Wednesday, June 15, 2011

তুষারকণা

কাল রাতে বাচ্চাদের গায়ে কম্বল ঠিক করে দিতে গিয়ে হঠাৎ জানালা দিয়ে বাইরে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম- আকাশবাতাস সব তুষারধবল হয়ে গিয়েছে! এই শীতে এটা কততম তুষারঝড় বলতে পারবনা। তবে এবারের শীত শুরুই হয়েছিল তুষার ঝড় দিয়ে। ঈদুল ফিতরের আগের রাতে আমাদের সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়ে তাপমাত্রা হঠাৎ ঝপাৎ করে +২ থেকে -৩৫ এ চলে গেল আর সে কি তুফান! পরদিন সবার দরজার সামনে হাঁটুসমান বরফ, অধিকাংশ লোকজনই নামাজে যেতে পারলোনা।

তুষারপাতের ব্যাপারটা কিছুটা বৃষ্টিপাতের মত। ঘরে বসে বাইরে দেখতে ভাল লাগে। তুষারকণা যখন পাখীর পালকের মত বাতাসে ভেসে ভেসে নামতে থাকে তখন এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্যের অবতারনা হয়। এই দৃশ্য আপনি বাসা থেকে বের হয়েও উপভোগ করতে পারেন কারণ- প্রথমতঃ যতক্ষণ তুষার পড়ে ততক্ষণ খুব একটা ঠান্ডা লাগেনা; দ্বিতীয়তঃ তুষারকণা কাপড়ের ওপর চুপচাপ বসে থাকে, ঝাড়া দিলে পড়ে যায়, উষ্ণতার সংস্পর্শে না এলে তুষার গলেনা, সুতরাং ঠান্ডা লাগার ভয় নেই। মাইক্রোস্কোপের নীচে রাখলে দেখা যায় প্রতিটি তুষারকণার রয়েছে এক অদ্বিতীয় ডিজাইন কেননা প্রতিট তুষারকণাই একটি ধূলিকণাকে ঘিরে তৈরী হওয়া এক একটি স্ফটিক।

তবে যারা যানবাহনে থাকেন তাদের কাছে এই স্বর্গীয় সৌন্দর্য বিভীষিকাময় হয়ে দেখা দিতে পারে। কখনো কখনো বাতাসে তুষারের পরিমাণ বেশী হলে বা বাতাসের বেগ তুষারকণাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেলে দৃষ্টিসীমা (visibility) স্বাভাবিক থেকে শূণ্যের কোঠায় নেমে আসতে পারে- সেক্ষেত্রে আপনি একহাত দূরের জিনিসও দেখতে পাবেন না। কখনো বা বাতাসের ঝাপ্টায় আপনার চলন্ত গাড়ীর সামনে মূহূর্তে তুষারের ঢিবি সৃষ্টি হয়ে আটকে যেতে পারে গাড়ী। তখন অন্য কেউ এসে আপনাকে উদ্ধার করা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া গত্যান্তর থাকেনা যেহেতু এই পরিমাণ স্নো সরানোর জন্য snowmoverএর সাহায্য প্রয়োজন নতুবা tow-truck দিয়ে টেনে গাড়ী তুষারের স্তুপ থেকে বের করা প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যা হোল আপনি গাড়ীতে বসে অপেক্ষা করতে পারবেন না, গাড়ী থেকে নেমে পথের পাশে কোথাও দাঁড়াতে হবে। দূর থেকে ছুটে আসা একটা গাড়ীর ড্রাইভার হয়ত ধারণা করতে পারবেনা যে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ীটি আসলে চলছেনা। সে যদি ছুটে এসে ধাক্কা দেয় তবে আপনার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে গেল! তবে বাইরে দাঁড়িয়ে থেকেও যে আপনি সম্পূর্ণ নিরাপদ তেমন কোন কথা নেই। -৩০ থেকে -৪০ তাপমাত্রায় যদি আপনি যথাযথ পোশাকে না থাকেন এবং দ্রুত সাহায্য এসে না পৌঁছয় তাহলেও আপনি বরফাকারে পরপারে পৌঁছে যেতে পারেন। দশ পনেরো মিনিটের মধ্যে সাহায্য এসে পড়লেও আপনি সম্পূর্ণ বা আংশিক জমে যেতে পারেন যদি আপনার শরীরের, পোশাকের বা জুতোর কোন অংশ ভেজা হয়, যদি আপনি সামান্য নড়াচড়া করে শরীরে তাপ উৎপাদন অব্যাহত না রাখেন বা অতিরিক্ত নড়াচড়া করে শরীরের তাপ অতিমাত্রায় ক্ষয় করে ফেলেন। রিহামের যেবার মাথা ফাটল, ওকে হাসপাতালে নিয়ে ইমার্জেন্সী রুমে গিয়ে দেখি ওর মাথায় সেলাই দেয়ার জন্য কোন ডাক্তার পাওয়া যাচ্ছেনা অথচ আরেকপাশে এক ক্যানাডিয়ান লোককে ঘিরে বেশ ক’জন ডাক্তার ভিড় করে আছে। পরে বুঝতে পারলাম বেচারার frostbite হয়ে পায়ের বেশ ক’খানা আঙ্গুল শেষ। ওগুলো কেটে না ফেললে তার সম্পূর্ণ শরীরেই পচন ধরতে পারে। এই নিয়ে রোগী আর ডাক্তারে টানাহেঁচড়া। ভীষণ মায়া লেগেছিল লোকটার জন্য।

তবে এই অবস্থা যেকোন কারো যেকোন সময় হতে পারে। ঈদুল ফিতরের সকালবেলা হাফিজ সাহেব চৌরাস্তার মধ্যখানে আটকা পড়লেন। অটোমেটিক গাড়ী লক হয়ে গিয়ে নামতেও পারছিলেন না। কিন্তু গাড়ীতে থাকাও নিরাপদ নয়। তখন সকাল সাতটা, ভোর হয় ন’টায়। কেউ দেখতা না পেয়ে মেরে দিলে কিছু করার নেই। বাইরে তাপমাত্রা -৪০। সুতরাং বাইরেও বেশীক্ষণ থাকার জো নেই। দশমিনিটের মধ্যে সাহায্য এসে পৌঁছল। Tow-truckএর লোকজন প্রথমেই ওনাকে নিয়ে ওদের গাড়ীতে বসিয়ে জোরে হীটার ছেড়ে দিল। বাসায় পৌঁছেও বেচারার সেকি কাঁপুনি!

সবচেয়ে ভয়ানক অবস্থা হয় যদি শীতের মধ্যখানে তাপমাত্রা মাইনাসের ওপরে চলে এসে হঠাৎ আবার মাইনাসে ফিরে যায়। সমস্ত বরফগলা পানি ঠায় জমে গিয়ে লোহার মত শক্ত হয়ে যায়। এখানে তুষার পরিষ্কার করার জন্য সরকার বছরে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যায় করে- রাস্তায় লবণ ছিটায়, snowmover দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করে, বিশাল বিশাল vacuum cleaner দিয়ে হাঁটার রাস্তা সাফ করা হয়, রাস্তার দু’পাশে জমে থাকে পাহাড়ের মত উঁচু ঢিবি। কিন্তু আইস (ice) পরিষ্কার করার কোন পদ্ধতি অদ্যাবধি আবিষ্কার হয়নি। ২০০৮ এর ডিসেম্বরে একদিন দুপুরবেলা তাপমাত্রা মাইনাসের সামান্য ওপরে উঠে বিকেলবেলা আবার নেমে গেল। ব্যাপারটা কেউ তেমন একটা লক্ষ্য করেনি যে স্নো গলে রাস্তার ওপর পাতলা আইসের আস্তরণ সৃষ্টি হয়েছে। লোকজন যথারীতি গাড়ী নিয়ে অফিস থেকে ফিরছিল। আর যে লঙ্কাকান্ড শুরু হয়ে গেল! গাড়ীর ওপর ড্রাইভারের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। সর্বোচ্চ গতিবেগ ১৫ থেকে ৩০ কিমি/ঘন্টা। কিন্তু গাড়ী সামনের দিকে না গিয়ে কেবল ক্যারমবোর্ডের ওপর উদ্দেশ্যহীবভাবে ছুঁড়ে মারা গুটির মত ঘোরে! সেদিন একরাতে ক্যাল্গেরী এলাকাতে ২০০০ দুর্ঘটনা হয়েছিল। বিপদ্গ্রস্ত লোকজনকে সাহায্য করার জন্য ছুটে চলা পুলিশের গাড়ীর নিরবিচ্ছিন্ন সাইরেন শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। রাতে বান্ধবী তানজীন ফোন করে সে কি কান্না- ওর গাড়ীর পাশ দিয়ে আরেক গাড়ীর সামনের দিক ঢুকে পড়েছে, ঐপাশে ওর ছেলে বসা ছিল। সে যে কিভাবে অক্ষত অবস্থায় বেঁচেছে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না। হাসপাতালে গিয়েও ছেলের কান্না থামেনা।

এই বরফে যে কেবল গাড়ী চালানো মুশকিল তাই নয়, হাঁটাও মুশকিল আর পড়ে গেলে আরো মুশকিল। শীতে আইসের ওপর পিছলা খেয়ে হাতপা কোমর ভাঙ্গা, ন্যূনপক্ষে জোর ব্যাথা পাওয়া বা ছড়ে যাওয়া এখানে রেগুলার ব্যাপার। আমার এক ক্যানাডিয়ান বান্ধবী হাত ভেঙ্গেছে আজ চারমাস, তিনবার অপারেশন করা হয়েছে কিন্তু এখনো সারার লক্ষণ দেখা যাচ্ছেনা। সে যেভাবে দিনে দিনে একহাতেই সমস্ত কাজ করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, আমার ওর অন্য হাতটার জন্য ভয়ই লাগছে! আরেক চাইনীজ বান্ধবী গতকাল স্কি করতে গিয়ে মুখটুখ পুড়ে ফেলেছে। বরফে সূর্যের আলোর ছটা ঠিকরে পড়ে চামড়া পুড়ে যায়। বাইরে শীতের কথা ভাবলে অনেক সময় এই কথাটা মানুষের মনে থাকেনা। তাছাড়া ঠান্ডাবাতাস লেগেও চামড়ায় একধরণের পোড়ার অনুভূতি হতে পারে যাকে কোল্ডবার্ণ (cold burn) বলা হয়।

তবে এই তুষার পছন্দ করে তারা যারা স্কি বা স্নোবোর্ডিং জাতীয় (ski/snowboarding) খেলায় আগ্রহী। ক্যাল্গেরী অলিম্পিক পার্কে বা ব্যানফ, জ্যাস্পার নগরীগুলোতে এইসব খেলার জন্য অনেক মানুষজন জড়ো হয় শীতকালে। শিশুরা আপাদমস্তক আবৃত হয়ে পরস্পরকে বরফ ছুঁড়ে খেলতে পছন্দ করে। অনেক সময় বড়রাও অংশগ্রহণ করে সব খেলায়। অনেকে বরফ দিয়ে স্নোম্যানের প্রতিকৃতি বানায়। আর আমার বাচ্চারা বারান্দায় হাঁটু বরফে কি যে খেলে জানিনা। তবে আমি চিন্তায় থাকি কবে ওরা এই কাপড়জুতা নিয়ে আমার কার্পেট ভিজিয়ে ফেলে। ঘরের ভেতর ২৪ ঘন্টা হীটার চালিয়ে তাপমাত্রাকে মোটামোটি সহনীয় পর্যায়ে রাখা হয়। এতে করে ঘরে স্বাভাবিক জামাকাপড় পরলেই হয়। কিন্তু এই স্নো-সহ জামাজুতা ঘরে ঢোকালে বরফ গলে আমার কার্পেটের কি অবস্থা হয় একবার ভাবুন তো!

এখানে তুষারপাতের আগে একটা মজার জিনিস হোল, দিন হোক বা রাত, আকাশ দেখতে একই রকম লাগে। তুষারকণায় ঠিকরে পড়া আলোয় আপনি রাতের বেলায় পর্দা আলো সব বন্ধ করেও দিব্যি দিনের আলোর মত সব দেখতে পাবেন। আর ভোরবেলা দেখবেন আপনার বাড়ীর ছাদ, গাছের ডাল, মাঠঘাট, আকাশবাতাস সব একই বর্ণ ধারণ করে বসে আছে! যে খয়েরী খরগোশগুলো গরমকালে সর্বত্র খেলে দৌড়ে বেড়ায় সেগুলোরও শীতে শ্বেতবর্ণ লোম জন্মায়।

তবে আমার সবচেয়ে ভালো লাগে ভোরবেলা, যখন ঘর থেকে বের হয়ে দেখি সমুদ্রের ঢেউয়ের মত তরঙ্গায়িত তুষারের স্তুপ মরুভূমির বালিয়ারির মত ভাঁজে ভাঁজে ছড়িয়ে আছে চতুর্দিকে। বাতাসের ঝাপ্টায় যদিবা নতুন বরফের বালিয়ারি সৃষ্টি হয় সে তার আদি স্তুপে রেখে যায় তার জন্মের ছাপ। এই বরফে অন্ধকারেও চিকচিক করে ঠিকরে পড়ে আলো। নির্দাগ, মসৃণ সেই তুষারস্তুপের দিকে তাকিয়ে আমি ক্ষণিকের জন্য ভুলে যাই আমি দাঁড়িয়ে আছি এই ব্যস্ত শহরে। মনে হয় আমি এই পৃথিবীর প্রথম মানুষ। সামনে অবারিত পৃথিবী। একে দেখতে এত ভাল লাগে যে এই অসাধারণ সুন্দরের বুকে আমার পদচিহ্ন এঁকে দিয়ে এগিয়ে যেতে ভীষণ ভীষণ কষ্ট হয়।

No comments:

Post a Comment