Sunday, June 16, 2013

আত্মপরিচয়


১/

গতকাল অফিস থেকে বেরোবার সাথে সাথে হাফিজ সাহেবের ফোন, ‘আমি হয়ত চাকরীটা ছেড়ে দিচ্ছি’।

বুঝলাম কিছু একটা সমস্যা  হয়েছে। জানি উনি অন্যের সমস্যা সমাধান করার জন্য পাহাড় কেটে সমান করে ফেলবেন, কিন্তু নিজের বেলা যদি একটা ‘উহ’ শব্দ করলে জান বাঁচে সেটুকুও করবেন না। বললাম, ‘সমস্যা হলে ছেড়ে দেন, রিজিকের মালিক আল্লাহ, যেখানে রিজিক থাকবে সেখানে ব্যাবস্থা হয়ে যাবে’।
 

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে এলে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি অবস্থা?’
বললেন, ‘সমস্যা মিটে গেছে’।
‘কি হয়েছিল?’
‘জেনারেল ম্যানেজার insist করছিল হোটেলের সমস্ত পণ্য আমাদের ব্যাবহার করে দেখা উচিত যেন আমরা গেস্টদের এর গুনগত মানের ব্যাপারে আশ্বস্ত করতে পারি। যখন সে জানলো আমরা হাতেগোণা কয়েকজন মদ্যপান করিনা তখন সে বলল, ‘অন্তত এক sip খেয়ে দেখ! নইলে বুঝবে কি করে এটার গুনগত মান কেমন?’ এই মহিলার অন্য দেশ বা সংস্কৃতি সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। কে বোঝাবে তাকে কেন আমি এই বস্তু এক sipও পান করে দেখতে পারবনা? আমি তখনই সিদ্ধান্ত নেই কিচ্ছু না বলে চাকরীটা ছেড়ে দেব। কিন্তু আমাদের হোটেলের এক শ্বেতাঙ্গিনী নিকোল এগিয়ে এসে বলল, ‘শোন, আমি একজন practicing ক্রিশ্চান। আমার বয়স ২৪ এবং আমি এখনও কুমারী, কোন পুরুষ আমাকে বিয়ের আগে স্পর্শ করতে পারবেনা। একইভাবে মদ এবং শুকরের মাংস আমাদের জন্য নিষিদ্ধ, কেউ আমাকে এগুলো পান করতে বা খেতে বাধ্য করতে পারবেনা, এক sip কেন এক ফোঁটাও না’। এ’সময় আমাদের আরেক ম্যানেজার ডেভিড এগিয়ে এলো। সে আমাকে গত চারবছর ধরে দেখছে। সে জেনারেল ম্যানেজারকে বোঝালো, ‘শোন, তুমি এই ব্যাপারটা ছেড়ে দাও। হাফিজ এখানে গত চারবছর ধরে কাজ করছে, সে নিজেও একজন ম্যানেজার, এখানকার সব প্রোডাক্ট সম্পর্কে ওর ভাল ধারণা র‍য়েছে, সুতরাং এই একটি বস্তু সে পান করে না দেখলে কোন সমস্যা হবেনা। তাছাড়া তুমি যদি এই ব্যাপারটি নিয়ে বাড়াবাড়ি কর আর ওরা ধর্মীয়ভাবে নিগৃহিত হবার কারণে হোটেলের বিরুদ্ধে মামলা করে দেয় তাহলে আমরা ভীষণ সমস্যায় পড়ে যাব। আর্থিকভাবে কত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে তা না হয় বাদই দিলাম, বদনাম হয়ে গেলে আমাদের হোটেলে আর লোকজন আসবেনা’। এভাবেই জেনারেল ম্যানেজার ঠান্ডা হয়ে গেল, সে আমতা আমতা করতে শুরু করল, ‘আমি তো ওদের বাধ্য করছিলাম না, কেবল বলছিলাম হোটেলের সব প্রোডাক্ট ব্যাবহার করে দেখতে! ওরা না চাইলে কোন সমস্যা নেই।’

 
ডেভিড ধর্মের চর্চা করেনা, কিন্তু অন্যের ধর্মবোধকে শ্রদ্ধা করে। আমার বিগত জীবনের অভিজ্ঞতা এটাই যে আপনি যখন কোন ধর্ম চর্চা করার সিদ্ধান্ত নেবেন, ধর্মকে মনে প্রানে শরীরে এবং জীবনে ধারণ এবং প্রতিষ্ঠিত করতে চাইবেন, তখন বিধর্মীদের সাথে আপনার যতটা না সমস্যা হবে তার চেয়ে বহুগুন বেশি সমস্যা হবে আপনার কাঙ্ক্ষিত ধর্মের সেসব লোকজনের সাথে যারা ধর্মচর্চা করেনা। আপনি হয়ত কেবল আপনার নিজের ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করছেন, প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন যেন আপনার কাজটি ত্রুটিমুক্ত হয়, ঘাটতি কিংবা বাহুল্য দোষে দুষ্ট না হয়, আর কেউ কি করছে না করছে তার প্রতি আপনার দৃকপাত করার সময় বা আকাঙ্খা কোনটিই নেই, কিন্তু তবু সেই ব্যাক্তি  আপনার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে যাবে যে নিজে ধর্মপালন করেনা কিংবা আংশিকভাবে করে, এই ভেবে যে ধর্ম পালন করার মাধ্যমে আপনি তাকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছেন। আপনি তো পুরোই বোকা বনে গেলেন, ‘আমি কি করলাম?!’

 
মাঝে মাঝে মনে প্রশ্নের উদয় হয়, ওরা কি এজন্য এমন করে যে ওরা অন্তরের অন্তঃস্থলে অনুভব করে তাদের নিজেদেরও এই কাজগুলো করা উচিত ছিল কিন্তু পৃথিবীর প্রতি লোভ, মোহ, কামনা তাদের ফিরিয়ে রেখেছে? কিংবা ভাবে আপনার নিষ্ঠা তাদের ফাঁকিবাজিটাকে প্রকাশ করে দিচ্ছে? এজন্যই হয়ত লেজকাটা শেয়াল চায় সব শেয়ালেরই লেজ কাটা যাক। তাই হয়ত আমার অন্তরঙ্গ বান্ধবী শিখা সাহা কিংবা ফ্যাং মে কিংবা ডনা জ্যাকসনের সাথে কোনদিন কোন সমস্যা হয়নি অথচ বানু, খানম আর খাতুনেরা মনে করে শুধু নামাজ পড়া আর নিজেকে আবৃত করাও অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি! এজন্যই হয়ত বিধর্মীরা অন্য ধর্মকে ততটা অবমাননা করেনা যেভাবে সেই ধর্মে জন্মগ্রহনকারী অথচ পালন করতে অনিচ্ছুক ব্যাক্তিরা আক্রমন করে থাকে। তাই যুগে যুগে জন্ম হয় সালমান রুশদী আর তাসলিমা নাসরিনদের। কেন যে তাঁরা ধর্ম পালনে ইচ্ছুক ব্যাক্তিদের তাঁদের মত চলতে দিয়ে নিজেরা নিজেদের মত চলতে পারেন না কে জানে!

 
 

২/

মার পূর্বতন কর্মস্থলে আমি যখন নামাজের জায়গা খুঁজছি তখন পরিচয় হয় সোমালিয়ার বান্ধবী আয়শার সাথে। সে জানায় এখানে এক ঈজিপশিয়ান ভাই নোমাইর মু’মিন কোম্পানীর সাথে কথা বলে একটি রুম নামাজের জন্য নির্দিষ্ট করে নেন এবং সেখানে জায়নামাজ কিনে জমা করে নামাজের ব্যাবস্থা করেন। আমাদের বাংলাদেশীদের অধিকাংশই হয় নামাজ পড়েনা, কিংবা বাসায় গিয়ে পড়ে অথবা নিজের ডেস্কে বসে পড়ে নেয়। তাই এই রুমে সচরাচর বাংলাদেশীদের আগমন ঘটেনা আয়শা আমাকে জানায় এই রুমে আগে কেবল পুরুষদের নামাজ হত। এখন মহিলাদের জন্য আলাদা করে সময় নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে এবং এর জন্য উদ্যোগ নিয়েছে ফিয়োনা রোচ। নাম শুনে একটু আশ্চর্য হলাম। বললাম, ‘ওর কি সম্ভাব্য স্বার্থ থাকতে পারে যে সে মহিলাদের নামাজের জন্য আলাদা সময় নির্ধারনের ব্যাপারে উদ্যোগ নিলো?’

আয়শা বলল, ‘কেন, সে নামাজ পড়ে তো!’

আমি তো হতবাক! ফিয়োনা ... রোচ ... নামাজ পড়ে! আমি তো পুরাই কনফিউজড!

ফিয়োনার নাম যেমন তেমনি ওর পোশাক আশাক দেখেও ধারণা করার কোন কারণ নেই যে সে মুসলিম। বুঝলাম, ম্ভবত সে নও মুসলিম এবং ইসলামের সকল ব্যাপারে তার পরিপূর্ণ ধারণা নেই। তবে সে এটুকু বুঝেছে যে নামাজ মুসলিম এবং অমুসলিমদের মাঝে পার্থক্য নির্ণয়কারী। তাই অফিসে সে যেভাবেই চলুক না কেন প্রতিদিন নামাজের সময় হবার সাথে সাথে সে ওজু করে নিজেকে সম্পূর্ন আবৃত করে নেয় এবং অফিসের কে কি ভাবল, কোন দৃষ্টিতে দেখল কোনকিছুর তোয়াক্কা না করে নিজেকে স্রষ্টার সামনে সমর্পন করে দেয়।
 

আমার বর্তমান কর্মস্থলের পাশের বিল্ডিংয়েই মসজিদ। এখানে ওজু করার সুব্যাবস্থার কারণে আমি অফিসে জায়গা থাকা সত্ত্বেও মসজিদে নামাজ পড়তে পছন্দ করি। তাছাড়া জুমার দিন এই মসজিদের খুতবাটাও দারুন হয়। মসজিদে গেলে প্রায়ই দেখি ডাউনটাউনের বিভিন্ন এলাকা যেখানে কাছাকাছি মসজিদ নেই কিংবা যেসব অফিসে নামাজের জায়গা নেই সেখান থেকে মহিলারা হেঁটে আসেন লাঞ্চটাইমে নামাজ পড়ার জন্য। এক ইরাকী মহিলা চারব্লক হেঁটে আসতেন আবার চারব্লক হেঁটে ফিরে যেতেন প্রতি ওয়াক্তে যেটা শীতকালে তিন ওয়াক্তও হতে পারে। ইদানিং আমি যে সময় বের হই তখন এক আফ্রিকান মহিলা আসেন যিনি কোর্টে কাজ করেন। প্রতিদিন দুপুরে যুহরের সময় পৃথিবীর দুই প্রান্ত থেকে আসা দু’টি মানুষ একত্রিত হই একই সত্ত্বার সামনে। এভাবেই আমাদের সকল পার্থক্য ঘুচে গিয়ে কেবল একটা পরিচয়ই অবশিষ্ট থাকে - আমরা দু’জনই একই সত্ত্বাকে ভালোবাসি এবং তারই জন্য পরস্পরকে ভালোবাসি এবং এতটা ভালোবাসি যে একে অপরের জন্য যেকোন কিছু করতে পারি যদিও আমরা একে অপরের নামটিও জানিনা!

 

/

কিছুদিন আগে এক বান্ধবীর বাসায় দাওয়াত খেতে গিয়ে দেখি কিছু অতিথি এসেছেন যারা অপরিচিত। তাঁদের দেখে কিছুতেই অনুমান করতে পারলাম না সালাম দেব না আদাব বলব। তাই কোনপ্রকার সম্ভাষনের পরিবর্তে কেবল হাসি দিয়ে আগে বান্ধবীকে খুঁজে বের করলাম। তারপর কানে কানে জিজ্ঞেস করে নিলাম, ‘সালাম দেব না আদাব বলব?’ সে বলল, ‘দেখে বোঝার উপায় না থাকলেও ওরা মুসলিম। আপনি সালাম দিতে পারেন

 
এঁরা আশ্চর্যজনক কৃতিত্বের সাথে নিজেদের অস্তিত্ব থেকে তাঁদের ধর্মীয় পরিচয় বাদ দিয়ে দিয়েছেন তাঁদের নামধাম, চেহারাসুরত, কথাবার্তা, পোশাক আশাক থেকে সন্তান সন্ততি পর্যন্ত কিছুই দেখে বোঝার উপায় নেই তাঁরা মুসলিম। দাওয়াতে যাবার আগে থেকেই অত্যন্ত ক্লান্ত ছিলাম। দাওয়াতে উপস্থিত সুধীমন্ডলীর সাহচর্যও তেমন স্বস্তিকর ছিলোনা। তাই বান্ধবী এবং আমাদের খুব কাছের এক ভাবীকে বিদায় জানিয়ে বাসায় এসে ঘুমিয়ে সময়ের সদ্ব্যাবহার করলাম।
 

পরে বান্ধবী ফোন করে জানালেন আমাদের ভাবীসাহেবা, যিনি নিজেও আধুনিকা, এক মজার কান্ড করেছেন। ভাবীও এসে আমার মতই কনফিউজড ছিলেন। তবে তিনি এই সমস্যার সমাধান করেছেন অন্যভাবে। গৃহকর্ত্রীর ব্যাস্ততা দেখে তিনি তাঁকে বিরক্ত না করে অতিথিদের সন্তানদের সাথে খানিকক্ষণ কথা বললেন, তাদের নামধাম জিজ্ঞেস করলেন। তারপর তিনি গিয়ে অতিথিদের নমস্কার করেন। খাওয়াদাওয়ার পর গল্প করতে করতে তিনি তাঁদের বার বার বৌদি সম্ভাষন করতে থাকলে তাঁরা অত্যন্ত বিব্রত বোধ করতে থাকেন। তাঁরা গৃহকর্ত্রীকে অনুরোধ করেন ভাবীকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলার জন্য। বান্ধবী নিজেও ভাবীকে এই বিষয়ে বলতে বিব্রত বোধ করতে থাকেন। তাই তিনি ইশারায় বলার চেষ্টার করেন। কিন্তু ভাবী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তাঁকে আশ্বস্ত করেন, ‘না ভাবী, আপনি একদম চিন্তা করবেন না। আমি বাচ্চাদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হয়ে নিয়েছি যে এঁরা হিন্দু। তাঁদের প্রতি আমার ব্যাবহারে আপনি কোন ত্রুটি খুঁজে পাবেন না
 

এভাবেই সমাপ্ত হয় বান্ধবীর অভূতপূর্ব দাওয়াতপর্ব!

Saturday, May 25, 2013

অনুগ্রহ

১/

চাকরী পেয়েছি শুনে এক বান্ধবী ফোন করলেন, ‘ভালোই তো, মানুষ ক্যানাডায় এসে ডিগ্রীর পর ডিগ্রী, কোর্সের পর কোর্স করেও চাকরী পায়না। আর আপনি কিচ্ছু না করে, এমনকি চেষ্টাও না করে একের পর এক ক্যানাডার সেরা কোম্পানীগুলোতে কাজ করে চলেছেন!’ ভেবে দেখলাম কথাটা আসলেই ঠিক। আহামরি কোন যোগ্যতা নেই, উচ্চাভিলাষ এবং অধ্যাবসায় উভয়ের অভাব, অথচ কিভাবে কিভাবে যেন রেজুমিটার ওজন বাড়তেই রয়েছে!

ক্যানাডায় এসে CRTP নামে একটা কোর্স করেছিলাম। এই কোর্সের মাধ্যমে তারা নিজের দেশে উচ্চপদে কাজ করে আসা অভিবাসীদের এখানকার কর্মক্ষেত্রে পুণর্বাসিত হবার যোগ্য করে গড়ে তোলে। সে সূত্রে নানান দেশের বেশ কিছু বন্ধুবান্ধবের পাশাপাশি একটি বৃহৎ গ্যাস কোম্পানীতে অ্যাডমিন হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা জুটে যায়। তারপর কিছুদিন ঘাপটি মেরে বসে থাকি বাসায়। আচানক একদিন চাইনিজ বান্ধবী জেনী (ওর চাইনিজ নাম ফ্যাং মে, ওরা বিদেশে আসার আগে নিজেই নিজের একটি ইংরেজী নামকরন করে নেয়) ফোন করে জানায় সে যে বিখ্যাত অয়েল কোম্পানীতে কাজ করে সেখানে একটি পজিশনের জন্য সে তার বসকে আমার কথা বলেছে। বস আমাকে বাসা থেকে ডেকে ইন্টারভিউ নিয়ে চাকরী দিয়ে দেন। মসজিদের পাশে অফিস- কাজ করি, খাই দাই, ঘুরি ফিরি আর মসজিদে নামাজ পড়ি।

তারপর চাকরী ছেড়ে দিয়ে CELTA কোর্স করলাম দেশে ফিরে যাব বলে। কিন্তু কপালে না থাকলে কি আর যাওয়া যায়? সমস্ত সংসার বাক্সে ভরে চলল এক বছর। তারপর একদিন আবার বাক্সপ্যাটরা খুলতে শুরু করলাম। এ’সময় আমার প্রভু সিদ্ধান্ত নিলেন, ‘চল তোকে এবার পৃথিবীর সেরা দশটি কোম্পানীর একটিতে কাজ করিয়ে দেই, দেখি তুই কি করিস!’ কি আর করব? চাকরীতে গিয়ে প্রথমেই তাঁর সামনে মাথা নত করার একটা জায়গা খুঁজে বের করলাম। পৃথিবীব্যাপী মুসলিমদের এক বিশাল সম্পদ সালাম। একটি ‘আসসালামু আলাইকুম’ সম্ভাষন সাদা কালো, এশিয়ান আফ্রিকান ইউরোপিয়ান, বস ক্লিনার সব পার্থক্য নিমিষেই ঘুচিয়ে দিয়ে দু’জন সম্পূর্ন অপরিচিত ব্যাক্তির মাঝে গড়ে তোলে হৃদয়ের বন্ধন অথচ দু’জন একে অপরের নামও জানেনা! এভাবেই বন্ধুত্ব হয় সোমালিয়ার আয়শার সাথে। আয়শার মাধ্যমে পরিচয় হয় নোমাইর ভাইয়ের সাথে। আল্লাহ মিশরীয়দের রহমত করুন। নোমাইর ভাই কোম্পানীর সাথে আলাপসাপেক্ষে একটি রুম স্থায়ীভাবে নামাজের জন্য বুক করে রেখেছেন যেখানে কাবার্ডের ভেতর সারি সারি জায়নামাজ!

ওখানে যেদিন কন্ট্র্যাক্ট শেষ হোল সেদিনই খবর পেলাম আগে যে অয়েল কোম্পানীতে কাজ করতাম সেখানে আবার চাকরী হয়ে গিয়েছে। জেনীর চাপে পড়ে ইন্টারভিউ দিলেও ভরসা ছিলোনা চাকরী হবে কারণ এবারের কাজটা ক্যাল্গেরী অফিসে বসলেও ক্যাল্গেরীর নয়, রেইনবো লেকের। যে দু’জন তাদের পছন্দের তালিকায় ছিল তার মধ্যে আমি ছাড়া অন্যজন রেইনবো লেকে কাজ করেছে তিনবছর। কিন্তু আরেক চাইনিজ বান্ধবী জেইন (ইয়ান জিং) অসাধ্য সাধন করল। ইন্টারভিউর পর পর সে রেইনবো লেকে চলে গেল এবং ওখানকার বস জো’র কাছে আমার যোগ্যতা নিয়ে সত্যমিথ্যা কি বলেছে আমি জানিনা কিন্তু সকল সম্ভাবনার উর্ধ্বে আমার চাকরী হয়ে গেল! আজ মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে পড়তে ভাবছিলাম, মানুষের এই ভালোবাসা পাবার কোন যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও আমার করুণাময় প্রভু আমার চলার পথকে কতই না প্রশস্ত করে দিয়েছেন! অতঃপর আমি আমার প্রভুর কোন কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করব?


২/

ক’দিন আগেই বাসা বদলেছি, এক বছরের লীজ। কিন্তু বাড়ীওয়ালা বেঈমানী করে কোন কথাবার্তা আলাপ না করে বাড়ী বিক্রি করে দিল। আমরা পড়ে গেলাম বিশাল সমস্যায়। ক্যাল্গেরীতে ইদানিংকালে অভিবাসীসহ অন্যান্য এলাকা থেকে চাকরীপ্রত্যাশী এত লোক এসেছে যে এক একটি বাড়ীর জন্য পঁচিশ থেকে একশ আবেদনপত্র জমা পড়ছে, বাড়ীওয়ালারা বিরক্ত হয়ে ফোনই উঠাতে চায়না, উঠালে বলে বাড়ী ভাড়া হয়ে গিয়েছে। দুইমাস ধরে হন্যে হয়ে বাড়ী খোঁজার পর একদিন এক ভাই অনুমতি চাইলেন একটি মুসলিম ওয়েবসাইটে অ্যাড দিতে যে একটি মুসলিম পরিবারের বাসস্থান প্রয়োজন। পরদিন এক লোক ফোন করলেন তাঁর বাড়ীটি দেখতে যাবার জন্য। গিয়ে দেখি এলাকাটি যেমন সুন্দর, বাড়ীটিও তেমনি। বিশাল বাড়ী, ঘাসবিছানো এবং পাকা করা বিরাট আঙ্গিনা, গাছপালা, সর্বত্র যত্নের ছাপ। ভদ্রলোক লেবানিজ, ডাউনটাউনে বিরাট ব্যাবসা। স্ত্রীটিও চমৎকার। ছয় ছয়টি সন্তান একহাতে সামলান, বিশাল ভ্যানে করে বাচ্চাদের আনানেয়া করেন, বাচ্চাদের বয়স আড়াই থেকে এগারো বছরের মধ্যে। সম্পূর্ন পর্দানশীন এই মহিলা কিভাবে ছয় ছয়টি সন্তান সামলে এত বিশাল ঘর এত টিপটপ রাখেন এবং নিজে এত ফিটফাট থাকেন আশ্চর্য হয়ে গেলাম। বাচ্চাগুলো যেমন সভ্যভদ্র তেমনি ঘরটিও বাড়ী খোঁজার প্রচেষ্টায় আমাদের দেখা দুই শতাধিক ঘরের মধ্যে সবচেয়ে পরিস্কার, কোথাও কোন দাগ নেই, গন্ধ নেই, ঝকঝকে তকতকে। কিন্তু এই বাড়ীর ভাড়া আমাদের নাগালের অনেক বাইরে। তাছাড়া আমরা মানুষ মাত্র চারজন। চার বেডরুম, আড়াই বাথরুম, তিনটি ড্রয়িং রুম এবং তিনশ লোকের বসার মত আঙ্গিনা নিয়ে আমরা কি করব বা তা পরিষ্কার রাখব কিভাবে?  আমাদের অপারগতার কথা জানিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ভদ্রলোক নাছোরবান্দা। তিনি ভাড়া কমাতে কমাতে অর্ধেকে চলে এলেন। আমরা খুব আশ্চর্য হলাম। একদিকে আমরা কুকুরের বিষ্ঠা ভরা বাড়ীর বাড়ীওয়ালাদের দেমাগে বাঁচিনা আর ইনি কিনা আমাদের ধরে বেঁধে তাঁর বাড়ীতে রাখতে চান। জিজ্ঞেস করলাম, ‘ঘটনা কি?’  তিনি জানালেন সন্তানদের ইসলামের ওপর গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য ব্যাবসাপাতি বাড়ীঘর রেখে লেবানন চলে যাচ্ছেন। তিনি চান না তাঁর ঘরে কুকুর বিড়াল বা গার্লফ্রেন্ডওয়ালা কিংবা নাস্তিক কেউ থাকুক তা সে যতই ভাড়া দিক। তিনি চান এই ঘরে তাঁর অনুপস্থিতিতেও নামাজ পড়া, ইসলামের চর্চা অব্যাহত থাকুক। এর পরে আর কি বলা যায়? তিনিও কমালেন যতটা তাঁর পক্ষে সম্ভব হোল, আমরাও বাড়ালাম যতটা আমাদের সামর্থ্য। বাড়ীটাও পাওয়া যাবে ঠিক সেদিনই যেদিন আমাদের বর্তমান বাড়ীতে থাকার শেষ সময়সীমা। কি জানি, হয়ত আমার প্রভু চান আমরা কিছুদিন শান শওকতে থাকি! অতঃপর আমি আমার প্রভুর কোন কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করব?


৩/

অফিসে সেলফোন বাজছে দেখে দৌড়ে গিয়ে ধরলাম। ডেন্টিস্টের অফিস থেকে ফোন। জানাতে ফোন করেছে মঙ্গলবার ডাক্তারের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট। বললাম সেদিন কাজ আছে, সুতরাং তারিখ পরিবর্তন করতে হবে। সে আমাকে তারিখ পরিবর্তন করে পরের মাসের এক শনিবার সকাল ন’টায় সময় দিল। কিন্তু আমরা উভয়েই শুনতে পেলাম ডাক্তারের অফিসের অন্য ফোনে অপর রিসেপশনিস্ট আরেক রোগীকে একই তারিখ একই সময় অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিচ্ছে। ঘটনার কাকতালিয়তায় আমরা তিনজনই হকচকিয়ে গেলাম। আমাকে লাইনে রেখে উভয় রিসেপশনিস্ট পরস্পরের সাথে আলাপ করতে লাগল, তারপর জানাল, ‘সব ঠিক আছে’। আমি বললাম, ‘কিভাবে সব ঠিক আছে? অন্য রোগীকে তো সময় পরিবর্তন করে দিলে না’। সে বলল, ‘অন্য রোগীও তুমি’। আমি হতবাক হয়ে বললাম, ‘মানে?’ ‘মানে অন্য লাইনে তোমার হাজব্যান্ড ফোন করেছে তোমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট পরিবর্তন করার জন্য। সুতরাং আমরা দু’জনেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট পরিবর্তন করে একই সময় দিলেও একই রোগীকেই দিয়েছি। সুতরাং, সব ঠিক আছে!’

এমন অদ্ভুত ঘটনায় হাসলাম কিছুক্ষণ সবাই মিলে।


আরেকদিন সন্ধ্যায় মাছ রান্না করব, চুলায় পেঁয়াজ ভাজা হচ্ছে, আমার ছেলে কাঠি দিয়ে পেঁয়াজ নেড়ে নেড়ে রান্নার ভান করছে, আমি মাছ শেষ ধোয়া দিচ্ছি, আমার মেয়ে ধনিয়া পাতা বেছে রেডি করছে। খানিক পর পেঁয়াজ ফুটতে শুরু করল। ছিটকে গায়ে পড়তে পারে বলে পুত্রকে বললাম, ‘বাবা, পেঁয়াজ ফুটছে, এবার তুমি একটু দূরে সরে যাও’। সাথে সাথে শুনি সে বোনকে গিয়ে বলছে, ‘আপু, আম্মু বলেছে the pot is going to explode. চল আমরা দু’জনেই এখান থেকে পালাই!’ প্রথমে থতমত খেয়ে গেলেও পরে বুঝতে পারলাম ইংরেজী boil, sputter, explode এই সবগুলো শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হোল ‘ফুটছে’। সুতরাং, আমার ভাষা সম্পর্কে স্বল্পজ্ঞানী কিন্তু বিজ্ঞান বিষয়ে big+জ্ঞানী পুত্রের কল্পনাবিলাসের ফলাফল  হোল সে ‘ফুটছে’ শব্দের সম্ভাব্য অনুবাদ করেছে ‘explode’! ব্যাপারটা বেশ কিছুদিন আমাদের সবার হাসির খোরাক জোগালো।


জীবনের এই টুকটাক মজার ঘটনা, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আনন্দই জীবনে বৈচিত্র আনে, জীবনকে অর্থবহ করে। ক্ষণে ক্ষণে ঘটমান এসব ঘটনা দেখে ভাবি, অতঃপর আমি আমার প্রভুর কোন কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করব?