা ইংরেজী শিক্ষা দিয়ে হয়? তাই তো দেখা যায় অনেক ইসলাম জানা অশিক্ষিত মানুষ নৈতিকভাবে উন্নত হয়, পথে পাঁচটাকা কুড়িয়ে পেলে খুঁজেপেতে দিয়ে যায়, সবার সাথে ভাল ব্যাবহার করে। আবার অনেক উচ্চশিক্ষিত ডিগ্রীধারী লোক বৌ পেটায়, অন্যের টাকা মেরে খায়, নিজের স্বার্থে অন্যকে খুন করে’।

'হুমম, বুঝলাম। তৃতীয়টা বল। এটায় আমার ইন্টারেস্ট বেশি’।

'কেন, একবার বিয়ে করে সাধ মেটেনি?’

'ক্ষ্যাপ কেন? ছেলেদের কোনদিন বিয়ের সাধ মেটেনা। তাছাড়া তোমার একজন ছোট বোন এলে তোমার কাজকর্মে সাহায্য করবে। তুমি সারাদিন ব্লগে বসে থাকতে পারবে...’

'হুমম, আমি সারাদিন ব্লগে বসে থাকলে আপনার ঘরের এত এত কাজ সব কোন বুয়া করে?’

'আমরা প্রসঙ্গ থেকে সরে যাচ্ছি। বাবামায়ের দায়িত্বের কথা বলছিলে...’

'হ্যাঁ, বাবামায়ের তৃতীয় দায়িত্ব ছেলেমেয়েদের সময়মত বিয়ে দেয়া। একটি নির্দিষ্ট সময় তাদের মাঝে একজন সঙ্গীর চাহিদা সৃষ্টি হবে, এটা আল্লাহই নির্ধারণ করেছেন তাঁর সৃষ্টিকে প্রবাহমান রাখার জন্য। সে সময় সে যদি বাবামায়ের সহযোগিতা না পায় তাহলে তার জন্য সৎ থাকা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকে বাবামাই ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া করাতে গিয়ে বা তাদের ইনকামের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে তাদের বিয়ের ব্যাপারটি ইগনোর করেন। ছেলেমেয়ে অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে জানলেও বলেন, ‘তোমরা যাই কর আমাদের কোন আপত্তি নেই, শুধু লেখাপড়া যেন ঠিক থাকে’। অনেকে আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের দোহাই দিয়ে ভাবেন, ‘নিজেদেরই চলেনা তো বৌ আসলে চলবে কি করে?’...’

হাফিজ সাহেব ইন্টেরাপ্ট করলেন, ‘এই কথাটা কিন্তু ঠিক’।

'না, ঠিক না। আসল কথা হোল আমাদের দেশের বাবামায়েদের অনেকের কাছেই ইসলাম একটা আনুষ্ঠানিক ব্যাপার। কিন্তু এর সাথে সংশ্লিষ্ট যে বিশ্বাস এবং আস্থার ব্যাপার আছে তা তাঁদের অনেকের কাছেই স্বচ্ছ নয়। প্রত্যেক ব্যক্তির রিজিক তাঁর অবস্থানস্থলে পৌঁছে যায়। আমাকে কি আপনি খাওয়ান? না, সেই ক্ষমতা আপনার নেই। আমার রিজিকের মালিক আল্লাহ। আপনি যদি আমাকে কোন মরুভূমির মাঝে ফেলে আসেন তবে সেখানেও তিনি আমার রিজিক পৌঁছে দেবেন। সুতরাং, ছেলেমেয়ে বিয়ে দেয়ার ব্যাপারে বাবামায়ের এই আশঙ্কা অমূলক। তাঁরা সময়মত বিয়ে দেন না বিধায় সন্তানেরা নানান অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ে, যতদিনে তাদের বিয়ে দেয়া হয় ততদিনে তাদের আর বিয়ের প্রয়োজনীয়তা থাকেনা, বিয়ের মাধ্যমে কিছু পার্থিব লাভ এবং সন্তান উৎপাদন ছাড়া আখিরাতের সাফল্য তাঁরা অনুসন্ধান করেন না, যে সংসার করবে বিয়ের ব্যাপারে তার মতামতের কোন গুরুত্ব দেয়া হয়না, ফলে বিয়ে করেও সে নৈতিক অধঃপতন থেকে নিরাপত্তা লাভ করতে পারেনা। সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ চিত্র’।

'আমরা রাদিয়া রিহামকে সময়মত বিয়ে করাব ইনশাল্লাহ’।

'ইনশাল্লাহ’।

'তুমি যে দায়িত্বগুলোর কথা বললে প্রত্যেকটিই কিন্ত মূলত মানুষের নৈতিক ভিতকে শক্ত করার জন্য। সন্তানের লালনপালন মূল দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি’।

'ঠিক। কারণ, ভেবে দেখুন, একটি সন্তানকে তার বাবামা খাওয়ানোর জন্য, পোশাক পরানোর জন্য, আদর করার জন্য, ভাল কথা শিক্ষা দেয়ার জন্য, অন্যায় হতে দূরে রাখার জন্য, তার নিরাপত্তার খেয়াল রাখার জন্য- সবকিছুর জন্য তাঁরা পুরস্কৃত হবেন যেহেতু এগুলো তাদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত নয়। কিন্তু শর্ত হোল তার নৈতিক ভিতটি দৃঢ় করে দিতে হবে। নইলে এত আদরযত্ন করে খাইয়ে পরিয়ে, লেখাপড়া করিয়ে তাঁরা কার্যত তাঁদের সন্তানকে জাহান্নামের জ্বালানী হতে পাঠাবেন!’

'তার মানে আমাদের বাবামায়েরা সন্তানদের যত্ন নিচ্ছেন ঠিকই কিন্তু মূল দায়িত্বগুলোতে গাফলতির কারণে তারা মানুষ না হয়ে দানবে রূপান্তরিত হচ্ছে’।

'জ্বি, বাবামা যদি সন্তানের সামনে সুন্দর চরিত্র, সততা, নৈতিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে না পারেন; তদুপরি তাঁরা যদি শিক্ষার মাধ্যমেও সন্তানের চরিত্রে এই গুণাবলী ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস না নেন; উপরন্তু তাদের সৎ জীবন যাপন করার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন না করেন- তাহলে ওরা কি করে ভাল হতে শিখবে? আমার তো কেবল ভয় হয়, এঁরা যদি কিয়ামতের দিন শাস্তিপ্রাপ্ত হয় তাহলে বাবামাকে টেনেহেঁচড়ে সাথে নিয়ে জাহান্নামে ঢুকবে, ‘আমাকে দোজখে পাঠিয়ে তুমি কিভাবে বেহেস্তে যাবে?’ আল্লাহ যেন আমাদের উত্তম পিতামাতা হবার তাওফিক দেন এবং আমাদের সন্তানদের পৃথিবিতে আমাদের জন্য চক্ষুশীতলকারী এবং কিয়ামতের দিন আমাদের জন্য মুক্তির নিমিত্ত বানিয়ে দেন’।

'আমীন’।

Sunday, February 17, 2013

শিশুরা যখন আয়না

শিশুরা অনেকটা আয়নার মত। ওরা চারপাশে যা দেখে বা শোনে সেটাই আবার প্রতিফলিত করে। ওদের অনেক কথা এবং কাজ আমাদের হাসির উদ্রেক করে বটে, কিন্তু এগুলো নিয়ে সামান্য গভীরভাবে ভাবলে আমরা নিজেদের ব্যাপারে ধারণা করতে পারি বাবামা হিসেবে আমরা কি ধরনের উদাহরণ স্থাপন করছি। গত ক’দিনে দেখা এবং শোনা এমন কিছু ঘটনা আমাকে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছে আমাদের আসলে প্রতিটি কথাবার্তা আচার আচরনে কতটা সচেতন হওয়া উচিত, কেননা শিশুরা তাই গ্রহন করে যা আমরা করি তা নয় যা আমরা বলি। সুতরাং, আমার শিশুটি যদি কোন অন্যায় করে তবে তাকে শাসন করার আগে আমার ভাবতে হবে সে আমাকে অনুকরণ করছে কিনা এবং যদি ব্যাপারটা তেমন হয় তাহলে তাকে শাস্তি দেয়ার আগে আমার নিজেকে সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।

 
১/ রাদিয়া রিহামকে ঘুমোতে যাবার আগে গল্প শোনাচ্ছিলাম। প্রসঙ্গ সুরা লাহাবের ব্যাকগ্রাউন্ড। রাসূল (সা) যখন পাহাড়ের ওপর উঠে সবাইকে ডেকে একত্রিত করলেন এবং ইসলামের কিছু মূলনীতি উপস্থাপন করলেন তখনকার ঘটনার বর্ণনা প্রসঙ্গে জানালাম রাসূল (সা) বলেছেন মিথ্যা বলা, চিটিং করা, চুরি করা, হত্যা করা নিষেধ। মাঝপথে রিহাম জিজ্ঞেস করল, ‘আম্মু, চিটিং মানে কি?’ সাধ্যমত বুঝিয়ে বললাম কিন্তু ধারণা করলাম সে ব্যাপারটা বুঝেনি কারণ এগুলো অ্যাবস্ট্রাক্ট জিনিস এবং শব্দটি অনেক ধরনের কাজকে অন্তর্ভুক্ত করে। একটু পর আবার গল্পের মাঝে বিরতি দিতে হোল। রিহাম বলল, ‘আম্মু, সেদিন রাদিয়া আপু একটা গেম খেলছিল। চারটা দেশের নাম আর চারটা দেশের পতাকার ছবি দেয়া হবে। আপুকে দেশের নামের সাথে পতাকার ছবি মিলাতে হবে। আপু দু’টো মিলানোর পর একটা দেশের পতাকার ব্যাপারে শিওর হতে পারছিলোনা। তখন ও গুগলে গিয়ে ঐ দেশের পতাকা দেখে নিয়ে তারপর উত্তর দিল। এটাই তো চিটিং, তাইনা?’ আমি তো ওর কথা শুনে থ! বলে কি ছেলে, সে তো দেখি আসলেই বুঝেছে চিটিং জিনিসটা কি! তারপর আমাকে একেবারে বাকরুদ্ধ করে দিয়ে সে রাদিয়ার দিকে ফিরে বলল, ‘রাদিয়া আপু, রাসূল (সা) যেভাবে বলেছেন সেভাবেই আমাদের চলতে হবে। তুমি একটা গর্হিত কাজ করেছ। এবার আস্তাগফিরুল্লাহ বল এবং আল্লাহর কাছে মাফ চাও, এর পর থেকে আর কখনো চিটিং করবেনা, বুঝলে?’!

 
২/ আট বছর বয়সী আলিয়ার (ছদ্মনাম) বাবা ওকে অনেকক্ষণ ধরে বোঝালেন ওর চাচা ফুপুরা কত মেধাবী, কত লেখাপড়া জানা, বড় বড় চাকুরী করা মানুষ। তিনি তাকে বোঝালেন ওকে অনেক উচ্চাভিলাষী এবং অধ্যাবসায়ী হতে হবে। লেকচার শেষে তিনি আলিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এবার তাহলে বল, তোমার জীবনের লক্ষ্য কি?’ সে এক মূহূর্তও চিন্তা না করে নির্দ্বিধায় বলল, ‘আমার জীবনের লক্ষ্য হোল কোন কাজ না করা, শুধু খাওয়া দাওয়া ঘুম আর টিভি দেখা’! আলিয়ার বাবা তো হতভম্ব! কিন্তু কিছুক্ষণ চিন্তা করার পরতিনি বুঝতে পারলেন, তিনি যে অফিসে কাজ করেন তা তো তার সন্তান দেখেনা। সে দেখে বাবা বাইরে থেকে আসে, খাওয়া দাওয়া করে, টিভি দেখে, তারপর ঘুমাতে যায়, মাকে কোন সাহায্য করেনা, বাচ্চাদের পড়াশোনায় সহযোগিতা করেনা, বাসার কোন কাজে হাত লাগায়না। সুতরাং সে ধরে নিয়েছে এটাই মানুষের জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত!

 
৩/ তিন বছর বয়সী রানিয়া (ছদ্মনাম) ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছে ওর বাবা ওর মাকে সম্মান করেননা, কষ্ট দেন এবং মা যখন আর সহ্য করতে পারেননা তখন বাবার অনুপস্থিতিতে সন্তানদের সামনেই মনোঃকষ্ট ব্যাক্ত করেন। একদিন মা নামাজ পড়ছেন, বাবা মাকে ডাকছেন, বড়বোন জানালো মা নামাজ পড়ছেন তবু বাবা ডেকে চলেছেন, রানিয়া বাবার সামনে গিয়ে কপাল চাপড়ে বলতে শুরু করল, ‘উফফ, এই লোকটা আমার লাইফ শেষ করে দিল!’ এই বাবার কি ভাবা উচিত নয় তিনি তার সন্তানের সামনে কি ধরনের আদর্শ স্থাপন করছেন?

বিভ্রাট


১/

 আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। ইসলামিক স্টাডিজের শিক্ষক পরীক্ষার সিলেবাস দিয়েছেন মাত্র একটি সুরা মুখস্ত করা- সুরা ইয়াসীন। আল্লাহর রহমতে আমার মুখস্তবিদ্যার দৌড় এত ভাল যে আমার সুরা ইয়াসীনের তিলাওয়াত শুনতে শুনতে অর্ধেক সুরা আমার ছোট ভাইয়ের মুখস্ত হয়ে গেল, কিন্তু আমার কিছুতেই মুখস্ত হয়না। পরীক্ষার দিন সকালে রান্নাঘরে গিয়ে মাকে ধরলাম, মুখস্ত হয়েছে কিনা শোনার জন্য। সবে বলেছি ‘আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম’, সাথে সাথে ফোন বাজতে শুরু করল। মা বলল, ‘আগে ফোনটা ধর, তারপর এসে বাকীটা বল’।

ফোন ধরে বুঝতে পারলাম প্রস্তুতি এত ভাল হয়েছে যে আমার মস্তিষ্ক কিছুতেই আরবী থেকে ইংরেজী মোডে ট্রান্সফার হতে রাজী নয়। কিছুতেই মুখে ‘হ্যালো’ আসেনা! শেষমেশ কথা বলার চেষ্টা করতে গিয়ে বেরোল, ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’!

ঐদিক থেকে আওয়াজ এলো, ‘ফোন ধরে আসসালামু আলাইকুম বললেই যথেষ্ট, বিসমিল্লাহ বলার দরকার হয়না!’

ভাগ্য ভাল ফোনটা বাবা করেছিল!
 
২/

 
বিজ্ঞান ছিল আমার প্রিয় বিষয়। সেভেনে যে শিক্ষক বিজ্ঞান পড়াতেন তিনি প্রতিদিন প্রত্যেক ছাত্রকে আগের দিনের পড়ার আদ্যোপান্ত প্রশ্ন করতেন, প্রায় সবাই কোথাও না কোথাও আটকে যেত, ক্লাস শেষে দেখা যেত ক্লাসে প্রায় সবাই দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাকেও প্রতিদিন কুপোকাত করতে পারতাম আলহামদুলিল্লাহ, তাই একটা সুপ্ত অহংকার হয়ত মনের কোণে কোথাও জন্ম নিচ্ছিল। একদিন আগাছাটা পরিস্কার হয়ে গেল খুব সহজেই।

ক্লাস নাইনে ব্যাঙের চ্যাপ্টারে এক লাইনের প্রশ্নের দুই লাইনের উত্তরে তিন রকম বানান দিয়ে ব্যাঙ শব্দটি লেখার পর বিজ্ঞান শিক্ষিকা জিজ্ঞেস করলেন ঘটনা কি? বললাম, ‘সবই তো সঠিক বানান, তাই সবগুলোই ব্যাবহার করেছি’।

হাসি চেপে প্রসঙ্গ পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে উনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, ফ্যাগোসাইটোসিস বলতে কি বুঝায় বল’।

ব্যাঙ যে প্রক্রিয়ায় ব্যাঙাচি হতে পূর্ণাঙ্গ ব্যাঙে রূপান্তরিত হবার সময় তার লেজটি খসিয়ে ফেলে তাকে ফ্যাগোসাইটোসিস বলে। খুব সুন্দর করে বর্ণনা দিলাম,  তারপর বললাম, ‘একেই বলে ফ্যাসোগাইটোসিস!’

আর সাথে সাথে পুরো ক্লাসে হাসির বন্যা বয়ে গেল, সেই বন্যায় আগাছার বীজখানাও ভেসে চলে গেল!

 
৩/

দশম শ্রেণীতে আমাদের বাংলার শিক্ষক অত্যন্ত মজা করে সাহিত্য পড়াতেন। যেমন নাটক পড়ালে একেকজনকে একেক চরিত্রে অভিনয় করতে দিতেন। ‘কাবুলীওয়ালা’ নাটকে আমি ছিলাম মিনির বাবা। সে সূত্রে তিনি আমাকে ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’ গান গাইতে বাধ্য করলেন। তখন আমার স্ত্রী চরিত্রে অভিনয়রত বান্ধবী রওশন আরা খুব হাসল।

তারপর যখন ‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাস পড়ার পালা এলো তখন আমাদের একেকজনকে একেকটি অংশ পড়ে শোনাতে দেয়া হত। একদিন আমার অংশে ছিল আধুনিক ডাক্তারের আধুনিকমনষ্ক কথাবার্তা, খুব ঠাট নিয়ে পড়লাম। রওশন আরার ভাগে পড়ল বাঁশগাড়ির ডায়ালগ। দরিদ্র ব্যাক্তির জায়গাজমি সুদের দায়ে বেদখল হয়ে যাচ্ছে, সে আকুল আবেদন জানাচ্ছে, ‘হুজুর, দয়া করেন। কনে যাব আমি এতগুলান বাচ্চাকাচ্চা নে?’ 

‘এতগুলান বাচ্চাকাচ্চা’ বলেই রওশন আরা লজ্জায় ইয়া বড় জিভ বের করে দিল, যেন বাচ্চাগুলো সত্যি সত্যিই ওর! ওর লজ্জা দেখে ক্লাসের সবার তখন সে কি হাসি!

 

৪/

প্রেসিডেন্সি স্কুলে আমি পড়াতাম ক্রিয়েটিভ রাইটিং। যদিও খাতা চেক করতে করতে অবস্থা কাহিল হয়ে যেত, এই বিষয়টি পড়াতে আমার খুব ভাল লাগত। এর মাধ্যমে আমি বাচ্চাদের কোমল মনের জানালায় উঁকি দেয়ার সুযোগ পেতাম, অনেকের লেখায় আগামীর সাহিত্যিকের ঝলক দেখতে পেতাম, আবার কেউ কেউ এত মজার সব ঘটনা লিখত যে না পড়লে বিশ্বাস করা যেতনা বাচ্চারা এত মজা করে লিখতে পারে।

একবার ক্লাস ওয়ানে লিখতে দিলাম ‘আমার মা’। এই বিষয়ে লিখতে দিলে ছোট বড় সবাই লিখতে লিখতে পাতার পর পাতা ভরাট করে ফেলে। খাতা চেক করতে করতে খানিকটা ক্লান্তই লাগছিল, কারণ সবার লেখার ধরন মোটামুটি একই ধাঁচের। কিছুক্ষণ পর একটা খাতা পেলাম। শুরুতেই লেখা, ‘আমার মা অত্যন্ত বদরাগী, সুযোগ পেলেই আমাকে ধরে মারে, মাঝে মাঝে আমার বাবাকেও মারে’!

ভাগ্য ভাল ওর মাকে  চিনতাম, তাই মেয়েটির সাহিত্য প্রতিভার প্রশংসা না করে পারলাম না!


৫/

প্রেসিডেন্সিতে একবার ছুটির দিনে আমরা কয়েকজন অফিসে বসে গল্প করছিলাম, সময় যাচ্ছিল ঢিমেতালে।

এক ভদ্রলোক দুই মহিলাকে নিয়ে এলেন তাদের বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি করাতে। যথারীতি তাদের পরীক্ষা নেয়া হোল। একটা বাচ্চা কেজিতে এবং আরেকটা ক্লাস ওয়ানে ভর্তি পেল। কিন্তু ভদ্রলোক বার বার অনুরোধ করতে রইলেন যেন হয় উভয়কে কেজিতে, নয় উভয়কে ক্লাস ওয়ানে দেয়া হয়। আমরা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম একজনের জন্য অপরজনকে প্রমোশন দেয়া যেমন সম্ভব নয়, তেমনি একজনের জন্য অন্যজনকে বঞ্চিত করাও অন্যায়। উনি কিছুতেই শুনবেন না। তখন আমরা ভাবলাম দুই মহিলার সাথে আলাপ করে দেখি তাদের বোঝাতে পারি কিনা। কিন্তু দুই বাচ্চাকে দুই ক্লাসে দেয়ার কথা বলতেই দুই মহিলার মাঝে হুলস্থুল বেঁধে গেল। যেহেতু এদের একজন মুসলিম এবং অপরজন হিন্দু, আমরা ধরে নিলাম বোরকাপরা মহিলা ভদ্রলোকের স্ত্রী এবং অপরজন হয়ত প্রতিবেশি। কিন্তু এদের মধ্যে এত প্রতিযোগিতার কারণ বুঝতে পারলাম না।

স্বাভাবিকভাবেই এক্ষেত্রে একজন বাকপটু লোক প্রয়োজন যে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। দৃশ্যপটে অবতীর্ণ হলেন হাফিজ সাহেব। ভদ্রলোকের সাথে কিছুক্ষণ আলাপসালাপ করার পর হাফিজ সাহেব বললেন, ‘সন্তানদের ব্যাপারে অনেকসময় মহিলারা একটু প্রতিযোগী মনোভাবাপন্ন হয়ে থাকেন। তখন তারা সন্তানদের সীমাবদ্ধতাগুলো বুঝতে চান না। এক্ষেত্রে সম্ভবত বাচ্চাদের বাবারা সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন। আপনি তো আছেনই, অন্যজনের স্বামীকে খবর দিন যেন তিনি একটি সিদ্ধান্ত দিতে পারেন’।

এই কথায় ভদ্রলোক এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন, ‘ভাই, আপনারা এত ঝামেলা করছেন কেন? বাচ্চাদের মা আলাদা বলে কি ওদের বাবা একজন হতে পারেনা?’!

ঘটনার আকস্মিকতায় বিস্মিত হতভম্ব হয়ে আমরা উভয়কে কেজিতে ভর্তি করে নিলাম।