Saturday, June 25, 2011

বিয়ে ১০ (অমানুষ)

‘অমানুষ!’
হুংকার শুনে পেছনে তাকিয়ে নাইমা বুঝতে পারল কথাটা তাকেই বলা হয়েছে। ওখানে শ্বশুরমহাশয়, শ্বাশুড়ীমা, ওর স্বামী বসা। কেউ ওর ননদকে জিজ্ঞেস করলনা কি কারণে এতবড় একটা গালি তাকে দেয়া হোল। শ্বশুরমহাশয় শান্তিপ্রিয় ভালোমানুষ। তিনি নাইমার প্রতি স্ত্রীকন্যাদের এসব ব্যবহার দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু নাক গলিয়ে তাদের বিরাগভাজন হতে নারাজ। স্বামী বেচারা সংসারের চাপে অস্থির। কিছু বলতে গেলে ঘরে অশান্তির সৃষ্টি হবে, ঝটকাটা যাবে নাইমার ওপর দিয়েই। তাই নাইমা নিজেই মুস্তাফাকে বলেছে সে যেন কখনো কিছু না বলে। ফলে সবাই নির্বাক। নাইমার ফ্যালফ্যাল দৃষ্টির জবাবে নাজ কোনপ্রকার ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলনা। মুখ বাঁকিয়ে বীরদর্পে ভেতরে চলে গেল। নাইমা একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস চাপা দিয়ে সাথে তিনজন মহিলা আর ওর বাচ্চাটা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

নাইমার বিয়ে হয়েছে দশবছর। এখনো কেন সে এই ব্যাপারগুলোকে স্বাভাবিক ভাবতে শেখেনি? এতদিনে তো ওর অভ্যস্ত হওয়া উচিত ছিল! নাকি এই ব্যাপারগুলোই এমন যে কেউ অভ্যস্ত হতে পারেনা?

ট্যাক্সিতে বসে ওর মন হারিয়ে যায় স্মৃতির সেলুলয়ডে। দশ বছর আগে যেদিন সে এ’ বাড়ীতে প্রথম পা রাখে, মুস্তাফার বড়বোন ওকে বসিয়ে সুপরামর্শ দেন, ‘দেখ, তুমি কখনো মনে কোরনা তুমি আমাদের একজন। তুমি যাই কিছু করনা কেন, আমরা তোমাকে আপন মনে করবনা, বুঝলে? সুতরাং তুমি আপন হবার চেষ্টাও কোরনা। তুমি বৌ, বৌয়ের মতই থেকো’। নাইমা হতভম্ব হয়ে ভাবে, বৌ কি কোন আলাদা শ্রেণীর প্রাণী? একজন মানুষ যদি একটি পরিবারের জন্য তার বাবামা, ভাইবোন, শৈশব কৈশোরের সোনালী দিন কাটানো সেই বাড়ীঘর, সেই প্রাণের মেলার সাথী বন্ধু- সব, সব ছেড়ে আসতে পারে, তবে কেন সে এই পরিবারে বাকী জীবনটা এক আগন্তুক হয়েই কাটাতে বাধ্য হবে? সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, কথাটা যিনি বললেন তিনি নিজেই আরেক বাড়ীর বৌ! তবু কেন তিনি তাকে আশ্বাস দিলেন না, বললেন না, ‘আজ থেকে এটাই তোমার বাড়ী, তুমি আমাদেরই পরিবারের একজন’? হোক না মিথ্যা! একজন মানুষকে মিথ্যামিথ্যিই যদি একটু ভালোবাসা দেয়া হয়, হতেও তো পারে তা একসময় সত্যি! একটু দরদমাখা কথা, পারে তো বুকের ভেতর সব ছেড়ে আসার ক্ষতে সামান্য মলম হতে!

বিয়ের পরদিন থেকেই নাইমা ব্যস্ত হয়ে পড়ে রান্নাঘরে। মুস্তাফা বিরক্ত হয়, ‘তুমি আসার আগেও পঁয়ত্রিশ বছর এ’ সংসারে খাওয়াদাওয়া চলেছে তো! তোমাকে এখনই রান্নাঘরে যেতে হবে কেন?’ নাইমা বোঝাতে পারেনা সে ঘরের সবাইকে খুশী করতে চায়, সবার ভালোবাসা পেতে চায়। মুস্তাফা বলবে, ‘কেন, আমার ভালোবাসা কি তোমার জন্য যথেষ্ট নয়?’ বেচারা! বয়স হয়েছে কিন্তু ম্যাচুরিটি আসেনি। বিয়ের আসরে নাইমার বান্ধবীর স্বামী মুস্তাফার সালামের জবাব দেয়নি বলে মুস্তাফার চোখ ছলছল করে ওঠে, ঘরে এসে বারবার নালিশ করে নাইমার কাছে। কিন্তু সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে রাজী না ওর মা নতুন বৌকে রান্নাঘরে যেতে বলতে পারে। ওর মায়ের মত মানুষ কি দুনিয়ায় দ্বিতীয়টি হতে পারে? নাইমা এই ধারণা নষ্ট করে দিতে চায়না। সে জানে বিয়ের পর পর ওদের একসাথে সময় কাটানো প্রয়োজন- পরস্পরকে বোঝার জন্য, জানার জন্য- এই সময় আর কখনো ফিরে আসবেনা। কিন্তু মুস্তাফাকে সে জন্ম দেয়নি, মানুষও করেনি। যিনি এই কষ্ট করে তাকে একজন ভালো স্বামী উপহার দিয়েছেন তার ব্যাপারে সে মুস্তাফাকে কোন বিরূপ ধারণা দিতে চায়না।

নাইমা বোঝে, আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যেখানে মায়েরা ভুলে যান তাঁরাও একসময় বৌ ছিলেন। নতুন মেয়েটিকে আপন করে নেয়ার পরিবর্তে তারা তার কাছে এত বেশী আশা করতে শুরু করেন যা সুপারম্যানের পক্ষেও পূরণ করা অসম্ভব! বাসার বুয়ার প্রতি যতটুকু সহানুভূতি দেখানো হয়, বৌ ততটুকুরও দাবী রাখেনা। তার ইচ্ছাঅনিচ্ছা বলতে কিছু থাকেনা- কোনদিন শরীরে বা মানসিকতায় না কুলালে বৌ হয়ে যায় ‘কুঁড়ে’, ‘আলসে’ বা ভাগ্য খারাপ হলে ‘বেয়াদব’ খেতাবের স্বত্ত্বাধিকারী। এই চাহিদার বিপরীতে এক হেরে যাওয়া রেস জেতার জন্য প্রাণপণে দৌড়ে চলেছে সে। সে জানত একসময় সে হেরে যাবে। তবে হারটা এত তাড়াতাড়ি আসবে সে ভাবেনি।

বিয়ের পর ছোট ননদটাকে সে বুকের ভেতরকার সব ভালোবাসা ঢেলে দেয়। নিজের ভাইবোনদের ছেড়ে আসার কষ্ট নাজকে ভালোবাসা উজার করে দিয়ে পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। বাজারে একটা সুন্দর জিনিস দেখলে নিজের জন্য না কিনে ওর জন্য নিয়ে আসে, অসুখবিসুখ হলে সব ছেড়ে দিয়ে সেবাযত্ন করে। কিন্তু শ্বাশুড়ীমা’র আস্কারায় নাজ ওর সাথে প্রচন্ড দুর্ব্যবহার করতে থাকে। যাকে এতখানি ভালোবাসে তার কাছ থেকে আঘাত পেতে পেতে সে আর সহ্য করতে পারছিলনা। একদিন শ্বাশুড়ীমাকে একান্তে ডেকে বলল, ‘মা, আজ তিনবছর আমি আপনাদের সাথে আছি। যদি আমি ভুল করি বা অন্যায় করি আপনি আমাকে দু’টো থাপ্পর দিয়েন, বুঝিয়ে দিয়েন, বকা দিয়েন, যা ইচ্ছে কোরেন। আপনি আমার মা, আমি কিছুই মনে করবনা। কিন্তু নাজ আমার ছোটবোন। ও যখন আপনাদের সামনেই আমার সাথে দুর্ব্যবহার করে, আমার ভীষণ কষ্ট লাগে। সে ছোটমানু্‌ষ, বোঝেনা, কিন্তু আপনি যদি ওকে বুঝিয়ে বলেন, ও নিশ্চয়ই এ’ব্যাপারে সচেতন হবে’।
উনি জবাব দিলেন, ‘শোন, তুমি নিজেকে এত ভালো মনে কর কেন? নিজেকে খারাপ মনে করতে শেখ। তুমি খারাপ বলেই নাজ তোমার সাথে দুর্ব্যবহার করে। ও যা করে ঠিক করে’।
নাইমা স্তম্ভিত হয়ে গেল। একজন মানুষ শত আঘাত সহ্য করতে পারে, কিন্তু মানুষ হিসেবে তার আত্মসম্মান নিয়ে টানাটানি করার চেয়ে কঠিন আঘাত আর কি হতে পারে? সে যাকে মা ডাকল তিনি তার সম্মানবোধই ধূলিস্যাৎ করে দিলেন! নাজ যদি আজ নাইমার সাথে দুর্ব্যবহার করে বাঁধা না পায়, কাল শ্বশুরবাড়ী গিয়ে সে সবার সাথে এই ব্যবহারই করবে। ওরা কি তা সহ্য করবে? শ্বাশুড়ীমা ওকে কষ্ট দেয়ার জন্য নাজকে ব্যবহার করতে গিয়ে যে নিজের মেয়ের জীবনটাই পক্ষান্তরে ধ্বংস করতে যাচ্ছে্‌ন তা কি তিনি বোঝেন না?

নাইমা একেবারে নেতিয়ে পড়ল। এতদিন যে প্রাণপণ চেষ্টা ছিল সবাইকে খুশী করার, শরীরের বাইরে গিয়ে সবার জন্য করার, নিজেকে দমন করে সবার চাহিদা মেটানোর- হঠাৎ সব কেমন অর্থহীন মনে হতে লাগল। সে নিজের ব্যাপারেই দ্বিধায় পড়ে গেল, ‘আমি কি সত্যিই খারাপ? আমি তো জেনেশুনে কারো ক্ষতি করিনা, কাউকে কষ্ট দেইনা, সম্ভব হলে উপকার করার চেষ্টা করি, না পারলে ক্ষমা চেয়ে নেই। তাহলে আমি কি এমন খারাপ কাজ করলাম যে যাকে মা মনে করলাম তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন আমি খারাপ বলেই আমার সাথে পশুতুল্য আচরণ করা যায়?’ ওর বুকটা খা খা করে ওঠে। কিন্তু চোখে পানি আসেনা। মুস্তাফাকে বললেও সে বিশ্বাস করবেনা। আর বলার স্বভাব তো নাইমার নেই। বাবামাকে বলার প্রশ্নই আসেনা, তাহলে ওঁরা চিন্তিত হবেন মেয়ে কষ্টে আছে ভেবে।

একমাস এই কষ্টের সাথে যুদ্ধ করে সে সিদ্ধান্তে আসে, কে কি বলল বা করল তার সাথে ওর কোন সম্পর্ক নেই। একজন মানুষ হিসেবে ওর দায়িত্ব পরিচিত অপরিচিত নির্বিশেষে সবার প্রতি আন্তরিকতার সাথে মানবিক দায়িত্ব পালন করা, সে তাই করবে। কে খুশী হল বা না হল তা কোন মানুষের পক্ষে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সুতরাং ওর পক্ষে যতটুকু সম্ভব ততটুকু সে করে যাবে। যা ওর পক্ষে করা সম্ভব নয় তা ছেড়ে দেবে যেহেতু মরে গিয়েও মানুষকে খুশী করা সম্ভব নয়।

বাচ্চা হবার পর দেখা গেল আরেক ঝামেলা। শ্বাশুড়ীমা বড়মেয়েকে সাথে রাখেন যাতে উনি ওর বাচ্চাদের দেখাশোনা করতে পারেন, সে নিশ্চিন্তে লেখাপড়া করতে পারে। কিন্তু নাইমাকে তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, ‘দেখ, শাহীনের তিনটা বাচ্চা দেখার পর আমার পক্ষে তোমার বাচ্চা রাখা সম্ভব না। তুমি দরকার হলে লেখাপড়া বন্ধ করে দাও। আমি তোমার বাচ্চা দেখতে পারবনা’।
নাইমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ‘মা, এই শিশুটি শুধু আমার নয়, শাহীনের মত ওর বাবা মুস্তাফাও আপনার সন্তান। শাহীনের সন্তানদের মত ওরও অধিকার আছে আপনার ওপর। আপনি যখন বৃদ্ধ হবেন তখন আমিই থাকব আপনার পাশে, শাহীন চলে যাবে ওর নিজের সংসারে। মাঝে মাঝে সে আপনাকে দেখে যাবে। কিন্তু দিনরাত সেবাযত্ন আপনি আমার কাছেই পাবেন’।
কথাগুলো সে বলছিল মনে মনে। বাবামা শিখিয়েছেন মুরুব্বীদের মুখে মুখে কথা বলতে হয়না। বড় হয়ে বুঝেছে ব্যাপারটা শোভন নয়। সুতরাং সে একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে চলে যায়।

নাইমার বাবামা থাকে আরেক জেলায়। সে ওখানে গিয়ে থাকলে এখানে ঘরের কাজ কে করবে? সুতরাং, উপায় একটাই, সে শিশুটিকে ইউনিভার্সিটিতে সাথে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। নাইমা কিছু না বললেও মুস্তাফা ততদিনে বুঝতে পারে কিছু কিছু। সে আর আপত্তি করেনা। কোন মুখে সে আপত্তি করবে? ওর মাবোনের আচরণ স্ত্রীর সামনে ওকে কত খাটো করে তা তো সে মুখ ফুটে বলতে পারেনা। অথচ ওদের ফেলে শুধু বৌ নিয়ে চলে যাওয়াও তো মানুষের কাজ নয়! নাইমাও তাতে রাজী হবেনা। মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোস্তফা, ‘নাইমা, তোমার দীর্ঘশ্বাস তো অন্তত আমি শুনতে পাই, কিন্তু আমার এ’বুকে যে কত দীর্ঘশ্বাস জমে আছে তা তো আমি তোমাকেও বুক চিরে দেখাতে পারিনা!’

বছরের পর বছর কেটে যায়। নাইমা লেখাপড়া শেষ করে ভালো চাকরী পায়। চাকরীতেও সে বাচ্চাকে সাথে নিয়ে যায়। এখন সে চাইলেই আলাদা বাসা নিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটা তার কাছে অমানবিক মনে হয়। বৃদ্ধ বাবামা, বোনকে ফেলে সে কি করে মুস্তাফাকে বলবে তাকে নিয়ে আলাদা থাকার জন্য? ওরা ওর সাথে কি আচরণ করলেন তা ওর বিবেচ্য নয়। ওর বিবেচ্য হোল সে ওদের সাথে কেমন আচরণ করল। মানুষ হবার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তো এটাই যে সে সর্বাবস্থায় মানবিক আচরণ করবে। সে যদি প্রতিশোধস্পৃহার অন্তরালে নিজেকে হারিয়ে যেতে দেয় তবে সে কি করে একজন উন্নত মানুষ হবে? শুধু একটা জায়গায় সে বারবার ধরা খেয়ে যায়। সব বুঝেও কেন ও ওদের কথাবার্তা আচরণে কষ্ট পায়? কেন সে এর উর্ধ্বে যেতে পারেনা? নিজের ওপর খুব রাগ হয় নাইমার। এখন শ্বাশুড়ীমা ওকে বেশ আদর করেন। কিন্তু কেন যেন সে কিছুই অনুভব করতে পারেনা। যখন ক্ষুধা থাকে তখন পানিভাতও অমৃত মনে হয়, ক্ষিদে মরে গেলে বিরিয়ানীও মজা লাগেনা। ওর মায়া, ভালোবাসাপ্রত্যাশী কোমল মনটা ঘাতপ্রতিঘাতে মারা গেছে আজ বহুবছর, সেজন্যই কি? নিজেকে খুব ছোটলোক মনে হয় নাইমার। কিন্তু সে শত চেষ্টা করেও কিছুই অনুভব করতে পারেনা।

এই ক’বছরে নাইমা নিজের পৃথিবীর বিস্তৃতি ঘটিয়েছে অনেক। ক্ষুদ্র গন্ডীর বাইরে এসে সে আবিস্কার করেছে এক বিরাট পৃথিবী যেখানে ওর প্রয়োজন আছে, যেখানে সে খুঁজে পায় জীবনের সার্থকতা। পরের কারণে স্বার্থ বলি দিতে পারলেই মানুষের জীবন পরিতৃপ্ত হয়। সে জীবনকে পরিপূর্ণ করে তোলার এমন পথ খুঁজে পেয়েছে যা সে নিজে গাড়ীবাড়ী শানশওকত নিয়ে থাকলেও পেতনা।

নাইমা গরীব দুঃস্থদের লেখাপড়া, বিয়ে, ব্যাবসা ইত্যাদি কাজে সহায়তা করতে শুরু করে। সমাজের হতদরিদ্র এই মানুষগুলোর সাথে কাজ করতে গিয়ে সে আবিস্কার করে, একজন দরিদ্র ব্যাক্তি সামান্য একটু উচ্ছিষ্ট ভাত তরকারী বা কাপড় পেয়ে যখন দাঁত কেলিয়ে হাসে তাতে যে আন্তরিক উচ্ছ্বাস থাকে তা যেকোন ধন্যবাদকে ম্লান করে দেয়। কোন রোগী বা মরণাপন্ন ব্যাক্তির হাত ধরে যখন সে বসে থাকে তখন সে অনুভব করে কিচ্ছু না বলে কতকিছু বলা যায়। একজন অসুস্থ মানুষকে এতটুকু সান্তনা দেয়ায় যে কি পরিতৃপ্তি সে কোনদিন জানতে পারতনা যদি সে এই জগতে জড়িত না হত। কেউ মারা গেলে সে বাড়ীতে গিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করা, মেহমানদের সামলে মৃতের আত্মীয় স্বজনের বোঝা হালকা করা এক অবর্ণনীয় শান্তি বয়ে আনে নাইমার মনে।

সেদিন সন্ধ্যায় এক বাসা থেকে ফোন আসে হঠাৎ ওদের মা মারা গিয়েছেন। আধুনিক শিক্ষার কল্যাণে আশেপাশে কেউ লাশ গোসল করাতে জানেনা। নাইমা তৎক্ষণাৎ খবর পাঠায় ওর দরিদ্র বন্ধুদের যারা এই শিক্ষায় অগ্রসর। সে প্রস্তুত হতে হতে ঐ তিনজন মহিলা নাজের ঘরে বসেছিল যেহেতু ড্রয়িং রুমে শ্বশুরশ্বাশুড়ী আর মুস্তাফা আলাপ করছিল। তাড়াহুড়ায় সে জুতো পায়েই নাজের ঘরে ঢুকে পড়ে। এরই খেসারত দিতে হয় তাকে এতগুলো মানুষের সামনে গালি শুনে।

লাশ ধোয়া বন্ধুদের বাসায় নামিয়ে দিয়ে রাত বারোটায় ঘরে ফেরে নাইমা। চরম ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত। মৃতের বাড়ীতে কান্নাকাটির রোল, খাবার পাবে কোথায়? বাচ্চাটাও তখন পর্যন্ত কিছু খায়নি। কলিং বেল টিপে বুঝতে পারে সবাই শুয়ে পড়েছে। মুস্তাফা এসে দরজা খুলে দেয়। নাইমা রান্নাঘরে গিয়ে দেখে খাবার কিছু নেই। ততক্ষণে মুস্তাফা দরজা বন্ধ করে রান্নাঘরে এসে পড়েছে, ‘নাহিদকে আমার কাছে দাও। তুমি গিয়ে কাপড় বদলে নামাজ পড়ে এস’।

নাইমা নামাজ পড়ে এসে দেখে মুস্তাফা এর মধ্যেই ভাত ডাল রেঁধে ডিম ভেজে রেখেছে। নাহিদ খাচ্ছে।

এত রাতে কথা বলতে ইচ্ছে করেনা। তাই নাইমা আর মুস্তাফা দু’জনেই চুপ করে থাকে। কিন্তু নাইমার মনটা আনন্দে ভরে যায়। এই ছোট ছোট খুশীগুলোই তো জীবনকে অর্থবহ করে তোলে! এই খুশীগুলো আসে অন্যের জীবনে আনন্দ বয়ে আনার মাধ্যমে, অন্যের বোঝা হাল্কা করার উপহার হিসেবে। নাইমা মনে মনে হিসেব কষে, ‘যে মানুষের জন্য আনন্দ নিয়ে আসে, তাদের কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করে, সে কি অমানুষ হতে পারে?... না মনে হয়… খুব বেশী কিছু না হলেও, সে মনে হয় মানুষ!’

হিসেবটা শেষপর্যন্ত মিলাতে পেরে নাইমার চোখেমুখে তৃপ্তির ছটা ছড়িয়ে পড়ে। স্ত্রীর হাসি মুস্তাফার মনেও দোলা দিয়ে যায়। সংসারের চাপে সে স্ত্রীকে অনেক কিছুই দিতে পারেনি। কিন্তু স্বাধীনতা, বিশ্বাস এবং সহযোগিতা দিয়ে ওর জীবনকে পরিপূর্ণ করে তোলার চেষ্টা করে চলেছে। মুস্তাফা আর নাইমা পরস্পরের দিকে তাকায়। কোন কথা না বলেও দুই সহযোগীর চোখে চোখে হয়ে যায় অনেক আন্তরিকতা, আশ্বাস আর আনন্দের কথোপকথন…

ভালো বক্তা হতে চান? যেভাবে বক্তৃতা দেবেন...

যেবার প্রথম বক্তৃতা দেই, তখন আমি ক্লাস ফাইভে। স্কুলে যাবার আগে থেকেই কাঁপাকাঁপি। মঞ্চে যখন নাম ডাকা হোল, মনে হোল আমি শ্রবনশক্তি হারিয়েছি। স্টেজে উঠে অনুভব করলাম পা দু’টো মোমের মত গলে যাচ্ছে। কোনক্রমে স্ক্রিপ্টে মুখ গুঁজে বক্তৃতা শেষ করলাম- মাইক্রোফোনের সাথে মুখের, দর্শকদের সাথে চোখের কোন সংযোগ ব্যাতিরেকেই। মঞ্চ থেকে নেমে এসে সারা শরীরে ঘাম ছাড়া আর কিছুই অনুভব করতে পারলাম না।

এটা কেবল আমার ঘটনা নয়। অধিকাংশ বক্তাই এমন অনুভব করে থাকেন।

তাহলে ভালো বক্তা হওয়া যায় কি করে?

অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং পড়াশোনা থেকে কয়েকটি পরামর্শ দিচ্ছি।

পূর্বপ্রস্তুতিঃ বিশেষ করে যারা নতুন বক্তা তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে যারা অভিজ্ঞ তাদের জন্যও এই পর্বটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

১। বিষয় নির্বাচনঃ কখনো কখনো বক্তৃতার বিষয় নির্ধারিত থাকে বা কয়েকটি নির্ধারিত বিষয় থেকে নির্বাচনের সুযোগ থাকে। সেক্ষেত্রে বক্তার খুব একটা করণীয় কিছু থাকেনা। নিজে থেকে বিষয় নির্বাচন করতে হলে এমন বিষয় নির্বাচন করা উচিত যে বিষয় সম্পর্কে আপনার মোটামুটি ধারণা বা আগ্রহ আছে। একেবারে নতুন বিষয়ের ওপরেও বলা যায় কিন্তু সেটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যেতে পারে যদি প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট সময় বা তথ্য পাওয়া না যায়। বিষয়বস্তুর পাশাপাশি বক্তৃতার জন্য নির্ধারিত সময়কাল জেনে নিতে ভুলবেন না।

২। নির্ধারিত বিষয়ের ওপর পড়াশোনাঃ এই কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেকোন বিষয় সম্পর্কে বলার জন্য ঐ বিষয়ে দক্ষতা অর্জন প্রয়োজন, সেটা কেবল পান্ডিত্য প্রদর্শনের জন্য নয় বরং শ্রোতার আকাংখাকে পরিতৃপ্ত করার জন্য। পাশাপাশি বক্তব্য বিষয়ের ওপর পরিস্কার ধারণা থাকলে বক্তা নিজেও বলার ক্ষেত্রে আরাম বোধ করেন এবং সাহস পান। তাই নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর যথাসম্ভব পড়াশোনা বা তথ্য সংগ্রহ করে বিষয়বস্তুকে আয়ত্ত্বে আনা অত্যন্ত জরুরী।

৩। ফোকাস নির্ধারনঃ এই ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ বক্তা বক্তৃতা দেয়ার সময় কোন আঙ্গিকে কথা বলবেন আগে থেকে নির্ধারণ না করার ফলে শ্রোতাদের ধৈর্য্যচ্যূতি ঘটিয়ে ফেলেন। স্বীয় পান্ডিত্য প্রদর্শন করতে গিয়ে তারা এত ব্যাপক বিষয়ে কথাবার্তা বলতে শুরু করেন বা একই বিষয়ের এত বেশী আঙ্গিক নিয়ে বলতে শুরু করেন যে দর্শকবৃন্দ খেই হারিয়ে ফেলেন। ফলে বক্তা বলতে থাকেন আর শ্রোতা শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকলেও মানসিকভাবে অন্যত্র বিরাজ করেন অথবা নিজেরা কথাবার্তা বলা শুরু করেন। বক্তাকে প্রথমেই নির্দিষ্ট করে নিতে হবে তিনি কোন আঙ্গিক থেকে বিষয়বস্তুকে বিশ্লেষণ করবেন এবং বক্তৃতার কোন পর্যায়ে ঐ ফোকাস থেকে বিচ্যূত হওয়া চলবেনা।

৪। বিষয়বস্তুকে নিজের মত ঢেলে সাজানোঃ পড়াশোনা বা আলোচনার মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য বক্তা নিজের মত ঢেলে সাজাবেন। এক্ষেত্রে দু’টি বিষয় তাকে বিবেচনা করতে হবে। তাঁকে মাথায় রাখতে হবে তাঁর শ্রোতা কারা এবং শ্রোতাদের বোঝার ক্ষমতা অনুযায়ী তাঁকে বক্তৃতার বিষয়বস্তু ঢেলে সাজাতে হবে। দ্বিতীয়ত, নির্ধারিত ফোকাসের সাথে সংশ্লিষ্ট তথ্যগুলো এমনভাবে সাজাতে হবে যেন কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়ে না যায় আবার অপ্রয়োজনীয় কিছু এসে শ্রোতাদের বিরক্তির উদ্রেক না করে।

৫। স্ক্রিপ্ট প্রস্তুত করাঃ এই কাজটি যারা করেন তাদের বক্তৃতা সুন্দর ও সুচারু হয়ে থাকে। কেননা পূর্বপ্রস্তুতি যেকোন জিনিসকেই সৌন্দর্যমন্ডিত করে। সম্পূর্ণ বক্তৃতাটি একবার কষ্ট করে লিখে ফেললে সম্পূর্ণ বক্তব্য সুসজ্জিত অবস্থায় সামনে পাওয়া যায়, এতে পরিবর্ধন বা পরিমার্জন করা সহজ হয়, সময় পরিমাপ বা প্র্যাক্টিস করতেও সুবিধা হয়। স্ক্রিপ্ট থাকলে যে স্ক্রিপ্ট দেখে পড়তে হবে বা এর বাইরে কিছু বলা যাবেনা ব্যাপারটা তেমন নয়। কিন্তু একবার স্ক্রিপ্ট তৈরী করলে লিখতে গিয়ে বিষয়বস্তু ঝালাই হয়ে যায়, তাই স্ক্রিপ্ট সাথে রাখার প্রয়োজন হয়না- পয়েন্টগুলো সংক্ষিপ্ত (কিউকার্ড) আকারে সাথে রাখাই যথেষ্ট।

৬। প্র্যাক্টিসঃ সভাস্থলে বক্তৃতা দেয়ার আগে নিজের ঘরে কয়েকবার প্র্যাক্টিস করুন। উচ্চারণ, সময় এবং যা বলছেন তা কতটুকু বোধগম্য হচ্ছে এসব ব্যাপারে আন্দাজ করুন। যেসব অংশে দুর্বলতা অনুভব করেন সেসব প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন, পরিবর্ধন না বর্জন করুন- বেশী বেশী চর্চা করুন। সবচেয়ে ভালো হয় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্র্যাক্টিস করলে যাতে বক্তব্যের সাথে প্রকাশভঙ্গীর সামঞ্জস্য রক্ষা হচ্ছে কিনা সহজে বোঝা যায়।

৭। পোশাক নির্বাচনঃ অনুষ্ঠানের প্রকার ও প্রকৃতি অনুযায়ী পোশাক নির্বাচন করা উচিত। ভাবগম্ভীর অনুষ্ঠানে অধিকতর ফরমাল এবং অপেক্ষাকৃত হাল্কা মেজাজের অনুষ্ঠানের জন্য ঐভাবে পোশাক পরা ভালো। তবে পোশাক এতটা জমকালো হওয়া উচিত নয় যাতে বক্তা বা বক্তব্যের পরিবর্তে পোশাক মূখ্য হয়ে পড়ে। পোশাক রুচিশীল হওয়া প্রয়োজন যাতে বক্তার ব্যাপারে শ্রোতাদের পজিটিভ ধারণার সৃষ্টি হয়।

অনুষ্ঠানে- আপনার বক্তৃতার আগেঃ আপনার বক্তৃতার আগে নিম্নোক্ত কাজগুলোর জন্য কিছু সময় ব্যায় করুন।

১। সময়ের আগে পৌঁছানঃ সভাস্থলে সময়ের আগে পৌঁছনোর চেষ্টা করুন যেন লোকসমাগম হবার আগেই সভাকক্ষের সাথে পরিচিত হতে পারেন। মঞ্চের প্রবেশপথ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জায়গাগুলো চিনে নিন। নিজেকে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সাথে অভ্যস্ত করে নিলে সহজেই কনফিডেন্স আসে।

২। উপস্থাপকের সাথে বন্ধুত্ব করুনঃ উপস্থাপকের সাথে পরিচিত হয়ে তার সাথে বন্ধুত্ব করে নিন। যেকোন সমস্যার ক্ষেত্রে উপস্থাপক হতে পারে আপনার শ্রেষ্ঠ বন্ধু।

৩। আপনার সময় জেনে নিনঃ বক্তাদের মাঝে আপনার ক্রম এবং বক্তৃতার জন্য নির্ধারিত সময় জেনে নিন। মানসিক প্রস্তুতির জন্য এটি অত্যন্ত জরুরী।

৪। পরিচিত হনঃ আপনার আশেপাশে সবার সাথে পরিচিত হবার চেষ্টা করুন। অন্যান্য বক্তাদের সাথে পরিচিত হলে তাদের কাছে কিছু জানার সুযোগ থাকবে। শ্রোতাদের সাথে পরিচিত হলে মঞ্চে উঠে মনে হবে বন্ধুদের সমাবেশে গল্প করছেন, সুতরাং নার্ভাস লাগবেনা। তাছাড়া শ্রোতারা আপনার ব্যাপারে পজিটিভ ধারণা পোষণ করলে আপনার বক্তৃতার প্রতি অনায়াসে আকৃষ্ট হবে।

৫। অন্যদের বক্তৃতা মনোযোগ সহকারে শুনুনঃ আপনি যদি অন্য বক্তাদের বক্তৃতার সময় মনোসংযোগ না করেন তাহলে দর্শকশ্রোতা আপনার উদাহরণ অনুসরণপূর্বক আপনার বলার সময় অমনোযোগী হবে। তাছাড়া না শিখলে শেখাবেন কি করে? অনেকক্ষেত্রে প্রসঙ্গ টানার জন্য, ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য বা এক বিষয় বারবার পুণরাবৃত্তি করা থেকে বিরত থাকার জন্য অন্য বক্তাদের বক্তব্য মন দিয়ে শোনা জরুরী।

৬। আপনাকে ডাকার আগেই মঞ্চের কাছাকাছি অবস্থান নিনঃ তড়িঘড়ি করে মঞ্চের দিকে ছুটতে হলে মঞ্চে উঠে হাঁপাবেন। সুতরাং, আপনার ক্রম অনুযায়ী প্রস্তুত থাকুন যেন উপস্থাপক আপনার নাম ঘোষনা করার সাথে সাথে উপস্থিত হতে পারেন এবং ধীরেসুস্থে মঞ্চে আরোহণ করতে পারেন।

৭। জোরে জোরে শ্বাসপ্রশ্বাস নিনঃ মঞ্চে ওঠার আগে কয়েকবার জোরে জোরে শ্বাসপ্রশ্বাস নিন। এতে টেনশন হ্রাস পাবে। এই কাজটি স্বাভাবিকভাবে করুন যাতে আপনাকে দেখে অসুস্থ মনে না হয়।

বক্তৃতার সময়ঃ এখন আপনি পুরোপুরি প্রস্তুত। সুতরাং, নীচের ব্যাপারগুলো মাথায় রেখে বক্তৃতা দিন।

১। সময় নিন, সময় দিনঃ মঞ্চে উঠেই আপনি হড়বড় করে কথা বলতে শুরু করবেন এমনটা কেউ আশা করেনা। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে দেখে নিন মুখের সাথে মাইকের অ্যাডজাস্টমেন্ট ঠিক হচ্ছে কিনা। যদি মাইক না থাকে, অনুষ্ঠানস্থলের দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করার চেষ্টা করুন কতটা জোরে কথা বললে সবাই শুনতে পাবেন। শোতৃমন্ডলীকে কথাবার্তা থামিয়ে আপনার বক্তব্য শোনার জন্য প্রস্তুত হবার সময় দিন। এই সুযোগে কয়েকবার জোরে জোরে শ্বাসপ্রশ্বাস নিন এবং ছাড়ুন, অনেক আরাম বোধ করবেন।

২। দর্শকদের দিকে তাকানঃ দর্শকশ্রোতা অনেক কষ্ট করে আপনার বক্তব্য শুনতে এসেছেন। তাঁদের মূল্যায়ন করুন। তাঁদের দিকে তাকান। যদি ভয় লাগে তাহলে উঁচু জায়গায় থাকলে তাদের মাথার তালুর দিকে এবং সমতলে অবস্থান করলে তাদের কপালের দিকে তাকান। দর্শক মনে করবেন আপনি তাঁদের দিকে তাকিয়েছেন, তাঁরা খুশী হবেন। আপনার কারো সাথে চোখাচোখি হবেনা, সুতরাং নার্ভাস লাগবেনা। ভীতি প্রশমিত হলে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে দেখবেন অনেক বন্ধু আপনার কথা মন দিয়ে শুনছেন আর অনেকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে বসে আছেন।

৩। সঠিকভাবে দাঁড়ানঃ একেবারে ঋজুভঙ্গীতে দাঁড়ালে অস্বাভাবিক বা আতংকিত মনে হবে। আবার একেবারে ঢিলে দিয়ে দাঁড়ালে মনে হবে আনস্মার্ট। সহজ এবং স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দাঁড়ান। যদি সামনে ডায়াস থাকে, দেখে নিন আপনাকে ডায়াসের সামনে থেকে দেখা যাবে কি’না। নতুবা মাইক হাতে নিয়ে ডায়াসের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে কুন্ঠিত হবেন না। এসব ক্ষেত্রে উপস্থাপকের সহযোগিতা অনেক কাজে লাগবে। বসা অবস্থায় বক্তৃতা দিলে স্বাভাবিকভাবে বসুন। সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকে দাঁড়ালে বা বসলে দর্শকদের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ পায়।

৪। গলার স্বরঃ অনেক বক্তা এত জোরে কথা বলেন যে শ্রোতাদের, বিশেষ করে মাইকের কাছাকাছি উপবিষ্ট শ্রোতাদের, অসম্ভব কষ্ট হয়। তাঁরা কথা শুনবেন কি দুয়া করতে থাকেন কখন বক্তা মঞ্চ থেকে নেমে তাদের উদ্ধার করবেন। আবার অনেকে এমনভাবে কথা বলেন যে কিছুই শোনা যায়না, তখন শ্রোতৃমন্ডলী নিজেদের মধ্যে কথা বলতে শুরু করেন, সভাকক্ষে বিশৃংখলা বিরাজ করে। অনেক বিখ্যাত ব্যাক্তিকে দেখেছি দর্শকশ্রোতা কথার মধ্যখানেই তালি দিতে শুরু করেছে যেন তিনি কথা বন্ধ করে মঞ্চত্যাগ করেন। গলার স্বর স্বাভাবিক এবং শ্রুতিমধুর রাখুন যেন শ্রোতৃমন্ডলী আপনার কথার প্রতি মনোনিবেশ করার সুযোগ পান।

৫। প্রকাশভঙ্গীঃ চেহারা স্বাভাবিক রাখুন। কথা বলার সময় যা বলছেন তার সাথে তাল মিলিয়ে হাসুন বা ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ চেহারা বজায় রাখুন, প্রয়োজন হলে হাত বা চেহারার মাধ্যমে আপনার বক্তব্য স্পষ্ট করে তুলে ধরুন। তবে মাথা চুলকানো, গালে হাত দেয়া ইত্যাদি বর্জনীয়।

৬। অভিবাদনঃ এতে সময় লাগবে মাত্র কয়েক সেকেন্ড, কিন্তু আপনার দর্শকশ্রোতার পজিটিভ প্রতিক্রিয়া বাড়বে অনেকখানি। অভিবাদন এমন হওয়া উচিত যা উপস্থিত শ্রোতাদের আবেগ অনুভুতিকে মাথায় রেখে নির্বাচন করা হয়েছে। এই পর্বটি অতিরিক্ত দীর্ঘ না হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

৭। মূল বক্তব্য উপস্থাপনঃ এটি আপনার বক্তৃতার প্রাণ। আপনার দর্শকদের শ্রেণীবিন্যাস মাথায় রেখে শব্দ এবং উচ্চারণ নির্বাচন করুন। শুদ্ধ বাংলায় কথা বলা সর্বাবস্থায় সর্বাপেক্ষা নিরাপদ কেননা এটি অধিকাংশ দর্শক সহজেই বুঝতে পারেন। স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে ধীরগতিতে কথা বলুন এবং প্রয়োজন হলে বক্তৃতার অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো ছেঁটে সময় বিন্যাস করুন। প্রতিটি শব্দ স্পষ্টভাবে উচ্চারণের প্রতি মনোযোগী হন। আপনি কি বললেন তা যদি আপনার শ্রোতা ধরতেই না পারেন তাহলে আপনার সব কষ্টই জলে যাবে। সুতরাং, কথার পরিমাণের প্রতি মনোযোগী না হয়ে মানের ব্যাপারে সচেতন হন।

৮। দর্শকদের প্রতিক্রিয়া যাচাই করুনঃ কথা বলার সময় এমনভাবে কথা বলুন যেন আপনি দ্বিপাক্ষিক আলাপে অংশগ্রহণ করছেন। দর্শকদের প্রশ্ন করুন, তাদের ভাবিয়ে তুলুন, প্রয়োজনে সামান্য কৌতুক করুন- মোটকথা দর্শকশ্রোতাকে আপনার বক্তৃতায় আগ্রহী করে তুলুন।

৯। প্রয়োজন অনুযায়ী মূল স্ক্রিপ্টে পরিবর্তন করুনঃ চাহিদা বা প্রয়োজন অনুযায়ী মূল স্ক্রিপ্টে পরিবর্তন করা যায় যেহেতু স্ক্রিপ্ট তখন আপনার মুখস্থ। তবে পরিবর্তনগুলো সংক্ষেপে লিখে নিলে মূল বক্তব্য থেকে খেই হারানোর ভয় থাকেনা। অন্যান্য বক্তাদের কথার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু বলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলে তাঁরা হুবহু কি বলেছেন তা লিখে নিন এবং এর প্রেক্ষিতে আপনি কি বলতে চান তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরার মত পয়েন্ট এর সাথেই লিখে রাখুন। যথেষ্ট সাহসী বা অভিজ্ঞ না হলে বড় ধরণের পরিবর্তনে না যাওয়াই শ্রেয়।

১০। বিদায়ঃ সব ভালো যার শেষ ভালো। যেকোন বক্তৃতার সৌন্দর্য নির্ভর করে বক্তৃতার বিষয়বস্তুকে সুন্দরভাবে গুটিয়ে এনে দর্শকশ্রোতাদের কাছ থেকে বিদায় নেয়ার ওপর। বক্তা অনেক বললেন অথচ উপসংহার টানতে ভুলে গেলেন বা তড়িঘড়ি বিদায় নিয়ে চলে গেলেন, এতে সম্পূর্ণ আবহই নষ্ট হয়ে যায়। তাই এই কাজগুলোর জন্য কয়েকটি সেকেন্ড হাতে সময় রাখা প্রয়োজন।

বক্তৃতার পরঃ বক্তৃতা শেষ, কাজ শেষ? না, সবে তো কাজ শুরু!

১। আগ্রহীদের সাথে কথা বলুনঃ আপনার বক্তৃতা শেষ হলে অনেকেই আপনার সাথে কথা বলতে আসবে। সবাইকে আন্তরিকতার সাথে সময় দিন- পজিটিভ কমেন্ট মন দিয়ে শুনুন, নেগেটিভ কমেন্ট আরো বেশী গুরুত্বসহকারে মনে গেঁথে নিন- যারা নেগেটিভ মন্তব্যের সাথে সাথে উত্তরণের জন্য পরামর্শ দেবেন তারাই আপনার সত্যিকার শুভাকাংখী। ভালো মন্তব্য এবং তোষামোদের মধ্যে পার্থক্য করতে শিখুন। পাশাপাশি নেগেটিভ মন্তব্যে মন খারাপ করবেন না। মানুষ মাত্রেই ভুল হবে। এই ভুল থেকে উত্তরণের জন্যই তো জীবন!

২। নিজেকে মূল্যায়ন করুনঃ বাসায় ফিরে স্ক্রিপ্ট হাতে নিয়ে বসুন। আপনার সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতাটি আরেকবার মাথায় ভেতর রিওয়াইন্ড করে দেখুন কোথায় কি ভালো হয়েছে, কোথায় আরো ভাল করা যেত, কি করলে ভুলত্রুটি এড়ানো যেত, ভবিষ্যতে কি করে আরো ভালো করা যেতে পারে। যারা যা মন্তব্য করেছে তা সততার সাথে বিচার করে দেখুন। যা যা দুর্বলতা খুঁজে পেলেন তার থেকে উত্তরণের চেষ্টা অব্যাহত রাখুন। পাশাপাশি ভালো দিকগুলো চর্চা করতে থাকুন।

অচিরেই আপনি হয়ে উঠবেন ভালো বক্তা!

Wednesday, June 15, 2011

সভ্য না বর্বর?

আমার ছোটভাই আহমদ মাঝে মাঝে খুব বিজ্ঞের মত কথা বলে। একবার আধুনিক শিক্ষিত লোকজনের পোশাকের অভাব নিয়ে হা হুতাশ করছিলাম, সে সান্তনা দিয়ে বলল, ‘আপু, দুঃখ কোরোনা, পৃথিবীতে দুই শ্রেণীর মানুষ পোশাকের অভাবে ভোগে- একেবারে বর্বর আর অতিরিক্ত সভ্য!’ আমার ভাইটির বিশ্লেষণের যথার্থতা যাচাই করে হতবাক হয়ে গেলাম। আসলেই তো! বর্বর জাতির লোকেরা হয়ত ঝোপজঙ্গলে বসবাস করে- শিক্ষা নেই, সচেতনতা নেই, তাই লজ্জাও নেই। কিন্তু শিক্ষিত মানুষ তো জ্ঞানের সাগরে মুক্তো আহরণ করার কথা, তাইনা? জ্ঞানই তো হবে তাদের অলংকার! শিক্ষার মূল্য কোথায় থাকে যদি শিক্ষার মূল লক্ষ্যই হারিয়ে যায়? যদি মানুষ সভ্য হয়ে আবার আদিম স্বভাবে ফিরে যাওয়াই সাব্যস্ত করে তাহলে তাতে কি তার মেধার প্রকাশ ঘটে? নাকি শরীরের? তবে কি আমাদের শিক্ষাই ত্রুটিপূর্ণ?

আজ লালবৃত্তের সাথে আলাপ প্রসঙ্গে কথাটা আবার মনে পড়ে গেল। লালবৃত্ত বলছিলেন, ‘আপু, ভেবে দেখেন, সমাজে অতি দরিদ্র এবং অতি ধনবান শ্রেণীর লোকেদের মাঝে আসলে খুব একটা তফাত নেই- এরা উভয়েই অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করে; উভয়েই অন্যের সম্পদ হস্তগত করে, কোন ধরণের বাজে কাজ করতে কাউকে পরোয়া করেনা; উভয়েই অন্যের স্ত্রীর প্রতি হাত বাড়ায় এবং নিজের স্ত্রীকে ছেড়ে দিতে কুন্ঠাবোধ করেনা…’ আমি জোগালাম, ‘উভয়ই নিয়মনীতিহীন, উচ্ছৃংখল’। তাহলে প্রশ্ন আসে, মানুষের সম্পদ কি কাজে লাগে? ক্ষুধা, তৃষ্ণা, দারিদ্র যাকে পথভ্রষ্ট করে তাকে বোঝার চেষ্টা করা যায়। কিন্তু যার সব থেকেও কিছু থাকেনা, তাকে কি দিয়ে সমবেদনা জানানো যায়? সম্পদ থেকে লাভ কি যদি তা তাকে একজন উন্নত মানুষে রূপান্তরিত করতে না পারে?

আমার ছাত্রী মাইমুনা দুঃখ করে লিখেছে, একজন মডেল জানে এখানে তাকে দেখিয়ে বস্তু বিকানো হচ্ছে- এখানে সে গৌণ আর বস্তু মূখ্য। তবু কেন মেয়েরা ঝাঁকে ঝাঁকে ব্লেড, জুতা, সাবান বা সিমেন্ট বিকানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ছে এমন এক অনিশ্চিত জগতে যেখানে পথ হারাবার ভয় ক্ষণে ক্ষণে? আহারে! যে মিডিয়া তাদের পণ্য বানায় সেই মিডিয়ার কল্যাণেই আজ আমাদের বোনেরা এবং তাদের বাবামা সবাই জানে সেই ঝকঝকে হাসি আর তকতকে মেকাপের পেছনের জগতটা কত পংকিল। এখানে হাজার জনের মধ্যে হয়ত একজন শেষপর্যন্ত পৌঁছতে পারে সেই স্বর্ণশিখরে যার স্বপ্ন দেখে তারা এই জগতে প্রবেশ করে, ততদিনে নিঃশেষ হয়ে যার তার অনেক সম্পদ। তবে কোন মোহে তারা একটি স্বল্পমেয়াদী সাফল্যের পেছনে ছোটে যার জন্য ত্যাগ করতে হয় অনেক কিন্তু তার তুলনায় পাওয়া যায় অল্পই? মাইমুনা লিখেছে, আজ আশি বছর বয়সেও লতা মঙ্গেশকরের গান শোনার জন্য লোকে ভীড় জমায়। কিন্তু এমন একজন মডেলের নাম বলুন তো যার আশি বছর বয়সে লোকে তাকে দেখার জন্য ভীড় করবে? পার্থক্যটা সবাই বোঝে। মেধার বিকাশ ঘটালে অনন্তকাল বেঁচে থাকা যায়। শরীরের বিকাশ মৃত্যুর আগেই সমাপ্তি ডেকে আনে। কিন্তু চোখ কান সব থাকা সত্ত্বেও মানুষ এগুলো বন্ধ করে চলতেই ভালোবাসে। এতে চিন্তা করে কাজ করার ঝামেলা থেকে সে বেঁচে যায়? কিন্তু আসলেই সে বাঁচে কি?

অনার্স জীবনে রেহানা ম্যাডাম প্রায়ই বলতেন, ‘আকলমান্দকে লিয়ে ইশারা কাফি’। আমি ভাবতাম তারপরও কুর’আনে এতবার শাস্তির কথা বলার, এমনকি সুরা তাওবার মত একখানা ভয়ানক থ্রেট দেয়ার কি দরকার ছিল? একসময় বুঝলাম, এই কুর’আন কেবল জ্ঞানী মানুষের জন্য পাঠানো হয়নি, বরং সার্বজনীন পাঠকশ্রেণীর জন্য একে ডিজাইন করা হয়েছে। এখানে বুঝদার পাঠকদের জন্য যেমন আনন্দদায়ক এবং চিন্তা উদ্রেককারী কথাবার্তা রয়েছে, তেমনি চোর ছ্যাঁচড় বাটপাড় শ্রেণীর লোকদের জন্য রয়েছে ভয়ানক সব বিপদসংকেত। চোরায় না শোনে ধর্মের কাহিনী। সুতরাং, তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে পথে আনা সম্ভব নয়। বরং জবাবদিহিতার ভয় তাকে পথে আনতে না পারলেও বিপথ হতে রক্ষা করতে পারে অনেকখানি। তাতে তার কতটুকু উপকার হোল না হোল সেটা সে বুঝবে, কিন্তু ভেবে দেখুন তো- নিরীহ গোবেচারা শ্রেণীর লোকজন, যারা আত্মরক্ষার খাতিরেও একটা কটু কথা বলতে পারেনা- তাদের কতখানি সহায়তা হয়!

বান্ধবী মিতুল আপা বলছিলেন, মানুষের নীচতায় হতবাক হয়ে যান। সান্তনা দিলাম, ‘আপা, হতবাক হবেন না, মানুষ নীচতায় শয়তানকেও হার মানায় কারণ আল্লাহ তাকে শয়তানের চাইতে বেশী বুদ্ধি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন’। আসলে মানুষকে শয়তান বা ফেরেস্তা কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা। সে পরিচালিত হয় নিজের ইচ্ছেয়। বেচারা শয়তান বড়জোর তাকে পরামর্শ দিতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্তটা পরিপূর্ণভাবে তার নিজের, কাজটাও তাকে কষ্ট করে নিজে নিজেই করতে হয়। এর জন্য সে নিজের কাছে নিজে যুক্তি খাড়া করে কাজটা আসলে কত মহৎ, এর পেছনে উদ্দেশ্যটা আসলে কত ভালো- দস্তয়েভস্কির ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্টের নায়কের মত। সে সুদখোর বুড়িকে হত্যা করার আগে নিজেকে বোঝায়- বুড়ির তো কেউ নেই, কেউ তাকে মিস করবেনা, বয়স্কা মহিলা এত টাকাপয়সা দিয়ে কি করবে? তদুপরি মহিলা একজন সুদখোর, তাকে সরিয়ে দিলে মানুষের উপকার হবে। সে একজন সম্ভাবনাময় তরুণ, তার যদি টাকাপয়সা থাকে তাহলে সে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। এই যুক্তির আশ্রয়ে সে বুড়িকে হত্যাও করে। কিন্তু বিবেকের দংশন তাকে শেষপর্যন্ত ফলভোগ করতে দেয়নি, সে নিজেই পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে। সমস্যা হোল, কাউকে গালি দিলে তাকে সরি বলা যায়। কাউকে মেরে ফেললে তাকে কবর থেকে তুলে জীবিত করা যায় কি? সুতরাং, পাপের প্রায়িশ্চিত্ত করার কোন উপায় থাকেনা।

এ’তো গেল যার বিবেক আছে বা কোন এক সুপ্রভাতে জেগে ওঠে তার কথা। কিন্তু যার বিবেকের কলকব্জায় সমস্যা আছে, তাকে কি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় বলুন তো? তার জন্য আসলে নৈতিক শিক্ষা এবং জবাবদিহিতার ভয় এ’ দু’টোর কোন বিকল্প নেই। মানুষ মানুষকে ফাঁকি দিতে পারে কিন্তু তাকে কি করে ফাঁকি দেবে যে তার মনের গোপন কথাটি পর্যন্ত টের পেয়ে যায়? তাকে কি করে এড়াবে যে তাকে সর্বত্র সর্বাবস্থায় দেখতে পায়? ফেসবুকের কর্মকর্তারা আমাদের কথাবার্তা, মনোভাব, পছন্দ অপছন্দ সব পর্যবেক্ষণ করে জেনে আমরা অজানা আশংকায় কুঁকড়ে যাই। অথচ কেউ এর চেয়েও বেশী জানে বিশ্বাস করলে কি কোন আজাবাজে কাজের চিন্তা আমাদের স্পর্শ করতে পারত? এই একটি চিন্তাই তো আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে পারত সমস্ত ধ্বংসাত্মক চিন্তাভাবনা এবং কাজ থেকে- নিজের প্রতি এবং অপরের প্রতি।

এভাবে চিন্তা করলে আমাদের শিক্ষা আমাদের আইনস্টাইন বা নিউটন বানাত, আমাদের বিত্ত আমাদের হাতেম তাঈ বা হাজী মোহসিন হতে উদ্বুদ্ধ করত, আমাদের মেয়েরা জোন অফ আর্ক বা মাদার টেরেসা হবার স্বপ্ন দেখত, আমরা ভালো কাজ করতে পারি বা না পারি অন্যায় কাজের চিন্তাও করতাম না।

আমাদের সমাজে আজ যে অন্ধকার চারিদিক থেকে ধেয়ে আসছে, আমরা পথ খুঁজে পাচ্ছিনা তা থেকে সহজেই উত্তরণ করা যেত জ্ঞানের আলো জ্বেলে। মায়েরা তাদের ক্যারিয়ারের পাশাপাশি তাদের সংসার এবং সন্তানদের সময় দিতেন, পাশ্চাত্যের অনুকরণে নিজেদের ভাসিয়ে দিতেন না অজানার পথের ভেলায়। স্বামীরা স্ত্রীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতেন, সংসারের দায়িত্ব পালনের প্রতি যত্নশীল হতেন, সন্তানদের সময় দিতেন যেন স্ত্রী কিছুটা সময় পায় নিজের উন্নয়নের জন্য। উভয়ে মিলে সন্তানদের জন্য সৃষ্টি করতে পারতেন সহযোগিতা, সহমর্মিতা আর সাহচর্যের এক অনন্য বাগান যেখানে প্রস্ফুটিত হতে পারত তাদের পুষ্পসম সন্তান। বাবামা একটা নতুন টিভি বা সাইকেল কেনার জন্য একটি মেয়েকে পাঠাতেন না দূর বিদেশে যেখানে সে অসহায় এবং অরক্ষিত। ছেলেরা মেয়েদের বিয়ে করতনা একজন ভালো স্ত্রী ব্যাতীত আর কিছু পাবার আশায়। ছেলেদের বাপমা বিয়ে করতে বাঁধা দিতনা ঘরে টাকাপয়সা আসা বন্ধ হয়ে যাবার ভয়ে। সন্তানেরা বাপমাকে অবহেলা করে নিজেদের সুযোগ সুবিধা নিয়ে মজে থাকতে পারতনা, ‘আমাদের বাপ মা তো সারাদিন পার্টি করে কাটিয়েছে, স্ফুর্তি করেছে, ওদের প্রতি আমাদের কেন দায়িত্ব পালন করতে হবে?’ বলে। আমার বোনটি, আপনার মেয়েটি পথে যেকোন একজন পুরুষকে দেখে নিজের ভাইয়ের মতই নিরাপদ মনে করত। আমার ছেলেটি, আপনার ভাইটি মনে করত এই দেশ আমার, এই সমাজ আমার, একে সুন্দর এবং পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্বও আমার। এমন একটি সমাজ কি আমরা চাইনা?

পথ কিন্তু চোখের সামনেই, পা বাড়ানোর অপেক্ষা …

IIUC ফিমেল ক্যাম্পাস

স্বভাবগতভাবে আমি খানিকটা অসামাজিক। তাই, সচরাচর বিয়ে বা দাওয়াতে যেতে পছন্দ করিনা। যেকোন public gatheringয়ে কেমন যেন একটা কৃত্রিমতা থাকে যেটা সহ্য করতে পারিনা। সেজন্যই হয়ত যাওয়ামাত্র মনে হয় আমার মহামূল্যবান সময়টা নষ্ট হোল যেটা আর আমি কোনদিন ফিরিয়ে আনতে পারবনা। এই সময়ে আমি হয়ত একটা বই পড়তে পারতাম বা ইন্টারনেট ঘেঁটে আবিস্কার করে ফেলতে পারতাম কোন মহামূল্যবান্ তথ্য অথবা আমার ছেলেমেয়ের সাথে গল্পের ছলে তাদের শেখাতে পারতাম কিছু।

সেদিন বহুদিন পর একটা দাওয়াতে গেলাম। দাওয়াতদাতাদের খুব পছন্দ করি বলেই যাওয়া। পৌঁছেই বুঝলাম ভুল করেছি। দেবীদের সারি আর শাড়ি, রঙ আর গহনা, শাড়ি চুরি আর পরচর্চার আলাপে প্রাণ ওষ্ঠাগত। যতটুকু না থাকলেই নয় কোনক্রমে ততটুকু সময় কাটিয়ে পালিয়ে এলাম। তাঁরা অহংকারী ভাবলেন হয়ত। তবুও পারলাম না এই বেকার সময় নষ্ট করার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে। বাসায় ফিরতে ফিরতে মেঘলা দিনের আকাশ দেখে মন হারিয়ে গেল IIUC ফিমেল ক্যাম্পাসের সেই স্বপ্নময় অঙ্গনে যেখানে অনেকজন সমমনস্ক মহিলার সমাবেশ ঘটেছিল।

আমাদের ইংরেজী ডিপার্টমেন্টে ছিলেন সালমা আপা, সানজিদা, সুমাইয়া, আমি। সানজিদা অবশ্য সুমাইয়া আসার আগেই চলে যান। পরবর্তীতে আমাদের ছাত্রীদের মধ্যে দু’তিনজন যোগ দেয় তবে তাদের আমি খুব বেশিদিন পাইনি। বিবিএ ডিপার্টমেন্টে ছিলেন নাজনীন ও সালমা আপা। আরো ছিল সেহেলী আর তাবাসসুম কিন্তু ওরা আমাদের অনেক ছোট। কম্পিউটার ডিপার্টমেন্টে ছিল আকলিমা আর আফরোজা। পরে যোগ দেয় ফারহানা। অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে ছিলেন হুসনা আপা আর ফারহানা। অ্যাকাউন্টসে ফাহমিদা। পরে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাসিস্টেন্ট হয়ে আসে শাকিলা। লাইব্রেরীতে ছিলেন তাওহিদা আপা। এই নিয়ে ছিল আমাদের IIUC ফিমেল ক্যাম্পাসের ছোট্ট পরিবার যা আজ কলেবরে বেড়েছে অনেকগুণ কিন্তু শুনেছি সেই সখ্য আর নেই।

আমরা একসাথে বসলে মনে হত ঐ ছোট্ট রুমে পৃথিবীর তাবৎ তথ্য আদানপ্রদান হচ্ছে, যেকোন একজায়গায় বসে পড়লেই জানা যাবে অনেক কিছু। কেউ ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে গবেষনা করছে, কেউ ইকনমিক্সের জটিল তত্ত্ব নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে, কেউ বিজ্ঞানের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি বোঝাচ্ছে অন্যদের; কেউ দেশবিদেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং এই পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে আলাপ ফেঁদে বসেছে; কোথাও আলাপ হচ্ছে বিখ্যাত চলচ্চিত্র বা গান নিয়ে; কেউ ইংরেজী vocabulary বর্ধিত করতে ব্যাস্ত আর কেউ বাচ্চা মানুষ করার ব্যাপারে পরামর্শ করছে; কেউ হাসিতামাশা করছে আর কেউ বা এই সুযোগে কেনাকাটা সেরে নিচ্ছে, “বাহ, তোমার জামাটা তো ভারী সুন্দর! আবার গেলে আমার জন্য একটা নিয়ে এসো, আমি টাকা দিয়ে দিচ্ছি’!

আমাদের যেকোন একজনের অসুস্থতায়, প্রমোশনে, বিয়েতে বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে আমরা ছুটে যেতাম সদলবলে। অনেক কাছের লোকজনের অনুষ্ঠানে যাবার চেয়ে এখানে যাওয়া ছিল আমাদের অনেক প্রিয়। প্রথমত ছিল অন্তরের টান যেটা সৃষ্টি হয়েছিল জ্ঞানপিপাসার common aspirationকে কেন্দ্র করে, দ্বিতীয়ত আমরা একজন আরেকজনকে যেভাবে বুঝতাম তা হয়ত আর কেউ বুঝতনা। মন ছুটলে হঠাৎ করেই সদলবলে সবাই চলে যেতাম কোন রেস্টুরেন্টে অথবা ট্যাক্সি চেপে কোন গ্রামেগঞ্জে আমাদের পিয়নের বিয়ে খেতে! পথেঘাটে দাওয়াতে অনুষ্ঠানে কোথাও আমাদের কথা থেমে থাকতনা। কথার ক্ষেত্রের বিস্তৃতিই হয়ত এর কারণ, আরেকটা কারন হোল আমরা জানতাম যাদের সাথে কথা বলছি তারাও এই বিষয়ে আগ্রহী সুতরাং নিজেকে স্বাধীনতা দেয়ায় কোন সমস্যা নেই। প্রচন্ড গরমের দিনে কথা বলতে বলতে আমরা গরমের কথা ভুলে যেতাম, বৃষ্টির দিনে জামা ভিজে গেলেও মন থাকত চনমনে।

একবার সবাই কক্সবাজার গেলাম ট্রেনিং ক্যাম্পে, সাথে বাচ্চাকাচ্চা আর তাদের কেয়ারটেকার। সেবার ঢাকা ক্যাম্পাসের সহকর্মীরাও যোগ দিলেন আমাদের সাথে। সেবারই প্রথম তাঁদের সাথে দেখা কিন্তু মনে হয় যেন কত বছরের সখ্য! রাতে উঠে সবাই মিলে তাহাজ্জুদ পড়া, কেউ কেউ গরম গরম চা বানিয়ে রাতজাগা বোনদের সেবা করে সওয়াব সংগ্রহ করে নিচ্ছে। তারপর ভোর পর্যন্ত শুদ্ধভাবে কুর’আন পড়ার চেষ্টা, একেকজনের ভুল তেলাওয়াত শুনে অন্যরা সবাই হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে কিন্তু কেউ লজ্জাও পাচ্ছেনা মনও খারাপ করছেনা। আমাদের এই হাসির ছটার সাথে তাল মিলিয়ে হোটেলের পেছনে পাহাড়ের ওপর থেকে সূর্য তার সোনালী আভা ছড়িয়ে জানান দিচ্ছে রাত কেটে দিন শুরু হোল। সবাই রুমে গিয়ে বাচ্চাদের তুলে হোটেলের সামনে সমুদ্রসৈকতে ছুট। সমুদ্রের সৌন্দর্য আর মুক্ত হাওয়া পান করে ফিরে এসে আমরা শান্তশিষ্ট লেজবিশিষ্ট হয়ে বসে পড়তাম আলোচনা অনুষ্ঠানে। আপাত শান্তশিষ্ট একদঙ্গল মহিলার চোখেচোখে যে কত আলাপ হয়ে যেত তা যদি কর্তৃপক্ষ জানতেন তাহলে নির্ঘাত কপাল চাপড়াতেন! বড় হয়েও ফাঁকি মারার, দুষ্টুমী করার মজাটা যে কি দারুণ, যারা অতিরিক্ত sincere তাঁদের কি বোঝাব?! ক্যাম্পের তৃতীয় দিন সবাই বাজারে ঘুরতে গেছিল। আমাদের দু’টি করে বাচ্চা, সাথে কেয়ারটেকার তাই সালমা আপা আর আমি যাইনি। বাচ্চাদের সময় দিচ্ছিলাম এই সুযোগে। সন্ধ্যার দিকে অন্যরা পাগলের মত ফোন করতে শুরু করল, ‘আপা, হোটেলের পেছনে আগুন লেগেছে। আমরা সামনে আছি, আপনারা তাড়াতাড়ি নেমে আসেন, আমরা অপেক্ষা করছি’। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু ভাবছিলাম আমার নিজের বোন থাকলেও আমার জন্য এত অস্থির হত কি’না!

এই ক্যাম্পের ফলাফলে আমরা চট্টগ্রাম ফিরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেই সবাই শুদ্ধভাবে কুর’আন পড়তে শিখব। শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে সদলবলে সবার কুর’আন শেখা হয়ে যায় একমাসেই যা একজীবনেও উদ্যোগ নিয়ে শেখা হয়নি কারো। সাথে সাথে চালু করা হয় সাপ্তাহিক বৈঠক যেখানে formally একজন কুর’আনের কিছু অংশ পড়ে বিশ্লেষণ করতেন আরেকজন recently পড়া একটা বই নিয়ে আলাপ করতেন। এভাবে আমাদের অনেক কিছুই শেখা হয়ে যায় যা হয়ত অন্যথায় সময় করে শেখা হত না। এর বাইরে প্রতিদিনই লাঞ্চের সময় কেউ না কেউ কুর’আনের কিছু অংশ পড়ে অন্যদের সাথে শেয়ার করত, লাঞ্চও শেয়ার হত বিধায় সাধারণত এইসময় উপস্থিত থাকত শিক্ষক, অ্যাডমিন, লাইব্রেরিয়ান এবং পিয়ন সবাই। একবার আমি একটি অংশ পড়ে কুর’আন রেখে দিলাম, কাউকে কিছু বললাম না। সবাই উৎসুক হয়ে বলল, ‘আপা, কি পড়লেন বললেন না তো!’ অগত্যা জানালাম, ‘আল্লাহ বলেছেন দুনিয়াতে আমাদের যে স্বামী বা স্ত্রী থাকবে আখিরাতেও তার সাথে থাকা যাবে’। ব্যাস, শুরু হয়ে গেল ফিরিস্তি। একজন পিয়ন এসে বলল, ‘ম্যাডাম, আমার স্বামী আমার সমস্ত টাকাপয়সা নিয়ে ফেলে। গতবার রাগ করে বেতনের টাকা আমার মা’র কাছে রেখে দিয়েছিলাম। জানতে পেরে সে আমাকে চুল ধরে যে ছুঁড়ে মারল, কোথায় পড়লাম কতক্ষণ বেহুঁশ ছিলাম বলতে পারবনা। মরার পরেও যদি তার থেকে মুক্তি না পাই…’ ওর কথার মাঝখানেই আরেকজন শুরু করল, ‘আপা, আমার স্বামী আমাকে তিনবাচ্চাসহ ফেলে রেখে লাপাত্তা হয়ে যায়, সে বেঁচে আছে না মরে গেছে বিয়ে করেছে না কি আমি কিছুই জানিনা, আমি কি আবার ওর পাল্লায় পড়ি…’ বহুকষ্টে বোঝাতে সক্ষম হলাম যে এই ধরণের স্বামীগুলোকে আগে তো বেহেস্তে যাবার উপযুক্ততা অর্জন করতে হবে, তারপর না ওদের সাথে থাকার প্রশ্ন! তখন সবাই খুশী!!

বছরে দু’বার আমরা দলবেঁধে বাজারে যেতাম IIUCর নবাগত ছাত্রীদের জন্য উপহার কিনতে। শ’দুইশ উপহার কিনতে কিনতে ফাঁকে ফাঁকে হয়ে যেত আমাদের নিজেদের কেনাকাটাও, অবশ্যই আলাদা রশিদে। তাছাড়া ছিল কারো কোন অনুষ্ঠানে, কারো বাচ্চা হলে উপহার কেনা অথবা ব্যাক্তিগত কেনাকাটা। একসাথে থাকতে থাকতে আমরা সবাই সবার রুচিপছন্দ ভালোভাবে বুঝতাম। তাই যখনই কারো কিছু কিনতে হত সবাই দঙ্গল বেঁধে বাজারে যেতাম যাতে একেকজন একেক আইটেম দেখে খুব অল্প সময়ের মধ্যে সবার বাজার সেরে ফেলা যায়। সবাই সবার পরিচিত দোকানে নিয়ে যেতাম বান্ধবীদের যাতে অল্প দামে ভালো জিনিস পাওয়া যায়। আর দোকানদারদের ভাবুন তো, সেদিনই ঈদ!

এভাবে জমে আছে আরো অনেক স্মৃতি। দু’টো সময়ের কথা খুব মনে পড়ে। যখন আমার দ্বিতীয় সন্তান হবে, IIUC ফিমেল ক্যাম্পাসের দারোয়ান থেকে শুরু করে এমন কেউ নেই যে আমার জন্য কিছু না কিছু করেনি। পিয়ন শাহীন ওর মায়ের হাতের পিঠা নিয়ে এসেছিল। আমি চট্টগ্রামের মেয়ে, বিয়ে হয়েছে বরিশালে তাই পিয়ন নাজমুন আমাকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক স্টাইলে শুটকী রান্না করে খাওয়ালো। অ্যাডমিন ফারহানা আর ফাহমিদা প্রতিদিন মজার মজার তরকারী করে এক্সট্রা ভাত নিয়ে আসত যাতে আমি তাদের সাথে খেতে পারি। ফারহানার আম্মা বরই আচার বানিয়ে পাঠিয়েছিলেন আমার জন্য, কতদিন যে ভাত খেয়েছি এই আচার দিয়ে! ফাহমিদা শুধু আমাকে খাওয়ায় বলে নালিশ আসায় বেচারী একদিন ক্যাম্পাসের সবার জন্য রান্না করে নিয়ে এসে এক হুলস্থুল বাঁধিয়ে দিল! এই সময়টা আমার প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট ছিল বলে প্রায়ই সালমা আপার সামনেই পা তুলে বসে থাকতাম কিন্তু উনি কখনো মাইন্ড করেননি। বরং আমি অ্যাডমিশন টেস্টের খাতা কাটতে কাটতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে বেচারী আমার ভাগের খাতাও কিছু কেটে দিতেন। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত কাজ করেছে সুমাইয়া আপা। জোর পূর্বক বাস থেকে, ট্যাক্সি থেকে নামিয়ে হলেও রিহামের জন্ম পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিন উনি আমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়েছেন, আবার চিন্তা করব দেখে রাদিয়াকে স্কুল থেকে তুলে সাথে নিয়ে নিয়েছেন। ডাক্তারের কাছে আনানেয়া করেছেন যেন আমি একা না যাই। প্রায়ই বাইরে কিছু না কিছু খেতে নিয়ে যেতেন, আমরা দু’জনেই বাইরে বড় হওয়ায় আমাদের খাবারের রুচিপছদ একরকম যা অ্ন্যরা হয়ত মুখেও দেয়ার উপযুক্ত মনে করবে না। আমার যত প্রয়োজনীয় কেনাকাটা উনি সাথে নিয়ে করে বাসায় পৌঁছে দিতেন- মাসের পর মাস! এই ঋণ কি দিয়ে শোধ করা সম্ভব?!

যখন ক্যানাডায় চলে আসা সাব্যাস্ত হয় তখন ফিমেল ক্যাম্পাস থেকে ফেয়ারওয়েল দেয়া হয় চারবার! প্রতিবার ভাবি এবার হয়ত ওরা আর আমার চেহারা দেখতে চায়না, আবার হুসনা আপার টেলিফোন, ‘আপা, চলে আসেন!’ সবচেয়ে স্মরণীয় ছিল যেবার আনুষ্ঠানিকভাবে ফেয়ারওয়েল দেয়া হয়। আটবছরে আমি যাদের পড়িয়েছি, অনার্স থেকে মাস্টার্স, ইংরেজী থেকে এমবিএ সকল ব্যাচের যাকে যেভাবে খবর দেয়া গেছে সবাই এসেছে। প্রত্যেক ছাত্রীর সাথে আমার কত স্মৃতি! এদের কারো সাথে স্টাডি ট্যুরে গেছি সিলেট বা অন্যত্র; কাউকে ফুলটাইম বা কাউকে কেবল এক সেমেস্টার পড়িয়েছি, এমন ছাত্রীও এসেছিল যাকে কখনো পড়াইনি; কাউকে হয়ত কখনো বকা দিয়েছি, কাউকে পরামর্শ দিয়েছি, কাউকে সাহায্য করেছি কাউকে দিয়েছি সান্তনা; কারো কাছে শিখেছি অনেক কিছু আর কাউকে হয়ত দিতে পারিনি কিছুই। অনেকের কাছেই RBA নামটা ছিল ভয় পাবার মত, শিক্ষকরা অক্ষরগুলোকে উলটে RAB বলে ভয় দেখাতেন ছাত্রীদের। কিন্তু আমি চলে যাব বলে সেই ছাত্রীদের কারো কান্না আর কারো প্রচন্ড রাগ দেখে মনে হোল কিছ হয়ত করতে পেরেছি। অনেকেই উপহার দিয়েছে অনেক কিছু। সবই আমার প্রিয়। কিন্তু দু’টো উপহার মনে গেঁথে গেছে। একটি সেমেস্টারের ছাত্রীরা একটা অটোগ্রাফবুক উপহার দিয়েছিল ওদের সবার মনের কথা লিখে। প্রতিটি পাতায় যেন ভালোবাসা উপচে পড়ছে। আরেক ছাত্রী হঠাৎ ওর ওড়না থেকে broochটা খুলে আমার ওড়নায় পিন করে দিয়ে তৃপ্তির হাসি হেসে বলল, ‘ওটা ওখানেই ভালো মানাচ্ছে’!

সম্পূর্ণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সালমা আপা। ছাত্রী শিক্ষক এবং অ্যাডমিন সহকর্মীদের বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে বলতে থাকেন আমাদের একসাথে আটবছর কাটানোর নানান রংবেরং-এর কাহিনী। চোখবুলিয়ে দেখি শিক্ষকদের মাঝেও আমার অনেক ছাত্রী যারা বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে যোগদান করেছে। ওদের ভালোবাসাস্নিগ্ধ মুখচ্ছবি দেখে মনে হোল এক জীবনে এতগুলো উদার মানুষের সাক্ষাত পাওয়া, ভালোবাসা পাওয়া কয়জনের ভাগ্যে জোটে?

গন্ডগোল



আমরা তখন অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে। সামনে পরীক্ষা। পলি আমার বাসায় বেড়াতে এসেছে। আলাপ আলোচনা পরীক্ষার প্রস্তুতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে বলাই বাহুল্য। মধ্যখানে শিমু ফোন করল। বললাম, “পলি তো এখন আমার বাসায়, ওর সাথে কথা বল”। পলিকে শিমুর সাথে কথা বলতে দিয়ে ওর জন্য নাস্তা রেডি করছি, দেখি সে হুট করে ফোন রেখে চলে এলো।
আমি বললাম, “এত তাড়াতাড়ি কথা শেষ?”
সে বলল, “আর বোলোনা, এক ফাজিল ঢুকে পড়েছে মাঝখানে ক্রস কানেকশনে”।
“বলতে ফোন রেখে দিতে”।
পলি বলল, “আমরা জানলে তো যে মাঝখানে কেউ শুনছে!”
“তাহলে টের পেলে কি করে?”
“হয়েছে কি, শিমু আমাকে জিজ্ঞেস করল পড়াশোনা কেমন চলছে। আমি বললাম, ‘পড়াশোনার সাথে ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে সেই কবে!’ ও বলল, ‘আবার বিয়ে করে ফেল’। তখন মাঝখানে কে যেন বলে উঠলো, ‘ওমা! তাহলে তো দ্বিতীয় বিয়ে হয়ে যাবে!’ আমি আর শিমু দু’জনেই অবাক, ‘কে কথা বলল?’ তখন লোকটা বলল, ‘আপনাদের কথা শুনতে বিরক্ত লাগছে, ফোন রাখেন, আমার এক জায়গায় জরুরী ফোন করতে হবে’…!!!”



আমাদের থার্ড ইয়ার অনার্স পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপ চলছে। সেই সকাল দশটা থেকে একদঙ্গল ছেলেমেয়ে ফর্ম জমা দেয়ার অফিসের সামনে কোলাহল করছে। অথচ যিনি ফর্ম জমা নিচ্ছেন তিনি নির্বিকার। নড়েন তো নড়েন, চরেন তো চরেন। আমার রোল নং সবার শেষে। ঐ ভদ্রলোকের অবস্থা দেখে আমি ওপরতলায় গিয়ে বসে রইলাম। সন্দেহ নেই আজ তিনটার আগে আমার ফর্ম জমা দেয়া হবেনা। বান্ধবী সোমারও রোল নাম্বার আমার কাছাকাছি। কিন্তু সে আশায় বুক বেঁধে অফিসের সামনেই দাঁড়িয়ে রইল। বারোটার সময় সে এসে মহা উৎসাহে আমাকে ডেকে নিয়ে গেল, “আর বেশী কেউ বাকী নেই। আমাদের মনে হয় একটার মধ্যে হয়ে যেতে পারে”। অবশেষে দুপুর একটায় আমাদের মাত্র চারজন বাকী দেখেও লোকটার পাষান হৃদয়ে কোন করুণার সঞ্চার হোলনা। উনি অফিস বন্ধ করে ভাত খেতে চলে গেলেন। সোমা, পলি আমি আর এক বান্ধবী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওনার চৌদ্দগুষ্টি উদ্দার করছি কিন্তু ওনার ফিরে আসার নাম নেই।

লোকটা ফিরে এলো দুপুর সাড়ে তিনটায়। এসে অফিসে ঢুকে চেয়ারে বসতে বসতে ওনার পৌনে চারটা বাজল। সোমা বলল, “চাচা, ক্ষিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে, প্লীজ একটু তাড়াতাড়ি করুন”। চাচা বললেন, “দাঁড়ান, আমি আগে পানটা খেয়ে নেই”। বলে উনি আয়েশ করে পান চিবুতে লাগলেন আর আমরা হা হয়ে ওনার কান্ড দেখতে লাগলাম। সোমা আর রাগ সামলাতে পারলনা, ক্ষেপে গিয়ে চিৎকার করে বলল, “এই পান খেয়ে যেন তোর ডিসেন্ট্রি হয়!” ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা মুখে হাত চাপা দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম! আর চাচা হা হয়ে মুখ বন্ধ করতে ভুলে গেলেন, ওনার মুখের দুপাশ বেয়ে লাল লাল পিক ঝরতে লাগল!

সোমা পরে সিটিভির প্রথম ঘোষিকা হয়েছিল।



আমি তখন ইউনিভার্সিটিতে চাকরী করছি দু’বছর হোল। একদিন দুপুর দু’টা বাজতে দশমিনিট। দু’টায় আমার একটা ক্লাস আছে। অন্য ডিপার্টমেন্টে নবাগত এক শিক্ষক এলেন আমার সাথে পরিচিত হতে। তিন চার মিনিট কথা বলে আমি উসখুস করতে লাগলাম। পাঁচ ছয়মিনিট পর আমার অস্থিরতা খালি চোখেই ধরা পড়ার মত ছিল। কিন্তু বেচারা মহা উৎসাহে কথা বলছেন তো বলছেন। আট মিনিটের মাথায় লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে বলেই ফেললাম, “ভাই, আপনার সাথে পরে কথা বলব, আমার মেয়েরা অপেক্ষা করছে”।
উনি বললেন, “কয় মেয়ে আপা?”
উনি কি বুঝাতে চাইছেন তাড়াহুড়ায় আমার মাথায় তখন খেলেনি। আমি বললাম, “চল্লিশ জন”।
বেচারার আতংকিত চেহারা খেয়াল হোল বিশাল গন্ডগোল হয়ে গেছে! তিনি কি ভাবছেন বুঝতে পেরে আমার নিজেরই তখন চক্ষু চড়কগাছ।
তাড়াতাড়ি তাঁকে আশ্বস্ত করলাম, “না না ভাই, ভয় পাবেন না! আমার একটাই মেয়ে। কিন্তু আমি মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে যাচ্ছিনা। আমার ছাত্রীরা অপেক্ষা করছে ক্লাসের জন্য। ওদের কথা বলছিলাম!”



ইউনিভার্সিটির রুটিনে স্থানাভাবে সবার নামের আদ্যক্ষর দিয়েই শিক্ষক কে তা ইন্ডিকেট করা হত। আমার আদ্যক্ষর ছিল RBA. সহকর্মীরা দুষ্টুমী করে মেয়েদের ভয় দেখাতেন, “বেশী ঝামেলা করলে RABকে ডাকব”। সেজন্যই কি’না জানিনা, ছাত্রীরা ভীষণ ভয় পেত। আমি এই ভয় ভাঙ্গানোর জন্য মাঝেমাঝে ওদের সাথে দুষ্টুমী করতাম।

একদিন দু’জন ছাত্রী এসে ভয়ে ভয়ে জানাল আমি যে রুমে ক্লাস নেয়ার কথা সে রুমে একজন বহিরাগত শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছেন, তিনি বলেছেন তাঁর আরো একঘন্টা লাগবে”।
বললাম, “স্যারকে বলনি বের হয়ে যেতে?”
ওরা কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “ম্যাডাম, এক্ষণি যাচ্ছি!”
মাথায় হাত দিয়ে বললাম, “আহারে আমার কন্যারা! স্যার ক্লাস নিক। তোমরা দেখ আর কোন রুম খালি আছে কি’না। এসে আমাকে জানাও”।
কিছুক্ষণ পর ওরা এসে জানালো ৪০৩ এবং ৫০৩ দুটোই খালি আছে।
আমি বললাম, “৪০৩ এই বসি, ৫০৩ হলে তো হারাম হয়ে যাবে!”
ওরা কিছুক্ষণ হা করে রইলো। একটু পরে টের পেয়ে মুচকি হেসে চলে গেল। আপনারা কি বুঝেছেন কি বললাম?

আমার মাকে কেন বিশ্বসুন্দরী করা হয়না?

আমার বয়স তখন দশ বা এগারো। আবুধাবীতে হুলস্থুল শোরগোল পড়ে গেল। প্রথমবারের মত টেলিভিশনে বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতা সম্প্রচারিত হবে। আমি বুঝিনা কিছুই। কিন্তু সবাই লাফায় তাই আমিও লাফাতে লাগলাম। বাসায় গিয়ে বাবাকে বললাম বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতা দেখব।

অনুষ্ঠান শুরু হবার আগে বাবাকে কানে কানে জিজ্ঞেস করে নিলাম এটি কিসের প্রতিযোগিতা, কাউকে বুঝতে দেয়া যাবেনা আমি এ’ব্যাপারে মহামূর্খ। বাবা বলল, “এই প্রতিযোগিতা হোল সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতা। পৃথিবীর নানান দেশ থেকে সবচেয়ে সুন্দরী মহিলাদের নির্বাচন করে এখানে নিয়ে আসা হয় এদের মধ্যে কে সবচেয়ে সুন্দর নির্ধারন করার জন্য”। আমি বসে রইলাম দেখার জন্য না জানি এরা কোন স্বর্গের অপ্সরী!

কড়া মিউজিক আর বর্নাঢ্য আলোকমালার ঝলকানির মাঝে শুরু হয়ে গেল সুন্দরী প্রতিযোগিতা। প্রথমেই সব সুন্দরীদের জড়ো করা হোল স্টেজে। তাদের দেখে আমি বিশাল এক ধাক্কা খেলাম। বাংলাদেশের গলি ঘুপচিতে এর চেয়ে অনেক সুন্দরী মেয়ে আছে। আমার মাকে দেখেই তো দেশবিদেশের সবাই মা’র সৌন্দর্যের প্রশংসা করত, জিজ্ঞেস করত মা’র বিবাহযোগ্যা বোন আছে কি’না, কার্ড উপহার দিত। বাবাকে বললাম, “এদের চাইতে মাকে বিশ্বসুন্দরী করা হলে ভালো হত”। বাবা হা হা হো হো হাসতে লাগল। আমি বিরক্ত হয়ে উঠে গেলাম।

তখন বুঝিনি কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে বুঝলাম এই বিশ্বসুন্দরী নির্বাচন একটা ভূয়া কন্সেপ্ট। প্রত্যেক মানুষের কাছে তার মা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী মহিলা এবং তার বাবা এই বিশ্বের সবচেয়ে হ্যান্ডসাম পুরুষ তা তারা দেখতে যেমনই হোন না কেন। কোন শিশুকে কি বলতে শুনেছেন, “আমার বাবা সুন্দর না, আমি এখন থেকে টম ক্রুজকে বাবা ডাকব” বা “আমার মা সুন্দরী নন, আমি এখন থেকে ঐশ্বর্য রাইকে মা ডাকব”? তাহলে কিসের ভিত্তিতে একজন মানুষকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষ হিসেবে নির্বাচন করা সম্ভব যেখানে পৃথিবীর সব মানুষ এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেনি বা তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট অনুভূতিগুলোকে বিবেচনায় আনা হয়নি? তাহলে এমন একটি অসার প্রতিযোগিতার আয়োজন করার অর্থ কি?

একসময় বুঝতে পারলাম এটি মূলত দেহব্যাবসার একটি আধুনিক ও যুক্তিযুক্ত সংস্করণ। ক্ষেপে যাবার আগে একটু চিন্তা করে দেখুন। দেহকে পুঁজি করে যে ব্যাবসা তাই তো দেহব্যাবসা। একজন সুন্দরী যদি তার দৈহিক সৌন্দর্যকে পুঁজি করে পয়সা কামানোর উদ্যোগ নেন তবে তাকে দেহব্যাবসা বলা অযৌক্তিক হয় কোন বিচারে? তবে সুন্দরী প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে দেহব্যাবসায় আসা অনেক লাভজনক ও মানবিক। আগেকার দিনে লোকালয় থেকে মেয়েদের অপহরণ করে এ’জাতীয় পেশায় বাধ্য করা হত (উদাহরণঃ ‘উমরাও জান’), কখনো সখনো অভাব বা অসহায়ত্ব তাদের এসব পেশায় ঠেলে দিত (উদাহরণঃ অমর প্রেম)। এখন আমরা জাঁকজমক করে আমাদের মেয়েদের স্বেচ্ছায়, সর্বসমক্ষে এবং বাবামা’র আশীর্বাদসহকারে এই পেশায় যোগ দেয়ার মত পরিবেশ সৃষ্টি করি। তারা ব্যাবসায় নামার আগেই নিজেদের অ্যাডভার্টাইজ করার মত একটি প্ল্যাটফর্ম পায়, সুপরিচিত হবার সুযোগ পায়। আর লোকজনও তাদের ছি ছি করেনা বরং বাহবা দেয়।

একদল বুদ্ধিমান এবং সৃষ্টিশীল লোক এই সুন্দরী নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নিয়ে থাকেন, তাদের উদ্দেশ্য থাকে এমন একদল মেয়েকে খুঁজে বের করা যারা নিজেকে পণ্য হিসেবে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে অনাগ্রহী নয় বা খ্যাতির পেছনে ছুটতে গিয়ে তাদের কি বিসর্জন দিতে হচ্ছে তা দেখতে না পাবার মত যথেষ্ট অসচেতন এবং যাদের পরিবার যথেষ্ট লোভী অথবা বোকা। অতঃপর তারা এদের একজনকে শ্রেষ্ঠ সুন্দরী নির্বাচন করে তাকে দিয়ে ফলাও করে নানাপ্রকার আপাতদৃষ্টিতে ভালো কাজ করায়। এটি একপ্রকার মূলা ঝুলানো। কেননা তখন বাকী সুন্দরীরা কে কোথায় গেল বা কি করল তা নিয়ে মানুষ আর মাথা ঘামায়না।

তবে ধন্য মিডিয়া। এ’ যেন শাঁখের করাত। সে নিজেই এই নিষ্পাপ মেয়েগুলোকে পতিত করে আবার এই পতনের কাহিনী নাটক সিনেমা নিউজ আকারে তুলে ধরে- এক্কেবারে “নগদ যা পাও হাত পেতে নাও” ফিলসফির বাস্তব প্রয়োগ। মিডিয়ার কল্যাণে আমরা এখন জানি এই বাকী মেয়েগুলোর কি হয়। সৌন্দর্যের খেতাবপ্রাপ্তির স্বপ্নে বিভোর মেয়েগুলো বাস্তবের জন্য প্রস্তুত থাকেনা মোটেই। ফলে যারা রিজেক্টেড হয় তাদের অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। উপরন্তু যেহেতু নিজের সৌন্দর্যকে বর্ধিত করার মত গুন ব্যাতীত তেমন আর কোন যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ বা সময় তাদের হয়না, ভবিষ্যত ক্যারিয়ার গড়ার জন্য এটিই তাদের একমাত্র পুঁজি হয়ে দাঁড়ায়।

যারা শ্রেষ্ঠ সুন্দরী নির্বাচিত হতে ব্যর্থ হয় তাদের প্রথম টার্গেট হয় মডেল বা অভিনেত্রী হওয়া। হায় রে! মডেল মানে তো কাপড়ের হ্যাঙ্গার বা বস্তুকে বিকানোর জন্য মানুষের ব্যাবহার! বান্ধবী শিমু বলত, “সিনেমার নামে কি সুকৌশলে আমাদের পর্ণোগ্রাফির টুকরো টুকরো ডোজ গিলিয়ে দেয়া হচ্ছে আমরা নিজেরাও টের পাচ্ছিনা”। একটু ভেবে দেখুন যে মেয়েটি এবং যে ছেলেটি অভিনয় করছে তারা আদতেই কেউ কারো কিছু নয়। অথচ একে অপরকে স্পর্শ করা থেকে অবলীলায় পরস্পরের সাথে শুয়ে যাওয়া পর্যন্ত সবই তারা নির্দ্বিধায় করছে (পয়সার জন্য, কোন মহৎ উদ্দেশ্যে নয়) আর আমরা সব জেনেও না জানার ভান করে সপরিবারে সাড়ম্বরে সামর্থের বাইরে গিয়েও বিশালাকার টিভি, ডিভিডি ইত্যাদি কিনে তাদের কীর্তিকলাপ দেখছি! এই অনুষ্ঠান দেখার জন্য আমরা আত্মীয় স্বজন আসলে বা ফোন করলে বিরক্ত হই, প্রতিবেশী বন্ধুবান্ধবের জন্য আমাদের হাতে কোন সময় নেই, বিয়েবাড়ীতে এখানে সেখানে সিনেমা টেলিভিশনের নায়িকা আর মডেলরাই এখন আমাদের আদর্শ। তাহলে আমাদের সন্তানেরা মডেল হওয়া বা অভিনেত্রী হওয়াকে উত্তম পেশা মনে করবে না কেন? ফলে আমাদের সন্তানদের এখন স্বপ্ন বড় মডেল বা নায়িকা হওয়া। খুব মজা লাগে যখন শোনা যায় অমুক নায়িকা খুব ভালো, সে অভিনয় করার সময় তার মা সাথে থাকে। আহারে, কি পবিত্র কাজে মা তার মেয়েকে সাহচর্য দেন! আরেকবার শুনলাম অমুক নায়িকা খুব ভালো সে শুধু তার স্বামীর সাথেই অভিনয় করে। কি মজা! স্বামীস্ত্রীর প্রেম্ কি সর্বসমক্ষে প্রদর্শনী দেয়ার মত ব্যাপার নাকি পয়সা কামানোর জন্য পুঁজি করার মত পণ্য?!

হলিউডের বিখ্যাত ফন্ডা পরিবারের খ্যাতনামা অভিনেত্রী জেন ফন্ডা থেকে শুরু করে ষাটের দশকের সকল আমেরিকান অভিনেত্রী সাক্ষ্য দিয়েছেন যে যেকোন প্রকার রোল পাবার জন্য তাদের আগে ডাইরেক্টরদের সন্তুষ্ট করতে হত। আর আজকাল তো ঘরের কাছেই বলিউডে নায়িকারা কিভাবে সিনেমায় সুযোগ পান তা নিজেরাই প্রচার করেন। যারা মডেলিং করেন তাদের অবস্থাও তথৈবচ। ব্যাতিক্রম আছে তবে তাকে তো আর নিয়মের মধ্যে ধরা যায়না। তবে একটু ভেবে দেখুন যদি একজন অভিনেত্রী, মডেল, গায়িকা বা নর্তকীর গুনই তার আসল পরিচয় হয় তবে তাকে পুতুলের মত সাজিয়ে, ক্যামেরার নানাবিধ পদ্ধতি প্রয়োগ করে তার দৈহিক শৈলীকেই কেন মূল উপজীব্য করে তুলে ধরা হয়? কেন নানাধরনের বিশেষন প্রয়োগ করে তাদের নিয়তই কনভিন্স করার চেষ্টা করা হয় যে তারা ভারী সুন্দর ইত্যাদি ইত্যাদি যেখানে তারা নিজেরাও জানে কোন মানুষই সবদিক মিলিয়ে সবচেয়ে সুন্দর হতে পারেনা?

এ তো গেল যাদের কোন উপায়ে এইসব ইন্ডাস্ট্রিতে ঠাঁই হয় তাদের কথা। যাদের হয়না তাদের নিয়ে তৈরী ভিক্টোরিয়া প্রিন্সিপাল অভিনীত Mistress মুভিটি দেখুন। সৌন্দর্যের গরবে এবং খরচে তাদের পক্ষে সাধারন মেয়েদের মত যেমনতেমন কোন চাকরী করে জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব হয়না। ফলে এদের একটা উপায় হয় কোন সুন্দরের পুজারী বড়লোক পুরুষকে বিয়ে করা। যাদের ভাগ্য ততটা ভালো হয়না তারা কেউ স্বেচ্ছায়, কেউ নিরুপায় হয়ে কখনো অন্য মহিলার বড়লোক অথচ লম্পট স্বামীর ঘাড়ে ঝুলে পড়ার কায়দা করে, কেউ ব্যার্থ হয়ে নিজের চরিত্র বিসর্জন দিয়ে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করে।

এই কি জীবনের সার্থকতা?! এই কি রূপের সার্থক ব্যাবহার?!

একটি ঘটনা আমার খুব মনে পড়ে। একবার এক বিশাল বড়লোক আত্মীয়ের বাসায় গেছি। খানিক পর শার্টপ্যান্ট পরা এক অসাধারন সুন্দরী মহিলা এলেন। তাঁর নখের আগা থেকে চুলের ডগা পর্যন্ত সৌন্দর্য চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে যেন। আত্মীয়ার সাথে কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে মুক্তোর মত কিছু অশ্রুবিন্দু তাঁর মসৃন গাল বেয়ে নেমে এলো। বিয়ের ছ’মাসের মাথায় তাঁর প্রতি স্বামীর সমস্ত আকর্ষণ শেষ। তিনি রান্না পারেন না, ঘরের প্রতি তাঁর কোন সহজাত আকর্ষণ নেই, পার্টির প্রতি স্বামীর আর নেশা নেই, তাঁর নিজের সৌন্দর্য বজায় রাখার জন্য যে বিশাল খরচ তা চালাবার মত যোগ্যতা তাঁর নেই, এদিকে সংসার ভাঙ্গে ভাঙ্গে অবস্থা। সেই অসম্ভব সুন্দর মুখে মক্তোর মত জ্বলজ্বলে অশ্রবিন্দু সেকথাই জানান দিল রূপে নয়, গুনেই পরিচয়। সুতরাং চলুন, আমরা রূপের নয়, বরং জীবনের সকল ক্ষেত্রে গুনের চর্চা করি। আর রূপ? একটি জীবন পার করার জন্য পরিচ্ছন্নতাই যথেষ্ট!

তুষারকণা

কাল রাতে বাচ্চাদের গায়ে কম্বল ঠিক করে দিতে গিয়ে হঠাৎ জানালা দিয়ে বাইরে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম- আকাশবাতাস সব তুষারধবল হয়ে গিয়েছে! এই শীতে এটা কততম তুষারঝড় বলতে পারবনা। তবে এবারের শীত শুরুই হয়েছিল তুষার ঝড় দিয়ে। ঈদুল ফিতরের আগের রাতে আমাদের সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়ে তাপমাত্রা হঠাৎ ঝপাৎ করে +২ থেকে -৩৫ এ চলে গেল আর সে কি তুফান! পরদিন সবার দরজার সামনে হাঁটুসমান বরফ, অধিকাংশ লোকজনই নামাজে যেতে পারলোনা।

তুষারপাতের ব্যাপারটা কিছুটা বৃষ্টিপাতের মত। ঘরে বসে বাইরে দেখতে ভাল লাগে। তুষারকণা যখন পাখীর পালকের মত বাতাসে ভেসে ভেসে নামতে থাকে তখন এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্যের অবতারনা হয়। এই দৃশ্য আপনি বাসা থেকে বের হয়েও উপভোগ করতে পারেন কারণ- প্রথমতঃ যতক্ষণ তুষার পড়ে ততক্ষণ খুব একটা ঠান্ডা লাগেনা; দ্বিতীয়তঃ তুষারকণা কাপড়ের ওপর চুপচাপ বসে থাকে, ঝাড়া দিলে পড়ে যায়, উষ্ণতার সংস্পর্শে না এলে তুষার গলেনা, সুতরাং ঠান্ডা লাগার ভয় নেই। মাইক্রোস্কোপের নীচে রাখলে দেখা যায় প্রতিটি তুষারকণার রয়েছে এক অদ্বিতীয় ডিজাইন কেননা প্রতিট তুষারকণাই একটি ধূলিকণাকে ঘিরে তৈরী হওয়া এক একটি স্ফটিক।

তবে যারা যানবাহনে থাকেন তাদের কাছে এই স্বর্গীয় সৌন্দর্য বিভীষিকাময় হয়ে দেখা দিতে পারে। কখনো কখনো বাতাসে তুষারের পরিমাণ বেশী হলে বা বাতাসের বেগ তুষারকণাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেলে দৃষ্টিসীমা (visibility) স্বাভাবিক থেকে শূণ্যের কোঠায় নেমে আসতে পারে- সেক্ষেত্রে আপনি একহাত দূরের জিনিসও দেখতে পাবেন না। কখনো বা বাতাসের ঝাপ্টায় আপনার চলন্ত গাড়ীর সামনে মূহূর্তে তুষারের ঢিবি সৃষ্টি হয়ে আটকে যেতে পারে গাড়ী। তখন অন্য কেউ এসে আপনাকে উদ্ধার করা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া গত্যান্তর থাকেনা যেহেতু এই পরিমাণ স্নো সরানোর জন্য snowmoverএর সাহায্য প্রয়োজন নতুবা tow-truck দিয়ে টেনে গাড়ী তুষারের স্তুপ থেকে বের করা প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যা হোল আপনি গাড়ীতে বসে অপেক্ষা করতে পারবেন না, গাড়ী থেকে নেমে পথের পাশে কোথাও দাঁড়াতে হবে। দূর থেকে ছুটে আসা একটা গাড়ীর ড্রাইভার হয়ত ধারণা করতে পারবেনা যে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ীটি আসলে চলছেনা। সে যদি ছুটে এসে ধাক্কা দেয় তবে আপনার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে গেল! তবে বাইরে দাঁড়িয়ে থেকেও যে আপনি সম্পূর্ণ নিরাপদ তেমন কোন কথা নেই। -৩০ থেকে -৪০ তাপমাত্রায় যদি আপনি যথাযথ পোশাকে না থাকেন এবং দ্রুত সাহায্য এসে না পৌঁছয় তাহলেও আপনি বরফাকারে পরপারে পৌঁছে যেতে পারেন। দশ পনেরো মিনিটের মধ্যে সাহায্য এসে পড়লেও আপনি সম্পূর্ণ বা আংশিক জমে যেতে পারেন যদি আপনার শরীরের, পোশাকের বা জুতোর কোন অংশ ভেজা হয়, যদি আপনি সামান্য নড়াচড়া করে শরীরে তাপ উৎপাদন অব্যাহত না রাখেন বা অতিরিক্ত নড়াচড়া করে শরীরের তাপ অতিমাত্রায় ক্ষয় করে ফেলেন। রিহামের যেবার মাথা ফাটল, ওকে হাসপাতালে নিয়ে ইমার্জেন্সী রুমে গিয়ে দেখি ওর মাথায় সেলাই দেয়ার জন্য কোন ডাক্তার পাওয়া যাচ্ছেনা অথচ আরেকপাশে এক ক্যানাডিয়ান লোককে ঘিরে বেশ ক’জন ডাক্তার ভিড় করে আছে। পরে বুঝতে পারলাম বেচারার frostbite হয়ে পায়ের বেশ ক’খানা আঙ্গুল শেষ। ওগুলো কেটে না ফেললে তার সম্পূর্ণ শরীরেই পচন ধরতে পারে। এই নিয়ে রোগী আর ডাক্তারে টানাহেঁচড়া। ভীষণ মায়া লেগেছিল লোকটার জন্য।

তবে এই অবস্থা যেকোন কারো যেকোন সময় হতে পারে। ঈদুল ফিতরের সকালবেলা হাফিজ সাহেব চৌরাস্তার মধ্যখানে আটকা পড়লেন। অটোমেটিক গাড়ী লক হয়ে গিয়ে নামতেও পারছিলেন না। কিন্তু গাড়ীতে থাকাও নিরাপদ নয়। তখন সকাল সাতটা, ভোর হয় ন’টায়। কেউ দেখতা না পেয়ে মেরে দিলে কিছু করার নেই। বাইরে তাপমাত্রা -৪০। সুতরাং বাইরেও বেশীক্ষণ থাকার জো নেই। দশমিনিটের মধ্যে সাহায্য এসে পৌঁছল। Tow-truckএর লোকজন প্রথমেই ওনাকে নিয়ে ওদের গাড়ীতে বসিয়ে জোরে হীটার ছেড়ে দিল। বাসায় পৌঁছেও বেচারার সেকি কাঁপুনি!

সবচেয়ে ভয়ানক অবস্থা হয় যদি শীতের মধ্যখানে তাপমাত্রা মাইনাসের ওপরে চলে এসে হঠাৎ আবার মাইনাসে ফিরে যায়। সমস্ত বরফগলা পানি ঠায় জমে গিয়ে লোহার মত শক্ত হয়ে যায়। এখানে তুষার পরিষ্কার করার জন্য সরকার বছরে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যায় করে- রাস্তায় লবণ ছিটায়, snowmover দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করে, বিশাল বিশাল vacuum cleaner দিয়ে হাঁটার রাস্তা সাফ করা হয়, রাস্তার দু’পাশে জমে থাকে পাহাড়ের মত উঁচু ঢিবি। কিন্তু আইস (ice) পরিষ্কার করার কোন পদ্ধতি অদ্যাবধি আবিষ্কার হয়নি। ২০০৮ এর ডিসেম্বরে একদিন দুপুরবেলা তাপমাত্রা মাইনাসের সামান্য ওপরে উঠে বিকেলবেলা আবার নেমে গেল। ব্যাপারটা কেউ তেমন একটা লক্ষ্য করেনি যে স্নো গলে রাস্তার ওপর পাতলা আইসের আস্তরণ সৃষ্টি হয়েছে। লোকজন যথারীতি গাড়ী নিয়ে অফিস থেকে ফিরছিল। আর যে লঙ্কাকান্ড শুরু হয়ে গেল! গাড়ীর ওপর ড্রাইভারের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। সর্বোচ্চ গতিবেগ ১৫ থেকে ৩০ কিমি/ঘন্টা। কিন্তু গাড়ী সামনের দিকে না গিয়ে কেবল ক্যারমবোর্ডের ওপর উদ্দেশ্যহীবভাবে ছুঁড়ে মারা গুটির মত ঘোরে! সেদিন একরাতে ক্যাল্গেরী এলাকাতে ২০০০ দুর্ঘটনা হয়েছিল। বিপদ্গ্রস্ত লোকজনকে সাহায্য করার জন্য ছুটে চলা পুলিশের গাড়ীর নিরবিচ্ছিন্ন সাইরেন শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। রাতে বান্ধবী তানজীন ফোন করে সে কি কান্না- ওর গাড়ীর পাশ দিয়ে আরেক গাড়ীর সামনের দিক ঢুকে পড়েছে, ঐপাশে ওর ছেলে বসা ছিল। সে যে কিভাবে অক্ষত অবস্থায় বেঁচেছে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না। হাসপাতালে গিয়েও ছেলের কান্না থামেনা।

এই বরফে যে কেবল গাড়ী চালানো মুশকিল তাই নয়, হাঁটাও মুশকিল আর পড়ে গেলে আরো মুশকিল। শীতে আইসের ওপর পিছলা খেয়ে হাতপা কোমর ভাঙ্গা, ন্যূনপক্ষে জোর ব্যাথা পাওয়া বা ছড়ে যাওয়া এখানে রেগুলার ব্যাপার। আমার এক ক্যানাডিয়ান বান্ধবী হাত ভেঙ্গেছে আজ চারমাস, তিনবার অপারেশন করা হয়েছে কিন্তু এখনো সারার লক্ষণ দেখা যাচ্ছেনা। সে যেভাবে দিনে দিনে একহাতেই সমস্ত কাজ করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, আমার ওর অন্য হাতটার জন্য ভয়ই লাগছে! আরেক চাইনীজ বান্ধবী গতকাল স্কি করতে গিয়ে মুখটুখ পুড়ে ফেলেছে। বরফে সূর্যের আলোর ছটা ঠিকরে পড়ে চামড়া পুড়ে যায়। বাইরে শীতের কথা ভাবলে অনেক সময় এই কথাটা মানুষের মনে থাকেনা। তাছাড়া ঠান্ডাবাতাস লেগেও চামড়ায় একধরণের পোড়ার অনুভূতি হতে পারে যাকে কোল্ডবার্ণ (cold burn) বলা হয়।

তবে এই তুষার পছন্দ করে তারা যারা স্কি বা স্নোবোর্ডিং জাতীয় (ski/snowboarding) খেলায় আগ্রহী। ক্যাল্গেরী অলিম্পিক পার্কে বা ব্যানফ, জ্যাস্পার নগরীগুলোতে এইসব খেলার জন্য অনেক মানুষজন জড়ো হয় শীতকালে। শিশুরা আপাদমস্তক আবৃত হয়ে পরস্পরকে বরফ ছুঁড়ে খেলতে পছন্দ করে। অনেক সময় বড়রাও অংশগ্রহণ করে সব খেলায়। অনেকে বরফ দিয়ে স্নোম্যানের প্রতিকৃতি বানায়। আর আমার বাচ্চারা বারান্দায় হাঁটু বরফে কি যে খেলে জানিনা। তবে আমি চিন্তায় থাকি কবে ওরা এই কাপড়জুতা নিয়ে আমার কার্পেট ভিজিয়ে ফেলে। ঘরের ভেতর ২৪ ঘন্টা হীটার চালিয়ে তাপমাত্রাকে মোটামোটি সহনীয় পর্যায়ে রাখা হয়। এতে করে ঘরে স্বাভাবিক জামাকাপড় পরলেই হয়। কিন্তু এই স্নো-সহ জামাজুতা ঘরে ঢোকালে বরফ গলে আমার কার্পেটের কি অবস্থা হয় একবার ভাবুন তো!

এখানে তুষারপাতের আগে একটা মজার জিনিস হোল, দিন হোক বা রাত, আকাশ দেখতে একই রকম লাগে। তুষারকণায় ঠিকরে পড়া আলোয় আপনি রাতের বেলায় পর্দা আলো সব বন্ধ করেও দিব্যি দিনের আলোর মত সব দেখতে পাবেন। আর ভোরবেলা দেখবেন আপনার বাড়ীর ছাদ, গাছের ডাল, মাঠঘাট, আকাশবাতাস সব একই বর্ণ ধারণ করে বসে আছে! যে খয়েরী খরগোশগুলো গরমকালে সর্বত্র খেলে দৌড়ে বেড়ায় সেগুলোরও শীতে শ্বেতবর্ণ লোম জন্মায়।

তবে আমার সবচেয়ে ভালো লাগে ভোরবেলা, যখন ঘর থেকে বের হয়ে দেখি সমুদ্রের ঢেউয়ের মত তরঙ্গায়িত তুষারের স্তুপ মরুভূমির বালিয়ারির মত ভাঁজে ভাঁজে ছড়িয়ে আছে চতুর্দিকে। বাতাসের ঝাপ্টায় যদিবা নতুন বরফের বালিয়ারি সৃষ্টি হয় সে তার আদি স্তুপে রেখে যায় তার জন্মের ছাপ। এই বরফে অন্ধকারেও চিকচিক করে ঠিকরে পড়ে আলো। নির্দাগ, মসৃণ সেই তুষারস্তুপের দিকে তাকিয়ে আমি ক্ষণিকের জন্য ভুলে যাই আমি দাঁড়িয়ে আছি এই ব্যস্ত শহরে। মনে হয় আমি এই পৃথিবীর প্রথম মানুষ। সামনে অবারিত পৃথিবী। একে দেখতে এত ভাল লাগে যে এই অসাধারণ সুন্দরের বুকে আমার পদচিহ্ন এঁকে দিয়ে এগিয়ে যেতে ভীষণ ভীষণ কষ্ট হয়।

বিয়ে ৮

“আপা আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন? আমি আপনাকে পাগলের মত খুঁজছি!” পেছন ফিরে গলার অধিকারীকে দেখে চিনতে অনেক বেগ পেতে হোল। শায়লা ভাবী না? এ কি অবস্থা ওনার? বিধ্বস্ত চেহারা, উস্কোখুস্কো চুল, ওনার ট্রেডমার্ক হাসিটাও মিসিং। দুষ্টুমী করে বললাম, “কি ব্যাপার ভাবী? আপনি কি আফগানিস্তানে যুদ্ধ করতে গেছিলেন নাকি? আপনাকে তো চিনতেই পারছিনা! তা বলুন, আমি আপনার কি খেদমত করতে পারি?”

শায়লা ভাবীকে আমার খুব ভালো লাগে। বিশাল বড়লোকের বৌ হয়েও ওনার মধ্যে কখনো কোন অহংকারের ছায়া পর্যন্ত দেখিনি, আমাদের চেয়েও সাধারণভাবে চলেন, নিজেই বাচ্চাদের রিক্সায় করে স্কুলে আনা নেয়া করেন। আমার হাত খুবলে ধরে বললেন, “আপা, আমাকে একটু সময় দেন, আমি আপনার বাসায় আসব”। অ্যাঁ! বলে কি? এত বড়লোক মানুষকে আমি কি দিয়ে অপ্যায়ন করব? আমার তো রান্নাঘর পর্যন্ত নেই- নিজেই খাই শ্বাশুড়ী আম্মার দয়ায়! যাই হোক। বললাম, “ভাবী, আমি বাসায় থাকার সুযোগ পাই খুব কম, আজকে তিনটা থেকে চারটা এক ঘন্টা বাসায় থাকব। আপনি আসতে পারেন কিন্তু দেরী করলে আমি সময় দিতে পারবনা”। উনি বললেন, “আমি আসব”। ওনার কথাবার্তা, চেহারায় একধরণের desperation দেখলাম। কিন্তু স্কুল ছুটির সময়, বাচ্চা আর বাবামাদের গিজগিজে ভীড়ে কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ পেলাম না।


ঠিক তিনটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে ভাবী এসে উপস্থিত। আমি তখনও আম্মার বাসায়, ভাত খাচ্ছি। হাতে সময় কম, তাই বাচ্চাকে ওর দাদুর বাসায় রেখে শায়লা ভাবীকে আমার দু’কামরার ফ্ল্যাটে নিয়ে বসলাম। উনি কোন ভনিতা না করেই কথা শুরু করলেন, “আপা, আমি আমার বাবামা ভাই বোন আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধব কারো কাছে না গিয়ে আপনার কাছে এসেছি, আপনি প্লীজ আমাকে ফেরাবেন না। আমি শুনেছি আপনি লোকজনকে পরামর্শ দেন। আমি কোন রাখঢাক না করেই আপনাকে আমার সমস্যার কথা খুলে বলব, প্লীজ আমাকে সাহায্য করুন”।
বলতে যাচ্ছিলাম, “আমি কবে থেকে পরামর্শদাত্রী হলাম?” কিন্তু উনি আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বলতে শুরু করলেন, “আপনি হয়ত জানেন আমি আর আমার স্বামী দু’জনই খুব সাধারণ পরিবার থেকে এসেছি। প্রথমদিকে আমরা তেমন একটা সচ্ছল ছিলাম না। পরে ও একটা ব্যবসার সন্ধান পায়। ব্যবসা শুরু করার মত পুঁজি ছিলোনা। তখন আমি বাবামা শ্বশুরশ্বাশুড়ী সবার উপদেশ উপেক্ষা করে আমার সমস্ত স্বর্ণ বিক্রি করে সেই টাকা ওর হাতে তুলে দেই। দিনে দিনে আমাদের ব্যবসা জমে উঠতে শুরু করে। সে চাকরী ছেড়ে দেয়, নিজের কোম্পানী খোলে। একসময় আমরা ভালো বাড়ী তৈরী করে, ভালো গাড়ী কিনে এমন এক জীবন গড়ে তুলি যার স্বপ্ন আমরা দু’জনে মিলে দেখেছিলাম। বাচ্চারা প্রাচুর্যের মাঝে বড় হতে থাকে। আমি আমার শেকড়ের কাছাকাছি থাকার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকি। কিন্তু আমার মনে হতে থাকে কোথায় যেন আমার স্বামী সাদাতের শেকড়টা আলগা হতে শুরু করে। কিছুদিন যাবত লক্ষ্য করছিলাম সে কাজে এত ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে যে কখনো কখনো সারারাত বাসায় আসেনা। যখন আসে তখন এত ক্লান্ত থাকে যে আমাকে সময় দেয়ার মত মুড থাকেনা। প্রথম প্রথম আমি একে কাজের চাপ মনে করলেও একসময় ওর আচরণে আমার সন্দেহ হতে শুরু করে। পরে একদিন ম্যানেজার সাহেবকে ডেকে কিরা-কসম কেটে শক্ত করে ধরার পর উনি বলেন, ‘ভাবী, আপনি কি কিছুই বুঝতে পারেন না? যে আগুনে সুন্দরী যুবতি সেক্রেটারীকে আপনার স্বামী সর্বত্র নিয়ে যান, উনি তার প্রেমে পড়েছেন। সাহেব তাকে বিয়ে করতে চান। আমরা খেটে খাওয়া মানুষ। ওনাকে বুঝাতে গেলে চাকরী যাবার ভয় দেখান। আপনাকে বলেছি জানলে কি করবেন কে জানে! ভাবী, উনি ভালো মানুষ। কিন্তু এখন উনি মোহগ্রস্ত। আপনি তাঁকে ফেরান’। আপা, আমার মনে হোল আমার পায়ের নীচে থেকে মাটি সরে গেছে, মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। একবার ভাবলাম সংসারের মুখে লাথি দিয়ে বাচ্চা দু’টো নিয়ে চলে যাই। কিন্তু আপা, আমার পরিবারের আমাকে দু’বাচ্চাসহ প্রতিপালন করার সামর্থ্য নেই। এতবছর আমি কোন চাকরীবাকরী করিনি, লেখাপড়া থেকেও বিচ্ছিন্ন- বিশ্বাস করুন আমি মনে হয় অ আ পর্যন্ত ভুলে গেছি! আমি বাচ্চা দু’টোকে কিভাবে বড় করব? আমি তাদের আমার মত সাধারণভাবে মানুষ করার চেষ্টা করেছি। ওরা হয়ত অনেক কষ্ট করতে পারবে। কিন্তু ওদের যে পরিমাণ কষ্ট করতে হবে তা চিন্তা করলে আমার বুক ফেটে যায়। আবার ভাবি, আমার এত বছরের সংসার আমি বিনাযুদ্ধে ছেড়ে দেব?! কিন্তু আপা, আমার যে কোন যোগ্যতাই নেই! যৌবনও যায় যায়। কি দিয়ে লড়ব আমি?”
একনাগাড়ে এতগুলো কথা বলে উনি হঠাৎ তন্ময় হয়ে পড়লেন। আম্মার বুয়া এসে নাস্তা দিয়ে গেল। অপদার্থ বৌদের শ্বাশুড়ীদের অনেক জ্বালা। আমি নাস্তার কথা বলতে ভুলে গেছি বলে তাঁকেই মনে করে পাঠাতে হোল। শায়লা ভাবী নাস্তার দিকে দৃকপাত না করে বললেন, “আপা, আমার নাওয়াখাওয়া উঠে গেছে। আপনি আমাকে পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেন”। আমি চুপ করে রইলাম। উনি আবার বললেন, “আপা, আমি আপনার সাহায্যের জন্য ছুটে এসেছি, আপনি আমাকে পরামর্শ দিন”। আমি বললাম, “আপা, আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারবনা”। ওনার মুখটা অজান্তেই হা হয়ে গেল, “আপা, আপনি আমাকে এভাবে মুখের ওপর না করতে পারেন না!”

আমি উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাড়ালাম। বাইরে প্রচন্ড রোদ, আকাশে একখন্ড মেঘ তার মাঝে ছায়া সৃষ্টি করে আছে। সেই ছায়া গিয়ে পড়েছে মাটিতে যেখানে ঘন সবুজ নারকেল বাগানের মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে আমগাছ বা কাঁঠালগাছের মাথা। আহা! আমি যদি ঐ মেঘখন্ডের মত এই সবুজমনা নারীকে ছায়া দিতে পারতাম জীবনের খর বাস্তবতা হতে! ফিরে এলাম ভাবীর সামনে। বললাম, “ভাবী, আমি আসলেই আপনাকে কোন সাহায্য করতে পারবনা। তবে যিনি পারবেন তার সাথে যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দিতে পারব। আপনার সমস্যার সমাধান আছে। কিন্তু তার জন্য সময় আর শ্রম দিতে হবে”।
বেচারীর চেহারাটা হঠাৎ আশার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। উনি বললেন, “আমি যার কাছে যেতে বলবেন যাব, যা করতে বলবেন করব, শুধু আপনি আমাকে পথ দেখান”। আমি বললাম, “ঠিক তো?”
উনি বললেন, “পাক্কা ওয়াদা। সাদাতের সাথে সংসার করা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যাথা নেই, কিন্তু আমি আমার সন্তানদের জন্য যা করতে হয় সব করব”।

শায়লা ভাবীর চোখে চোখ রেখে বললাম, “ভাবী, আপনি আপনার স্বপ্নের পথ ধরে বহুদুর এগিয়েছেন, স্বামীর জন্য সর্বস্ব দিয়ে দিয়েছেন, সন্তানদের জন্য বাকীটাও উজার করে দিতে রাজী আছেন, কিন্তু পথের কোন একখানে আপনি আপনার সের্বশ্রেষ্ঠ বন্ধুর হাত ছেড়ে দিয়েছেন, তার সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেছেন। আপনাকে সবার আগে সেই সম্পর্ক পুণর্গঠন করে তুলতে হবে কারণ সে ছাড়া আর কেউ আপনাকে উদ্ধার করতে পারবেনা”।
উনি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললেন, “আপা, আমি তো লোকজনের সাথে যদ্দুর পারি যোগাযোগ রাখি। আপনি কার কথা বলছেন আমি তো বুঝতে পারছিনা!”
আমি হেসে বললাম, “আপনি তার সাথে যোগাযোগ না করতে করতে তার নামও ভুলে গেছেন! ভাবী, দায়িত্বের খাতিরে নয়, আল্লাহকে ভালোবেসে সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করে নামাজ পড়েছেন কবে মনে আছে? অর্থসহ কুর’আন পড়ে আপনাকে কি দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বসে পাঁচমিনিট ভাবার চেষ্টা করেছেন কতবছর হোল? কিছু চাইবার জন্য নয়, বন্ধুর সাথে কথা বলার জন্য আল্লাহর সামনে হাত তুলেছেন কবে মনে পড়ে? আপনি যদি তার ডাকে সাড়া না দেন, আপনার বিপদেও সে গড়িমসি করবে এটাই কি স্বাভাবিক নয়? আমি আপনাকে এতদিন পর একঘন্টা সময় দিলাম আর আপনি পাঁচমিনিট আগেই ছুটে এলেন। অথচ যে আপনার কথা শোনার জন্য, আপনাকে দেবার জন্য উপহারের ডালি সাজিয়ে বসে আছে কে জানে কত বছর তার সাথে কথা বলার আপনার ফুরসতই মেলেনা!” ভাবী চোখ নামিয়ে নিলেন।
বললাম, “ভাবী, আমার কথায় কষ্ট পেয়েন না। আপনি পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ রেগুলার করে ফেলুন। সাতদিন তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে, কুর’আন পড়ে, আল্লাহর সাথে পরামর্শ করুন। তারপর সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাকে জানান আপনি কি করতে চান। সংসার করবেন, নাকি চলে যাবেন? আপনি যে পথ বেছে নেবেন সেভাবেই আমি আপনাকে পরামর্শ দেয়ার চেষ্টা করব ইনশাল্লাহ”।

শায়লা ভাবী চলে গেলেন।


সাতদিন পর উনি এসে বললেন, “আপা, আমার মনে কেমন যেন একটা স্বস্তি আর সাহস এসেছে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি একটা উটকো মহিলা এসে আমার সন্তানদের অধিকার কেড়ে নিয়ে যাবে আর আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখব তা হবেনা। আমি লড়ব। আল্লাহ আমাকে সাহায্য করবেন। আপনি আমাকে বলুন কিভাবে কি করব”।
বললাম, “ভাবী, আপনাকে কিছু কড়া সত্য কথা বলব, আপনি সহ্য করতে পারবেন তো? নইলে আপনি এখনই চলে যেতে পারেন”। উনি বললেন, “কি যে বলেন আপা! যে মহিলার স্বামী অন্য মহিলা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় তার কি রাগ ঘেন্না বাকী আছে? আপনি তো আমার ভালোর জন্য ক’টা কড়া কথা হলেও বলছেন, সে তো সেটুকুও আমার জন্য করছেনা!”
উচিত কথা বলা থেকে নিজেকে কখনই বিরত রাখতে পারিনি যদিও বুঝি তা আমার জন্য কতখানি অনুচিত। আজও প্রবৃত্তির কাছে হার মানলাম। ক’খানা কটু কথা বলারই সিদ্ধান্ত নিলাম, “ভাবী। বিয়ের সময় একটা ছেলে আর একটা মেয়ের শিক্ষাগত এবং অন্যান্য যোগ্যতা আনুপাতিক কি’না দেখেই বিয়ে দেয়া হয়। তারপরে কি হয় জানেন? ছেলেটা উত্তরোত্তর উন্নতি করতে থাকে, তার পরিধি বিস্তৃত হতে থাকে, তার জ্ঞান বাড়তে থাকে। আর মেয়েটা? সে সংসার করতে করতে জীবনের যে মূল লক্ষ্য জ্ঞান অর্জন করা সেটাই ভুলে যায়। তার পৃথিবী একসময় রান্নাবান্না, ধোয়াপালা, বাচ্চা সামলানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায় নতুবা আটকে যায় টেলিভিশনের পর্দায় যা তার মেধার বিকাশে কোন ভূমিকা রাখতে পারেনা। আমি বলছিনা মহিলাদের চাকরী করতে হবে বা তারা ঘরের কাজ করবেনা। কিন্তু দৈনিক অন্তত একটি ঘন্টা সময় তো নিজের জন্য ব্যায় করা যায়, হোকনা সে দুপুরের ঘুম বাদ দিয়ে বা যেকোন একটি কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ আগামী দিনের জন্য বাকী রেখে। কার্যত দেখা যায় মহিলারা নামাজ পড়ার পর্যন্ত সময় পান না, লেখাপড়া না করতে করতে বাচ্চাদের সামান্য প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়েও বলেন, ‘আব্বুকে জিজ্ঞেস কর’। সংসারের ব্যাস্ততায় আমাদের মেজাজ হয়ে যায় খিটখিটে সুতরাং ঐদিক দিয়েও ভদ্রলোক কোন সুবিধা করতে পারেন না। এই বৌয়ের সাথে কথা বলে তখন স্বামী আর মজা পাননা, তার মন চলে যায় বাইরে, বন্ধুবান্ধবের আড্ডায়। আমরা বাইরে যাবার সময় সেজেগুজে যাই অথচ বাসায় বুয়ার মত হয়ে থাকি, সুতরাং, স্বামী ভদ্রলোক হলে অসন্তুষ্টির সাথে মেনে নেন আর তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাব থাকলে দৃষ্টি হয়ে যায় বহির্মুখী। সেই লোক যদি বাইরে এমন কোন মহিলার সন্ধান পান যে এই উভয়প্রকার চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম এবং আগ্রহী তখন তাকে বিয়ে নামক সম্পর্কের দলিল দিয়ে আটকে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ভাবী, আমরা মানুষ। তাই খুব সহজেই ভুলে যাই সে সঙ্গীর কথা যে তার জীবন যৌবন আমাদের উন্নতির পেছনে ব্যায় করে নিজে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে। আমরা সবসময় নিজের স্বার্থটাই চিন্তা করি আর স্বার্থ চিন্তায় বর্তমানে কি পাইনি তা ছাড়া অন্য কিছু আমাদের নজরের সামনে আসেনা। যার আল্লাহর ভয় আছে সে নাহয় জবাবদিহিতার ভয়ে নিজের প্রবৃত্তির সাথে যুদ্ধ করে, কিন্তু যার সে চিন্তা নেই সে কি দিয়ে নিজকে আটকাবে বলুন তো? আরেকজনকে সংশোধন করা আমাদের সাধ্যের অতীত। আমরা কেবল নিজেকেই সংশোধন করতে পারি। সুতরাং, চলুন আগে নিজের দিকে যথাসম্ভব উন্নয়নের চেষ্টা করি। ভেবে দেখুন, আপনার কাছে যে গুণগুলো গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো সাদাত ভাই নিজের মধ্যে সৃষ্টি করার চেষ্টা করলে আপন কত খুশী হবেন। একইভাবে চিন্তা করে দেখুন আপনার স্বামীর কাছে কোন জিনিসগুলো আকর্ষণীয় বা গুরুত্বপূর্ণ এবং সেসব ব্যাপারে আপনার দক্ষতা সৃষ্টির চেষ্টা করুন। আপনি আমার সাথে একদিন বের হবেন। আমি আপনাকে ইংরেজী কোর্সে ভর্তি করিয়ে দেব। আরেকদিন বের হব আপনার জন্য ভালো জামাকাপড় কিনতে- আপনি বাসায় সবসময় ফিটফাট হয়ে থাকবেন। প্রতিদিন অন্তত একঘন্টা আপনি বিভিন্ন সাধারন জ্ঞানবর্ধক বই পড়বেন এবং বাচ্চাদের সাথে এগুলো শেয়ার করবেন। আজ থেকে হিন্দি সিরিয়াল টাটা বাই বাই। Discovery, History বা National Geographic চ্যানেল দেখবেন। এতে ইংরেজীও শেখা হবে, জ্ঞানবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখাপ্রশাখা সম্পর্কে জানারও সুযোগ হবে। সবচেয়ে বড় কথা আপনার হাতে প্রচুর পরিমাণ সময় আসবে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য। কি, রাজী?”

শায়লা ভাবী প্রচন্ড আগ্রহ আর উদ্যম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে।


কয়েকমাস পর দেখা গেল তিনি বিবিধ বিষয়ে অনর্গল আলাপ করতে পারছেন, ইংরেজীতে কথা বলতে বা বুঝতে তাঁর কোন অসুবিধা হচ্ছেনা বিধায় স্বামী অপর মহিলার সাথে ব্যাবসায়িক আলাপের ভান করে গোপন আলাপ করার সুযোগ পাচ্ছেন না, তাঁর কথাবার্তা চেহারা পোশাক পরিচ্ছদে রুচি ও শালীনতার বহিঃপ্রকাশ তার স্বামীকে মোহিত করে তুলল, তিনি আগে যে কাজ সারাদিনে করতেন তা এখন কৌশল প্রয়োগ করে কয়েকঘন্টায় করতে পারছেন ফলে বাচ্চাদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে তিনি সময় দিতে পারছেন- কিন্ত সবচেয়ে বড় কথা সাদাত ভাই শায়লা ভাবীর আচরণে এমন এক আত্মবিশ্বাস দেখতে পেলেন যে তাঁকে ছেড়ে দেয়ার চিন্তার পরিবর্তে শায়লা ভাবীই তাকে ছেড়ে যাবেন কি’না সেই চিন্তা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। স্ত্রী এবং সেক্রেটারীর মধ্যে তুলনা করে তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন দু’জনের মধ্যে কে শ্রেয়। একসময় তিনি নিজেই সেক্রেটারীকে বাদ দিয়ে স্ত্রীর প্রতি ঝুঁকে পড়লেন।

ছ’মাস পর ভাবী একদিন বাসায় দাওয়াত দিলেন। ভদ্রলোকেরা ড্রইং রুমে কথা বলতে বলতে আমরা রান্না ঘরে দাঁড়িয়ে খাবার বাড়তে বাড়তে গল্প করতে লাগলাম। ভাবীকে জিজ্ঞেস করলাম, “ভাবী, এখন কি অবস্থা?”
শায়লা ভাবী হাতে ভাতের চামচের অস্তিত্ব ভুলে গেলেন, তন্ময় হয়ে বলতে লাগলেন, “আপা, একসময় মনে হত আমি সাদাতকে ছাড়া কি করে বাঁচব? আমার বাচ্চাদের কি হবে? এখন বুঝি আমাদের দেখাশোনার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, সাদাত তো কেবল একটা মাধ্যম। সে যখন বুঝতে পারল আমি এখন আর ওর ওপর dependent নই তখন সে আমাকে আর বাচ্চাদের আরো বেশী করে আঁকড়ে ধরল। ঐ মহিলা বিদায় হয়েছে তিনমাস আগে। সাদাত নিজেই তাকে বিদায় করেছে। এখন তো সে ঘর ছেড়ে এক পাও নড়তে চায়না, আমার পরামর্শ ছাড়া কিছুই করেনা, বাচ্চাদের প্রচুর সময় দেয়- কিন্তু কি জানেন? আমি এখন যুদ্ধক্লান্ত। আল্লাহর অসীম সাহায্যে আমি জিতেছি, এই বোধ ছাড়া আর কোন বোধ এখন আর আমাকে স্পর্শ করেনা …”
তাঁর দৃষ্টি আনুসরণ করে আমিও হারিয়ে গেলাম সেই মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মেঘমালার মাঝে যা আনন্দে ঝরঝর গেয়ে ওঠা বৃষ্টির বার্তা নিয়ে আসে…

বিয়ে - ৭

মাহমুদ বুঝতে পারছেনা কান্নার শব্দ কোথা থেকে আসছে। দেখার চেষ্টা করছে, কিন্তু ওর চোখ আটকে আছে দিশার চেহারায়। চেহারাটা সুন্দর না- চোখের নীচে গাঢ় নীলবর্ণ কালি পড়েছে, ঠোঁট ফেটে চৌচির, মুখ শুকিয়ে চিমসে গেছে, কিন্তু ওর চোখ দু’টো … আহ! যে চোখ দু’টো তাকিয়ে আছে ওর মরণাপন্ন বাবার চেহারার দিকে, সে চোখের মায়া আর সবকিছু মলিন করে দিয়েছে যেন! এই মায়া যেন পৃথিবীর সব গতি থমকে দেবে, এই প্রচন্ড ভালোবাসা বুঝি ওর বাবাকে বাঁচিয়ে তু্লবে এই মরণব্যাধি থেকে! কিন্তু কান্নাটা থামছেই না! কাঁদছে কে? দিশার চেহারা থেকে চোখ না সরিয়েই মাহমুদ কি যেন একটা সুইচ চাপ দিল আর সাথে সাথে শুনতে পেল হাবিবের কন্ঠ, “মাহমুদ, বাবা আর নেই!” মাহমুদের ঘুম ছুটে গেল। লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসে সে বলল, “আমি এক্ষুণি আসছি”।

হাবিবের বাবা সাতদিন আগে স্ট্রোক করেছেন। হাবিব প্রথমেই মাহমুদকে ফোন করল গাড়ীর জন্য। ওরা ছোটবেলা থেকেই একসাথে পড়েছে, একসাথে খেলেছে, দু’জনের সব দুঃখকষ্ট ভাগ করে নিয়েছে। দু’জনের সামাজিক স্ট্যাটাসের বৈষম্য সবার চোখে ধরা পড়লেও ওদের দু’জন কেন যেন ব্যাপারটা কখনো খেয়ালই করেনি। মাহমুদ সারাজীবন সবকিছুতে এগিয়ে থেকেও কখনো লেখাপড়ায় হাবিবকে টপকাতে পারেনি। হাবিব সবসময় বলত, “তোর তো বাবা ছাড়া আর কোনকিছুর অভাব নেই আর আমাদের মেধা ছাড়া আর সবকিছুর অভাব- এভাবেই আল্লাহ ভারসাম্য বজায় রাখেন- হা হা হা…”। হাবিবের বাবাকে হাসপাতালে নেয়ার মূহূর্ত থেকে মাহমুদ হাবিবের পাশেই ছিল এই সাতটা দিন। এমনকি রাতে বাসায় ফিরে শুতে গেলেও সেলফোনটা বালিশের পাশে রাখত যেন হাবিব ফোন করলেই ধরতে পারে। রেডী হবার জন্য আলো জ্বালাতেই ঘড়িতে চোখ পড়ল, রাত দু’টো বেজে তের মিনিট।

হাবিবের বাবা মাহমুদের শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকদের কখনো খুব একটা টাকাপয়সা হয়না, তাঁরও হয়নি। তবে সম্মান ছিল সবার কাছে। তিনি ছেলেমেয়েদের আর কিছু দিতে না পারলেও উত্তম শিক্ষা দিয়ে বড় করেছেন। হাবিব ভালো রেজাল্ট করে চাকরী পাওয়ার পর থেকে পরিবারটি কেবল একটু সচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করেছিল। কিন্তু স্যারের ভাগ্যে এই সুখ বেশিদিন ছিলোনা হয়ত।

হাসপাতালে পৌঁছেই মাহমুদ দেখতে পেল এরই মাঝে একটা ছোটখাট ভীড় জমে উঠতে শুরু করেছে। হাবিবের করুন মুখটা দেখে সে আশ্বস্ত করল, “তুই বস, আমি সব ব্যবস্থা করছি”। স্যারকে শেষবারের মত দেখার জন্য বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াতে সে দেখতে পেল চাচী অবুঝ শিশুর মত কাঁদছেন, “তুমি কেন আমাদের ছেড়ে চলে গেলে!...” যে মেয়েটা গত সাতটা দিন বাবার পাশ ছেড়ে এক মূহূর্তের জন্য নড়েনি, সেই দিশাকে কোথাও দেখা গেলনা।

মাহমুদ জানে এখন অনেক কাজ। দাফনকাফন থেকে শুরু করে হাসপাতালের বিল দেয়া পর্যন্ত সব যথাসম্ভব দ্রুত সারতে হবে। কিন্তু মনটা এত খারাপ! কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে নিজেকে সামলে নেয়ার জন্য একটা মূহূর্ত নেয়া কি খুব অন্যায় হবে? সে ভীড় কাটিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। মৃদু হাওয়া বইছে, আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। মারা যাওয়ার জন্য সুন্দর একটি রাত। নাহ! সময় নষ্ট করলে চলবেনা। যাওয়া দরকার। চাঁদের দিকে পেছন ফিরতেই মনে হোল দেয়ালের সাথে কিসের যেন ছায়া। দিশা না? হ্যাঁ, দিশাই তো! মৃতবৎ দাঁড়িয়ে আছে সে। নির্নিমেষ তাকিয়ে আছে কে জানে কোন মহাশূণ্যের পানে। ওকে দেখেছে বলে মনে হোলনা। মাহমুদ ছোটবেলা থেকে হাবিবের বন্ধু হলেও দিশাকে খুব একটা দেখার সুযোগ হয়নি। মেয়েটাকে মনে হয় কেউই খুব একটা ঘোরাঘুরি করতে দেখেনি। বইপত্র নিয়েই থাকত। মাহমুদ ওর মায়ের দেখা মেয়ের ব্যাপারে খোঁজ নেয়া ছাড়া ওর সাথে খুব একটা কথা হয়েছে বলেও মনে করতে পারলোনা। কিন্তু এই মেয়েটাই গত ক’দিন স্যারের পাশে থেকে যা করেছে, মাহমুদ কল্পনা করার চেষ্টা করেছে সে নিজের মায়ের জন্য এতটা করতে পারত কি’না। সে একবার ভাবল চলে যাবে, কারো গভীর কষ্টের মূহূর্তে তাকে একা ছেড়ে দেয়াই হয়ত উচিত। কিন্তু কেন যেন ওর মনে হোল এই মেয়েটার আর কষ্ট পাবার ক্ষমতা নেই- স্বপ্নের কথাটা মনে করেই কি?
সে বলল, “দিশা”।
দিশা কেমন যেন ফাঁকা চোখে তাকাল, যেন চিনতে পারেনি। সে আবার বলল, “দিশা, চাচী প্রচন্ড কান্নাকাটি করছেন, তোমার মনে হয় ওনার সাথে থাকা উচিত”।
দিশা কিচ্ছু না বলে ঢলতে ঢলতে মায়ের কাছে চলে গেল। মাহমুদের হৃদয় মোচড় দিয়ে উঠল। একজন মানুষ কি করে সর্বাবস্থায় নিজের চেয়ে অপরকে অগ্রাধিকার দেয়? সে কেন এই পরিবারটার মত হতে পারেনা?

পরদিন স্যারের দাফন হয়ে গেল। সবাই বাড়ী চলে গেল। একটা জলজ্যান্ত মানুষের শুধু কিছু স্মৃতি ছাড়া আর কোন চিহ্ন রইলোনা।

একমাস পর সুলতানা বেগম আবার ছেলের কাছে বিয়ের কথা পাড়লেন। এবার যে মেয়ে পাওয়া গেছে তাতে তিনি খুশীতে গদ গদ। মেয়ে সুন্দরী, আগেই খোঁজ নিয়ে নিয়েছেন লেখাপড়ায় আহামরি না হলেও খারাপ নয়, অনেক বড়লোকের কন্যা। মাহমুদ বলল, “মা, তোমার দেখা মেয়ে আমি দেখব, অবশ্যই দেখব। কিন্তু আমি একটা মেয়ে দেখেছি, তুমি দেখবে?”
সুলতানা বেগম মুচকি হেসে বললেন, “বাহ! আমার ছেলে প্রেম করছে আর আমি টেরই পাইনি!”
মাহমুদ বলল, “না মা, তুমি যা ভাবছ তা না। আমি একটা মেয়ে দেখেছি। মেয়েটা আহামরি সুন্দর না কিন্তু মায়া আছে। লেখাপড়ায় তুখোড় কিন্তু অহংকার নেই। বাবামা’র টাকাপয়সার গরম নেই কিন্তু আদবকায়দায় জুড়ি নেই। আমার মনে হয় তোমার পছন্দ হবে”।
সুলতানা বেগম বললেন, “আচ্ছা, দেখব আর কি”।
মাহমুদ বুঝল মা ব্যাপারটাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছেন না। সে বলল, “মা, আমি আজিম স্যারের মেয়ে, হাবিবের বোনের কথা বলছি”।
মা চলে যাচ্ছিলেন, সটান দাঁড়িয়ে গেলেন। একমূহূর্ত পর উনি যখন ওর দিকে ঘুরলেন মাহমুদ স্পষ্ট দেখতে পেল মায়ের চোখে অবিশ্বাস, “তুই বলছিস কি? ওরা তো গরীব! মেয়ের বাবাও নেই। তুই কি ওর সাথে প্রেম করছিস?”
মাহমুদের মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল, সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “মা, আমি প্রেম করলে সবার আগে তুমি জানতে। মেয়েটা জানেও না আমি ওকে বিয়ে করার কথা ভাবছি, জানলে ও রাজী হবে কি’না তাও জানিনা। হাবিবের সাথে পর্যন্ত আমার এ’ব্যাপারে কোন কথা হয়নি। আর তুমি কি আবোল তাবোল ভাবছ! তুমিই আমাকে শিখিয়েছ সব মানুষই সমান, গরীবের জন্য তোমার মন কাঁদে, অথচ নিজের ছেলের বেলা তুমি গরীব বলে একটা মেয়ের শিক্ষাদিক্ষা পরিবার স্বভাবচরিত্র সব তুচ্ছ করে কেবল তার আর্থিক অবস্থাটাই দেখলে! আর বাবার কথা বলছ? বাবা তো আমারও নেই!...”
বেশী বলা হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারে মাহমুদ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

সাতদিন পর মা আর মাহমুদ খেতে বসেছে। গত সাতদিন মা খুব একটা কথা বলেননি মাহমুদের সাথে। খাবার মাঝখানে মা ইতস্তত করে ভাতের গ্রাসটা মুখে দিতে গিয়েও নামিয়ে রাখলেন। ভাতের প্লেটের দিকে তাকিয়েই বলতে শুরু করলেন, “বাবা, তুই আমাকে আবারও শেখালি। ছোটবেলা থেকে তোকে শিখিয়ে আসছি ইসলামে ধনী গরীব, কালো ধলোর কোন পার্থক্য নেই। অথচ আমি মেয়ে দেখার সময় ঠিকই এই পার্থক্য করেছি। আজ বিশবছর ধরে এই পাড়ায় আছি, কোনদিন দিশার ব্যাপারে বা ওর পরিবারের ব্যাপারে খারাপ কিছু শুনিনি। আজিম স্যারের দুই ছেলেমেয়েই লেখাপড়ায়, আদবকায়দায় শ্রেয়। আর ওদের পরিবার যে নিজেরা কষ্ট করেও অন্যের কষ্ট লাঘব করার জন্য ছুটে আসে তা তো কতবার স্বচক্ষে দেখেছি! নইলে ওরা অনেক ভালো অবস্থায় থাকতে পারত। হাবিব ছেলেটা আমাদের কাছ থেকে যা টাকা ধার করেছিল ওর বাবার অসুস্থতার সময় না চাইতেই শোধ করতে শুরু করেছে সেই প্রথম সপ্তাহ থেকে। অথচ কত বড়লোকের কাছে টাকার জন্য ধর্ণা দিতে হয় কতবার! কি আশ্চর্য এই মেয়েটাকে আমি চোখের সামনে দেখেও ওকে কক্ষনো আমার ছেলের জন্য কল্পনাও করিনি”। দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন সুলতানা বেগম, “কত ক্ষুদ্র মন আমার! বলা কত সহজ অথচ কার্যত আমি প্রমাণ করলাম বলা আর করা এক জিনিস নয়!...”
মাহমুদ চেয়ার ছেড়ে মায়ের পায়ের কাছে বসে মায়ের চোখের দিকে তাকাল যেখানে চিকচিক করছে ক’ফোঁটা অশ্রু, “মা, তোমার মন যে কত বড় তুমি নিজেই জানোনা! মানুষ ভুল করে আবার সেই ভুলের ওপরেই দন্ডায়মান থাকে। কিন্তু আমি তোমাকে দেখেছি তুমি নিজেকে বিশ্লেষণ কর, সংশোধন কর, নিজের ভুল অকপটে স্বীকার কর। আমার এই মাকে আমি এমন এক বৌ এনে দিতে চাই যে তাকে দেখেশুনে রাখবে, কোন কষ্ট পেতে দেবেনা আর কষ্ট যদি আসেই তবে তা তোমার সাথে ভাগ করে নেবে। মা, যে নিজের বাবামাকে সম্মান করতে শেখে সে অন্যের বাবামাকেও শ্রদ্ধা করতে জানে। আমার দিশার সাথে কখনো কোন আলাপচারীতা হয়নি কিন্তু ও ওর বাবার জন্য যা করেছে … আমি তখনই ভেবেছি আমার মায়ের জন্য আমি এমনই এক দরদী মেয়েকে চাই…”
ছেলের কথায় মা আর অশ্রু সামলাতে পারলেন না, ভাত হাতেই ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন।

দু’দিন পর মাহমুদ আর ওর মা হাবিবের বাসায় গেল। হাবিবের মা স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে তাদের অপ্যায়ন করলেন, স্বামীর শেষ দিনগুলোতে তাদের সাহায্যের কথা স্মরণ করে তাদের ধন্যবাদ জানালেন। কিন্তু মাহমুদের মা দিশার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহের কথা জানাতে চাচী কেমন যেন ভড়কে গেলেন। “আপা, আপনারা অনেক বড়লোক। আপনি বলেছেন এটাই আমাদের জন্য অনেক বড় ব্যাপার …”, চাচীর গলার স্বর মিইয়ে গেল। মা কি বলতে চাইছেন বুঝতে পেরে হাবিব বলল, “আন্টি, আমরা আপনাদের কাছে যারপরনাই কৃতজ্ঞ, মাহমুদ আমার বাবার জন্য যা করেছে তা কেবল একজন আপন ভাইই করতে পারে। কিন্তু আমরা সামাজিকভাবে আপনাদের অনেক নীচে। আমি চাইনা আমার বোন মনে করুক আমরা আপনাদের থেকে ফায়দা নেয়ার জন্য তাকে আপনাদের কাছে বিয়ে দিচ্ছি”। সুলতানা বেগম আর যাই মনে করে আসুন না কেন, এমন বাঁধার সম্মুখীন হবেন ভাবেননি। তিনি আমতা আমতা করতে লাগলেন।

মাহমুদ মায়ের পাশ থেকে উঠে হাবিবের কাছে গিয়ে দাঁড়াল, “চাচী, আপনার যদি আপত্তি না থাকে, দিশাকে ডাকুন। ওর ব্যাপারে কথা হচ্ছে সুতরাং ওর শোনা দরকার”।
চাচী ইতস্তত করে দিশাকে ডাকলেন। সলতানা বেগম এই প্রথম মনোযোগ দিয়ে মেয়েটিকে দেখলেন। হাল্কাপাতলা, মায়াবী চেহারা, বাবার চেহারার ছাপ আছে, লেখাপড়া করতে করতে নিজের যত্ন নেয়া হয়না কিন্তু বেশ বুঝতে পারলেন ঠিক মত যত্ন নিলে মেয়েটির স্বাস্থ্য চেহারা দেখার মত হবে। আফসোস হোল কেন তিনি চোখের সামনে থাকা এই মেয়েটির কথা আগে ভাবেননি। হাবিব দিশাকে সব খুলে বলল। দিশা হতবাক হয়ে মাহমুদের দিকে তাকালো। সুলতানা বেগমের কোন সন্দেহ রইলোনা যে আসলেই এমনকি দিশার সাথেও মাহমুদের কোন আলাপ হয়নি।
সুলতানা বেগম উঠে মেয়েটির কাছে গিয়ে চিবুক ধরে তাকে আদর করলেন। তাঁর মনে হোল এটি যেন তাঁর নিজেরই মেয়ে! তিনি ওর পাশেই বসে পড়লেন, “আপা, আমার কোন মেয়ে নেই। আপনার মেয়েটি আমাকে দিন। আমি বৌ নয় মেয়ে চাইতে এসেছি। সেক্ষেত্রে কোন সামাজিক পার্থক্য বা দেনাপাওনার হিসেব আমাদের মাঝে বাঁধার দেয়াল রচনা করতে পারেনা, তাইনা?”
চাচীর চোখের কোণ থেকে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। হাবিব মাহমুদকে জড়িয়ে ধরল, দিশা সুলতানা বেগমের আঁচলে মুখ লুকাল- মা ছেলে দুই ভাইবোনের কাঁধের ওপর থেকে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগল- সে হাসিতে আত্মার বন্ধন …

বিয়ে -৬

মাহমুদ আর ওর মা যেন দুই দেহ একপ্রাণ। এই ছেলেটিকে মা যেমন ভালোবাসেন, তেমনি ছেলেও মায়ের প্রতি বিশেষ যত্নশীল। সে কখনো মাকে নিরাশ হতে দেয়নি। লেখাপড়ায় যেমন এগিয়ে ছিল সবসময় ঠিক তেমনি পড়ালেখা শেষ করেই ভালো চাকরী পেয়েছে নিজ যোগ্যতায়। মাহমুদের মা, সুলতানা বেগমের অনেক আশা এবার ছেলেকে বিয়ে করাবেন। সে চাকরী পাওয়া মাত্র উনি মেয়ে দেখতে শুরু করেছেন। অনেক দেখেশুনে ওনার বান্ধবী শায়লার মেয়েকে পছন্দ হোল।

একদিন মাহমুদ অফিস থেকে আসতেই উনি খাবার টেবিলে কথাটা তুললেন। মা-ছেলের মাঝে কোন ব্যাবধান ছিলোনা। মাহমুদ বলল, “বেশ তো, তোমার পছন্দ হলে আমার তো মনে হয় পছন্দ হবে”।
মা বললেন, “আমি ওর একটা ছবি এনেছি, দেখবি?”
মাহমুদ বলল, “নাহ, চেহারা দেখে কি হবে? তবে ওর সাথে একবার কথা বলা গেলে ভালো হত। যার সাথে সারা জীবন থাকব তার মনমানসিকতা আমার সাথে মিলবে কি’না সেটা একটু যাচাই করে নিলে মনে হয় খারাপ হয়না”।
ছেলে আপত্তি করেনি তাতেই মা খুশী। বললেন, “আমি কালই শায়লার সাথে কথা বলে মেয়ে দেখার ব্যবস্থা করছি”।

শায়লা জানালেন, “কাল মেয়ের রেজাল্ট দেবে, অনার্স থার্ড ইয়ার। দুপুর নাগাদ সে বাসায় চলে আসবে। তোমরা মা ছেলে বিকেলে চলে আস। তাহলে আমরা দুই বান্ধবী ডাইনিং রুমে বসে গল্প করব আর ওরা ড্রইং রুমে বসে যা বলার, যা জানার সব সেরে নিতে পারবে। আমরা ওদের দেখতে পেলাম আর ওরা ওদের মত কথা বলতে পারল”।
প্রস্তাবটা সুলতানার পছন্দ হোল। মাহমুদকে বললে সেও জানাল, কাল বৃহস্পতিবার বলে অফিসে কাজের চাপ বিশেষ নেই। সুতরাং সে একটু আগে আগে চলে আসতে পারবে।

পরদিন মাহমুদ আর সুলতানা বেগম মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে চললেন মেয়ে দেখতে। শায়লা প্রস্তুত ছিলেন। মেহমানদের যথাযথ অপ্যায়ন করে উনি মেয়েকে ডাকলেন। মেয়ে এলে উনি মাহমুদের সাথে মেয়েকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে সুলতানাকে বললেন, “চল তো আমরা খাবারগুলো ভেতরে নিয়ে যাই!” মাহমুদ ইশারা বুঝতে পারল। সে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল, “আপনার সাথে ভনিতা করে লাভ নেই, আপনি নিশ্চয়ই জানেন আমাদের মায়েরা এত বছর ধরে বান্ধবী হবার পরও আমাদের কেন আজই প্রথম দেখা হচ্ছে?”
মেয়েটি মাথা নাড়ল।
সে বলল, “আমার মনে হয় প্রথমে নিজের ব্যাপারে কিছু বলা উচিত। বাবা নেই। মা অনেক কষ্ট করে আমাকে মানুষ করেছেন। সুতরাং, আমার প্রথম প্রায়োরিটি থাকবে আমার মাকে দেখাশোনা করা। দেখাশোনা আমিই করব, কিন্তু আমার স্ত্রীকে এই ব্যাপারে সহনশীল হতে হবে। আমার মায়ের পেছনে আমার সময় বা টাকাপয়সা ব্যায় নিয়ে বাড়াবাড়ি বা অশান্তি করা যাবেনা”।
মেয়েটি আবার মাথা নাড়ল।
মেয়েটির চুপচাপ ভাব দেখে মাহমুদের কেমন যেন খটকা লাগল, সে বলল, “আপনার কি কোথাও পছন্দ আছে? থাকলে বলুন, আমি কাউকে জানাব না, বলব আমার এখানে বিয়ে করার ইচ্ছে নেই”।
এবার মেয়েটি নড়েচড়ে বসল, “নাহ, আমার কোথাও পছন্দ নেই”।
“আপনার যদি আমাকে পছন্দ না হয় তাও আপনি সরাসরি বলতে পারেন। বিয়ে তো আর বারবার করা যাবেনা, সুতরাং মনে কোন অশান্তি রেখে রাজী হবেন না”।
মেয়েটি কিছু বললনা। এই অবস্থায় মাহমুদ কি বলবে খুঁজে পেলোনা। শেষমেশ বলল, “আপনার আজ রেজাল্ট দেবার কথা ছিল, রেজাল্ট কেমন হোল?”
মেয়েটি একটু ইতস্তত করে বলল, “ফার্স্ট ক্লাস … ফার্স্ট”।
মেয়েটির ইতস্তত ভাব মাহমুদের চোখ এড়ালোনা। সে বলল, “দেখুন, আমি আবারও বলছি। বিয়ে আমার কাছে অত্যন্ত সিরিয়াস একটা ব্যাপার। আশা করছি আপনিও ব্যাপারটাকে হাল্কাভাবে নিচ্ছেন না। আপনি কি আমাকে কিছু বলতে চান?”
মেয়েটি আবার কিছুক্ষণ ইতস্তত করে মাথা ঝাঁকাল।

বাসায় এসে সুলতানা বেগম গদ গদ হয়ে ছেলেকে বললেন, “কি? মেয়েটা অসম্ভব সুন্দর না?”
মাহমুদ বলল, “হ্যাঁ”।
“ওরা খুব ভদ্রলোক”।
“জ্বী মা, শায়লা আন্টিকে দেখলে বোঝা যায়”।
“ওদের আর্থিক অবস্থাও আমাদের মতই, সুতরাং তোকে কেউ ছোট করবেনা”।
“জ্বী মা”।
“তাহলে শায়লাকে হ্যাঁ বলে দেই?”
“না মা”।
“সে কি? কেন?”
“আমি আরেকটু ভেবে দেখি”।
“কেন বাবা? বলছিস তো পছন্দ হয়েছে। তাহলে এত ভাবাভাবির কি আছে?”
“এত না মা … একটু। কি যেন একটা আমার ঠিক মনে হচ্ছেনা। আমাকে দু’টা দিন সময় দাও”।
মা চোখ কপালে তুলে চলে গেলেন।

পরদিন মাহমুদ মায়ের কাছে মেয়েটির ছবি চেয়ে নিল। মা খুশী হয়ে গেলেন যে ছেলে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। মাহমুদ ছবি নিয়ে বন্ধু হাবিবের বাসায় গেল। জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হোল যে হাবিবের বোন আর তার দেখা মেয়েটি একসাথে পড়ে। সে হাবিবকে বলল, “তোর যদি আপত্তি না থাকে আমি একটু দিশার সাথে কথা বলতে চাই।
হাবিব বলল, “আপত্তি কিসের? দিশা, একটু এদিকে আয় তো! মাহমুদ একটু কথা বলবে”, মাহমুদকে চোখ টিপে বলল, “এই উসিলায় যদি ওকে পড়ার টেবিল থেকে তোলা যায়!”
দিশা এসে বলল, “আসসালামু আলাইকুম, ভাইয়া! মিষ্টি খান। আমি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছি”।
চমকে উঠল মাহমুদ। কিন্তু কেউ কিছু বোঝার আগে সে মুখে একটা আস্ত মিষ্টি পুরে দিয়ে ভাবতে লাগল এর পরে কথা কিভাবে এগোনো যায়।
মিষ্টি শেষ করে সে দিশাকে বলল, “আচ্ছা, এই ছবিটা দেখ তো! এই মেয়েটাকে আমাদের এক আত্মীয়ের জন্য দেখা হচ্ছে। শুনলাম সে তোমার সাথে পড়ে। ওর ব্যাপারে কি জানো বল তো?”
দিশা ছবি দেখে একটু ইতস্তত করতে লাগল। মাহমুদ বুঝে পেলোনা কি সমস্যা।
সে বলল, “কি দিশা? মেয়েটার কি বয়ফ্রেন্ড আছে?”
দিশা তাড়াতাড়ি বল, “নাহ ভাইয়া। ও ভালো মেয়ে”
“তাহলে কি?”
“আপনি তো বরপক্ষের লোক। আপনাকে বলা যাবেনা”।
মাহমুদ মরিয়া হয়ে উঠল, “শোন, বিয়ের ব্যাপারে লুকোচুরি করতে হয়না। তুমি নির্দ্বিধায় বল। বরপক্ষকে কি বলতে হবে আমি বুঝেশুনে বলব”।
দিশাও সমান মরিয়া হয়ে বলল, “আল্লাহ আমাকে মাফ করুন। ভাইয়া, আমি বলতে চাচ্ছিনা”।
মাহমুদের এবার আরো খটকা লাগল। সে বলল, “দিশা, আমার জানা প্রয়োজন কি এমন ঘটনা যা তুমি বলতে চাইছনা!”
হাবিব বলল, “বলে দে দিশা, তুই না বললেও কেউ না কেউ বলবে। মাহমুদ দায়িত্বশীল ছেলে। সে বরপক্ষকে বুঝেশুনে যা বলার তাই বলবে”।
দিশা মাটির দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাইয়া, প্লীজ আপনি কাউকে বলবেন না। ও ভালো মেয়ে কিন্তু পড়াশোনায় মন নেই। প্রতিবার কোনক্রমে থার্ড ক্লাসে পাশ করে আসছে কিন্তু বাবামা’র ভয়ে বাসায় গিয়ে বলে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে। গতকাল কে যেন ওকে দেখতে এসেছে। ও বলে দিয়েছে ও ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছে। পরে আমাকে ফোন করে বলল। আমার ব্যাপারটা ভালো লাগেনি ভাইয়া। সে যা বলেছে তাতে আমার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু সে বাবামাকে মিথ্যা বলছে সেটাই যথেষ্ট খারাপ কথা তার ওপর একটা বাইরের মানুষকে এরকম একটা মিথ্যা বলা আমার ঠিক মনে হয়নি। এই বিয়েটা হলে ঐ ভদ্রলোক সব জানতে পারবেন। তখন উনি ওর বাবামাকে প্রতারক মনে করবেন। এটা কি ওর বাবামা’র প্রতি সুবিচার হবে?”
মাহমুদ দিশাকে আশ্বস্ত করে চলে এলো।

বাসায় এসে মাহমুদ মাকে জানিয়ে দিল সে এ বিয়ে করবেনা। সুলতানা বেগমের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। তিনি ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন এটুকু ব্যাপারে বিয়ে ভেঙ্গে দেয়ার কোন যুক্তি নেই। আবার চিন্তায় পড়ে গেলেন ছেলে কিছুতেই রাজী না হলে তিনি বান্ধবীকে কি বলবেন। শেষে রাগ করে তিনি মাহমুদের সাথে কথা বন্ধ করে দিলেন, অসুস্থতার ভান করলেন। কিন্তু ছেলে কিছুতেই গললনা।

কয়েকদিন পর খাবার টেবিলে সুলতানা বেগম চুপচাপ খাচ্ছেন আর মাহমুদ চোখে কৌতুক নিয়ে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ সে বলল, “মা, সত্যি করে বল তো, তুমি কি শায়লা আন্টিকে কি বলবে সেটা নিয়ে বেশী চিন্তিত নাকি তোমার ছেলে সুখী হবে কি’না সেটা নিয়ে?”
সুলতানা বেগমের গলায় ভাত যেন আটকে রইল। ছেলের সাথে কথা না বলার সংকল্প ভুলে গিয়ে উনি বললেন, “বাবা, তোর সুখই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তুই কেন এটুকু কথার ওপর বিয়েতে নারাজ সেটা আমাকে একটু বুঝিয়ে বল। আমি তো এই মেয়ের আর কোন ত্রুটি দেখিনা”।
“দেখ না সেটা ঠিক না মা, বল দেখতে চাও না। দেখ মা, কথাটা এটুকু আবার অনেক বড়ও বটে। আমিও জানি আমাদের সাংসারিক জীবনে সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হলেও যা ফেল করলেও তা- ওর রেজাল্টের ফলে আমাদের দাম্পত্য জীবনে কোন হেরফের হবেনা। কিন্তু আমি যার সাথে সারাজীবন সংসার করব তার ওপর আস্থা রাখতে পারাটা আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে যদি আমাকে জানাত সে ফেল করেছে তাহলেও আমি বিয়ের ব্যাপারে অগ্রসর হতাম। কিন্তু যে আমাকে এত তুচ্ছ একটা বিষয়ে মিথ্যা বলল তাকে আমি আমার জীবন দিয়ে কিভাবে বিশ্বাস করব? আমি কি করে বুঝব যে সে আমাকে অন্যান্য ব্যাপারেও মিথ্যা বলছেনা?”
মা তার ভুল বুঝতে পেরে নিজের ভুলের জন্য অত্যন্ত লজ্জিত হলেন। কিন্তু মাহমুদ তাঁর চেহারা দেখে বুঝতে পারল এই ভাবনাটা মায়ের মনেও দোলা দিয়েছে আবার তিনি এটাও চিন্তা করেছেন যে বান্ধবীকে কি বলবেন।

মাহমুদ চেয়ার ছেড়ে মায়ের পায়ের কাছে গিয়ে বসল, মায়ের চোখে চোখ রেখে বলল, “মা, আমি তো তোমারই ছেলে, তুমি না বললেও বুঝি তোমার মনে কি কাজ করছে। শায়লা আন্টিকে আমাদের বলার কোন প্রয়োজন নেই আমরা কেন রাজী না। মেয়েটার রেজাল্ট বিষয়ে কিছু বলে ওর জীবনটা বিষিয়ে দেয়ার কোন দরকার নেই আমাদের। আন্টিকে বল, ‘আমার ছেলে খারাপ, সে এক জায়গায় প্রেম করে’ বা যা তোমার বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু এটুকুর জন্য আমাকে এমন বিয়ে করতে বাধ্য কোরনা মা যাকে তোমার ছেলে কোনদিন মন থেকে বিশ্বাস করতে পারবেনা”।
সুলতানা বেগমের চোখে পানি চলে এলো। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে উনি বললেন, “আজ আমার ছেলেই আমাকে শেখাল কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল! আজকে আমার খুশীর অন্ত নেই রে বাবা! তুই চিন্তা করিস না। আমি তোকে কোন কিছুতে বাধ্য করবনা। এ’কদিন তোকে যে কষ্ট দিয়েছি তার জন্য তুই আমাকে মাফ করে দে বাবা। আমি এখনই শায়লার সাথে কথা বলছি”।

মাহমুদ শুনতে পেল মা ফোনে বলছেন, “শায়লা? হ্যাঁ, সুলতানা বলছি। না রে বোন। আমার ছেলেটা একটা আস্ত পাগল। কিছুতেই সে এখন বিয়ে করতে রাজী হয়না। বলে নতুন চাকরী, এখন ওখানেই কনসেন্ট্রেশন দেয়া জরুরী। যাক, সময় তো পড়েই আছে। তোমার মেয়েরও অনার্স শেষ হতে আরো একবছর বাকী। দেখা যাক এই এক বছরে ওরা বিয়ের জন্য প্রস্তুত হয় কি’না। ঠিক আছে বোন, রাখি। আবার পরে কথা হবে”।

মাহমুদ মুচকি হেসে শুতে চলে গেল। মায়েরা বোঝে সবই … কিন্তু কেন যে পাগলামী করে!

বিয়ে ৫

বহুদিন পর দুই বান্ধবী মন ভরে গল্প করার সুযোগ পেল। মিনা বাপের বাড়ী এসেছে ক’দিন থাকতে। রাহির বর গেছে ঢাকায়। এ সুযোগ কি হাতছাড়া করা যায়? দু’জনেই এখন মিনার বাপের বাড়ী। বসে আছে ড্রইং রুমের ঝুল বারান্দায়। গভীর রাত। বাসার আর সবাই ঘুমে অচেতন। কিন্তু দুই বান্ধবীর তাতে ন্যূনতম মাথাব্যাথা নেই। মিনাদের বাড়ীর আশপাশটা কেমন যেন একটু গ্রাম গ্রাম ধরণের, রাতের বেলা ঝিঁ ঝিঁ ডাকে, জোনাকীর আলো দেখা যায়। সাথে শেষরাত্রির একটু একটু বাতাস, আকাশে চাঁদের আলোর বন্যার মাঝে তারাদের সাঁতার কাটা। চমৎকার লাগে রাহির।

“তুই কেমন আছিস সত্যি করে বল তো রাহি?”, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে মিনা যেন দৃষ্টি দিয়েই সত্যটা উদ্ঘাটন করে নেবে আজ।
ওর অনুসন্ধিৎসু চেহারা দেখে হাসি সামলাতে পারেনা রাহি, “কি বললে তোরা সবাই বিশ্বাস করবি যে আমি ভালো আছি?”
“আচ্ছা, তুই হলি একটা আগুনের গোলা আর রাশিদ ভাই হলেন পানির ড্রাম; তুই অসম্ভবরকম স্বাধীনতা পেয়ে বড় হয়েছিস- যেমন তুই রাজী বলে আংকেল বিয়ে দিয়ে দিলেন, আর দেখ ডাক্তারসাহেবের থেকে মুক্তি পাবার জন্য আমার তোকে ভাড়া করে আনতে হয়েছে, তারপর একটা কনজার্ভেটিভ পরিবেশে গিয়ে তুই কি করছিস- এসব নিয়ে আমরা খুব চিন্তা করি রে!”
“শোন, লেকচার দিচ্ছিনা তবে আমার অভিজ্ঞতা বলে দু’জনের বেসিক মানসিকতায় মিল থাকলে আর বাকী ব্যাপারগুলো উল্টো হলে সম্পর্কটা ভালো হয়, বৈচিত্র আসে, একজন অপরজনের থেকে কিছু শিখতে পারে। ভেবে দেখ আমরা দু’জনেই হুলস্থুল মেজাজী হলে কবে একজন আরেকজনকে খুন করে ফেলতাম!”
মিনা হাসতে হাসতে বলে, “এখনো যে করিসনি তাতেই তো আমরা অবাক হয়ে যাই! আর পারিবারিক ক্ষেত্রে যেসব পার্থক্য, সেগুলো সামাল দিস কিভাবে?”
রাহি গম্ভীর হয়ে বলে, “একেবারে ভিন্ন দুই পরিবেশ থেকে এসে একে অপরের সাথে একেবারে মিশ খেয়ে যাওয়া সহজ নয়। এর জন্য উভয়পক্ষের সময় প্রয়োজন, সহনশীলতার প্রয়োজন আর দরকার একে অপরকে বোঝার আগ্রহ। তবে ইসলাম আমাদের মাঝে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে, পরস্পরকে সম্মান করতে একে অপরের প্রতি সহনশীল হতে শেখায়। রাশিদ সাহেব খেয়াল রাখেন তাঁর পরিবার যেন আমাকে ভুল না বোঝে, আর আমাকে আগেভাগে বলে দেন কার কি পছন্দ কেমন মনোভাব। তাহলে যেকোন পরিস্থিতি বোঝা, সামাল দেয়া সহজ হয়ে যায়”।
“মজার পার্টনারশিপ তো তোদের! আহারে আমার খালাত ভাইটা যদি একটু বুদ্ধি খরচ করত!”
“কেন রে, ভাইজান আবার কি অন্যায় করল?”
“তুই চাকরীতে ঢোকার পর থেকে তো তোকে পাওয়াই মুশকিল। কত কথা যে জমে আছে! জানিস তো ভাইজান বিয়ে করেছে।“
“হ্যাঁ”।
“বিয়ের আগে ভাইজান বলত, ‘মিনা, দেখিস আমি এমন মেয়ে বিয়ে করব যে আমার সাথে মিলে আমাদের পরিবারটাকে সংশোধন করে ইসলামের পথে নিয়ে আসবে’। ওর কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে খুঁজেপেতে এরকম একটা মেয়ে ঠিক করলাম। খালা, খালাত বোনরা কিছুতেই রাজী না। এই মেয়ে তাদের সাথে মিশ খাবেনা- ওরা সিরিয়াল দেখতে গেলে এই মেয়ে ওদের নামাজের জন্য ডেকে নিয়ে যাবে, ওরা বিয়েবাড়ীতে যাবার জন্য পার্লারে সাজতে যাবে আর এই মেয়ে ঢেকেঢুকে ওদের সাথে গেলে ওদের স্মার্ট ইমেজের বড্ড ক্ষতি হয়ে যাবে। ওরা ভাইজানকে বলল, ‘তুমি আগে আমাদের পছন্দের একটা মেয়ে দেখ, তারপর তোমার ভালো না লাগলে নাহয় ঐ মেয়েকেই বিয়ে কোর’। ওরা দেখেশুনে এক অসাধারণ সুন্দরীকে দেখালো আর ভাইজান এক বলেই কুপোকাত! বিলকুল ভুলে গেল ওর সমস্ত সংকল্প, পরিকল্পনা। ভাবী খুবই ভালো মেয়ে, খালা আর খালাত বোনদের সাথে ওর সম্পর্ক খুব ভালো- বাসার সবাইকে দাওয়াত দিয়ে সিরিয়াল দেখতে বসে, প্রত্যেক বিয়েতে নতুন কাপড়, নতুন সাজ। কিন্তু ভাইজান কি পেল? ওর পরিবার কি পেল?”
রাহি কি উত্তর দেবে খুঁজে পায়না।
হঠাৎ ফুঁসে ওঠে মিনা, “সেদিন ভাইজান দেখা করতে এসেছিল। বলে, ‘আমার বৌ আমাকে ভালোবাসেনা- নামাজ পড়ার ব্যাপারে গাফলতি করে, মাথায় তো দূরে থাক গায় পর্যন্ত ঠিকভাবে ওড়না দেয়না, কত বইপত্র এনে দেই কিন্তু ওর পড়ার কোন ইচ্ছা বা জানার কোন কৌতুহল নেই’। মনে মনে বলি, ‘ব্যাটা তুই মেয়েদের কি মনে করিস? যে পাত্রে রাখা হবে সেই পাত্রের আকৃতি ধারণ করবে। মেয়েরা কি মানুষ নয়? এতদিন সে যে বিশ্বাস, ধ্যানধারণা নিয়ে বেড়ে উঠেছে, তুমি বলবে আর সে সুবোধ বালিকার মত সব ত্যাগ করে নিজেকে তোমার রংয়ে রাঙ্গিয়ে নেবে? কোথায় পেয়েছ এসব ফালতু ফিলসফি? বেচারী নিজের সৃষ্টিকর্তাকেই ভালোবাসতে শেখেনি, তোমাকে ভালোবাসবে কোথা থেকে?’ বাইরে বললাম, ‘বিয়ে যখন করে ফেলেছ শিখিয়ে পড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা কর’। রাহি, ঘোড়াকে পানির কাছে নিয়ে যাওয়া যায় কিন্তু তাকে জোর করে পানি খাওয়ানো যায়না। ওকে এই ভুলের মাশুল সারাজীবন গুণতে হবে”।

বেশ কিছুক্ষণ দু’জনেই নীরব। তারপর কি যেন ভেবে মিনা একটা বিশাল দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। রাহি চোখে জিজ্ঞাসা নিয়ে তাকায়, “কি ভাবছিস?”
“এই যে যারা ইসলাম বোঝে তারা বিয়ে করার সময় ইসলামকে প্রাধান্য দেয়না, ফলে দু’জনেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়”।
“বুঝলাম না”।
“শোন, এমনিতেই আমরা নিজেদের মুসলিম বলে দাবী করলেও ইসলাম প্রকৃতপক্ষে বুঝে, জানে বা মানে এমন মানুষের সংখ্যা ক’জন? তার ওপর ভাইজানের মত ছেলেরা, যারা নিজেরা ইসলাম বোঝে, তারা এমন মেয়েদের বিয়ে করছে যাদের প্রকৃতপক্ষে ইসলাম সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। ফলে না তারা নিজেরা সুখী হতে পারছে না পারছে স্ত্রীদের সুখী করতে। যখন তাদের সন্তান হচ্ছে তখন সন্তানেরা মায়ের কাছ থেকে ইসলাম সম্পর্কে কোন ধারণা পাচ্ছেনা আর বাবামায়ের প্রচ্ছন্ন দ্বন্দ্বে সন্তান সবসময় মায়ের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। তাছাড়া ভেবে দেখ, যে পুরুষ বিয়ে করার সময় উদাসীন তুই কি মনে করিস সে সন্তানের জ্ঞানের ক্ষেত্রে এই শূণ্যস্থান পূরণ করার জন্য তৎপর হয়? ফলে দ্বিতীয় জেনারেশনে যেতে না যেতেই ঐ পরিবার থেকে ইসলামের বিলুপ্তি। তারপর দেখ এর উল্টো চিত্র। সামান্য ক’টা ইসলাম জানা ছেলে যখন অন্যত্র বিয়ে করছে তখন যে ক’টা মেয়ে ইসলাম জানে তাদের বিয়ে করতে হচ্ছে এমন ছেলেদের যারা ইসলাম বোঝেনা। ফলে তারা প্রথমেই মেয়েগুলোকে পর্দা ছেড়ে দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। আমাদের মেয়েদের ছোটবেলা থেকে স্বামীর অধিকার সম্পর্কে এমন আকাশচুম্বী ধারণা দেয়া হয় যে তা স্বয়ং কুর’আনে কি আছে তাকেও ছাড়িয়ে যায়। ফলে যদি আল্লাহর কথা আর স্বামীর কথা দ্বান্দ্বিক হয়ে পড়ে সেক্ষেত্রে সে যে স্বামীকে ‘না’ বলার অধিকার রাখে, এ’টুকু অধিকার সে প্রয়োগ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। সামাজিক একটা চাপ তো আছেই। একটা ঘরের একটা পিলার যদি তুই ফেলে দিস আগেপরে পুরো ঘরটাই ড্যামেজ হয়ে যাবে। সুতরাং যে মেয়েটা তার জীবনের সবচেয়ে অর্থবহ অবদান রাখার সম্ভাবনার শুরুতেই কম্প্রোমাইজ করে, সে আর কখনো উঠে দাঁড়াতে পারেনা। ফলাফল, এই পরিবারে প্রথম জেনারেশন থেকেই ইসলামের বিলুপ্তি। বৃহত্তর পরিসরে গিয়ে দেখ এক বিশাল নামধারী মুসলিম জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি হচ্ছে যাদের অধিকাংশই কালিমা পর্যন্ত জানেনা। ফলে জনসংখ্যা জরীপে মুসলিমদের যে বিশাল সংখ্যা দেখে আমরা আনন্দিত হই সেটাই তো আসলে আমাদের দুঃখিত হবার কারণ”।
মিনার চিন্তার গভীরতায় রাহির মাথা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছিল।

[imghttp://www.sonarbangladesh.com/blog/uploads/rehnuma201103151300156902_1531979022_e704bded72.jpg]

কিছুক্ষণ চিন্তায় মশগুল থেকে রাহি বলল, “মিনা, আমাদের ছেলেরা এভাবে দিগ্বিদিকজ্ঞানশূণ্য হয়ে বিয়ের আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ছে কেন সেটা তো একটু ভাববি!”
মিনা বলল, “ওদের মাথার সমস্যা তাই”।
হেসে ফেলল রাহি, “তুই হুলস্থুল রেগে আছিস, নইলে তুই নিজেও দেখতে পেতি। মাথার সমস্যাই বটে। আমাদের বাপ মায়েরা নিজেরা অল্পবয়সে বিয়ে করেছে। তারপর খুব তাড়াতাড়িই ভুলে গিয়েছে অল্পবয়সে মানুষের চিন্তাভাবনা অনুভূতিগুলো কেমন থাকে। আমাদের এই সমাজে এতরকম প্রলোভন, পথভ্রষ্ট হবার এত বেশী সুযোগ যে আমাদের এই ভাইবোনগুলোকে বাঁচানোর জন্য যথাসময়ে বিয়ে দেয়ার বিকল্প নেই। কিন্তু আমাদের গার্ডিয়ানদের আমাদের পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, বিদেশ যাওয়া নিয়ে যত টেনশন তার ১% টেনশনও নেই তাদের সন্তানদের চরিত্র বাঁচানোর জন্য উদ্যোগ নেয়ার ব্যাপারে। ছেলেমেয়েরা লজ্জায় বলতে পারেনা আর বাবামায়েরা ভাব করে তারা কিছু বোঝেনা। এই লজ্জা লজ্জা খেলায় একসময় বলি হয়ে যায় চরিত্র বা সংকল্প- যে উইকেট আগে পড়ে। বাবামাদের বললে বলে, ‘সে কি চাকরী করে? ওর বৌকে খাওয়াবে কি?’ আচ্ছা বাবা, ‘আমার বোন যদি বিয়ের পরেও মাসের পর মাস জামাই নিয়ে বাচ্চা নিয়ে আমাদের বাসায় থাকে, খায়, লেখাপড়া করে তাতে তোমাদের গায়ে লাগেনা আর ছেলের বৌ এলেই যত সমস্যা? সে তো নিজের রিজিক নিয়েই আসে। কিন্তু আমাদের সমাজে এখনো ছেলের বৌদের মনে করা হয় সে পরিবারে দেবে কিন্তু পরিবার থেকে পাবার তার কোন হক নেই- যতদিন সে কর্মক্ষম থাকে ততদিন তার শ্বশুরবাড়ীতে ঠাঁই হয়, আর অসুস্থ হলেই দাও পাঠিয়ে বাপের বাড়ী!- মাঝখানে ছেলেটার চরিত্র মাটি হয়ে যায়”।
মিনা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “বুঝি রে রাহি, সব বুঝি। আমাদের এই মধ্যরাতের আড্ডায় আমরা দুনিয়ার সব সমস্যার সমাধান করে ফেলি অথচ বাস্তবে আমরা কতটুকুই বা করতে পারি?”

গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে দুই বান্ধবী পূব আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, কবে সেখানে আলো ফুটবে?

বিয়ে ৪


রাশিদ ভাইকে নিয়ে অফিসে হাসাহাসির অন্ত নেই। মানুষটা হঠাৎ করেই দিনরাত এক্সারসাইজ করছে, মাপঝোঁক করে খাওয়া দাওয়া করছে- অথচ উনি পারলে দুইকদমও হাঁটেন না! একদিন রাহি ঠাট্টাচ্ছলে বলেই ফেলল, “কি রাশিদ ভাই, আমাদের হবু ভাবীকে ইম্প্রেস করার জন্যই কি এই প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা?” রাশিদ ভাই ভীষণ লজ্জা পেয়ে বললেন, “অনেকটা তাই”। এত্তবড় লোকটাকে মেয়েদের মত লজ্জা পেতে দেখে সে হাসি সামলাতে পারলনা। ওর উচ্ছসিত হাসি শুনে রাশিদ ভাই পালিয়ে বাঁচলেন।

এবার অফিসে জল্পনা কল্পনা শুরু হোল রাশিদ ভাই কাকে বিয়ে করার জন্য ফিট অ্যান্ড হ্যন্ডসাম হবার চেষ্টা করছেন। তিনি কিছুদিন আগে বাড়ী থেকে ফিরলেন। তাই অধিকাংশ ধারণা করল তিনি মেয়ে দেখার জন্য বাড়ী গেছিলেন। কেউ কেউ ধারণা করল অফিসের সুন্দরী ফারহানা- যে তাকে প্রায়ই ফুল দিয়ে যায় আর তিনি তৎক্ষণাৎ তা নিকটস্থ কোন পুরুষ বন্ধুকে সমর্পণ করে কৃতার্থ করেন- হয়ত শেষ পর্যন্ত তাঁর মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে।

রাহির অতসব ভাবাভাবিতে কাজ নেই। রাশিদ ভাই বিয়ে করবেন জেনে সে চটপট কয়েকটা হিসেব করে নিলো। প্রথমত যে মেয়েটিকে তিনি বিয়ে করবেন সে কয়েকটি ফ্রি উপহার পাবে। যেমন কেউ কখনো রাশিদ ভাইকে নামাজ কাজা করতে দেখেনি। যার জবাবদিহিতার ভয় আছে সে নিশ্চয়ই একটি মেয়েকে ঠকাবে না। তিনি যে পদে অধিষ্ঠিত তাতে তিনি চাইলে ঘুষ খেয়ে লাল হয়ে যেতে পারেন কিন্তু তিনি একটি পয়সাও কখনো খেয়েছেন কেউ বলতে পারবেনা। বরং রাহিকে তিনি একদিন কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন, “ম্যাডাম, পৈত্রিক সূত্রে একখানা বাড়ী পেয়েছি, যা বেতন পাই তাতে বাবা মা, দু’টো বোন আর আমার খাওয়া পরা হয়ে কিছু বাঁচে। মানুষের সুখী হবার জন্য আর কত চাই বলুন?” এটা রাশিদ ভাইয়ের আরেকটা গুন। অফিসের পিয়ন থেকে শুরু করে বড়সাহেব পর্যন্ত সবার সাথে তিনি একই ব্যাবহার করেন। তাই সবাই এই সদালাপী আর হাসিখুশী মানুষটাকে খুব পছন্দ করে। দ্বিতীয়ত, কোন মেয়েকে সুখী এবং সৌভাগ্যবতী করার এটা মোক্ষম সুযোগ। সুতরাং, রাহি হিসেব করতে শুরু করল আত্মীয় বন্ধুদের মধ্যে কাকে কাকে রাশিদ ভাইয়ের জন্য দেখা যায়। হিসেব নিকেশ করে দু’জনকে ওর পছন্দ হোল। ব্যাস, যেই ভাবা সেই কাজ। রাশিদ সাহেবের মাকে ফোন করে জানালো, “আন্টি, আমার পরিচিত এই দু’জন মেয়ে অসম্ভব ভালো। এদের মধ্যে একজনকে আপনি রাশিদ ভাইয়ের জন্য দেখতে পারেন”। কিন্তু আন্টি শুধু মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে ফোন রেখে দিলেন, এত ভালো দু’টো প্রস্তাব দিল সে অথচ তিনি কোন আগ্রহ দেখালেন না! ভীষণ রাগ হোল ওর। কিন্তু পরে ভাবল হয়ত তিনি মেয়ে দেখে ফেলেছেন।

ওদিকে দু’দিন পর বাসায় একটা ফোন এলো। আব্বুর চেহারা দেখেই সে বুঝতে পারল ওর জন্য কোন প্রস্তাব এসেছে। সে মনে মনে আরেকটা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হোল।

রাহিদের পরিবার আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, এখানে ধর্ম নিতান্ত অপাংক্তেয় বা একেবারেই অনুপস্থিত। যারা ধর্ম পালন করে তারাও ধর্মের ব্যাপারে স্বচ্ছ কোন ধারণা না থাকায় এ’ব্যাপারে লজ্জিত থাকে। এর মধ্যে রাহি ধর্ম নিয়ে অল্পস্বল্প লেখাপড়া করে যখন পুরোপুরি ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে চলার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল তখন এই ব্যাকওয়ার্ড মেয়েকে নিয়ে আত্মীয়স্বজন ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলেন- এর কি হবে গো?! প্রথমে উপদেশ, তারপর অনুরোধ, তারপর আদেশ, শেষমেশ গালাগাল করেও যখন তাকে পর্দার মত বাড়াবাড়ি থেকে নিবৃত করা গেলনা তখন সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন রাহিকে বিয়ের মাধ্যমেই সংশোধন করতে হবে। সুতরাং, রাহিও যথারীতি যেকোন প্রস্তাব এলেই যুদ্ধংদেহী হয়ে উঠত- বিয়ে না করার যুদ্ধ।

তবে এক্ষেত্রে ওর বিশেষ একটা সুবিধা ছিল। ওর আব্বু সবসময় ওর সাথে খোলাখুলি আলাপ করতেন, মাঝেমাঝে উপদেশ বা পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করতেন, কিন্তু ওর মতামত পছন্দ হোক বা না হোক তিনি রাহির সিদ্ধান্তকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন। তাই বরাবরের মতই তিনি ওকে জানালেন, “তোমার জন্য একটা প্রস্তাব এসেছে। রাশিদের আব্বা রাশিদের জন্য তোমার কথা বললেন। এখন তুমি হ্যাঁ বললে আমি আলাপ করতে পারি”। রাহি প্রথমে বুঝতে পারলনা, “কোন রাশিদ?” এবার আব্বু একটু অবাক হলেন, “তোমার অফিসের রাশিদ। তুমি কিছু জানোনা?” রাহি হতভম্ব হয়ে গেল, ‘বলে কি? প্রতিদিন দেখে হয় লোকটার সাথে, কই উনি তো কিছু বলেননি!’ সে আব্বুকে বলল, “আচ্ছা, আমি তোমাকে কাল বা পরশু জানাব”।

পরদিন অফিসে গিয়ে রাহি সম্পূর্ণ অফিস তোলপাড় করে ফেলল, “রাশিদ সাহেব কই?” শেষপর্যন্ত তাঁকে পাওয়া গেলে সে ডেকে মিটিং রুমে নিয়ে গেল। বেচারার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোথায় লুকাবেন খুঁজে পাচ্ছেন না। কিন্তু রাহির তখন আহ্লাদিপনার মুড নেই। সে চড়া গলায় জিজ্ঞেস করল, “ঘটনা কি বলুন তো?”
রাশিদ সাহেব খুব গোবেচারা চেহারা করে বললেন, “কি ঘটনা ম্যাডাম?”
রাহির মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেল, “আপনি কি করার চেষ্টা করছেন?”
রাশিদ সাহেব আরো মিইয়ে গিয়ে বললেন, “কই কিছু না তো!”
রাহি এবার ক্ষেপে গিয়ে বলল, “আপনি আমাদের বাসায় প্রস্তাব পাঠালেন কি বুঝে?”
রাশিদ সাহবে ইতস্তত করে বললেন, “ম্যাডাম, জবাব দেব কি? আপনার চেহারা দেখেই তো ভয় লাগছে!”
হঠাৎ রাহির হাসি পেয়ে গেল। সে মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, “এবার বলুন আপনার উদ্দেশ্য কি?”
“ম্যাডাম, আমার উদ্দেশ্য আপনি সদয় হলে আপনাকে বিয়ে করা”।
“মানে”, খিঁচিয়ে উঠলো রাহি। কিন্তু তখনই মনে পড়ে গেল যে ও রেগে গেলে রাশিদ সাহেবের কথা গুলিয়ে যায়। বহু কষ্টে চেহারাসুরত ঠিক করে সে যথাসম্ভব শান্ত গলায় বলল, “শুনুন, আমি বিয়ে করবনা। শুধু আপনাকে না, কাউকেই করবনা। আপনি বরং আমার ফুপাত বোন বা বান্ধবীকে দেখুন। আমি আপনার আম্মাকে ওদের ব্যাপারে জানিয়েছি”।
“ঠিক আছে, তবে কেন করবেন না যদি একটু জানাতেন …”
“পুরুষরা বিয়ে করলে মনে করে মেয়েটাকে কিনে ফেলেছে। তার কোন ইচ্ছা অনিচ্ছা, রুচিপছন্দ, স্বাধীনতা থাকেনা- আমি ঐভাবে থাকতে পারবনা, তাই বিয়ে করবনা …”
“আমি আপনার স্বাধীনতায় কোথাও কখনো হস্তক্ষেপ করবনা, আমি আপনাকে আকাশে মুক্ত স্বাধীন ঘুড়ির মত উড়তে দেব, তারপর বলুন …”
রাশিদ সাহেবের গলার স্বরে, চেহারায় আত্মবিশ্বাসের ছাপ- কেমন যেন অন্যরকম লাগছে। রাহি খুব অবাক হয়ে গেল, উনি হঠাৎ এত কনফিডেন্স পেলেন কোথা থেকে?! সেও সিরিয়াস হয়ে বলল, “আপনি আসলে কি করতে চাচ্ছেন বলেন তো?”
এবার রাশিদ সাহেবকে দেখতে তেমনই গম্ভীর দেখাচ্ছে যেমন তিনি কাজের সময় হয়ে যান, “শুনুন ম্যাডাম। আপনি সবার সমস্যা সমাধান করেন। কিন্তু কেউ কল্পনাও করতে পারেনা যে আপনারও কোন সমস্যা থাকতে পারে, থাকতে পারে কোন কষ্ট বা কোন অনুভূতি। আমি জানতে পেরেছি আপনি ইসলাম পালন করার জন্য কি struggle করছেন। আমি আপনাকে এ’ব্যাপারে সাহায্য করতে চাই। নতুবা আমার এই মূহূর্তে বিয়ে করার কোন পরিকল্পনা ছিল না”।
রাহি এ প্রথম কিছু বলার মত ভাষা হারিয়ে ফেলল।

বাসায় গিয়ে রাহি আব্বুকে জানাল সে এই বিয়ের প্রস্তাবে আগ্রহী। আব্বু ভীষণ অবাক হলেন। কারণ সে কখনো কোন প্রস্তাবে ন্যূনতম আগ্রহ দেখায়নি, এত বন্ধুবান্ধবের মাঝে কখনো কোন ছেলেকে ভালোলাগার কথা বলেনি, কোন পেশার লোক তাকে আকর্ষন করেনি- বরং একবার এক ডাক্তারের ব্যাপারে তাকে বোঝাতে গেলে সে ছুরি নিয়ে বলেছিল, “ঠিক আছে, আমি এই ছুরি দিয়ে ঐ ডাক্তারের পেট চিরে দেব, তারপর যদি সে নিজে নিজে জোড়া দিতে পারে তাহলেই বুঝব সে কত বড় ডাক্তার”। তারপর থেকে তিনি আর রাহিকে ঘাটান না। এই প্রস্তাবে আগ্রহ দেখানোতে তিনি ঠিক ধারণা করলেন তাঁর মেয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করেছে। কিন্তু রাহির কিছু করার নেই।

দু’দিন পর রাশিদের বাবাচাচা এলো, ওর আব্বু আর চাচার সাথে কথা বলে ওদের বাসায় যাবার দাওয়াত দিয়ে গেল। পরদিন ওদের বাসা থেকে এসে রাহির আম্মু হুলস্থুল ক্ষেপে গেলেন, এই বিয়ে কিছুতেই হতে পারবেনা, ঐ বাড়ীতে সব মহিলা পর্দা করে। তাঁর মেয়ে গেঁয়ো ভূত হয়ে যাবে। রাহির আব্বু বললেন, “বিয়ে তো তোমার না, দেখি রাহি কি বলে”। “রাহি কি বলে মানে? বললাম তো এই বিয়ে হবেনা”। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠতে লাগল। চাচা সবাইকে শান্ত হতে বলে রাহিকে নিয়ে আলাদা ঘরে চলে গেলেন।

রাহির মাথায় হাত দিয়ে চাচা বললেন, “মারে, আমি কখনো আমার নাজনীনের সাথে তোকে আলাদা করে দেখিনি। বাপ হিসেবেই তোকে ক’টা কথা বলি। রাশিদ খুব ভালো ছেলে, ওর পরিবারকেও আমার খুব ভালো লেগেছে যদিও ওরা চালচলনে আমাদের থেকে আলাদা। তবে কি জানিস মা, তুই চাইলে আরো ওপরে যেতে পারিস। বাকীটা তুই যা সিদ্ধান্ত নিবি আমি তোর সাথে পথের শেষ পর্যন্ত আছি”।
আম্মুর পাগলামীর পর চাচার এই কথায় রাহির চোখে পানি এসে গেল। সে বলল, “চাচা, এর পরে যাই হোক, তোমার এ’কথা আমি সারাজীবন মনে রাখব”।
একটু পর সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “চাচা, একেকজনের কাছে একেকটা জিনিস গুরুত্বপূর্ণ। যে যা চায় তার কাছে বিবেচনার দিক থেকে সেটাই ওপরে। তোমরা ভাবছ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার, টাকাপয়সা, গাড়ীবাড়ী যার আছে সে ওপরে। আর আমি ভাবছি যে ইসলামের পথে আমার সঙ্গী হবে সে আমার বিবেচনায় সবার ওপরে। পৃথিবীতে স্বল্পকালীন কিছু কষ্ট করে নেয়া যায়, কিন্তু অল্প সুখের জন্য অনন্তকাল কষ্টভোগ করার কি কোন অর্থ আছে বল? আমি এখানেই বিয়ে করতে চাই”।
“ঠিক আছে মা, আমার আর কিছু শোনার প্রয়োজন নেই। বাকীটা আমি দেখব”।

চাচার পরামর্শে আব্বু রাশিদের সাথে কথা বললেন। বাসায় ফিরে তিনি রাহিকে বললেন, “এই ছেলে তোকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা আর সম্মান দেবে- আমি জানি সুখী হবার জন্য আমার মেয়ের কাছে এই স্বাধীনতা আর সম্মান কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমার এই বিয়েতে আর কোন আপত্তি নেই”। স্বামীকেও ঝুঁকে পড়তে দেখে রাহির আম্মু ক্ষেপে গিয়ে বাপের বাড়ী চলে গেলেন। রাহির এঙ্গেজমেন্টের সময় তিনি এলেন না। মেহেদী লাগাবার ব্যবস্থা করলেন আব্বু আর বান্ধবীরা মিলে। শেষপর্যন্ত বিয়ের আগের দিন চাচা অনেক সাধ্যসাধনা করে ভাবীকে ঘরে ফিরিয়ে আনলেন।

হলভর্তি লোকজনের সামনে সং সেজে বসে থাকা রাহির কাছে এত বিরক্তিকর ছিল যে সে বিয়েবাড়ীতে যেতে আগ্রহী ছিলোনা। তবু যেতে হোল। বিয়েবাড়ীতে দুইপক্ষের পার্থক্য ওর কাছে স্পষ্ট ধরা পড়লো। নদীর দুই ধারকে মেলানো হয়ত এর চেয়ে সহজ! সে বুঝতে পারল এ’বিয়ে যুদ্ধের শেষ নয়, শুরু। তবে এবার সে একা নয়, সাথে আছে এমন এক বন্ধু যে তার সাথে পথের শেষ পর্যন্ত যাবে।