Wednesday, October 27, 2010

ছাত্রীজীবনের স্মৃতি (স্কুলজীবন)


১. অহসন

ভাবছেন ভুল লিখেছি? নাহ, আমাদের ক্লাসের আহসান বানানে এত কাঁচা ছিল যে ক্লাস ফাইভের পরীক্ষার খাতায় নিজের নাম সে এভাবেই লিখেছিল। তারপর থেকে শাস্তিস্বরূপ সমাজ টিচার বলে দেন সবাই যেন ওকে ‘অহসন’ ডাকে। আমি নিজে লেখাপড়ায় আহামরি কিছু না হলেও যারা জ্ঞানপিপাসু তাদের সবসময় শ্রদ্ধা করতাম। তাই লাকী তিথি মিনহাজের মত মেধাবীদের ভীড়ে ওকে খুব একটা গণ্য করা হতনা।

একদিন আমার ছোটভাই আহমদ বাসায় এসে জানালো ক্লাসে ওর এক বান্ধবী হয়েছে। ক্লাস ওয়ানের সে বান্ধবী আবার ওকে সপরিবারে দাওয়াত করেছে! সে কান্নাকাটি করে বাবামাকে রাজী করিয়ে ফেল্ল ওদের বাসায় যাবে। মেয়েটি ছিল খুব সুন্দরী। তাই ক’দিন আমরা ব্যাপারটা নিয়ে খুব হাসাহাসি করলাম। পরে একদিন ঐ আংকেল ফোন করে দাওয়াত দিলেন।

ওদের বাসায় গিয়ে দেখি আহমদের সুন্দরী বান্ধবী হোল আহসানের ছোটবোন! ওদের বাসায় যেতেই সে আহমদকে নিয়ে ওর রুমে খেলতে চলে গেল। আমি কিছুক্ষণ গোঁ ধরে বড়দের মধ্যে বসে রইলাম। শেষে আংকেল বললেন, “তুমি বড়দের মধ্যে বসে কি করছ? আহসান, ওকে নিয়ে যাও। তোমরা একসাথে খেল”। মেজাজটা বিগড়ে গেল। কিন্তু কিছু করার নেই। আমার ভাই বা তার বান্ধবীর কোন দেখা নেই। অগত্যা আহসানই শেষ ভরসা।

যেহেতু ক্লাসে আমাদের খুব একটা কথাবার্তা হতনা, দু’জনেই ভীষণ অপ্রস্তুত বোধ করছিলাম। তাই কথা বার্তা না বলে সে ওর বিভিন্ন খেলনা আমাকে দেখাতে শুরু করল। আমি অবাক হয়ে দেখি কোন খেলনাই আমি পুরোপুরি চিনতে পারছিনা! সবই মনে হোল এক খেলনার এক পার্টের সাথে আরেক খেলনার আরেক পার্ট নিখুঁতভাবে জোড়া দেয়া অথচ এগুলো দিব্যি ব্যাটারী দিয়ে চলে ফিরে বেড়াচ্ছে! আমি আগ্রহী হয়ে উঠলে আহসানও বেশ সাবলীল হয়ে উঠলো। সে বল্ল বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক জিনিসপত্র নিয়ে কাজ করা ওর নেশা। সে খুটখাট করে টুকটাক মেরামত শুরু করেছিল দু’বছর আগে। এখন টিভি থেকে ট্রানজিস্টার সব ঠিক করতে পারে। একই প্রযুক্তি খেলনার ওপর প্রয়োগ করলে কি হয় দেখার জন্যই সে খেলনাগুলো নিয়ে এই পরীক্ষা চালিয়েছে!

সেদিন বুঝলাম, কাউকে বাইরে দেখে বোঝার উপায় নেই তার মধ্যে কি প্রতিভা লুকিয়ে আছে। ওর বাবামা ওর মেধাকে চিহ্নিত করে তাকে বিকশিত করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। কিন্তু সে মেধা আবিষ্কার করার কথা ছিল আমাদের শিক্ষকদের- কেননা শিক্ষকদের দায়িত্ব কেবল পড়ানো নয়, ছাত্রছাত্রীদের সুপ্ত মেধাকে চিহ্নিত করে তাকে বিকশিত করার চেষ্টা করাও। হায়! ক’জন শিক্ষক এই দায়িত্ব পালন করেন?

পুনশ্চঃ শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আহসান টেক্সাস ইউনিভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছিল। যেহেতু ওটাই ওর ক্ষেত্র ছিল, নিশ্চয়ই সে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছিল।


২. ক্লাস পালানো

জীবনে একবার ক্লাস পালিয়েছিলাম! তখন আমরা ক্লাস সিক্সে পড়ি। আবুধাবী সরকারের নির্দেশে সব স্কুলে দু’টো পেপার এক্সট্রা পড়ানো হত। আরবী আর কুর’আন মিলে এক পেপার, ইউ.এ.ই. সোশ্যাল স্টাডিজ আরেক পেপার। আরবী পড়াতেন এক ঈজিপ্সিয়ান শিক্ষক। কেউ পড়া না পারলে তিনি তাদের মাথায় চাঁটি মারতেন। তবে শুধু ছেলেদের। দুঃখজনক ঘটনা হোল, আগের বছর ‘ড্রেস অ্যাজ ইউ লাইক’ প্রতিযোগিতায় ‘আরবী মেয়ে’ সাজার পর থেকে উনি কেন যেন আমাকে খুব পছন্দ করতে শুরু করলেন। লাভ হোল এই যে একমাত্র আমার বেলায় উনি মেয়ে হলেও পড়া না পারলে চাঁটি মারার ভয় দেখাতেন!

সেদিন পড়া ছিল ‘সূরা আলাক’ মুখস্ত করা। কিছুতেই প্রথম সাত আয়াতের পর মনে রাখতে পারিনা! ক্লাসের ছেলেদের সাথে কথা বলে কিছুটা সান্তনা পেলাম যে শুধু আমি না, আর কেউ পুরোটা মুখস্ত পারেনা। আরবী ক্লাসের আগের পিরিয়ডে জানা গেল লাকী পুরোটা মুখস্ত করে এসেছে। ও ছিল আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল, সবকিছুতে পার্ফেক্ট। খুব মেজাজ খারাপ হোল। কে বলেছে ওকে এত ভালো হতে? ছেলেরা ওকে থ্রেট দিল ও যদি বলে ও পুরোটা শিখে এসেছে, ওকে মেরেই ফেলবে! কিন্তু মনে শান্তি পেলাম না।

কুর’আন ক্লাসের আগে আগে আমি আর তিথি গেলাম ওজু করতে। আমাদের স্কুলের নিজস্ব প্রেমিস ছিলোনা। একটা আরবী স্কুলে ক্লাস শেষ হয়ে গেলে ঐ প্রেমিসে বিকেলে আমরা ক্লাস করতাম। স্কুলের দু’টো ভাগ ছিল, আমাদের ক্লাস চলত একভাগে। দু’ভাগের মধ্যখানে ছিল ওজু করার জায়গা। ওখানে কোন ক্লাসরুম ছিলোনা। মেয়েদের ওজু করার জায়গাটা একটু বাগান দিয়ে ঘেরা। ওজু করতে করতে তিথি আর আমি আলাপ করতে শুরু করলাম আজকে ক্লাসে কি হতে পারে। কথা বলতে বলতে আমরা এর এমন ভয়াবহ এক চিত্র কল্পনা করে বসলাম যে শেষমেশ আর ক্লাসে ফিরে যেতে সাহসে কুলালনা। সিদ্ধান্ত নিলাম ক্লাস পালাবো। কিচ্ছু করার দরকার নেই। আরবী স্যার ছিলেন একজনই। উনি আমাদের ক্লাসে থাকলে আর কেউ এখানে ওজু করতে আসবেনা। সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে, অন্ধকার। তাছাড়া জায়গাটা বাগান দিয়ে ঘেরা। সুতরাং, এখানে বসে থাকলে আমাদের কেউ দেখতে পাবেনা। তবুও এই অন্যায় কোনদিন করিনি, ভীষণ ভয় লাগতে শুরু করল। ধুকপুক করতে করতে মনে হোল হৃৎপিন্ডটা ফেটেই যাবে। দু’জনে কথা বলতে বলতে সময় মনে হয় শেষই হয়না! যখন মনে হোল বুকটা মনে হয় ব্যাথা করতে করতে মরেই যাব, শেষপর্যন্ত ঘন্টা বাজল! খুব দেখেশুনে স্যার নিরাপদে অন্য ক্লাসে প্রবেশ করে দরজা আটকে দেয়ার পর আমরা চোরের মত ক্লাসে ঢুকলাম।

আমাদের দেখে ক্লাসের সবাই হো হো করে হাসতে শুরু করে দিল। জেনে খুব মর্মাহত হলাম যে সেদিন স্যার ‘সূরা আলাক’ ধরেননি, শুধু গল্প করে চলে গিয়েছেন!

পুনশ্চঃ আমাদের পড়াশোনায় নিবেদিতপ্রাণ বান্ধবী লাকী এখন ডাক্তার। তিথি আর আমি এখনো একসাথে আছি ক্যাল্গেরীতে! এখনো ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলি, কিন্তু নির্ভয়ে। ঐ দিনের কথা মনে হলে ভীষণ হাসি পায়!


৩. বন্ধুত্ব

ক্লাস সিক্সে বিজ্ঞান ক্লাসে একটা প্রজেক্ট ছিল পিনহোল ক্যামেরা। এতে একটা ক্যামেরা বানাতে হয় যার ভেতর দিয়ে দেখলে মোমবাতি উলটো দেখা যায়। যেদিন টিচারকে দেখাতে হবে আমরা সবাই খুব সাবধানে নিজের নিজের ক্যামেরা সামলে রাখলাম যেহেতু এগুলো এত ঠুনকো জিনিস দিয়ে বানানো ছিল যে যেকোন মূহূর্তে অসাবধানতাবশত নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

পঞ্চম পিরিয়ডে টিফিনের পর আহসান আর আশিক দুই বন্ধু একে অপরের ক্যামেরা নিয়ে বসল মন্তব্য করার জন্য। ঘটনাটা কি করে ঘটল আমরা কেউ লক্ষ্য করিনি। আশিককে চিৎকার করতে শুনে ক্লাসের পেছনে তাকিয়ে দেখি কিভাবে যেন ওর ক্যামেরাটা একটু চ্যাপ্টা হয়ে গিয়েছে আর আহসান মুখ কাঁচুমাচু করে তাকিয়ে আছে। সবাই আশিককে বোঝানোর চেষ্টা করল আহসান নিশ্চয়ই ইচ্ছে করে ওর ক্যামেরাটা নষ্ট করেনি, কিন্তু সে ক্ষেপে গিয়ে আহসানের ক্যামেরাটা পায়ের নীচে ফেলে মাড়িয়ে দুমড়ে মুচড়ে ওটার দফারফা করে দিল। তারপরও ওর মাথা ঠান্ডা হোলনা। টিচার যেকোনসময় আসবেন বলেও ওকে আমরা ক্লাসে আটকে রাখতে পারলাম না; সে মাঠে গিয়ে ঐ দুমড়ানো ক্যামেরাটাকে মাঠের এ’মাথা থেকে ও’মাথা লাথি দিয়ে নিয়ে যেতে থাকল। রুবী টিচার শব্দ শুনে ক্লাস ফোর থেকে বেরিয়ে এসে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন কিন্তু কোন লাভ হোলনা। বিজ্ঞান টিচার, মিসেস বজলুর রহমান, আবার স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল ছিলেন, দুর্ভাগ্যবশত সেদিন উনি মিটিংযে আটকে পড়ায় ক্লাসে আসতে দেরী হচ্ছিল।

শেষপর্যন্ত হয়ত মাড়ানোর মত আর কিছু অবশিষ্ট ছিলোনা বলেই সে ক্লাসে ফিরে এলো। কিন্তু এসে মাত্র সে আহসানের টেবিলটা তুলে মেয়েদের সীটের পাশে বসিয়ে দিয়ে গেল, “যা, তুই মেয়েদের সাথে বস”, তারপর ওর আগের জায়গায় থুথু ছিটালো। শেষমেশ আর করার কিছু না পেয়ে নিজের জায়গায় বসে পড়ল।

ভীষণ মেজাজ খারাপ হোল আমাদের মেয়েদের। ছেলেগুলো এরকম অভদ্র কেন?

সেদিন ক্লাস শেষে স্কুলবাসে বসে বাস ছাড়ার অপেক্ষা করছি। হঠাৎ আমার জানালার বাইরেই একটা দৃশ্য দেখে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল! আশিক আর আহসান একে অপরের গলা জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে! আহসান বলছে, “ভুল হয়ে গেছে দোস্ত, মাফ করে দে ভাই”। আর আশিক ওকে জড়িয়ে ধরে বলছে, “আমার মাথার ঠিক ছিলোনা ভাই, তুই সব ভুলে যা, আমাকে মাফ করে দে”।

সেদিন ঠিক করলাম ছেলেরা হয়ত আসলে অত খারাপ না কারণ আমি হলফ করে বলতে পারি ৯০% মেয়ে, সে তাদের হৃদয় যত বড়ই হোকনা কেন, এ’রকম একটা ঘটনার পর পরস্পরের সাথে স্বাভাবিক হতে পারতনা, অন্তত এই রেকর্ড সময়ে তো নয়ই!

আমি এখনো কারো সাথে মনখারাপ হলে এই ঘটনা মনে করে নিজেকে প্রশস্ত করার চেষ্টা করি। আহা! সেই নিষ্পাপ মনটা যদি আমরা আজীবন ধরে রাখতে পারতাম!


৪. দ্য আগলী ডাকলিং

বাংলাদেশ ইসলামিয়া স্কুল থেকে আদৌ এসএসসি দেয়া যাবে কি’না ব্যাপারটা যখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ল বাবা আমাকে একটা ও’লেভেল স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার জন্য নিয়ে গেল। এই স্কুলে ছেলেমেয়েদের সেকশন আলাদা এবং অংকের জন্য একজন বৃদ্ধ শিক্ষক ছাড়া কোন পুরুষ শিক্ষক মেয়েদের পড়ান না। লৈখিক পরীক্ষার পর মৌখিক পরীক্ষা। আমি যখন ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছি তখনো শ্রীলঙ্কা থেকে ইংরেজীর শিক্ষক এসে পৌঁছননি তাই আমার ক্ষেত্রে ভাইভার জন্য ছেলেদের সেকশনের শিক্ষককে নিয়ে আসা হোল। ওনাকে দেখে আমি একটু হকচকিয়ে গেলাম। উনি ইংরেজ! বাংলাদেশ স্কুলে সবসময় শিক্ষকরা বলে এসেছেন আমি ইংরেজীতে ভালো না। আর এই ভদ্রলোক আমার কি অবস্থা করবেন?

যা থাকে কপালে বলে বসে পড়লাম। উনি আমাকে একটা গল্প পড়তে দিলেন, হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের ‘দ্য আগলী ডাকলিং’। আমি পড়তে পড়তে বিমুগ্ধ হয়ে ভুলেই গেছিলাম যে আমি পরীক্ষা দিচ্ছি! মনে হচ্ছিল এটা যেন আমারই গল্প! স্যারের ডাকে পৃথিবীতে ফিরে এলাম। উনি আমাকে কয়েকটা প্রশ্ন করলেন। ভাইভা শেষে আমার ইংরেজীর প্রশংসা করলেন (!),আমাকে কিছু ইসলামী উপদেশ দিলেন, তারপর আমাকে ছেড়ে দিলেন। ঐ পরীক্ষায় আমি খুব ভালো করলাম। বহু পরে বুঝেছি কেন আমাকে বাংলা স্কুলের শিক্ষকরা বলতেন আমি ইংরেজীতে কাঁচা কিন্তু ইংরেজী স্কুলে আমি ইংরেজীতে হাইয়েস্ট পেতাম। আমি ইংরেজী শিখেছি সেভাবে যেভাবে একজন রিক্সাওয়ালা ভাই বাংলা শিখেছেন। তিনি বাংলা বলার সময় কোন ভুল করেননা কিন্তু তাঁকে যদি ব্যাকরণ জিজ্ঞেস করা হয় উনি আকাশ থেকে পড়বেন, “ঐটা আবার কি জিনিস?”

সে যা হোক, এই শিক্ষকের সাথে যদিও আমার ঐ একবারের পর আর দেখা হয়নি, আমার জীবনে ওনার যে কি অবদান তা উনিও কোনদিন জানবেন না। ‘দ্য আগলী ডাকলিং’ গল্পটি এবং আমার ব্যাপারে তাঁর অ্যাসেসমেন্ট প্রথম আমার মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়েছিল যে সবাই আমাকে যেমন অপদার্থ বলে বা আমি সুন্দর নই বলে আজেবাজে কমেন্ট করে এগুলো কোন মূখ্য বিষয় নয়! আমাকেই খুঁজে নিতে হবে আমি কি পারি এবং ধৈর্য্য আর ডিটারমিনেশনের সাথে এগিয়ে যেতে হবে।

পরবর্তীতে দেখলাম শুধু আমিই নই, ছাত্রী শিক্ষক সবাই ওনার ব্যাপারে কৌতুহলী ছিল। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল তিনি ছিলেন ধর্মান্তরিত মুসলিম। কিন্তু তিনি যখন ইসলামকে গ্রহণ করেছেন তখন পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করেছেন। স্কুলের মাঠের ওপাড়েই ছিলো ওনার বাসা। একদিন উনি ক্লাসে থাকাকালীন ছাত্রীদের ওনার বাসা দেখানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। দেখলাম উনি ঠিক রাসূল (সা)এর আদর্শ অনুযায়ী মাটিতে শুতেন এবং ঘরে নূন্যতম পরিমাণ জিনিস ছিল যা একজন জন্মগত বৃটিশের জন্য অস্বাভাবিক। অংক স্যারের কাছে শুনেছি তিনি হাত দিয়ে খেতেন, চাকুরীর সময়টুকু ছাড়া রাসূল (সা)এর মত করে জামাকাপড় পরতেন। দেখেছি তিনি মানুষের সাথে সদ্ব্যাবহার করতেন, ভালো উপদেশ দিতেন। তাঁকে দেখেই আমার প্রথম ইসলাম সম্পর্কে নিজে নিজে লেখাপড়া করে জানার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আমি আজকের আমি।

হয়ত শিক্ষক হবার আগ্রহটাও তাঁকে দেখেই কেননা একজন মানুষের দশ মিনিটের সংস্পর্শ যদি কারো জীবনে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে, তবে আপত্তির কি আছে?

৫. পাগল

আমরা যখন ক্লাস এইটে, একদিন বাংলা স্যার এসে জিজ্ঞেস করলেন আমরা জীবনে কে কি হতে চাই। সবাই যে যার ইচ্ছা অনিচ্ছা প্রকাশ করতে লাগল।

ক্লাসের এক ছেলে কিছুতেই বলবে না। অনেকক্ষণ পর ওর ভাই (দু’ভাই একই ক্লাসে পড়ত) বলে দিল, “স্যার, ও ট্রাকড্রাইভার হতে চায়!” আসলে আগেরদিন বাবার কাছে পড়াশোনায় গাফলতির জন্য বকা খাওয়ার একপর্যায়ে সে জেদ করে এ’কথা বলেছিল। কিন্তু বেঈমান ছোটভাই সব ফাঁস করে দিল!

মেয়েদের সাথে কথাবার্তা বলতে বলতে যখন আমার পালা এলো, বললাম, “আমি এতকিছু হতে চাই যে আমি নিজেই ঠিক করতে পারিনা আমি আসলে কি হতে চাই! তবে আপাতত মানসিক রোগীদের ওপর একটা লেখা পড়ে ভাবছি মানসিক ডাক্তার হব। ওদের কষ্টের কথা এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে আমার মনে হয় ওদের একজনকেও সাহায্য করতে পারলে জীবন সার্থক হয়ে যাবে”। স্যারকে মনে হোল এই অদ্ভুত সিদ্ধান্তে উনি একটু কনফিউজড! অন্যমনষ্ক হয়ে উনি আমার পাশে বসা শিরিনকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি হতে চাও?” ও ছিল ভীষণ দুষ্ট। ও বল্ল, “স্যার, আমি পাগল হতে চাই!” স্যার চমকে উঠে বললেন, “বল কি? কেন?” ও বল্ল, “স্যার, আমার প্রিয় বান্ধবীর জন্য। নাহলে ও রোগী পাবে কোথায়?!”

পুনশ্চঃ সে’বছর শিরিন সত্যি সত্যিই পাগল হয়ে গিয়েছিল। নাহ, সিরিয়াস কিছু না। ‘ড্রেস অ্যাজ ইউ লাইক’ প্রতিযোগিতায় সে এত বাস্তবভাবে পাগলের অভিনয় করেছিল যে প্রথম পুরস্কার ওর জন্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল ফলাফল ঘোষনার আগেই!


৬. হুদা টিচার

মিসেস হুদা ছিলেন কেজির টিচার। আমি আবুধাবীর বাংলাদেশী স্কুলে ভর্তি হয়েছি ক্লাস ফাইভে। তাই ওনার ক্লাস কখনো পাইনি। তবে দূর থেকে ওনাকে আমরা সবাই খুব পছন্দ করতাম। মার্জিত রুচি, পরিশীলিত আচরণ, তীক্ষ্ণ মেধা আর শৈল্পিক ব্যাক্তিত্ব- সব মিলে উনি ছিলেন এক আদর্শ নারী।

চার বছর বয়স থেকেই বাবামা, দাদাদাদু আমাকে প্রচুর বই কিনে দিয়ে পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি করে দেয়। পাঁচবছর থেকে লেখালেখির শুরু। কিন্তু বই আর লেখালেখি আমাকে আস্তে আস্তে অসামাজিক করে তোলে। মানুষের সাথে কথা বলার চাইতে আমি এক কোণে একখানা বই নিয়ে বসে থাকা হাজারগুনে পছন্দ করতাম। আর কারো সামনে বক্তৃতা, বিতর্ক বা আবৃত্তি করতে বললে মনে হত যেন আমাকে কোরবানী করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে! ক্লাস ফাইভে উঠে বাবা আমাকে এসব প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার জন্য উৎসাহিত করতে লাগল। আমি যতই বই আর লেখালেখি নিয়ে মেতে থাকতে চাই, বাবা আমাকে ততই ঠেলে। আমি নিরুপায় হয়ে সবার সামনে গিয়ে ঘামতে থাকি, মাটির দিকে তাকিয়ে হড়বড় করে কি বলে আসি আমি নিজেই শুনতে পাইনা। এভাবেই চলতে লাগল বছরের পর বছর।

সেভেনে আমি অন্য স্কুলে ছিলাম। এইটে যখন জানা গেল বাংলাদেশ স্কুল থেকে এসএসসি দেয়া যাবে আমি আবার আমার আগের স্কুলে ফিরে এলাম। সেবার হুদা টিচার ছিলেন আমাদের বক্তৃতার বিচারকদের একজন। প্রতিযোগিতা শেষে উনি আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি একটু অবাক হলাম যেহেতু ওনার সাথে আমাদের কোন সংস্পর্শ ছিলোনা। টিচারের কাছে গেলে উনি বললেন আমার বক্তৃতার স্ক্রিপ্ট দেখবেন। স্ক্রিপ্ট পড়ে উনি হতবাক হয়ে বললেন, “তাইত বলি, যে মেয়ে রেগুলার ম্যাগাজিনে লেখে সে বক্তৃতার স্ক্রিপ্ট লিখতে পারেনা কেন? তোমার লেখা তো চমৎকার, তাহলে তোমার সমস্যা কি? তুমি কেন কনফিডেন্টলি বক্তৃতা দিতে পারোনা?” আমি চুপ করে রইলাম। উনি বুঝে নিলেন আমার সমস্যা কি। পরে আমাকে বলে দিলেন আমি যেন প্রতিদিন টিফিন টাইমে ওনার সাথে বসি।

উনি আমাকে সাতদিন বক্তৃতা আর আবৃত্তির বেসিক্স শেখালেন তার সাথে প্রতিদিন প্র্যাক্টিস। সাতদিন পর উনি বললেন, “এবার তুমি নিজে নিজে এগোতে পারবে। আমি তোমার পরবর্তী পারফর্মেন্সগুলোর দিকে নজর রাখব”।

প্রতিযোগিতা আর অনুষ্ঠানের কথা বাদ দিলাম। পরবর্তীতে ওনার এই শিক্ষা যে আমার কত কাজে লাগবে তা হয়ত উনিও কোনদিন ধারণা করতে পারেননি। কিন্তু আমার শিক্ষকতা জীবনে প্রতিটি দিন প্রতিটি মূহূর্ত আমি ওনার বদান্যতার কথা স্মরণ করেছি।

পুনশ্চঃ আমাদের ফেয়ারওয়েল অনুষ্ঠানের একটা ছবি আছে যেখানে দেখতে পাচ্ছি আমি বক্তৃতা দিচ্ছি আর হুদা টিচার গালে হাত ঠেকিয়ে একমনে শুনছেন, চোখ আমার দিকে নিবদ্ধ। খুব জানতে ইচ্ছা করে উনি আমাকে নিয়ে যে কষ্ট করলেন এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি আমার পার্ফরমেন্সে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন কি’না!


৭. আংকেল

ক্লাস নাইনের ফাইনাল পরীক্ষার আগেরদিন বাংলা ক্লাসে রহিম স্যারের পরিবর্তে আনিস স্যারকে দেখে সবাই হকচকিয়ে গেলাম। স্যার বুঝতে পেরে জানালেন যে রহিম স্যার অসুস্থ বলে উনি ক্লাস নিতে এসেছেন। যেহেতু সব পড়া হয়ে গিয়েছে উনি বাংলা বই নিয়ে শুরু থেকে প্রশ্ন করা শুরু করলেন। আনিস স্যার ইংরেজীর শিক্ষক হলেও বাংলা সাহিত্যে ওনার ভালো দখল ছিল। তাই উনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে একদম ভেতর থেকে প্রশ্ন করছিলেন। আমাদের ক্লাসে ছেলেরা যে শুধু সংখ্যালঘু গোষ্ঠী ছিলো তাই নয়, তাদের লেখাপড়া ছাড়া আর কোন বিষয়ে আগ্রহের অভাব ছিলোনা। তাই দেখা গেল মেয়েরা পটপট উত্তর দিয়ে যাচ্ছে অথচ ওরা হাতও তুলতে পারছেনা।

কিছুক্ষণ পর স্যার প্রশ্ন করলেন, “’কপোতাক্ষ নদ’ কে লিখেছেন?” শেষপর্যন্ত একটা সহজ প্রশ্ন পেয়ে ক্লাসের এক ছেলে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ালো, মেয়েরা যাতে উত্তর দিতে না পারে সেজন্য সে খুব তাড়াতাড়ি বলে ফেল্ল, “আমি পারি স্যার! আংকেল মুধুসূদন দত্ত!”

পুনশ্চঃ সেদিন হাসির তোড়ে ভেসে গেছিল আমাদের ক্লাস। স্যার কোনরকমে হাসি চেপে ক্লাস ছেড়ে দৌড়ে পালিয়ে গেছিলেন প্রাণ খুলে হাসার জন্য। দুর্ভাগ্য আমার! ছেলেটা আমাদের বাসেই যেত। তাই ওকে যতবার দেখছিলাম ‘আংকেলের’ কথা মনে করে কিছুতেই হাসি বন্ধ করতে পারছিলাম না। রাতে যে পেটব্যাথা করছিল, মাগো, সে কথা মনে করতেই ভয় লাগে!


৮. রাশেদ

সেদিন খেলার মাঠে রাশেদকে না পেয়ে মেজাজটা খারাপ হয়ে গেছিল। আমাদের ক্লাসের মেয়েরা ক্লাস সেভেন এইট থেকেই খেলাধুলা বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু ভাইদের সাথে বড় হওয়ার কারণেই কি’না জানিনা আমি খুব একটা ভদ্রটাইপ মেয়ে হতে পারিনি কখনো। ক্লাস টেনে উঠে ক্লাস নাইনের ছেলেমেয়েদের সাথে খেলা ছাড়া আর গত্যান্তর রইলোনা আমার। সেদিন দেখি কেউ নেই। এদিক সেদিক ঘুরে টিফিন শেষের ঘন্টা বাজতে ক্লাসে ফিরে এলাম। দেখি আমাদের ক্লাসের সবাই খুব উত্তেজিত হয়ে আলোচনা করছে রাশেদকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমি তো হতবাক! ঘটনা কি? ওদের ক্লাসের এক ছাত্রী ওকে কি বলে যেন ক্ষেপিয়েছে আর সেও চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে বায়োলজি প্র্যাক্টিকালের ব্লেড দিয়ে কব্জী থেকে কনুই পর্যন্ত কেটে ফেলেছে!

ভারী আশ্চর্য লাগল। ওরা চার ভাইবোন পড়ত আমাদের স্কুলে। সবাই ছোটখাট, ধবধবে ফর্সা আর সুন্দর। কিন্তু আমার সবচেয়ে আশ্চর্য লাগত ওর ছোট তিনবোনকে। ওরা প্রতিদিন স্কুলে জায়নামাজ নিয়ে আসত। সময় হলেই নিজেরা নামাজ পড়ত, বড় ভাইকে ডেকে নামাজ পড়াত, হোক ক্লাস বা পরীক্ষা। ওরা যেমন লেখাপড়ায় অগ্রগামী ছিল তেমনি খেলাধূলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। কিন্তু কোন বাজে কাজে বা উলটাপালটা কথায় তাদের দেখতাম না। ওদের ভাই একটা মেয়ের কথায় এমন করতে পারে ভাবতেই অবাক লাগল!

দু’দিন পর রাশেদ আবার স্কুলে আসতে শুরু করল। ফুলশার্ট পরে। টিচাররা বলে দিয়েছিলেন কেউ যেন ওকে কিছু না বলে। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা তো আর আমার জন্য প্রযোজ্য নয়! আচ্ছামত ঝাড়লাম ওকে।

কয়েকদিন পর হঠাৎ বায়োলজি স্যার এসে বললেন জবা ফুলের ডিসেকশন করাবেন। যেহেতু সেদিন রুটিনে বায়োলজি ক্লাস ছিলোনা আমরা কেউ বায়োলজি কিট নিয়ে যাইনি।স্যার বললেন, একটা ব্লেড পাওয়া গেলেও আমরা একে একে সবাই প্র্যাক্টিকালটা করতে পারতাম। সবাই মুখ গোমড়া করে বসে আছে। আমি বললাম, “স্যার, আমি দেখি ক্লাস নাইনে কারো কাছে আছে কি’না”। গিয়ে সোজা রাশেদকে ধরলাম, “ব্লেড দাও”।
ও বল্ল, “কেন আপু?”
“আমাদের ফুল ডিসেকশন করার জন্য লাগবে”।
“আজকে তো ব্লেড আনিনি আপু”।
“অসম্ভব, আর কারো কাছে না থাকলেও তোমার কাছে অবশ্যই থাকবে”।
বেচারা লজ্জায় লাল হয়ে বল্ল, “বিশ্বাস করেন আপু, আমি এখন ভালো হয়ে গিয়েছি। সত্যিই আমার কাছে ব্লেড নাই!”

কি আর করা? হাসতে হাসতে চলে এলাম। সেদিন হাত দিয়েই ব্লেডের কাজ চালাতে হয়েছিল ঐ জবাফুলগুলোর ওপর। আবুধাবীতে জবাফুল সবসময় মিলতোনা তাই যখন পাওয়া যেত তখনই বায়োলজি ক্লাসের আয়োজন করতে হত।

ক্লাস টেনের শেষে আমাদের শিক্ষকরা জানালেন আমাদের কোন ফেয়ারওয়েল দেয়া হবেনা। আমাদের পরীক্ষার ব্যাবস্থা হয়েছিল আবুধাবীস্থ বাংলাদেশ এম্বাসীতে। নতুন স্কুলের কন্সট্রাকশনের কাজ শুরু হয়েছে তাই স্কুল কর্তৃপক্ষের হাতে এই স্কুলের এসএসসি পরিক্ষার্থী প্রথম ব্যাচের ফেয়ারওয়েল অনুষ্ঠানের জন্য ফান্ড ছিলোনা।

তা রাশেদ এই কথা কিছুতেই মেনে নিতে রাজী হোলনা, “আমি আপুদের কিছুতেই ফেয়ারওয়েল ছাড়া স্কুল ছেড়ে চলে যেতে দেবনা!” বেচারা সবার কাছ থেকে টাকাপয়সা সংগ্রহ করে, স্কুলের মাঠে টেবিল চেয়ার বিছিয়ে, উপহার কিনে, মানপত্রসহ সবার জন্য ব্যাক্তিগতভাবে কার্ড বানিয়ে আমাদের বিদায় সম্বর্ধনার আয়োজন করল! ওর এই মায়া চিরিদিন মনে থাকবে।

পুনশ্চঃ আমার এসএসসি পরীক্ষা শেষে বাংলাদেশে ফিরে আসার আগে সে একবার বাসায় এসেছিল আমার বইখাতা নিয়ে যাওয়ার জন্য। তারপর আর কোনদিন ওর সাথে আমার দেখা হয়নি। কিন্তু ওকে আর ওর অসাধারণ বোনদের আমার সবসময় মনে পড়ে।









Wednesday, October 20, 2010

আমি কিপটা বলছি

আমি ভীষণ কিপটা। যেমন আমি কখনো ভিক্ষুকদের ভিক্ষা দেই না। একবার এক ভিক্ষুককে দারোয়ান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলাম। সে বোবা সেজে মানুষের কাছ থেকে ভিক্ষে চাইত। বেচারার একটাও দাঁত ছিলোনা। দাঁত কি জন্মগতভাবে ওঠেনি নাকি ভিক্ষে করার জন্য সে উপড়ে ফেলেছিল আমি কখনো তাকে জিজ্ঞেস করিনি। কিন্তু এ’ছাড়া তার আর কোন সমস্যা ছিলোনা। তার একমাত্র কাজ ছিল কেউ এলে দরজা খুলে দেয়া। সদর দরজা ছিল বাসার দরজা থেকে খানিকটা দূরে। আমি তখন ছাত্রী। বাবামা থাকে ইন্ডিয়াতে। বারবার উঠে দরজা খুলতে গেলে পড়াশোনা ঘরের কাজ হয়না, তাই দারোয়ান রাখা। দাঁত নেই, ঝাল খেতে পারেনা তাই প্রতিদিন আমি নিজ হাতে তার জন্য রান্না করতাম। তখন বাসার কাজের লোকের বেতন হত সাধারণত দু থেকে তিনশ টাকার মধ্যে। আমি তার বেতন নির্ধারণ করেছিলাম পাঁচশ। কয়েকমাস কাজ করার পর সে একদিন আমার কাছে ছুটি নিয়ে গেল মায়ের সাথে দেখা করতে। সাতদিন পরও তার দেখা নেই। আমি খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম সে অসুস্থ হয়ে পড়ল বা কোন বিপদ হোল কি’না। এ’সময় একদিন ভাইয়া এসে বল্ল ওকে আমাদের দোকানের সামনে ভিক্ষা করতে দেখেছে। আমি তো হতবাক! ওকে আমি এত বেতন দিলাম, এত যত্ন করে নিজ হাতে রান্না করে খাওয়ালাম, আর সে কি’না …! ভাইয়াকে বললাম তাকে ধরে আনতে। সে এসে বোবার অভিনয় করতে শুরু করল। আমি বললাম, “তুমি মাসের পর মাস আমার সাথে কথা বলেছ, এখন বোবার অভিনয় করছ কেন? তুমি কাজ করবেনা ভালো কথা কিন্তু বলে তো যাবে!” সে তখন বল্ল, “আপা, আপনি এত আদর করেছেন যে আমি আপনাকে সামনাসামনি বলতে পারিনি, আপনি আমাকে অনেক টাকা বেতন দিতেন কিন্তু সে পরিমাণ টাকা আমি ভিক্ষা করে সপ্তাহে কামাতে পারি। তাই …” আমি কি বলব? তাকে যেতে দেয়া ছাড়া আমার আর কোন উপায় রইলোনা।

আরেকবার ঢাকার ট্রাফিক জ্যামে এক মহিলা ধরে বসল ভিক্ষা দিতেই হবে! স্বাস্থ্যবতী যুবতী কেন এভাবে ছেঁড়াফাটা কাপড় পরে রাস্তায় ভিক্ষা করতে নেমেছে আমি বুঝে পেলাম না। তাকে বললাম, “আমার সাথে চল, আমি তোমাকে এক বাসায় কাজ দেব। ওরা খুব ভালো মানুষ। কাজও কম। তুমি ভালো থাকবে”। সে আরো কিছুক্ষণ ভিখারীরা সচরাচর যে ঘ্যানঘ্যানে টোনে কথা বলে সেভাবে টাকা চাইল। শেষে ট্রাফিক জ্যাম ছুটে গেলে যখন ট্যাক্সি চলতে শুরু করল হঠাৎ সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে বলে উঠলো, “হুহ! ভিক্ষা দেয়না আবার কাজ করতে বলে!” আমি হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলাম আর আমার পাশে বসা আমার ননদ শেষপর্যন্ত হাসি সামলাতে না পেরে বলেই ফেল্ল, “ভাবী, তুমি খুব বোকা। তুমি কি মনে কর সে অভাবের কারণে ভিক্ষা করে? তুমি খুব সহজেই মানুষকে বিশ্বাস কর!”

আমি যখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি তখন এক বান্ধবী এসে জানালো কলেজে ব্যান্ড পার্টি আসবে। লীড সিঙ্গার আমাদের এক ছাত্রীর বয়ফ্রেন্ড। সে টাকাপয়সা নেবেনা। কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষ চান মেয়েরা অন্তত ৫ টাকা করে চাঁদা দিয়ে ব্যান্ডদলকে কিছু উপহার দিক। আমার তখন ধর্ম সম্পর্কে খুব একটা ধারণা ছিলোনা। কিন্তু আমি এমন সম্পর্কে কখনো আস্থাশীল ছিলাম না যার কোন নীতিগত ভিত্তি নেই। যার অস্তিত্ব তাদের ঠকিয়ে টিকে থাকে যাদের ভালোবাসা আর বিশ্বাস আমাদের বড় হওয়ার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যে সম্পর্কে আনন্দ আছে কিন্তু দায়িত্ব নেই তাকে আমি সম্মান করতে পারতাম না। তাছাড়া আমি নিজে গান ছেড়ে দিয়েছিলাম। যা আমি নিজে বিসর্জন দিয়েছি তাতে আমি আরেকজনকে কি করে উৎসাহিত করি? বান্ধবীকে বললাম, “আমি টাকা দিতে পারবনা”। সে বল্ল, “তুমি না এলে না এসো, পাঁচটাকা কোন ব্যাপার?” আমি বলেই ফেললাম, “পাঁচশ টাকাও কোন ব্যাপার না যদি আমি বিশ্বাস করি আমার এ’টাকায় কারো উপকার হবে। কিন্তু হুঁশজ্ঞান হারিয়ে পাগলের মত নাচানাচি করার জন্য পাঁচটাকা কেন একপয়সাও আমি দেবনা”। বেচারী মুখ বেজাড় করে চলে গেল।

তাই বলি আমি খুব কিপটা। রিক্সাওয়ালা ভাইরা উলটাপালটা ভাড়া বললে আমি ঐ রিক্সায় উঠিনা তা সে আমার যত কষ্টই করতে হোকনা কেন, পেছনে পেছনে এসে ঠিক ভাড়া বল্লেও আমি আর তাদের দিকে ফিরে তাকাইনা। অথচ যারা ঠিক ভাড়া বলে তাদের নিজ থেকে কিছু বেশী দিতে আমার খারাপ লাগেনা। এটা কি অস্বাভাবিক নয়? একবার কলেজ থেকে বেরিয়ে দেখি প্রচন্ড ভীড়- অনেক ছাত্রছাত্রী, মাত্র কয়েকটা রিক্সা। ভাবছি কি কর্‌ব, এমনসময় এক রিক্সাওয়ালা ভাই দূর থেকে ডাক দিয়ে বললেন, “এই যে জুবিলী রোড আপা, মিনারা বোর্ডিঙ্ এর গলি, ছয়টাকা- আপা এদিকে আসেন”। বান্ধবীরা হতবাক হয়ে বল্ল, “আমরা রিক্সা পাইনা আর তোকে কি’না রিক্সাওয়ালা নিজে সেধে নিয়ে যায়!” এ’ঘটনা একবার নয় বহুবার ঘটেছে। তাই মনে হয় আমার ভাগ্যটা খুব ভালো। আমি নিজে যেমনই হইনা কেন, আল্লাহ সর্বস্তরের ভালোমানুষগুলোকে পথেপ্রান্তরে আমার সাথে মিলিয়ে দেন- হয়ত আমাকে শিক্ষা দেয়ার জন্য!

একবার খবর পেলাম এক মেট্রিক পরিক্ষার্থী মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ওর গার্মেন্টসকর্মী বিধবা মা এসে কান্নাকাটি শুরু করলেন। ওর চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করার পর জানা গেল ওরা যে এলাকায় থাকে সেখানে বখাটে ছেলেরা মায়ের অনুপস্থিতিতে ওর সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করে। সে ভয়ে বেহুঁস হয়ে পড়ার পর থেকেই অসুস্থ। হাফিজ সাহেবের সাথে পরামর্শ করে ওদের আমাদের বিল্ডিং এ নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। আব্বা কিছুতেই ভাড়া দেবেন না যেহেতু আমাদের বাসার যে ভাড়া মহিলা ঐ পরিমাণ বেতনও পান না। উনিও জাস্টিফাইড কেননা রিটায়ার করার পর থেকে বিল্ডিং এর ভাড়াই আব্বার একমাত্র নিজস্ব ইনকাম। তখন কত যে মিথ্যা কথা বলে আব্বাকে রাজী করলাম! মেয়েটির বিয়ে হয়ে যাওয়া পর্যন্ত ওরা আমার নীচতলায় থাকত। এত বছর ঐ ভাড়া কে চালিয়েছে আব্বা আজ পর্যন্ত জানেন না।

এভাবে পরীক্ষার্থীদের জন্য, বিয়ে দেয়ার জন্য, চিকিৎসার জন্য, ছোটছোট ছেলেমেয়েদের ম্যাগাজিন চালানোর জন্য, নলকূপ বসানোর জন্য, বাংলাদেশে ফেঁসে যাওয়া বিদেশীকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য আরো নানান কাজে আল্লাহ একবারে সর্বোচ্চ ৫০,০০০ পর্যন্ত খরচ করার তাওফিক দিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ। অনেক প্রজেক্টে নিজের টাকার পাশাপাশি সাহায্য পেয়েছি বাবামা, আত্মীয় পরিজন, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী এমনকি ছাত্রছাত্রীদের থেকে। এক ছাত্রীর কথা খুব মনে পড়ে। আমার প্রায় প্রজেক্টেই সে কন্ট্রিবিউট করত, প্রচুর পরিমাণে, যেমন একসাথে ত্রিশহাজার টাকাও সে দিয়েছে। কিন্তু এমন গোপনে সে টাকা দিত যেন সে চুরি করছে। সবসময় নতুন করে রিমাইন্ডার দিত যেন তার নাম কেউ না জানে। বাংলাদেশে এমন কত যে ভালো মানুষ আছে!

একবার এক মহিলাকে নিয়ে এক গার্মেন্টস মালিক ভাইয়ের কাছে গেলাম তাঁকে একটা চাকরী দেয়ার জন্য। উনি সম্ভ্রান্ত গৃহবধু ছিলেন কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর শ্বশরের সম্পত্তির পাশাপাশি তাঁর স্বামীর অর্জিত বিশাল সম্পদ সব ভাসুর দেবররা দখল করে নিয়ে ওনাকে বঞ্চিত করেছে। ভাই সব শুনে বললেন, “রেহনুমা, আমি তাকে এই মূহূর্তেই চাকরী দিতে পারি। কিন্তু তিনি ঘর ছেড়ে চাকরী করতে আসছেন কেন বল? স্বামী মারা গিয়েছে, বাচ্চা দু’টোকে মানুষ করতে হবে, তাইত? কিন্তু উনি যদি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাইরে থাকেন তাহলে বাচ্চাগুলোকে মানুষ করবে কে?” আমি বললাম, “তাহলে কি করতে পারি ভাই? পরামর্শ দিন।” উনি বললেন, “উনি কি কি কাজ পারেন?” আমি বললাম, “উনি খুব ভালো সেলাই করতে পারেন”। ভাই বললেন, “ওনাকে বল বাজারের সেরা সেলাই মেশিন যেটা ওনার আরাম লাগে দেখে আমাকে জানাতে কত লাগবে”। ভদ্রমহিলাকে জানালাম। উনি সাতদিন মার্কেট সার্ভে করে ভয়ে ভয়ে জানালেন সবচেয়ে ভালো মেশিনটার দাম ১০,০০০ টাকা। আমি নিজেও একটু শংকিত বোধ করলাম কেননা ঐ মূহূর্তে ভাই কিছু দিলে বাকীটা আমার দেয়ার মত হাতে টাকা ছিলোনা। কিন্তু ভাইকে বলার সাথে সাথে উনি চেকবুক বের করে দশহাজার টাকার চেক সাইন করে দিলেন। শুধু চুপিচুপি বললেন এ’ব্যপারে যেন কেউ না জানে।

এসব কাজ করতে গিয়ে যে কত অসংখ্য অসাধারন মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে! এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তাই আমি কিপটা এ’ নিয়ে আমার কোন লজ্জা নেই। আমার বাবামা, জীবনসঙ্গী এবং যাদের সাথে আমার ওঠাবসা তারা এত ভালো এবং আমার এসব কাজের ব্যাপারে এত উৎসাহ দেন যে এতেই আমার জীবন সার্থক!

Tuesday, October 19, 2010

চট্টগ্রামের পর্দানশীন বোনেরা

আমাদের দেশে এটা প্রচলিত ধারণা যে সিলেট এবং চট্টগ্রামের লোকজন অপেক্ষাকৃত ধার্মিক হয়ে থাকে। হয়ত যারা এ’দেশে ধর্মপ্রচার করতে এসেছিলেন তাঁদের অনেকের ঘাঁটি এসব অঞ্চলে থাকায় এতদঞ্চলে লোকজন ধর্মের ব্যাপারে অধিকতর সচেতন হয়ে থাকবে আশা করেই এ’ধরণের ধারণা করা হয়ে থাকে। এ অনুমান কতটা সঠিক কতটা বেঠিক সে হিসেবে যাওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। চট্টগ্রাম আমার জন্মস্থান এবং জীবনের একটা অংশ এখানে কাটিয়েছি আমি। সে হিসেবে আমার বোনদের মধ্যে ইসলামের একটি মৌলিক বিধান পালন সংক্রান্ত যেসব ভুল ধারণা দেখেছি সেটা নিয়ে আলোচনা করতে চাই।

কেউ যদি সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করে আমার ভুল ধরিয়ে দেন তাকে আমার সবচেয়ে বড় শুভাকাংখী মনে হয় কেননা তিনি বিচার বিশ্লেষন করে আমাকে আমার একটি ত্রুটি হতে মুক্ত হবার আহ্বান জানিয়েছেন। বোনেরা, আমি নিজেও আপনাদের একজন। তাই আপনারা আমার কথায় আহত না হয়ে যদি বোঝার চেষ্টা করেন আমরা উভয়েই উপকৃত হব।

আমি খুব একটা ইসলামিক পরিবারে জন্মাইনি। এখনো শিখছি। ইসলামের মৌলিক নিয়মগুলোর মধ্যে যে ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের সবচেয়ে ঝামেলা হয় তা হোল পর্দা। আমরা অনেকেই জানিনা যে নামাজ বা রোজার মত পর্দাও পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য ফরজ। অধিকাংশ মানুষ এখনো মনে করে পর্দা একটি অপশনাল ব্যাপার এবং এটি শুধু নারীদের জন্য প্রযোজ্য। অনেকের ধারণা পর্দা মানে শুধু একপ্রস্থ কাপড়। কিন্তু পর্দা মানে যে আচার আচরণ থেকে শুরু করে সৌন্দর্যের প্রদর্শন পর্যন্ত সবকিছুতে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আসা সেটা যেদিন থেকে বুঝতে পেরেছি সেদিন থেকে আমি একে মনেপ্রাণে গ্রহণ করেছি। সুকুমার রায়ের কবিতায় “নিয়মছাড়া হিসাবহীন” বাক্যাংশটি পড়তে যত ভালো লাগে আসলে কিন্তু প্রায় অনিয়মের মধ্যে তেমন ভালো কিছু পাওয়ার নেই।

আমি ফকীহ নই। সুতরাং পর্দাসংক্রান্ত ফিকাহের আলোচনায় যাবোনা। আমি সহজভাষায় যতটুকু বুঝি, পর্দা বলতে বোঝানো হয়েছে এমন পোশাক যা শরীরের রঙ এবং আকৃতিকে ঢেকে রাখে এবং এমন আচরণ যা ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হতে মানুষকে নিরাপদ রাখে। নারীদের আল্লাহ সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন, তাদের চুল থেকে নখ পর্যন্ত সবই আকর্ষনীয়- বিশ্বাস না হলে যেকোন ভাষায় যেকোন কবির প্রেমের কবিতা পড়ুন- তাই আল্লাহ তাদের শুধু মুখ এবং হাত ছাড়া বাকী সবটুকুই ঢেকে নিজেদের কেবল তাদের জন্য উন্মুক্ত রাখতে বলেছেন যারা অবিসংবাদিতভাবে মেয়েটির ভালো চায়। পুরুষদের যেহেতু আল্লাহ ভারী কাজের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তাদের এমন আহামরি কোন সৌন্দর্য দেননি; সুতরাং তাদের জন্য শারিরীক পর্দার পরিধিও অনেক কম করে দিয়েছেন। আচরণের দিক থেকে পুরুষদের নিয়ন্ত্রণ কম বিধায় তাদের জন্য পর্দা অনেক বেশী কঠোর করে দেয়া হয়েছে- দৃষ্টি থেকে শুরু করে বাড়ীতে প্রবেশ পর্যন্ত সর্বত্র তাদের সাবধানতা অবলম্বন করার কথা বলা হয়েছে। এদিক থেকে মেয়েদের তরল গলায় বা আজেবাজে কথা বলা ছাড়া আর তেমন কোন বাঁধা দেয়া হয়নি। উভয়ের কথা বলার ক্ষেত্রে কেবল প্রয়োজনীয় কথার মধ্যেই সীমিত রাখার ব্যাপারে তাগিদ দেয়া হয়েছে কেননা অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা এবং অনিয়ন্ত্রিত আচরণ থেকে কি কি হয় তা নিয়েই পৃথিবীর তাবৎ নাটক সিনেমা রচনা করা হয়।

এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। আমি যখন আবুধাবী থেকে ১৯৯০ সালে চট্টগ্রাম থাকতে আসি তখন কিছু কিছু জিনিস দেখে খুব আশ্চর্য হয়ে যাই। আবুধাবীতে দেখতাম যারা পর্দা করতেন তাঁরা সম্পূর্ণভাবে করতেন আর যারা করতেন না তাঁরা করতেন না। চট্টগ্রাম এসে প্রথম দেখলাম মহিলারা বোরকা পরে হাঁটছেন কিন্তু তাদের মাথার কাপড় গলায় পেঁচানো! মাথাও ঢাকছেনা, শরীরও ঢাকছেনা! তাঁরা কখনো সেই স্বচ্ছ ওড়না তুলে আধামাথায় দিচ্ছেন আবার কখনো খুলে সবার সামনে চুল ঠিক করছেন। আমি মহাফাঁপড়ে পড়ে গেলাম। যাদের দেখে আমি নিজেই হতবাক, স্বাভাবিকভাবেই তাদের দেখে আমার বাবামাকে বোঝানো কঠিন হবে আমি কেন পর্দা করতে চাই।

কলেজে যাওয়া শুরু করার পর দেখতে পেলাম অনেক মেয়েরা পরিবারের চাপে বাসা থেকে বোরকা পরে বেরোচ্ছে কিন্তু রিক্সায় উঠেই ওড়নাসহ খুলে শুধু অ্যাপ্রন পরে কলেজে আসছে! আরেকবার চট্টগ্রাম এয়ারপোর্টে এক অসাধারন সুন্দরীকে দেখলাম শ্বশুরবাড়ীর সবাই বিদায় জানাতে এসেছে। প্লেনে উঠেমাত্র দেখি তিনি বোরকা স্কার্ফ সব খুলে ফেললেন, পাশে বসা স্বামী নির্বিকার! আমার খুব মায়া লাগত ওদের জন্য। ওদের বাবামা সমাজ ওদের ওপর জগদ্দল পাথরের মত করে পর্দা চাপিয়ে দিয়েছে কিন্তু এর কি প্রয়োজন বা কেন করতে হবে তা তাঁরা নিজেরাই জানেননা। এটা তাঁদের কাছে একটা ফ্যামিলি ট্রেডিশন, আর কিছুই না। যা তারা বোঝেনা তা তাদের ওপর চাপিয়ে দিলে মেয়ারাই বা কি করে মেনে নেবে? আমার খুব দুঃখ হত। ওরা পর্দা করার সুযোগ পেয়েও খুলে ফেলছে আর আমি করতে চাইছি কিন্তু এই নিয়ে আমার পরিবার আমার ওপর মহাখাপ্পা!
চট্টগ্রামে একটা ট্রেডিশন আমার ভীষণ ভীষণ খারাপ লাগে। যে মেয়েরা বাইরে পর্দা করে তারা ঘরে কেউ এলে নির্দ্বিধায় তাদের সামনে বেপর্দা অবস্থায় চলে যায়। এ’ব্যাপারটা যে কত হাস্যকর তা কারো মাথায়ই আসেনা! যদি পর্দার উদ্দেশ্য হয় যে ব্যাক্তি শুভাকাংখী নয় তার কাছ থেকে নিজের সৌন্দর্য গোপন করা তাহলে তার সামনে এই সৌন্দর্য এক জায়গায় গোপন আর আরেক জায়গায় প্রকাশ করলে কি লাভ? এর মানে এই নয় যে বাসায় মেহমান এলে বোরকা পরে যেতে হবে, কিন্তু মাথায় ওড়না তো দিতে হবে!

আরেকটা মজার ব্যাপার হোল বেপর্দা হয়ে ছবি তোলা! যে মেয়েটি পর্দা করে সেও বেপর্দা হয়ে ছবি তোলে এবং আজকাল ফেসবুকের কৃপায় সে ছবি সবাই দেখতে পায়। ক্যানাডায় আসার জন্য যখন ছবি তুলতে গেলাম ক্যামেরাম্যান খুব স্বাভাবিকভাবে বল্ল, “আপনি ওড়না খুলে ফেলেন”। আমি হাঁ করে তাকিয়ে বললাম, “মানে?” সে বল্ল, “মাথায় কাপড় দেয়া ছবি হলে আপনি ক্যানাডায় যেতে পারবেন না”। আমার মেজাজ গরম হয়ে গেল, “আপনার কাজ ছবি তোলা আপনি ছবি তোলেন, ক্যানাডার সরকার আমাকে মাথায় কাপড় দিলে নেবে কি নেবেনা আপনার চিন্তা করতে হবেনা; আর না নিলেও সমস্যা নাই, ক্যানাডায় না গেলে আমার বেহেস্তের টিকেট ক্যান্সেল হবে বলে কথা নেই”।

আজকাল যেসব ফ্যাশন বেরোচ্ছে তাতে মনে হয় কাপড় কম পড়েছিল বিধায় জামা টাইট এবং সালোয়ার ছোট হয়ে গিয়েছে আর ওড়নার প্রস্থ কমে চিমসে গিয়েছে। সেক্ষেত্রে লেটেস্ট ডিজাইনের জামা পরতে হবে বলে তো কোন কথা নেই। আমার এক বান্ধবী আজীবন কেবল পাঞ্জাবী স্টাইল পরলো। সে পর্দা করেনা কিন্তু সে বোঝে তাকে এই ডিজাইনেই সবচেয়ে ভালো লাগে। তাহলে আমাদের কেন এমন জামা পরতে হবে যাতে পর্দা চুলোয় যাক, ন্যূনতম ভদ্রতা পর্যন্ত বজায় থাকেনা? ভীষণ আশ্চর্য একটা ঘটনা হোল অনেকে হাফহাতা জামা পরে তার সাথে স্কার্ফ পরে, অনেকে বোরকা পরে এত টাইট যে মনে হয় এর চেয়ে শুধু জামা পরলেই ভালো হত আর অনেকের আচরনে পর্দার লেশমাত্র থাকেনা। যেহেতু হাতের কব্জী পর্যন্ত পর্দার অন্তর্ভুক্ত হাফহাতা জামার পরলে সাথে স্কার্ফ পরলেও পর্দার শর্ত পূরণ হয়না। বোরকার উদ্দেশ্য যেহেতু শরীরের আকার বোঝা না যাওয়া, টাইট বোরকা পরলে সেই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হচ্ছেনা। আর আচরণে নিয়ন্ত্রণ না থাকলে একপ্রস্থ কাপড় ঝুলিয়ে দিয়ে নিরাপত্তা পাওয়ার আশা দুরূহ। একবার বানিজ্যমেলায় গিয়েছি আমার মেয়ের জন্য ক্লিপ কিনতে। আমরা আই আই ইউ সি’র সব মহিলারা একসাথে যেতাম ভর দুপুরে যখন মেলা ফাঁকা থাকত। ক্লিপের দোকানে ঢুকে বাচ্চাদের ক্লিপ দেখছি এমন সময় দেখি এক বোরকাপরা মহিলা ঢুকলেন, কয়েকটা কাঁটা বেছে নিলেন, তারপর মাথার ওড়না খুলে একটা একটা করে কাঁটা মাথায় লাগিয়ে দোকানদারদের জিজ্ঞেস করতে লাগলেন তাঁকে দেখতে কেমন লাগছে! আমার চেহারা দেখে ফাহমিদা আমাকে টেনে নিয়ে গেল, “আপা, অন্য দোকানে চলেন”।

সবচেয়ে আশ্চর্য পরিবর্তন দেখা যায় বিয়েবাড়ীতে যে কারণে আমি আমার নিজের বিয়ের সময় পর্যন্ত বিয়েবাড়ীতে যেতে চাইনি। এক এক জনের সাজপোশাক দেখে আমি আর কিছুতেই তাদের চিনতে পারিনা। যেমন ধরুন এক বিয়েতে আমার ছাত্রীর মাকে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার ছাত্রী আসেনি?” উনি বললেন, “ঐতো বৌয়ের পাশে! আপনি ওকে দেখতে পাচ্ছেন না?” ছাত্রী ইউনিভার্সিটিতে বোরকা পরে আসে। আমি বৌয়ের আশেপাশে কোন ওড়না পরা মেয়েও দেখছিলাম না। আমার বিহবল চেহারা দেখে উনি বললেন, “ঐ যে লাল লেহেঙ্গা পরা!” এবার দেখতে পেলাম কিন্তু একনজর দেখেই আমি লজ্জায় চোখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হলাম। বোরকা কোথায়? সে পরে এসেছে হিন্দি সিনেমার মত ছোট্ট একটা ব্লাউজ একখানা স্কার্টের সাথে, ঘাড় থেকে একপাশে ঝুলানো ওড়না! মনে মনে ধিক্কার দিলাম ওর মাকে যিনি এই বৃদ্ধ বয়সে বোরকা পরে এসেছেন অথচ উনি এখন পর্দা না করলেও ওনার দিকে কেউ তাকাবেনা, আর যে মেয়েকে উনি বোরকা পরে ইউনিভার্সিটি পাঠান তাকে তিনি অর্ধউলঙ্গ করে এমন এক জায়গায় নিয়ে এসেছেন যেখানে সর্বাধিক সংখ্যক মানুষ তাকে দেখছে! এটা বিয়েবাড়ীতে সচরাচর ঘটনা। অনেক বয়স্কা মহিলারা পর্যন্ত বিয়েবাড়ীতে গেলে বোরকা খুলে মাথার কাপড় ফেলে দেন। আর গহনার পরিমাণ এবং আকারের প্রতিযোগিতায় পর্দা যে কোথায় ফেলে দেয়া যায় তাছাড়া আর কিছু তখন কারো মাথায় থাকেনা। পর্দার উদ্দেশ্য যদি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা হয় তবে বিয়েবাড়ীর এই প্রতিযোগিতাকে জ্ঞানের অভাব ছাড়া আর কি বলব?

পুরুষ সহকর্মীদের অনেকেই দুঃখ করতেন যে তাঁদের স্ত্রীদের এক এক বিয়েতে সাজার জন্য পার্লারের খরচ দিতে তাদের মাসের খরচ ব্যায় হয়ে যেত! প্রত্যেক অনুষ্ঠানের জন্য নতুন নতুন শাড়ী আর গহনার সেট চাই। দাওয়াত পেলেই বেচারাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ত!

পুরুষদের ব্যাপারেও বলতে হয় তাঁরা চোখের পর্দা করার ব্যাপারে ভীষণ উদাসীন। বিশ্বাস না হয় দেখুন প্রত্যেক বিয়েবাড়ীতে মেয়েদের হলে ঢোকার জন্য পুরুষরা কিভাবে লাইন দেন। যেখানে বলা হয়েছে নিজের ঘরে পর্যন্ত প্রবেশ করার সময় নক করতে সেখানে চট্টগ্রামে খালাত ভাই, মামাত ভাই, ফুপাত ভাই, চাচাত ভাইরা বোনদের রুমে নক না করেই ঢুকে পড়ে যখনতখন, যেন এটা তাদের জন্মগত অধিকার! তাদের সুবিধা-অসুবিধা চিন্তা না করেই ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকে তাদের ঘরে। নতুবা রান্নাঘরে বসে বসে গল্প করে। অথচ মেয়েদের রান্নাঘরে কাজ করার সময় পর্দা বজায় রাখা কতটা কঠিন ব্যাপার তা নিশ্চয় সবাই জানেন। হাসপাতালে সদ্যপ্রসূতির রুমে বসে থাকা পুরুষ আত্মীয়দের দেখুন যাদের নতুন মায়েরা না চলে যেতে বলতে পারেন না পারেন সঠিকভাবে বিশ্রাম নিতে। এক বান্ধবীর বিয়ের ছবি দেখে অবাক হয়ে গেলাম। ওর দু'পাশে, পেছনে সব ওর স্বামীর বন্ধুরা বসে ছবি তুলেছেন! ওর স্বামী যে তাঁদের বৌয়ের পাশে বসিয়ে নিজে ছবি তুল্লেন এ’ কি ধরণের আত্মসম্মান বা ওর পর্দার প্রতি উনি কি সম্মান দেখালেন?

এভাবে আরো অনেক বোঝার অভাব সংক্রান্ত সমস্যা আছে চট্টগ্রামের পর্দার ট্রেডিশনে। আমরা যদি ট্রেডিশন মনে না করে একে ধর্মীয় দায়িত্ব মনে করি এবং এ’ব্যাপারে সঠিকভাবে জানার চেষ্টা করি, যা শিখলাম সে অনুযায়ী পালন করি তাহলে এসব ভুল বুঝাবুঝির অবসান হতে পারে। আমি নিজে নিখুঁত নই তাই অন্যের ভুল ধরতে চাইনা। কিন্তু আমার মনে হয় যা করব তা সঠিকভাবে জেনেবুঝে করা উচিত যেন আমার কারণে আরেকজনের মধ্যে কোনপ্রকার অহেতুক সন্দেহ সংশয় সৃষ্টি না হয়।

Friday, October 15, 2010

ক্ষণিকের দেখা


চলার পথে হঠাৎ দেখা কিছু কিছু মুখ অকারণেই মনে গেঁথে যায়, অবসরে শুধু শুধুই মানসপটে উঁকি দিয়ে যায়।

আমার খুব মনে পড়ে দুবাইগামী সেই যুবককে যাকে এয়ারপোর্টের বাসে উঠতে উঠতে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখে আমার শিশুচোখ দু’টো খুব অবাক হয়েছিল, “এতবড় ছেলেরাও কাঁদে?!”

মানুষের ছোটখাটো মানবিক আচরণগুলো আমাকে খুব স্পর্শ করে। তাই মনে পড়ে এয়ারপোর্টের বাসে নিজের সীট ছেড়ে আমাদের বসতে দেয়া সেই ভ্রমণক্লান্ত ভদ্রলোকের কথা যাকে দেখে আমার বালিকামন বলেছিল, “আমার ছেলে হলে যেন এমন হয়!” মনে পড়ে কলকাতার ট্রামে সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোককে যিনি ট্রামের পেছনে বসে ছিলেন। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম সামনে। অন্যান্য প্যাসেঞ্জারদের দিয়ে তিনি খবর পাঠালেন আমি যেন তাঁর কাছে যাই। দাঁড়িয়ে থাকা নারীপুরুষের ভীড় ঠেলে তাঁর কাছে পৌঁছুলে তিনি ধুতি ঠিক করতে করতে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমি এই স্টপে নেমে যাব মা, আমার জায়গায় বসার জন্য তোমাকে ডেকেছি”। আমার এখনো অবাক লাগে তাঁর কাছেই এতগুলো মানুষ দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তিনি কেন আমাকে ডেকে নিয়েছিলেন সামনে থেকে যেখানে আমি ছিলাম একমাত্র বোরকাপরিহিতা যুবতী!

মাদ্রাজ থেকে কলকাতা আসার সময় দেখা প্লেনে দেখা এক ভদ্রলোকের কথা মনে পড়ে। লম্বাচওড়া, ফর্সা, দাঁড়িওয়ালা চেহারা দেখে পাঠানের মত লাগল। কথা বলতে বলতে জানলাম তাঁর বাড়ী পাকিস্তান, তবে তিনি হিন্দু। যে দু’টো ধর্মের উৎপত্তি পাকিস্তানে- হিন্দু এবং শিখধর্ম, অথচ দু’টোর একটিও এখন পাকিস্তানের মূল ধর্ম নয় বা তাদের পাকিস্তানী অনুসারীদের কখনো দেখিনি- তাদের একজনকে দেখে আমার ভীষণ মজা লাগল, কারণ এটা একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। প্লেন থেকে নামার সময় উনি আমার ব্যাগ নিতে সাহায্য করতে চাইলে আমি মানা করলাম, “ব্যাগ অনেক ভারী, আপনি আল্গাতে পারবেন না”। উনি বললেন, “তুমি আমার সাইজ দেখেছ?” আমি বললাম, “ঠিক আছে, চেষ্টা করেই দেখেন”। ব্যাগ তুলতে গিয়ে উনি একপাশে ঝুঁকে পড়ে বললেন, “বাপস, এর মধ্যে কি আছে? ইট নাকি?” আমি হাসতে হাসতে ব্যাগের আরেকপাশ ধরে বললাম, “না, বই, ওজনে না হলেও সম্মানের ভারে ভারী হয়ে যায়!”

মনে পড়ে বিসিএস পরীক্ষার ইন্টারভিউ দিতে যাবার ঘটনা। যাবার পথে পাশের সীটে বসা ভদ্রমহিলা খাইয়েছিলেন এই খুশীতে যে আমি আমার সার্টিফিকেটগুলো স্যুটকেসে না দিয়ে হাতে নিয়েছি। আসার পথে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বডিগার্ড বাহিনীর অগ্রবর্তী দলের চারজন ছিলেন বাসে আমার সামনে পেছনে পাশে বসা। তাঁরা আগেভাগেই চট্টগ্রাম যাচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরে তাঁর নিরাপত্তার প্রস্তুতি নিতে। তাঁদের বিভিন্ন বাহিনী থেকে খন্ডকালীন রিক্রুট করা হয়। বেচারারা নিজ দায়িত্বে পুরো রাস্তা আমাকে দেখেশুনে রাখলেন! আমি আশ্চর্য হলে তাঁদের একজন বললেন, “আমাদেরও বোন আছে, আমরা আপনাকে দেখলে আমাদের বোনদেরও হয়ত কেউ দেখবে”।

এই চেহারার কালেকশন নিয়তই বেড়ে চলেছে। তার সাথে সাথে বেড়ে চলেছে এই বিশ্বাস যে পৃথিবীর মানুষগুলো আসলে খুব ভালো। পরিস্থিতির কারণে হয়ত আমরা অনেকসময় অনেক অদ্ভুত আচরণ করি কিন্তু স্বভাবগতভাবে মানুষ মূলত ভালো।

Friday, October 8, 2010

ভালোবাসা মানে কি ধরে রাখা না ছেড়ে দেয়া?




কোথাও পড়েছিলাম, When you love someone, you give them what they want. এখানে they শব্দটি মূখ্য এবং you শব্দটি গৌণ। অর্থাৎ যাকে ভালোবাসেন তার ইচ্ছেটাই মূখ্য।

আমরা আমাদের আশেপাশে সাধারণত দু’প্রকার ভালোবাসা দেখতে পাই। একপ্রকার ভালোবাসা নিঃস্বার্থ, ততটুকু, যতটুকু মানুষের পক্ষে হওয়া সম্ভব। আরেকপ্রকার ভালোবাসায় স্বার্থের মিশ্রণ সুস্পষ্ট। প্রথমপ্রকার ভালোবাসায় ব্যাক্তি প্রিয়জনের জন্য তাই চায় যা প্রিয়জন চায় যদিও এতে করে সে প্রিয় ব্যাক্তিটির সংসর্গবঞ্চিত হয়। আর দ্বিতীয়প্রকার ভালোবাসায় সে প্রিয়জনকে ধরে রাখার জন্য তাকে কষ্ট দিতেও পিছপা হয়না।

আজকাল দ্বিতীয় প্রকার ভালোবাসার দৌড়াত্ম্য দেখে ভয় হয় যদি এ’বিষয়ে কিছু বলি, মানুষ মনে করবে আমি পাষানহৃদয়, ভালোবাসা কাকে বলে তার আমি কি জানি! আজ My Sister’s Keeper ছবিটি দেখে সাহস পেলাম যে আরো কিছু মানুষ আমার মত করে ভাবে।

বহুদিন অপেক্ষা করে ছিলাম ছবিটি দেখার জন্য। কাহিনী খুবই সাধারণ। এক ভদ্রমহিলা যখন জানতে পারলেন যে তার বড় মেয়েটির লিউকেমিয়া তখন তিনি আরেকটি সন্তান নিলেন যাতে করে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে তার শরীর থেকে প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করে বড় সন্তানটিকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। তেরো বছর বয়সে উপনীত হয়ে ছোট মেয়েটি এক বিখ্যাত উকিলের সাথে কথা বলে কেস করে দিল যাতে তার শরীর থেকে আর কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নেয়ার ওপর আদালত থেকে নিষেধাজ্ঞা সংগ্রহ করা যায়। বড় মেয়েকে দেখাশোনার জন্য কাজ ছেড়ে দেয়ার আগে মা নিজেও উকিল ছিলেন। তিনিও লড়াই না করে ছেড়ে দেয়ার পাত্রী নন। কিন্তু তিনি কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না যে মেয়ে বড়বোনকে এত ভালোবাসে সে হঠাৎ এভাবে বেঁকে বসল কেন। কোর্টে কেসের শুনানীর এক পর্যায়ে ছোট মেয়েটির জবানবন্দী নেয়ার সময় দুই বোনের মধ্যবর্তী ভাইটি ফাঁস করে দেয় যে বড় মেয়েটি জানে তার রোগের কোন চিকিৎসা নেই, সে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত অথচ মা চিকিৎসা করানোর ব্যাপারে নাছোড়বান্দা। বড়বোন তখন ছোটটিকে বোঝালো সে এই “life of pain” থেকে বাঁচতে চায়, সে মৃত্যুর মাধ্যমে এই কষ্ট থেকে নিষ্কৃতি চায়। তখন দুইবোন মিলে সিদ্ধান্ত নেয় যে মায়ের সাথে কথা বলে মাকে বোঝানোর চেয়ে এইভাবেই তার চিকিৎসা বন্ধ করে তাকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করা যায়। শেষপর্যন্ত মা নিজেও বুঝতে পারেন মেয়েটি কি কষ্টে আছে এবং এই মূহূর্তে তার জন্য জীবনের চেয়ে মৃত্যুই সহজ। মেয়েটি মারা যায় কিন্তু তার পরিবার তাকে মনে রাখে সবসময়।

মৃত্যু একটি স্বাভাবিকতা। জন্মের সাথে সাথে মৃত্যু আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যে পরিণত হয়। জীবনের উদ্দেশ্য বা প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে মৃত্যুর মাধ্যমে আমরা পরবর্তী পর্যায়ে চলে যাই। সক্রেটিস বিষপানের সময় তাঁর শিষ্যদের কাঁদতে দেখে বলেন, “Death may be the greatest of all human blessings.” মৃত্যুকে মেনে নেয়ার ব্যাপারে একটিমাত্র ক্ষেত্রে আপত্তি থাকতে পারে; যদি আমরা মনে করি যে এটি সকল কিছুর সমাপ্তি।

পরিচিত মহলে বেশ কয়েকটি কেস দেখে আমি আপত্তি জানিয়েছিলাম যে বৃদ্ধ বাবামাকে মেশিন দিয়ে মাসের পর মাস vegetable state-এ রেখে দিয়ে তাদের নামমাত্র বাঁচিয়ে রাখা অন্যায়। তাঁরা তাঁদের আয়ু পূর্ণ করেছেন এবং যখন তাদের চলে যাবার সময় হবে তখন যেকোন এক উসিলায় মৃত্যু তাদের সামনে উপস্থিত হবে। সে সময় চিকিৎসার চেষ্টা অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু কোন চিকিৎসা নেই বলে মেশিন দিয়ে শুধু তাদের শরীরটাকে বাঁচিয়ে রাখা তাঁদের প্রতি জুলুম। আমি নিজেকে দিয়ে চিন্তা করি। আমার বিবেক বুদ্ধি বিবেচনা যেদিন থেকে কাজ করবেনা সেদিন থেকে আমার বেঁচে থাকার কোন উদ্দেশ্য থাকবেনা। সেক্ষেত্রে আমার শরীরটকে যদি মেশিন দিয়ে বাঁচিয়ে রেখে আমার সন্তানেরা আত্মতৃপ্তি লাভ করে যে মা আছেন বা আমরা টাকা পয়সার প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে মাকে বাঁচিয়ে রেখেছি- সেটা কি হাস্যকর হবেনা? কি জানি, আমি এতে পরিতৃপ্ত হবার মত কিছু দেখিনা। শরীরটা আমার হতে পারে কিন্তু আমি সেই শরীরের চেয়ে নিজেকে আরেকটু বেশী কিছু মনে করি। সেই বেশী কিছুর অস্তিত্ব যদি না থাকে তবে শুধু খোলটা জিইয়ে রাখা বোকামী নয় কি?

যাকে ভালোবাসি তাকে ধরে রাখার চেয়েও ছেড়ে দেয়া অনেক সময় অনেক বড় ভালোবাসার দাবী। এটা বুঝতে পারলে হয়ত আমরা বাবামাকে মেশিন দিয়ে জিইয়ে না রেখে তাদের জীবদ্দশায় তাদের সাথে সময় কাটানোর বা তাদের খুশী রাখার ওপরেই বেশী গুরুত্ব দিতাম।

Saturday, October 2, 2010

কি করে থাকব?

রোজিনা আমাকে নিয়ে সবসময় হাসাহাসি করত। সে দিনে দু’বার ঘর ঝাড়ু দিত, আমি দিতাম তিনবার। আমি মাটিতে ঘুমাতে ভালোবাসি। তাই আমার ঘরে কেউ স্যান্ডেল পরে ঢুকতনা। তারপরও একটা বালুকণা থাকলে সেটা আমার পায়েই লাগত। সে দু’বার বিছানা ঝাড়ার পর আমি নিজে ঝাড়তাম আরো দু’বার। তারপরও একটা বালু গায়ে লাগলে বিছানায় ঘুমাতে পারতাম না যতক্ষণ না বালিটা খুঁজে বের করে ফেলে আসতে পারতাম। এত আদরযত্নে থাকার পর আমার ঘুম হতনা। হায় আল্লাহ! যে ঘরে নীচে মাটি, ওপরে মাটি, মাটির বিছানা পাতা, সে ঘরে থাকব কি করে?

আমার একটা রিসার্চ আর্টিকেলের প্রিন্ট করার জন্য পিয়ন শাহীনকে ব্যস্ত না রেখে নিজেই কাগজের ফীড দিচ্ছিলাম। দুপুরে যখন সবাই খেতে বসলাম দেখি হাত জ্বলে ছিঁড়ে যাচ্ছে অথচ তরকারী ঝাল হয়নি। শেষপর্যন্ত হাতের জ্বলুনী সহ্য করতে না পেরে আলোতে দাঁড়িয়ে দেখার চেষ্টা করলাম হাতে কি হয়েছে। দেখি পুরা হাত জুড়ে সুক্ষ্ণ সব কাটা। কাগজে হাত কেটে ফালাফালা হয়ে গেছে! কি আশ্চর্য বাজে চামড়া! অথচ শাহীন প্রতিদিন হাজার হাজার পেজ প্রিন্ট আর ফটোকপি নেয়, ওর কিছু হয়না। কবরের কঠিন মাটিতে যখন আমাকে শুইয়ে দিয়ে সবাই চলে আসবে, চারদিক থেকে কৌতুহলী পোকামাকড়ের দল পরীক্ষা করতে আসবে এখানে কে এলো, সেদিন কি লাভ হবে আমার এই চামড়া দিয়ে যা আমাকে কাগজের থেকে পর্যন্ত রক্ষা করতে পারেনা?

একবার আমাদের চট্টগ্রাম বাসায় গ্রাম থেকে এক মামাতো বোন বেড়াতে এলো। সে আমার অন্তত পাঁচ ছ’বছরের ছোট। মা তরকারী গরম করে করে দিচ্ছে আর আমরা বাটি টেবিলে এনে রাখছি। ওর হাতে তরকারীর বাটি দেখে আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম, “তুমি বস, আমাকে দাও”। ও বল্ল, “আপু, তুমি নিতে পারবেনা, গরম”। আমি বললাম, “তুমি যখন খালি হাতে ধরেছ আর কত গরম হবে? দাও, আমাকে দাও”। ওর হাত থেকে বাটি নিয়ে কোনরকমে দু’পা হেঁটে টেবিলে রেখে দৌড় দিয়ে ফ্রিজ থেকে বোতল বের করে হাতে পানি ঢালতে ঢালতেই দেখি দু’হাতের আঙ্গুলে এত্ত বড় বড় ফোস্কা পড়ে গেছে! মনে হচ্ছে যেন আরো কয়েকখানা আঙ্গুল গজিয়েছে আমার! সেদিন খাওয়া দাওয়া লাটে উঠলো। ফোস্কা আর জ্বলুনীতে প্রাণ যায়। ভাবলাম আমার বোন আমার ছোট হয়েও আমার চেয়ে কত শক্তিশালী। এই বাটি চুলা থেকে খালিহাতে এনে ওর কিছু হোলনা, আর আমার কি’না দু’হাতের দশ আঙ্গুলে দশটা ফোস্কা পড়ে গেল! এই আমি দোজখে গেলে কি করে থাকব?

ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরীতে ছাত্রীদের স্টাডি ট্যূরে ছাত্রীদের দু’ভাগ করে আমি এক গ্রুপ আর চৌধুরী গোলাম মাওলা ভাই এক গ্রুপ নিয়ে দু’দিকে ছড়িয়ে পড়লাম। আমি যখন ফ্যাক্টরী পরিদর্শন শেষে বৃষ্টিতে ভিজে ছাত্রীদের নিয়ে নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে আছি প্রায় পনেরো মিনিট তখনো মাওলা ভাইয়ের গ্রুপের দেখা নেই। মোবাইলে কলের পর কল দিচ্ছি কেউ ধরছেনা। প্রায় আধঘন্টা পর যখন সবাই ফিরে এলো দেখি কেউ কোন কথা বলেনা, কোন কথার উত্তর দেয়না, সবার চোখমুখ ফোলাফোলা। এদের কি হয়েছে বুঝতে না পেরে আমরা নদী পার হওয়ার জন্য নৌকায় উঠতে শুরু করলাম। বাকী তিনদিনেও কেউ বল্লনা ওরা কোথায় গিয়েছিল, কি হয়েছিল। চট্টগ্রাম ফেরার পথে বাসে সবাই স্টাডি ট্যূরের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছিল। তখন এক ছাত্রী বল্ল সেদিন কি হয়েছিল। সিমেন্ট ফ্যাক্টরীর যেখানে ৩০০০ ডিগ্রী তাপমাত্রায় পাথর গলানো হয় সেখানে আমার গ্রুপ দূর থেকেই গরমে দাঁড়াতে না পেরে খুব দ্রুত চলে গিয়েছিল তার পরের জায়গায়। কিন্তু মাওলা ভাইয়ের গ্রুপ ওখানে যায় সবার শেষে। তখন বাইরে বৃষ্টি, তাই ওরা ভেতরে ঢুকে পড়ে। কাছাকাছি থেকে এই আগুন দেখে মাওলা ভাই বলতে শুরু করেন, “আল্লাহ সৃষ্টির মাত্র একভাগ আগুন দিয়েছেন তাবৎ পৃথিবীতে, বাকী সবটা আছে দোজখে। এই একভাগ আগুনের কত লক্ষতম ভাগ দিয়ে এই পাথর গলে বালি হয়ে যাচ্ছে। আমাদের এই মাটির শরীর কি করে দোজখের আগুন সইবে?” এই কথায় মাওলা ভাইসহ ছাত্রীরা সবাই কাঁদতে শুরু করে। কাঁদতে কাঁদতে তাদের সময়ের হিসেব হারিয়ে যায়। আগুনের দাউদাউ শব্দে মোবাইলের রিং কেউ শোনেনি। হায়! আমরা নিজেদের কত শক্তিশালী মনে করি! তাৎক্ষণিক আনন্দ উপভোগ আর ইন্দ্রিয়সুখ কত সহজেই না দোজখের এই দাউদাউ আগুনকে আমাদের কাছে ম্লান করে দেয়! আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে মাওলা ভাইয়ের মত অনুভূতিসম্পন্ন হওয়ার তৌফিক দেন!

আমি ‘লেডী’ নই

টাইটানিক ছবিটা আমার ভাইয়েরা আমাকে অনেক সাধ্য সাধনা করে দেখিয়েছিল, অনেক ভাগে বিভক্ত করে। একবার প্রথম ভাগ, একবার শেষভাগ, আরেকবার মধ্যভাগ। আমার রুচিতেই মনে হয় কিছু একটা সমস্যা আছে। আমার কোনভাগই ভালো লাগলোনা! এজন্যই মনে হয় আমার এক ননদ একবার আমাকে বলেছিল, “ভাবী, আপনি তো দেখি সব ফ্লপ ছবি পছন্দ করেন যেগুলো কেউ দেখেওনা!” আমি মনে হয় আসলেই একটু অদ্ভুত! অনেক ছবির শেষ একমিনিট দেখেও আমি অনুপ্রাণিত হই আবার অনেক ছবির পুরোটা দেখেও আমার সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছু মনে হয়না।

এই টাইটানিক ছবিতে একটা অংশ ছিল যেখানে একটা বাচ্চামেয়েকে তার মা শেখাচ্ছিল কি করে একজন ‘লেডী’র মত আচরণ করতে হয়। পোশাক থেকে শুরু করে কথাবার্তা আচরণে একটা নিখুঁত মেকীভাব সৃষ্টি করতে পারাটাই হোল ‘লেডী’ হওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কেন যেন এই এক জায়গায় এসে নায়িকার অনুভূতিগুলোর বঃহিপ্রকাশ আমার সাথে সম্পূর্ণ মিলে গেল। মানলাম, অনেকসময় সামাজিক প্রয়োজনে আমাদের অনেক ইচ্ছা অনিচ্ছা পছন্দ অপছন্দ বিসর্জন দিতে হয়। কিন্তু তার একটা মাত্রা আছে। একটা মানুষ তার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তাই করবে যা মানুষ তার কাছে আশা করবে, একটি মূহূর্তের জন্যও সে স্বাভাবিক আচরণ করতে পারবেনা, মনের মত হাসতে পারবেনা, কাঁদতে পারবেনা- এটা কি একটা জীবন হতে পারে?

নাটকে সিনেমায় বইয়ের পাতায় যেসব আদর্শ মেয়েদের ছবি উঠে আসে তারা সারাক্ষণ প্রজাপতির মত নেচে গেয়ে হাসিমুখে সেবা দিয়ে যায়। তাদের কোন দুঃখ তারা কাউকে বুঝতে দেয়না, রেগে গিয়ে চেঁচামেচি করেনা, শতকথায় রা করেনা। আমি কখনো তাদের মত হতে চাইনি। হওয়া সম্ভব বা উচিত আমার কখনো মনে হয়নি। একটা মানুষ যেমন অন্যের সেবা করবে ঠিক সেভাবে সেবা পাবার অধিকারও তার থাকতে হবে। কখনো সে ক্লান্ত হবে, কখনো তার মন খারাপ হবে, কখনো সে রাগ করবে, চেঁচামেচি করবে। আমরা যদি স্বতঃসিদ্ধ ধরে নেই “nobody is perfect’ তবে তাকে কেন নিখুঁত হতে হবে? মেয়ে বলে সে মনখারাপ করতে পারবেনা? মন খারাপ করার দোষে তাকে ‘আঁধারমুখো’ বা ‘বদমেজাজী’ না বলে কেউ কি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতে পারেনা, “মন খারাপ কোরনা, সব ঠিক হয়ে যাবে”? সবসময় রাগ চেপে রেখে নিজেই কষ্ট পেতে হবে কেন? কখনো কখনো কি সে রাগ প্রকাশ করলে তাকে ‘মাথাগরম’ বা ‘বদরাগী’ খেতাব না দিয়ে ভয় পাওয়ার অভিনয় করে বলা যায়না, “ঠিক আছে বাপু, তোমার চা বানানোর দরকার নেই, আমিই বানিয়ে নিচ্ছি!”? কেন তার প্রতি অন্যায় করা হলে সে বলতে পারবেনা, “তোমরা আমার প্রতি অন্যায় করছ”? কেন সে কোন ব্যাপারে তার মতামত প্রকাশ করতে পারবে না? যার ওপর সবার অধিকার আছে তার কি কারো ওপর কোন অধিকার নেই?

খুব সাধারন সব ব্যাপারে মেয়েদের খুঁত ধরা হয়। যেমন আমি ছোটবেলা থেকেই খাবার নিয়ে খুব ঝামেলা করি। রান্না করা মাংস থেকে রগ বেছে, চর্বি আলাদা করে ফেলে দেই। মাছের কাঁটা ভীষণ ভয় পাই, ততক্ষণ বাছি যতক্ষণ না নিশ্চিত হই যে আর একটিও কাঁটা নেই। সব্জীও খাই বেছে। তাই আমার খেতে সময় লাগে অনেক। আর এই নিয়ে কত কথা! “মেয়েদের খেতে এত সময় লাগলে হয়? তুমি এত আস্তে খাও বলেই তো তুমি ঠিকমত খেতে পারোনা, বাচ্চা ঘুম থেকে উঠে যায়। মহিলারা কি করে এত আস্তে আস্তে খায়?” কেন? একজন পুরুষ যদি বাসায় একটা কাজও না করে খাবার টেবিলে গল্প করে করে একঘন্টা ধরে বিপুল পরিমাণে খাওয়াটা দোষ না হয় তাহলে একজন মহিলা সারাদিন রান্নাবাড়া করে, ঘরের কাজ বাইরের কাজ বাচ্চা সামলে তাকে জন্তু জানোয়ারের মত হাপুস হুপুস খেতে হবে কেন? কেন সে স্বস্তিমত খাওয়ার সময়টুকুও নিজের জন্য ব্যয় করতে পারবেনা? বহু কথা শুনলাম জীবনে কিন্তু কারণটা কেউ বুঝিয়ে বলতে পারলোনা। বিয়ে হলেই মেয়েদের কাছে আশা করা হয় যে তারা চিরাচরিত খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে ফেলবে অথচ একজন পুরুষ শ্বশুরবাড়ী বেড়াতে গেলেও তার জন্য তাই রান্না করা চাই যা সে নিজের বাড়ীতে খায়। সন্তানসম্ভবা হলে যখন মেয়েদের বাপের বাড়ীতে পাঠিয়ে দেয়া হয়, তার অনেক কারণ থাকে। কিন্তু আমার খুব মজা লাগে এই ভেবে যে মেয়েটা যতদিন কাজ করার উপযোগী ছিল ততদিন তাকে শ্বশুরবাড়ীতে রাখা হোল, আর যখন তাকে দেখাশোনা করা প্রয়োজন হয়ে পড়ল তখন তাকে মায়ের বাড়ী পাঠিয়ে দেয়া হোল! বলি বাচ্চাটা কাদের নামে পরিচিত হবে? দাদার না নানার?

ছোটবেলায় কবিতা পড়েছিলাম “হাসতে মানা”। পড়ে হাসতে হাসতে কুটিকুটি হয়ে গেছিলাম। অথচ এই ঘটনা যে আমার জীবনে ঘটবে তা কখনো ভাবিনি। বিদেশে বড় হওয়াতে আমাদের কখনো মেপে হাসার অভ্যাস করতে হয়নি। দেশে ফেরার পর একবার এক মামা এসেছিলেন বাসায়। মা ওনার সাথে কথা বলতে বলতে আমি নাস্তা এনে দিচ্ছিলাম। সব আনা হলে মা ইশারা করে বল্ল টিস্যু পেপার দিতে। মামা বলে উঠলেন, “না না, এত খাবার আমি এমনিতেই খেতে পারবনা, আর কিছু আনার প্রয়োজন নেই”। হঠাৎ মামার কথায় হাসি সামলাতে পারলাম না। মা চোখ রাঙ্গিয়ে উঠলে হাসি আরো বেড়ে গেল। মামা মা’কে জিজ্ঞেস করলেন, “ওর কি হয়েছে?” যেন মেয়েদের হাসি নিষেধ! মা আমাকে ভেতরে যেতে বলে মামাকে বুঝ দিল, “না, ওর একটু মাথা খারাপ আছে, ও এমনিতেই হাসে”।

আর কান্না? ও জিনিস আমার দ্বারা হয়না। এটাও একটা দোষ! আমার মনে হয় কান্নাটা একপ্রকার দুর্বলতা। আমি আমার দুর্বলতা শুধু একজনের কাছেই প্রকাশ করি। বাকীদের এ’ব্যপারে জানার কোন প্রয়োজন বা অধিকার আছে বলে আমি মনে করিনা। তাই মানুষের সামনে কাঁদাটা আমার জন্য প্রায় অসম্ভব একটা ব্যপার। শুধু একদিন কেঁদেছিলাম তাও ধরে বেঁধে কাঁদালে যা হয়! যখন ক্যানাডা চলে আসছি আমার মহিলা সহকর্মী এবং ছাত্রীরা আমার জন্য আলাদা করে বিদায়ী অনুষ্ঠান করেছিলেন। আমার আট বছরের ইউনিভার্সিটি শিক্ষকতা জীবনে যাদের পড়িয়েছি- অনার্স, মাস্টার্স, এমবিএ, ডিপ্লোমা, অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের ছাত্রীরা, আমার যেসব ছাত্রী আমার সহকর্মী হয়ে গিয়েছে প্রায় সব ব্যাচ থেকে যারা খবর পেয়েছে সবাই এসেছিল। এই আট বছরের স্মৃতিচারনা করলেন সব ছাত্রী, শিক্ষক, সহকর্মী- আট বছর যার সাথে সবচেয়ে বেশী সময় কাটিয়েছি সেই সালমা আপার উদ্যোগে, তাঁর সাবলীল উপস্থাপনায়। তারপর যখন ছাত্রীরা কান্না শুরু করল, অনেকে রাগ করল “ম্যাডাম কেন আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন?” না পারি উঠে যেতে না পারি বসে থাকতে! এ’ছাড়া আমি বিয়ের দিন পর্যন্ত কাঁদিনি। ছোটভাই শাওনের ওপর রাগ খুব কাজ দিয়েছিল তখন। ছেলেরা কেন মেয়েদের হলের ভেতরে আসার চেষ্টা করছে, ও কি করছে এসব নিয়ে বকাবকি করতে করতে কেটে গিয়েছে দেড়ঘন্টা-দু’ঘন্টা যা আমাকে বিয়েবাড়ীতে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। কিন্তু পরে এই নিয়ে কত কথা! বৌ তো খুশী হয়ে নাচতে নাচতে শ্বশুরবাড়ী চলে গেল। একটু কাঁদলোও না! মনে হোল বলি, “বাসা থেকে আসার আগে আপনাদের সবাইকে আমার সাথে বাথরুমে নিয়ে যাওয়া দরকার ছিল”। কিন্তু ভদ্রতা একটা বিরাট সমস্যা। অনেক কথাই বলা যায়না। আর মানুষ যখন এই ভদ্রতাকে দুর্বলতা মনে করে তখন যে কি ইচ্ছে করে তা আর নাইবা বললাম।

যে মেয়েরা খুব বেড়াতে পছন্দ করে তাদের জন্য টাইটেল হোল “ঠ্যাংলম্বা”। আমার সবসময় বেড়ানোর খুব শখ ছিল। তাই ছোটবেলা থেকে শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। বিয়ের আগে প্রিয় বেড়ানোর জায়গা ছিল বান্দরবান। ওখানে সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, চিম্বুক পাহাড়ের ওপর একটা কাঁঠালচাঁপার গাছ ছিল যে গাছের ওপর উঠলে রুমা থেকে সাতকানিয়া পর্যন্ত দেখা যেত। গাছটা পাহাড়ের একপ্রান্তে প্রায় ঝুলে আছে তাই দৃষ্টিসীমা ছিল অবারিত। চিম্বুক গেলেই আমি ঐ গাছের ওপর উঠে বসে থাকতাম। আর আমার খালাত ভাই, যে আমার জন্মের বহু আগে থেকেই বাংলাদেশে এলে মা’র সাথে সাথে থাকে, অনবরত চেঁচাতে থাকত, “এই, মেয়েরা গাছে ওঠেনা, নাম নাম!” সমস্যা কি বুঝলাম না! কিন্তু আমিও কম ট্যারা না। আমি যতক্ষণ পাহাড়ের ওপর থাকতাম ততক্ষণ ঐ গাছের ওপরেই থাকতাম। মজার ঘটনা হোল, বাবা একবার আমার একটা ছবি তুললো ঐ গাছের মগডালে বসা। বান্দরবান থেকে এসে অনেক ছবির সাথে ঐ ছবিটাও নিয়ে গিয়েছিলাম আমার প্রেসিডেন্সী ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সহকর্মীদের দেখাতে। ওখান থেকে ছবিটা কিভাবে যেন ‘মিসিং’ হয়ে যায়। আমার বিয়ের পর ঐ ছবিটা পেলাম আমার শ্বশুরবাড়ীর অ্যালবামে! আম্মা এই ছবি দেখে বধু নির্বাচন করেছেন! সাহসী শ্বাশুড়ী বটেন!

মেয়েদের চিন্তা চেতনা ভাবনা হতে হবে পানির মত তরল আর না হলেই সে হয়ে যাবে “পেঁচী” বা “পাগল”। আমার এক ননদ একবার অস্থির হয়ে আমাকে বলেছিল, “ভাবী, আমি আপনাকে বুঝিনা। কখনো মনে হয় আপনি তুলার মত নরম আর কখনো মনে হয় আপনি লোহার চেয়েও শক্ত!” এটা কোন কঠিন সমস্যা নয়। আমি মানুষের কষ্টের ব্যপারে তুলার মত নরম আর নিজের কষ্টের ব্যপারে লোহার চেয়েও শক্ত, নিজের অধিকারের ব্যপারে আমি তুলার চেয়েও নরম আর অন্যের অধিকারের ব্যপারে আমি লোহার চেয়েও শক্ত। আমি মহান বলে নয়। আমার অধিকারের ব্যপারে আমাকে কারো কাছে জবাবদিহি করতে হবেনা তাই এতে ছাড় দেয়া যায়। কিন্তু আমি অন্যের প্রতি অন্যায় হতে দেখেও যদি চুপ থাকি তাহলে আমি কিরকম মানুষ হলাম? আর এ’নিয়ে চেঁচামেচি করি দেখে কত মানুষ যে আমাকে অপছন্দ করে তার সীমাসংখ্যা নেই।

অনেক ব্যাপারে আমাদের দিয়ে এমন কাজ করানো হয় যার কোন যুক্তি নেই। আমি যে দোকান থেকে সোনার জিনিস কিনতাম তাদের কাছে একবার চেন কিনতে গেলাম আমার ননদের মেয়ে আর আমার মেয়ের জন্য। ওরা দু’রকম চেন দেখালেন- একটা চিকন, মনে হয় এখনি ভেঙ্গে গুড়ো গুড়ো হয়ে যাবে আরেকটা মোটা, মজবুত। বললাম, দ্বিতীয়টা থেকে দু’টো দিতে। উনি একটু আশ্চর্য হয়ে বললেন, “ভাবী কি তিনটা চেন নিচ্ছেন নাকি?” আমি ততোধিক আশ্চর্য হয়ে বললাম, “না তো ভাই! দু’টাই তো নেব- আমার মেয়ের একটা আর ননদের মেয়ের একটা!” উনি বললেন, “সবাই তো নিজের জন্য মোটা নেয় আর দেয়ার জন্য চিকন নেয়, তাই আপনাকে দু’রকম দেখালাম!” আমি থ হয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। রাসূল (সা) বলেছেন বাসায় কাজের লোককেও তাই খেতে পরতে দিতে যা আমরা নিজের জন্য পছন্দ করি। সেটা সাধ্যে না কুলালে অন্তত দুরত্বটা কাছাকাছি রাখা উচিত। কিন্তু নিজের জন্য ভালোটা নিয়ে অন্যকে খারাপটা দিলে দেয়ার দরকার কি? কর্তার পয়সা বাঁচাতে গিয়ে এই সাধারন ইনসাফের ব্যাপারটাই আমরা অনেক সময় মনে রাখিনা! সোনার জিনিসই দিতে হবে কথা নেই, তবে সামর্থ্যের মধ্যে ভালো জিনিসটা অন্যের জন্য নির্বাচন করাটা তো স্বাভাবিক মানবতার দাবী!

আমার ছেলেকে যে মেয়েটা দেখাশোনা করত ওর নাম ছিল রোজিনা। ওরা আট বোন। বাপের সামর্থ্য বলতে কিছুই ছিলনা। তাই বড়লোকের ছেলে পেয়ে মেয়ে ভালো থাকবে ভেবে উনি রোজিনার বিয়ে দিলেন এক পাগলের সাথে। ঐ ঘরে একটা ছেলে হবার পর ও আর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে সে ছেলেকে বড়বোনের কাছে রেখে সুদূর যশোর থেকে চট্টগ্রাম চলে এলো। বাপের কবল থেকে বাঁচানোর জন্য ছোট আরো দু’বোনকে সে নিজের কাছে নিয়ে এলো। লেখাপড়া জানতনা বলে গার্মেন্টসে চাকরী পাচ্ছিলনা। চারটা বাসায় কাজ করে সে নিজে চলত, বোনদের পেট চালাত। বোনেরা যৎসামান্য লেখাপড়া পুঁজি করে তখন মাত্র গার্মেন্টসে ঢুকেছে। আমার কাছে যখন সে আসে তখন আমি ছেলের জন্য ম্যাটার্নিটি লীভে। আমার বাসাটা ছিল তার পঞ্চম ছুটা বাসা। আমি ওকে বললাম, “তুমি কি লেখাপড়া শিখলে ভালো চাকরী পাবে?” সে বল্ল, “হ্যাঁ”। তখন আমি তাকে বললাম যখন সে ফ্রি থাকে তখন আমার কাছে পড়তে আসতে। একসময় খেয়াল করলাম আমার ছেলে তাকে খুব পছন্দ করছে। ভাবলাম আমি যখন আবার কাজে ফিরে যাব তখন তো বাচ্চা রাখার জন্য কাউকে লাগবে। তখন বললাম, “এতগুলো বাসা না করে তুমি আমার বাচ্চাকে দেখাশোনা কর। আমি তোমাকে বেতন পুষিয়ে দেব, থাকাখাওয়ার পয়সা বেঁচে যাবে, লেখাপড়াও শিখতে পারবে”। তখন সে রাজী হয়ে গেল। আমার খারাপ লাগত যে নিজের ছেলেকে বোনের কাছে ফেলে এসে সে আমার ছেলেকে নিয়ে থাকে। তাই রোজিনাকে আমি সবসময় চেষ্টা করতাম সবচেয়ে ভালো কিছু দিতে যেহেতু আমার সবচেয়ে ভালো জিনিসটা আমি ওর কাছে রাখি। অথচ এটাকে সবাই পাগলামী মনে করত। বলত, কাজের লোকজনকে এত লাই দিতে নেই।

আমি এ’কথায় কান দিতাম না এটাও আমার দোষ। একবার রোজিনাকে নিয়ে গিয়েছিলাম ওর মা বোনদের জন্য শাড়ি কিনতে। ওরা যে তিনবোন চট্টগ্রামে ছিল আর সবচেয়ে ছোট যে বাড়ীতে থেকে পড়াশোনা করত তাদের কাপড় আমি দিয়েছি। ওর মা আর বাকী চারবোনের জন্য বাজেট ছিল এই তিনবোনের। তাই ওকে ওয়্যারহাউজে নিয়ে গেলাম অল্প দামে যাতে ভালো কাপড় পাওয়া যায়। দোকানী জানেন আমি শাড়ী পরিনা। তাই শাড়ী কেনা হবে এই খুশীতে উনি শুধু দামী দামী শাড়ী বের করছেন। কিছুক্ষণ পর বিরক্ত হয়ে বললাম, “ভাই, শাড়ী আমি কিনবনা উনি কিনবেন। আপনি আরেকটু কম দামে শাড়ী দেখান”। দোকানী বললেন, “উনি কি আপনার আই আই ইউ সি’র কলিগ?” তখন বুঝলাম ঘটনা কি। রোজিনাকে আমি যে বোরকা বানিয়ে দিয়েছি তার দাম ছিল আমার বোরকার চাইতে বেশী আর সে আপার সাথে বাইরে যাচ্ছে এই খুশীতে সেই চটকদার বোরকা পরে এসেছে। তাই দোকানী ধরে নিয়েছেন আজকে হেভী বাজেটে কাপড় কেনা হবে! বহুকষ্টে দোকানীর বিরস চেহারা উপেক্ষা করে বাজেটের মধ্যে শাড়ী কিনে বের হয়ে রোজিনাকে যে বকা দিলাম বুঝতেই পারছেন!

বাংলা সাহিত্যে প্রায়ই পড়তাম, “মেয়েমানুষ ছেলে ঠ্যাঙ্গাবে, পরের বদনাম করবে- তার আবার লেখাপড়ার কি দরকার?” এটা যে সত্যি সত্যি কেউ অনসরণ করতে পারে তা কখনো ভাবিনি। আমি যখন কোন বইয়ের মধ্যে হারিয়ে যাই তখন আমার ঘরবাড়ীর অবস্থা থাকেনা, কোনক্রমে বাচ্চাদের খাওয়া দাওয়া ঠিক থাকলে আর নিজের খাবারের চিন্তাও মাথায় থাকেনা। তাই আমার বিয়ের পর পর হয়ত আমাকে অনুপ্রানিত করার জন্য আম্মা আমাকে এক আত্মীয়ার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বলতেন তিনি কি সুন্দর করে ঘরবাড়ী, সংসার, সন্তানদের ঝকঝকে তকতকে করে রাখেন। আমি নিজেই বলব আমি ভালো গৃহিনী নই। সুতরাং, আমার ‘ইম্প্রেসড’ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু উনি সাথে সাথে এ’ও বলতেন ভদ্রমহিলা গাঁটের পয়সা খরচ চট্টগ্রামের বাইরে থেকে ঘন্টার পর ঘন্টা ফোন করে আম্মাকে উপদেশ দিতেন বৌকে যেন মাথায় তোলা না হয়, সবসময় পায়ের নীচে দাবিয়ে রাখা হয়! অথচ উনি আমাকে কখনো দেখেননি, আমার সাথে কথাও হয়নি! তাঁর কথা শুনে আমার মাথায় শুধু এ’টাই কাজ করত, যে মহিলার মন এত অপরিষ্কার তাঁর ঘর পরিষ্কার রেখে কি লাভ? যে অন্যের ঘরে সম্প্রীতি আর বিশ্বাসের বীজ জেগে উঠতে না উঠতেই আগুন জ্বালিয়ে দেয়, সে নিজের জন্য কি করে সুখের স্বপ্ন দেখতে পারে? এসব দেখে আমি দোয়া করতাম আমি কারো সাথে সজ্ঞানে এরকম আচরণ করার আগে যেন আল্লাহ আমাকে উঠিয়ে নিয়ে যান।

যাই হোক। সবদিক বিবেচনায় শেষপর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে এলাম যে আমি ‘লেডী’ বিবেচিত হওয়ার উপযুক্ত নই। তাই আমার জীবনের নিম্নোক্ত ঘটনা ছিল আমার কাছে অন্যতম আশ্চর্য এক ঘটনা। ‘৯২ সালে আমি যখন ঢাকা থেকে দিল্লী যাচ্ছি আমার বাবামার সাথে মিলিত হবার জন্য তখন আমি অনার্স ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী। প্লেনে আইলের অন্যপাড়ে এক ভদ্রলোকের সাথে আমার পরিচয় হোল। উনি শ্রী লংকান মুসলিম। ঢাকা এসেছিলেন গার্মেন্টস সংক্রান্ত কাজে। ওনার মেয়ে আমার সমবয়সী। ওনার পাশে বসা ভদ্রলোক দিল্লীর মুসলিম পরিবারের ছেলে, ঢাকা শেরাটনে বারে কাজ করেন, বিয়ে করতে দেশে যাচ্ছেন। দ্বিতীয় ভদ্রলোকের প্রতি বিতৃষ্ণায় মন ভরে গেল। কিন্তু প্রথম ভদ্রলোকের সাথে নানান বিষয়ে কথা হোল পুরো রাস্তা। আমাদের দু’দেশের এজুকেশন সিস্টেম, দু’দেশের মেয়েদের বেড়ে ওঠা, আমাদের চোখে দু’দেশের জনগোষ্ঠী আরো অনেক কিছু। বিমানবন্দরে নামার কিছু আগে খুব ‘টার্বুলেন্স’ শুরু হোল। বিমান কাঁপতে শুরু করল হুলস্থুল আর শব্দের জন্য শোনা মুশকিল হয়ে পড়ল। উনি কি যেন বললেন, আমিও হেসে মাথা নাড়ালাম, “ঠিক, ঠিক”। ভাবলাম উনি নিশ্চয়ই ‘টার্বুলেন্স’ বিষয়ক কোন কথা বলছেন। কিছুক্ষণ পর অবস্থা স্বাভাবিক হলে উনি বললেন, “তুমি কি শুনেছ আমি কি বলেছি?” বললাম, “হ্যাঁ, শুনবনা কেন?” তখন আমি নামার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যাস্ত। আমার একটাই ব্যাগ কিন্তু বইপত্রের কারণে অনেক ভারী। কিভাবে নেব বুঝে পাচ্ছিনা। উনি বললেন, “তুমি শোননি”। আমি হাল্কাভাবে বললাম, “বলেন আপনি কি বলেছেন?” উনি বললেন, “আমি বলেছি যে ছেলে তোমাকে বিয়ে করবে সে খুব সুখী হবে”। আমি যদি ফর্সা হতাম আমার গাল তখন আগুনের মত লাল হয়ে যেত। কিন্তু উনি বাবা, বুঝতে পারলেন। ওনার সফরসঙ্গীর দিকে ফিরে বললেন, “এখানে একজন লেডী আছে, চল ওর ব্যাগটা আমরা চেকিন পর্যন্ত এগিয়ে দেই”।

একানব্বইয়ে যা দেখেছি

১৯৯১ সালের ২৯ শে এপ্রিল চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে যায় বাংলাদেশের ইতিহাসের ভয়াবহতম সাইক্লোনগুলোর একটি। আমরা আবুধাবী থেকে এসেছি তখন দেড়বছরের কাছাকাছি। আবুধাবীতে তিনবছরেও একবার বৃষ্টি দেখতাম না। সেখান থেকে এসে জীবনের এই প্রথম সাইক্লোন দেখা আমার জন্য ছিলো এক স্মরনীয় অ্ভিজ্ঞতা। তবে আরো নানাবিধ কারণে এই ঝড়ের স্মৃতি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের চট্টগ্রামের বাড়ীটি ১৯৪৮ সালে তৈরী। সামনে একসারি ঘর, মধ্যে মূল বাড়ী, পেছনে আরেক সারি ঘর। বৃটিশ আমলের বাড়ীগুলোর মত ডিজাইন, রাস্তা থেকে রান্নাঘর পর্যন্ত সরলরেখায় দেখা যায়। দেশে এসে একে পরিবর্তন পরিবর্ধন করে বাসোপযোগী করে তোলা হয়। সামনের ঘর ভেঙ্গে কম্পিউটার সেন্টার এবং ভাড়া দেয়ার জন্য গোডাউন করা হয়। বাথ্রুম এবং রান্নাঘর পেছনের ঘর থেকে মূল বাড়ীতে নিয়ে আসা হয়। পেছনের ঘর পরে কখনো ভেঙ্গে ঠিক করার জন্য পেন্ডিং রাখা হয়। সামনের ঘর আর মূলবাড়ীর মধ্যখানে গোলাপবাগানসহ চারপাশে আম, জাম, কাঁঠাল, বড়ই, পেয়ারা, নারকেল, সুপারী আরো নানান গাছপালা, লতাপাতা লাগালো বাবা আর মা, বাবার দাদীর হাতে লাগানো বাগানকে সম্বৃদ্ধ করার জন্য। মধ্যে ওয়াসার সাথে রাগারাগি করে বাবা মূলবাড়ী আর পেছনের ঘরগুলোর মাঝখানে টিউবওয়েল বসালো। কিন্তু সেই টিউবওয়েল ব্যবহার করার সুযোগ পাওয়ার আগেই বাবাকে দেশ ছেড়ে আবার পাড়ি জমাতে হোল আমেরিকায়।

যেদিন ঝড় হোল সেদিন ঝড়ের আগের কিছু মনে পড়েনা। যেহেতু আগে কখনো সাইক্লোন দেখিনি, আমার কোন ধারণা ছিলোনা আমাদের বাসার লোকজন ওয়েদার বুলেটিন কি দেখছে, কি বুঝছে বা বাইরে কি হতে চলেছে। আমরা তিন ভাইবোন স্বাভাবিকভাবেই গল্পসল্প করছি। সন্ধ্যার পর পর ঝোড়ো হাওয়ার সাথে সাথে শোঁ শোঁ শব্দ শুরু হোল। মা বল্ল ডইং রুম আর ডাইনিং রুমের মধ্যে দরজা বন্ধ করে দিতে। ডইং রুম ছিল অর্ধেকটাই কাঁচের, তাছাড়া পুরাতন বাড়ীর কারুকাজ করা বারান্দার কারুকাজের ওপর টিনের ঝকঝকে পাত দিয়ে ঢেকে ড্রয়িং রুম করা। কাঁচ ভেঙ্গে ছিটতে পারে বা টিন খুলে পড়তে পারে এই ভয়েই মা দরজা বন্ধ করে দিতে বল্ল। কিন্তু ড্রয়িং রুমে গিয়ে আমি যেন মোহগ্রস্তের মত আটকে গেলাম। ইয়া বড় বড় টিনের পাতগুলো, যেগুলো আলগে ধরে লাগাতে কয়েকজন শক্তিশালী লোকের ঘাম ছুটে গেছে, সেগুলোর নাটবোল্ট বাতাসে পটপট করে খুলে যাচ্ছে! বহু কষ্টে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে লাইট বন্ধ করলাম। সাথে সাথে চোখ ছুটে গেল জানালার বাইরে। আমি শুধু দেখলাম আকাশটা লাল। সেই লাল ব্যাকগ্রাউন্ডে দেখতে পেলাম সামনের চারতলা বিল্ডিং-এর সামনের পাঁচতলা সমান নারকেল গাছগুলো বাতাসের ঝাপটায় একবার ধনুকের মত নুয়ে মাটি স্পর্শ করছে, আবার বাতাসের গতিবেগ কমে যেতেই সাঁই করে তীরের মত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এই অদ্ভুত দৃশ্য কতক্ষন দেখে ছিলাম জানিনা। মাথার ওপর পটপট টিন খোলার শব্দ শুনেও চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। হঠাৎ মা’র ডাকে সম্বিত ফিরে পেলাম। আমার দেরী দেখে মা ছোট ভাই দুটোকে বেডরুমে বসিয়ে দেখতে এসেছে আমি উড়ে গেলাম কি’না। মাদের সেফটি সেন্স খুব ভালো হয়। একবার ঢাকায় শিলাবৃষ্টি হয়েছিল। তখন মা আমাদের দুইভাইবোনকে নিয়ে বাথরুমের সামনে প্যাসেজে দাঁড়িয়ে ছিল। পরে দেখলাম ঐ একজায়গায় ছাড়া ঘরের আর কোথাও কাঁচভাঙ্গার জন্য পা রাখার জায়গা নেই। আমাদের চট্টগ্রাম বাসার বেডরুমগুলো ছিল বাউন্ডারী ওয়ালের একগজের ভেতর। তাই মা বুঝে নিয়েছে বাচ্চাদের রাখার জন্য ওটাই ঘরের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা যদিও নিরাপত্তা আল্লাহর হাতে।

ড্রইয়িরুম থেকে বেডরুমে যেতে যেতে ইলেকট্রিসিটি চলে গেল। বেডরুমে পৌঁছতেই বাউন্ডারীর ও’পাশের বাড়ীর পুরুষমহিলার আর্তচিৎকার শুনতে পেলাম। বিকট শব্দে ওদের ঘরের টিনের চাল কাপড়ের মত ছিঁড়ে যাচ্ছে। ওদের যে আমাদের বাসায় ডেকে আনব তাও এই তুফানের মধ্যে সম্ভব না। আমরা অসহায়ের মত শুনতে লাগলাম ওদের চিৎকার। ওদের পাশের বাসা তখন পর্যন্ত নিরাপদ ছিল। কিন্তু এই দুই পরিবারের মধ্যে আজন্ম শত্রুতা। ওরা কি এদের ঠাঁই দেবে? কিছুক্ষণ পর ওদের গলার শব্দ অনসরণ করে বুঝতে পারলাম এই ঝড়ের রাতে তারা শত্রুতা ভুলে গিয়ে অসহায় প্রতিবেশীকে ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়েছে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে না ফেলতেই দেখি কানফাটানো শব্দে বাতাস বেচারা চালের শেষ শক্তিটুকুও শুষে নিয়ে তাকে উড়িয়ে নিয়ে গেল।

একটু পরে বাতাসের গতি আরো বেড়ে গেল। আমাদের পুরোঘর পাকা হলেও চিলেকোঠায় টিন দেয়া ছিল। এবার শুনলাম ঐ টিন ফরফর করতে শুরু করেছে। বেচারা টিন চিলেকোঠাকে আঁকড়ে ধরে থাকার জন্য প্রচন্ড চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কিন্তু বাতাস তাকে কিছুতেই ছাড়বে না। চিলেকোঠা ছিল রান্নাঘরের একপাশে আর রান্নাঘর থেকে ডাইনিং রুমের দরজা মা বন্ধ করে দিয়েছিল। আমি দু’একবার ডাইনিং রুমে গিয়ে ছালা বিছিয়ে রান্নাঘর থেকে ধেয়ে আসা পানির স্রোত স্তিমিত করার চেষ্টা করলাম। দীর্ঘসময় যুদ্ধ করতে করতে বেচারা টিন একসময় হাল ছেড়ে দিয়ে উড়েই গেল। আমিও পানি বন্ধ করার চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে বাড়ীর ফ্লোরে নদীর সৃষ্টিরহস্য পর্যবেক্ষণ করে লাগলাম।

ভোরের দিকে বাতাস কমে এলো।মনে হোল সদর দরজায় কে যেন ধাক্কা দিচ্ছে। মা ভাইয়াকে পাঠালো দেখার জন্য। একটু পরে দেখি ছোটমামা এসে হাজির। বেশ কিছুদিন থেকেই নাকি সাইক্লোনের ওয়ার্নিং দেয়া হচ্ছিল কিন্তু কিছুই হচ্ছিলনা। তাই অধিকাংশ মানুষ এই ওয়ার্নিংকে পাত্তা দেয়নি। মামাও তাই ঝড়ের আগে আমাদের বাসায় না এসে দোকানেই রয়ে গিয়েছিল। দোকানের চাল উড়ে গিয়ে ভিজতে ভিজতে বেচারা কোনক্রমে উড়ে যাওয়া থেকে বাঁচার চেষ্টা করছিল। পরে বাতাসের বেগ বাড়তে দেখে দোকান থেকে বের হতেই একটুর জন্য উড়ে আসা টিনে দোফালা হয়ে যাওয়া থেকে বেঁচে গেল। তখন ভেবে দেখল দোকান থেকে আমাদের বাসা পর্যন্ত আসতে গেলে প্রাণ হারানোর সম্ভাবনা। এতদুর আসার চেয়ে দোকানের কাছাকাছি এক বাসার সিঁড়িতে আশ্রয় নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল এতক্ষণ। বাতাস কমে যাওয়ায় সাহস করে আমাদের বাসা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে।

রাত জাগার ক্লান্তি নিয়ে ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে পড়লাম কিছুক্ষণের জন্য। সকালে উঠে দেখি বাইরে সব চুপচাপ যদিও মৃদু বাতাস বইছে তখনো। ডাইনিং রুমের নদী ততক্ষণে আমাদের রুম পর্যন্ত গড়িয়েছে। ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখি একটা টিন তিনদিক খুলে ঝুলে আছে, আরেকটা তখনো দুদিকে লাগানো। ড্রয়িংরুমের দরজা খুলে বাইরে বেরোতেই বাতাসের প্রচন্ডতা সত্যিকার অর্থে টের পেলাম। গোলাপবাগান মনে হোল বিরানভূমি যেখানে কখনো কিছু ছিলোনা। বেলুম্বু আর অড়বড়ই গাছের ডালে কোন পাতা বা ফল নেই, সব গাছের নীচে। কাঁঠালগাছ একটা ভেঙ্গে গেছে আর একটা কোনরকমে প্রাণে বেঁচে গেছে। বাবার দাদীর লাগানো আমগাছটা পাতা পড়ে ন্যাড়া হয়ে গেছে কিন্তু ডালপালা ভাঙ্গেনি। সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হোল নয়টা সুপারীগাছ আর ছয়টা নারকেল গাছের দেখি মাথা কোথায় উড়ে চলে গিয়েছে, দুমড়ানো মোচড়ানো কান্ডটা কিভাবে যেন দাঁড়িয়ে আছে। আমরা যেভাবে ম্যচের কাঠি বা টুথপিক ভাঙ্গি, কোন বিশাল হাত যেন গাছগুলোকে ঠিক সেভাবে মাঝ বরাবর ভেঙ্গে ফেলেছে! আর পেছনের ঘরগুলোতে দেখি বাতাসে পুরনো জীর্ণ দেয়াল ভেঙ্গে গিয়েছে জায়গায় জায়গায় আর এক জায়গায় ভেঙ্গে পড়েই গেছে!

সেদিন খবর এলো উপকুলীয় অঞ্চলে প্রচুর মানুষ মারা গিয়েছে। দু’একজায়গায় ছাড়া আর কোথাও ইলেকট্রিসিটি পানি টেলিফোন কিছুই নেই। আমাদের বাড়ী শহরের মধ্যখানে। কিন্তু বারিক বিল্ডিং পর্যন্ত সমুদ্রের পানি এসে পড়েছিল আর কোথাও কোথাও বিল্ডিং-এর ছাদ পর্যন্ত পানি উঠেছিল। গ্রামের বাড়ীতে কি অবস্থা দেখার জন্য মা সাথে সাথে ছোটমামা আর ভাইয়াকে বাড়ী পাঠিয়ে দিল। সেদিন পর্যন্ত আমাদের ট্যাংকের পানিতে চলল। তারপর দিন থেকে শুরু করলাম টিউবওয়েল থেকে ভেতরের বাথরুমে, রান্নাঘরে পানি টানা। দুতিনদিন পর যখন আবার লোকজন প্রকৃতিস্থ হয়ে কাজে যেতে শুরু করল তখন মা সবার আগে ছাদে টিন লাগাতে লোক নিয়োগ করল। নইলে প্রতিবারের বৃষ্টিতেই ঘর ভেসে যায়।

গ্রাম থেকে ফিরে ভাইয়া আর মামা যে বিবরণ দিল তাতে মনে হোল আমাদের কষ্ট কোন কষ্টই না। আজকাল অনেক বাড়ীর ছেলেমেয়েরা বিদেশে চাকরী করতে যাওয়ায় প্রবাসের টাকায় ইটের বাড়ীঘর হচ্ছে। এ’ছাড়া গ্রামাঞ্চলে পাহাড় কাছে হওয়ায় মাটির ঘরই তৈরী হয় বেশী। সাইক্লোনে সৃষ্ট পাহাড়ী ঢলে গলে ভেঙ্গে পড়েছে অধিকাংশ মাটির ঘর। টিনের ঘর এতদঞ্চলে খুব একটা প্রচলিত নয় কিন্তু টিনের ছাদ উড়ে গিয়েছে অধিকাংশ ঘরের আর সেই টিনে কাটা পড়ে মারা পড়েছে অনেকেই। অনেকের বাড়ীর ওপর গাছ পড়ে বাড়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লোকজন সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেছে এই ঝড়ে। অনেকের লাশ কোমর পর্যন্ত গেড়ে গেছে কাদায়। মৃতদেহ এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন ওরা এখনই কথা বলবে। এই লাশ কি করে তোলা হবে কেউ বুঝতে পারছেনা। বাতাসে মহিলাদের শাড়ি উড়ে গেছে। যতক্ষণ ঝড় ছিল ততক্ষণ তারা বাঁচার তাগিদে গাছপালা আঁকড়ে ছিলেন। কিন্তু অন্ধকার কেটে যেতেই অনেকে লজ্জা ঢাকার জন্য গলা পর্যন্ত পুকুরের পানিতে নেমে লুকিয়ে আছেন। খাবারের অভাব তো আছেই, রান্না করার কোন উপায় নেই।

আমাদের সাপ্তাহিক বাজার করা হয়েছিল তুফানের আগের দিন। মা বিশাল ফ্রিজারসম্পন্ন ফ্রিজটা আমাদের আবুধাবী বাসা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত নিয়ে এসেছিল। এতে একটা আস্ত গরুর সমুদয় মাংস রাখা যেত। এই ফ্রিজার সম্পূর্ণ খালি করে মা মাছ মাংস যা পেল সব বিশাল বিশাল হাঁড়িতে চুলায় বসিয়ে দিল। রান্না করে হাঁড়িসহ পাঠিয়ে দেবে গ্রামে। আমি গেলাম আমাদের আলমারীতে ঘাটাঘাটি করে তিন ভাইবোনের কাপড় থেকে না রাখলেই নয় এমন সব কাপড় বেছে বস্তাভর্তি করতে।

কাপড় প্রায় গুছিয়ে এনেছি, এ’সময় মা এসে বল্ল স্যার এসেছেন। জীবনে অংক ছাড়া আর কিছুর জন্য শিক্ষক রাখতে হয়নি। সাতটা বিষয়ে সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়েও আমি দু’একবার ছাড়া অংকে কোনদিন পাশ করতে পারিনি। সেই স্যার। এমনিতে ঘরবাড়ীর এই অবস্থা, ব্যস্ততা আর পানি টানতে টানতে অবস্থা কাহিল, তার ওপর আমি অংক সহ্য করতে পারিনা- স্যারের আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই? আমার চেহারাটা খুব বিচ্ছিরী। কখনোই কোন অনুভূতি লুকাতে সে আমাকে সাহায্য করেনা। স্যার আমাকে দেখেই বললেন, “শোন আজ তোমাকে পড়াতে আসিনি, ছাত্রী বেঁচে আছে না আমার চাকরীটা গেছে দেখতে এসেছি!” তখন আমার বেশ ভালো লাগল। ওনাকে আমার অভিজ্ঞতার কথা বললাম। ওনাদের কি অবস্থা ছিল জিজ্ঞেস করলাম। স্যারের বাড়ী হালিশহর। একতলা বাড়ী সম্পূর্ণ পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গেলে ওঁদের সম্পূর্ণ পরিবার এই বৃষ্টিতে ভিজে ছাদে আশ্রয় নেয়। সারারাত ওঁরা ছাদ থেকে উঠে থাকা রডের সাথে নিজেদের বেঁধে রেখে বাতাসে উড়ে যাওয়া থেকে আত্মরক্ষা করেন। বেচারার কাহিনী শুনে মনে হয় আল্লাহ আমাদের ঐ সময় বেহেস্তে রেখেছিলেন। এইচ এস সি পরীক্ষা পিছাবে কি’না খবর নিতে মনে করিয়ে দিয়ে স্যার তাঁর অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদের খবর নিতে রওয়ানা হয়ে যান।

তার পরদিন থেকে প্রতিবেশীরা টিউবওয়েলের পানি নেয়ার জন্য আমাদের বাসায় ভিড় জমাতে শুরু করেন। আমাদের পেছনের দরজা প্রায় ফুলটাইম খুলে দেয়া হয়। ধীরে ধীরে অন্যান্য এলাকার লোকজন খবর পেয়ে সর্বোচ্চ আট কিলোমিটার দূর থেকে পর্যন্ত পানি নিতে আসে। বাবার টিউবওয়েল, যা থেকে বাবা বেচারা একগ্লাস পানিও তোলেনি, বাবাকে বালতি বালতি সাওয়াব অর্জনের সুযোগ করে দেয়।

তুফানের প্রায় একসপ্তাহ পর প্রিয় বান্ধবী শিখা আসে। দু’জনে কলেজে যাই আমাদের আসন্ন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার কি হবে জানতে। সাইক্লোনের পর এই প্রথম আমার রাস্তায় বের হওয়া। চারপাশে পুরাতন বিল্ডিংগুলো দেখে মনে হোল এগুলোকে কেউ বিশাল সব বুরুশ দিয়ে পরিষ্কার করেছে! কোন বিল্ডিং –এর দরজা নেই, কোন বিল্ডিং-এর জানালা। বিরাট বিরাট সাইনবোর্ডগুলো মনে হচ্ছে কেউ বাতিল চিঠির মত মুচড়ে ফেলেছে! কিছু কোনক্রমে ঝুলে আছে বিল্ডিং-এর গায়ে আর কিছু খুলে পড়েছে রাস্তায়। কলেজে যেতে যেতে দেখি অসংখ্য গাছ ভেঙ্গে পড়েছে। অনেকগুলো তখনো সরানো সম্ভব হয়নি। কলেজে পৌঁছে দেখি আলোচনার মূখ্য বিষয় সাইক্লোন এবং এ’কারণে এইচ এস সি পরীক্ষা পেছানো আর বিদেশে ইরাক কুয়েত যুদ্ধে আমেরিকার জড়িয়ে পড়া। কিন্তু আমার মনে হোল কি হবে পরীক্ষা দিয়ে বা আমেরিকা ইরাক কি করল জেনে যেখানে এক মূহূর্তের জন্য জীবনের কোন নিশ্চয়তা নেই? আমার হাতে আছে তো কেবল এই মূহূর্তটুকুই! এই মূহূর্তটা আমি কি কাজে লাগালাম তা ছাড়া আর কোন কিছু চিন্তাভাবনা করে কোন লাভ নেই। কিছুক্ষণের মধ্যে সব বান্ধবীদের খবরাখবর নিয়ে বাসায় রওয়ানা হলাম, বাসায় অনেক কাজ।

বাসায় গিয়ে তাড়াতাড়ি আলমারী খুললাম, কলেজ ড্রেস বদলে বাসার জামা পরতে হবে। আলমারী খুলে তো আমি বিস্ময়ে বিমূঢ়! আলমারী সম্পূর্ণ ফাঁকা! কিচ্ছু নেই! মাকে জিজ্ঞেস করলাম। মা বল্ল গতবার গ্রামে যে কাপড় পাঠানো হয়েছে তা তাদের প্রয়োজনের তুলনায় কিছুই না। তাই আজকে আবার আলমারী খালি করে সব পাঠিয়ে দিয়েছে। আমাকে পরে বানিয়ে দেবে। আমি বললাম এতে আমার কোন আপত্তি নেই কিন্তু আপাতত আমি কি পরব? মা খুঁজেপেতে বাবার দুটো খাদি পাঞ্জাবী আর মা’র ইউরোপ সফরের দু’টো ট্রাউজার বের করে দিল। বল্ল, “আপাতত এই দিয়ে চালাও”। কি আর করা? আমার মায়ের এখন তিন ছেলে হোল!

এর প্রায় একসপ্তাহ পর পানি নিতে নিতে টিউবওয়েলের ফিল্টার ফেটে কাদা উঠতে শুরু করল। লোক ডাকা হোল, ওরা বল্ল নতুন করে টিউবওয়েল খুঁড়তে হবে। এই টিউবওয়েলে আর পানি উঠবে না। তখনো পানি বা ইলেকট্রিসিটি আসার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছেনা। লোকজন শেষপর্যন্ত সেই কাদাই নিয়ে গেল, কাদা বসে গেলে ফিটকিরি দিয়ে পরিষ্কার করে পান করবে। পানির কি মূল্য আমি সে ক’দিনে বুঝতে পারলাম।

তার এক্সপ্তাহ পর একটা আশ্চর্য ঘটনা দেখলাম। নিজের চোখে না দেখলে আমি বিশ্বাস করতাম না যে আল্লাহ মানুষের দোয়া তাৎক্ষণিক কবুল করেন। জুহর নামাজ পড়ছি। বাইরে লোকজনের কোলাহল শুনছি যেটা তখন আমাদের কাছে স্বাভাবিক। এক লোক এসেছেন এই কাদাপানি নিয়ে যেতে। কাদা বসে গেলে ওপর থেকে পানি তুলে তার অসুস্থ বাবামাকে খাওয়াবেন যেহেতু অন্য পানিতে রোগব্যাধি হওয়ার সম্ভাবনা। নামাজের মধ্যেই শুনতে পেলাম উনি দুঃখ করছেন, এখন আর কাদাও উঠছেনা। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। বাইরে উনি দোয়া করছেন আর ভেতরে আমি, কেউ কাউকে দেখছিনা কিন্তু দু’জনে একই কথা বলছি, “হে আল্লাহ, তুমি আমাদের রিজিক তুলে নিয়োনা! এই কল বিকল হয়ে যেতে পারে কিন্তু তোমার সীমাহীন রহমতে এই ভাঙ্গা কল থেকেই পরিষ্কার স্বচ্ছ পানি ওঠা সম্ভব। হে আল্লাহ, তুমি আমাদের পানির উৎস বন্ধ করে দিয়োনা”। নামাজ শেষ হওয়ার আগেই শুনি ওরা আবার পানি তোলার চেষ্টা করছেন আর ঐ ভদ্রলোক উচ্ছসিত হয়ে বলছেন, “এরকম পরিষ্কার পানি তো আমরা যখন টিউবওয়েল ভালো ছিল তখনো পাইনি!” আমার মত মানুষের কথা আল্লাহ শোনার কথা না। তাই আমি নিশ্চিত ঐ ভদ্রলোকের কারণেই আল্লাহ ঐ ভাঙ্গা টিউবওয়েল দিয়েই স্বচ্ছ পানির স্রোত বইয়ে দিয়েছিলেন। ওয়াসার পানি ফিরে আসা পর্যন্ত ঐ পানি অব্যাহত ছিল। তারপর আর কোনদিন ঐ টিউবওয়েল দিয়ে একফোঁটা পানিও ওঠেনি। কিন্তু ওর মর্চেপড়া মাথাটা আমি যতবার দেখি, আমি পুণর্বার বিশ্বাস করি- আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা নেন, কিন্তু তারপরও তিনি আমাদের প্রতি অতিশয় দয়ালু, ক্ষমাশীল এবং তিনি আমাদের দোয়া কবুল করার জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছেন, যদি আমরা শুধু চাইতে জানি।