Monday, July 1, 2013

বাদল দিনের বন্ধুরা

১৪ই জুন ২০১৩, শুক্রবার

আজ যখন কাজ থেকে ফিরছি তখন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। গায়ের জ্যাকেটটা ওয়াটারপ্রুফ আর তাতে একটা মাথার আচ্ছাদন আছে, তাতেই খানিকটা বাঁচোয়া। ট্রেন থেকে নেমে যখন বাসার দিকে আসছি তখন দেখি এক বুড়া দাদা মনের সুখে ঢাউস সাইজের একখানা গাড়ী নিয়ে যেতে যেতে হাত নাড়ছেন। চারিদিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হলাম তিনি আমাকেই হাত নাড়ছেন যেহেতু আশেপাশে আর কেউ নেই। অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারলাম না তাঁকে আমি কিভাবে চিনি। রাস্তা পাড় হয়ে বাসার সামনে আসতে আসতে দেখি উনি গাড়ী ঘুরিয়ে আমার সামনে এসে পড়েছেন, জানালার কাঁচ নামিয়ে বললেন, 'আমি কি তোমাকে বাসায় নামিয়ে দিতে পারি?' চেহারা দেখে নিশ্চিত হলাম আমি তাঁকে কোনভাবেই চিনিনা। তিনি দাদা হলেও ক্যানাডিয়ান দাদা। বেরিয়েছেন বৃষ্টিতে কারো উপকার করা যায় কিনা এই উদ্দেশ্য নিয়ে। জানালাম, যে বাসার সামনে তিনি গাড়ী থামিয়েছেন এটাই আমার বাসা। তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় জানিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে ভাবলাম, 'আহা! চাকরী তাঁকে অবসর দিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তিনি কাজ থেকে অবসর নেননি, জনহিতকর কাজ থেকে অবসর না নেয়াই তো জীবনের সার্থকতা!'

 

২০শে জুন ২০১৩, বৃহস্পতিবার

আমি ডাউনটাউনের যে স্টেশনে নামি সেখানে ট্রেন থেকে নেমেই উর্ধ্বশ্বাসে কর্মস্থলের দিকের ছুটে চলা মানুষগুলোকে খবরের কাগজ বিতরণের অলোভনীয় এবং নিষ্ফল কাজটি করেন এক বুড়ো দাদা। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা নির্বিশেষে প্রতিদিন সকালে তাঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি কাগজ নিয়ে, হাতখানা বাড়িয়ে। আমি কোনদিনই কাগজ নেইনা যদিও এগুলো ফ্রি বিলি করা হয়। কাগজে কোন ভাল খবর ছাপা হয়না, দুনিয়ার যত খারাপ কাজ আর বাজে লোকজনের কীর্তিকলাপের খবর পড়ে কোন লাভ নেই তাই। আজও জানিনা দাদাটির নাম কি, কোথায় থাকেন, পরিবার পরিজন আছে কিনা। কিন্তু প্রতিদিন সকালে চলার পথে একটু হাসি কিংবা দু’টো শব্দ দিয়ে তাঁকে অভিবাদন জানাতে ভুল হয়না।

আজ সারারাত প্রচন্ড বজ্রপাতের সাথে প্রবল বৃষ্টি হয়েছে কিন্তু সকালেও দেখি আকাশের ভান্ডারে মেঘ ফুরোয়নি। সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে টের পেলাম শুধু বৃষ্টি আর বজ্রপাতই নয়, সাথে বইছে প্রবল বাতাস। এখানে সাধারনত অল্প বৃষ্টি হয়েই বন্ধ হয়ে যায়, তাই এই বৃষ্টি মাতৃভূমির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল বার বার। ঝুম বৃষ্টির কারণে ট্রেনের দরজা একবার খুললে বন্ধ হতে চাচ্ছিল না যেহেতু সেন্সর দেখাচ্ছিল কেউ ঢোকার চেষ্টা করছে। শেষপর্যন্ত যখন আমার স্টেশনে পৌঁছলাম তখন দেখি কাগজ বিলি করেন যে দাদা তিনি নেই। হেঁটে যেতে যেতে তবু রেইনকোটের হুডের নীচে থেকে ইতিউতি তাকাচ্ছিলাম তাঁকে দেখা যায় কিনা। হঠাত চোখের কোণায় ধরা পড়ল পথের পাশে একটা দোকানের সানশেডের নীচে থেকে রেইনকোট পরা কেউ জোরেজোরে হাত নাড়ছে, হাতে ধরা পেপারটা দেখে বুঝলাম ইনি আমার সেই খবরের কাগজ বিলি করা দাদা, আমাকে আশ্বস্ত করার জন্য হাত নাড়ছেন, ‘ভেবোনা, আমি আছি’, যদিও তিনি জানেন আমি কাগজ নেবোনা!

 

২১শে জুন ২০১৩, শুক্রবার

গতকাল দুপুর থেকে State of Local Emergency ঘোষনা করা হয়েছে। নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়ে নাকি দু’জন মানুষসহ একটি মোবাইল হোম ভেসে গিয়েছে। অবশ্য ১৭ তলার ওপর অফিসে বসে ব্যাপারটা কেমন যেন বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছিলনা। মনে হচ্ছিল কোথাও কোন ভুল হচ্ছে। তবে অফিস থেকে আসার পথে যখন দেখলাম যে শীর্ণকায়া বো নদী দেখে বাংলাদেশের নদীগুলোর সাথে তুলনা করে হাসি পেত, যার পেটের ভেতর প্রতিটা নুড়ি পাথর পঞ্চাশ হাত ওপরে ব্রিজ থেকে দেখা যেত, তার পানি ঘোলা হয়ে প্রচন্ড বেগে প্রবাহিত হচ্ছে, পানি প্রায় ব্রিজ ছুঁই ছুঁই, তখন ভাবলাম তাহলে নদীর আশেপাশে প্লাবিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

আজ সকালে বাসার সামনে স্টেশনে গিয়ে একটু অবাক হলাম। গত পাঁচ বছরে কোনদিন দেখিনি সকালবেলা স্টেশন পরিস্কার করা হয়নি। সর্বত্র বাতাসে বেঁকে যাওয়া ভাঙ্গা ছাতা ছড়িয়ে রয়েছে। ভাবলাম, ‘কি জানি, আমার মত ভোর সাড়ে পাঁচটায় কাজে রওয়ানা হয় এমন পাগল ক’জন আছে? হয়ত ঝড়বৃষ্টির কারণে ওরা পরিস্কার করে কুলিয়ে উঠতে পারেনি!’

কিন্তু তিন স্টেশন গিয়ে সবাইকে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেয়া হোল। সামনে ট্রেনের লাইন নাকি পানির নীচে, বাকী পথটুকু বাসে যেতে হবে। বাস আসে বাস যায়, আমি কিছুতেই স্বাস্থ্যবান লোকজনের ভিড় ঠেলে উঠতে পারিনা। একবার উঠলাম কিন্তু দরজা বন্ধ করা যাচ্ছেনা বলে নেমে গেলাম। কিছুক্ষণ পর বাস স্টেশনে যিনি নিয়ন্ত্রক ছিলেন তিনি জানালেন একটি রাস্তা দিয়েই ডাউনটাউনে যাওয়া যাচ্ছিল, সে রাস্তাটিও এখন ভিড়ের কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে, সম্ভব হলে অফিসে ফোন করে ছুটি নিয়ে নিতে। তখন বাজে সাতটা। কি আর করা? জেইনকে ফোন করলাম। সে বলল আমাদের গ্রুপের প্রায় সবাই ফোন করে জানিয়েছে যাবার কোন পথ নেই। ফিরে এলাম বাসায়। বহুদিন পর বড় মসজিদটায় জুমা পড়ার সুযোগ হোল যদিও ছাতা মাথায় দিয়েও জামাকাপড় ভিজে শেষ।

রাতে ইফতেখার ভাই বললেন, ‘চলে আসুন, একসাথে খাই’। ভাবী খাবার সাজাতে সাজাতে টিভিতে খবরে দেখলাম শুধু ক্যাল্গেরী নয়, আশেপাশের সমস্ত শহর প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে নৈসর্গিক দৃশ্যের লীলাভূমি ক্যানমোরে বাড়ীঘর থেকে রাস্তা পর্যন্ত সব টুকরো টুকরো হয়ে ভেসে গিয়েছে। ক্যাল্গেরীর কিছু কিছু এলাকায় নদীপাড়ে বিলাসবহুল সব বাড়ীঘর দোতলা পর্যন্ত পানির নীচে, কিছু কিছু বাড়ী ভেসে গিয়ে নদীপাড়ে কিংবা ব্রিজের সাথে প্রচন্ড গতিতে ধাক্কা খেয়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। ডাউনটাউনে তিনফুট পানি, যারা সকালে গিয়েছিল তাদের সবাইকে সাঁতার কেটে ফিরে আসতে হয়েছে, অফিসের সামনে নদীর ধারে যে পার্কে জেইন আর আমি প্রতিদিন হাঁটতে যাই সেসব জায়গায় প্রচন্ডবেগে নদী প্রবাহিত হচ্ছে আর তাতে হাঁসগুলো মনের আনন্দে সাঁতরে বেড়াচ্ছে। শুনলাম চিড়িয়াখানার প্রানীগুলোকে কোর্ট বিল্ডিংয়ে স্থানান্তর করা হতে পারে। এই খবরে বেশ মজা পেলাম। কোর্ট বিল্ডিংয়ে সাধারনত এমন সব মানুষদের বিচার করা হয় যাদের মাঝে মানবিক অপেক্ষা পাশবিক গুনাবলী অধিকরূপে বিদ্যমান, আর এখন আদতেই সব পশুদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে!

ক্যানমোর
 
বন্যার্ত ক্যানমোর


পানির নীচে ডাউনটাউন

রাতে সোমালী বান্ধবী আয়শার খবর নিলাম, সে বোনের বিয়ের জন্য টরোন্টোগামী, সুতরাং নিরাপদ আছে। কিছুক্ষণ পরই জেইন ফোন করে জানালো আমাদের গ্রুপের সবাই নিরাপদ আছে, শুধু হ্যাভিয়েরকে ডাউনটাউনের বাসা ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে যেহেতু বিদ্যুতায়িত হয়ে মৃত্যুর হাত থেকে ডাউনটাউনবাসীদের রক্ষা করার জন্য ওখানে সব বিল্ডিংয়ের বিদ্যুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।

 

২২শে জুন ২০১৩, শনিবার

বাংলাদেশের মেয়ে আমি কোনদিন বাংলাদেশে বন্যা দেখিনি। ছোটবেলায় বিদেশে ছিলাম, টিভিতে কিছু নিউজক্লিপ দেখেছি কিন্তু তখনকার রিপোর্টিং আজকালকার মত নিবিড় ছিলোনা। বিয়ের সময় দেশে বন্যা ছিল, আমরা বললাম অনুষ্ঠান লাগবেনা, অনুষ্ঠানের টাকা বন্যার্তদের দান করে দেয়া হোক, আমাদের অভিভাবকরা রাজী হলেন না। আমাদের অবিরাম চেষ্টায় হলুদ, গানবাজনা, লাইটিং সব বাদ দেয়া গেল কিন্তু আড়ম্বরহীন হলেও অনুষ্ঠান একটা হোলই। বিয়ের পর ছিলাম চট্টগ্রামে, সেখানে পাহাড়ী ঢল নামে বটে কিন্তু বন্যা হয়না। শেষমেশ বন্যা দেখলাম এই ক্যাল্গেরী এসে। ওদের খুব বড় একটা অনুষ্ঠান হোল স্ট্যাম্পিড, এই মেলার জন্য অ্যামেরিকা থেকে পর্যন্ত লোকজন আসে যদিও সে সময় মদের গন্ধে রাস্তাঘাটে হাঁটা যায়না বলে অনেকসময় ক্যাল্গেরীর সচেতন লোকজনও ক্যাল্গেরী থেকে পালিয়ে বাঁচে। সেই স্ট্যাম্পিডের মাঠ এমনভাবে পানির নীচে তলিয়ে গেল যে মাটি দেখাই যায়না। স্যাডেলডোম স্টেডিয়ামের নীচের সাতটি সারির সব সীট, প্লেয়ারদের ইকুইপমেন্ট রুম থেকে ড্রেসিং রুম সব শেষ। ক্যানাডিয়ানরা আবার অভাবকে মৃত্যুর চেয়েও বেশি ভয় পায়, তাই সব দোকানের মালপত্র খালি হয়ে গেল, সব জিনিস মানুষের বাসায়!
পানির নীচে স্ট্যাম্পিডের মাঠ
 
স্যাডেলডোম স্টেডিয়ামের ভেতরেও পানি
 

মেয়র বলে দিলেন ডাউনটাউন অন্তত বুধবার পর্যন্ত বন্ধ, পানির ব্যাবহার সীমিত করতে হবে এবং লোকজন যেন যথাসম্ভব ঘরেই অবস্থান করে। কিন্তু ঘরে অবস্থান করা গেলনা। বান্ধবী তানজিন বহু আগে থেকেই দাওয়াত দিয়ে রেখেছিল আমাদের প্রায় সত্তুরজনকে। সবাই মিলে ওর বাসায় মজার মজার খাবার খেলাম তারপর মসজিদে গেলাম, বন্যার মাঝেও একটা সুন্দর দিন কাটল।

 

২৬শে জুন, ২০১৩

অপ্রত্যাশিতভাবে পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় আজ থেকে ডাউনটাউন জনসাধারনের জন্য সীমিতভাবে খুলে দেয়া হোল। ডাউনটাউনে তিনটি ট্রেনের লাইন যায়, একমাত্র আমাদের লাইনটিই সম্পূর্নরূপে চালু হোল। অফিসে পৌঁছে জানতে পারলাম আমাদের গ্রুপে শুধু হ্যাভিয়ের ছাড়া কারো কোন ক্ষতি হয়নি। সে বেচারা দু’সপ্তাহের বাজার করেছিল বন্যার দু’দিন আগে। ডাউনটাউনে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ থাকায় ওর সব খাবার পঁচে গিয়েছে, তবে সে কৃতজ্ঞ বোধ করছে যে আগেভাগেই ডাউনটাউন ছেড়ে যাওয়ায় সে আরো বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছে।

অফিসের ইমেলে দেখলাম অনেকেই বন্যার্তদের থাকার জন্য নিজেদের বাসা, যাতায়াতের জন্য নিজেদের গাড়ী, খাবার দাবাড় কম্বল, জিনিসপত্র সরানোর জন্য সহযোগিতা অফার করছে। খবর পেলাম ডাউনটাউনকে পুণরায় চালু করার জন্য মেয়র এক হাজার লোকের সহযোগিতা চেয়েছিলেন দু’ঘন্টার ভেতর, পাঁচ হাজার লোক হাজির হয়েছিল। বন্যার্তদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রে লোক হয়েছিল ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক কম যেহেতু অনেকেই তাদের বাড়ীঘর উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন বন্যার্তদের জন্য।
গৃহহারা একজন

কিছুক্ষণ পর জেইন আমাদের নিয়ে তৎক্ষনাৎ একটি মিটিং করে জানালো অফিসের দু’জন লোকের বাড়ী এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে বাড়ী ভেঙ্গে নতুন করে তৈরী করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। তারা সাহায্য চেয়েছে মালপত্রগুলো বাছাই করতে- যা রক্ষা করা যায় তা নিয়ে কোথাও তুলবে আর যা ফেলে দেয়া ছাড়া উপায় নেই তা রাস্তার পাশে জড়ো করবে যেন সিটি কর্পোরেশনের গাড়ী এসে তুলে নিয়ে যেতে পারে। এই প্রথম নিজের শারীরিক সামর্থ্যের অভাবে দুঃখবোধ হোল। আমি যদি যথেষ্ট শক্তিশালী হতাম তাহলে হয়ত হাত লাগাতে পারতাম। কিন্তু নিজের বাসা পরিবর্তন করার প্রস্তুতি নিতে গিয়েই কাহিল অবস্থা আমার, অন্যকে সাহায্য করব কি?

 

১লা জুলাই, ২০১৩

নদীর পাশে কিছু কিছু জায়গা এখনো পানির নীচে, নদীর ভেতর ঘরের ছাদ থেকে ওয়াশিং মেশিন ফ্রিজসহ নানাবিধ বস্তু দেখা যাচ্ছে। কিছু কিছু জায়গায় এখনো ট্রেনের যাতাযাত স্বাভাবিক হয়নি, কিছু কিছু স্টেশন এখনো বন্ধ। এর ভেতর পরম করুণাময় আমাদের এতটা নিরাপদ রেখেছেন যে আমার পুত্র কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায়না ক্যাল্গেরীতে বন্যা হয়েছে, সে বলে, ‘কই, আমি তো কোথাও পানি দেখলাম না, তাহলে বন্যা হোল কি করে?’ আমাদের বাসা বদলানোর প্রাথমিক ধাপও সম্পন্ন হোল কোন ঝামেলা ছাড়াই। এতকিছুর মাঝে যিনি আমাদের এতটা নিরাপদ এবং আনন্দময় রেখেছেন সেই দয়াময়ের প্রতি সম্যকভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব কিভাবে?

Tuesday, June 25, 2013

প্রেম ২

‘আপু, একটা বিষয়ে আপনার পরামর্শ চাচ্ছিলাম’।
‘বল’।
‘হয়েছে কি, আমি একটা মেয়েকে পড়াই। মেয়েটার বাবামা খুব বিশ্বাস করে আমাকে এই দায়িত্বটি দিয়েছেন। মেয়েটির স্বভাব চরিত্র অত্যন্ত ভাল। আমি ওর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছি। আমি ওকে বিয়ে করতে চাই’।
‘ছাত্রীদের বিয়ে করা কোন ভাল কথা নয়, এটা আমার ব্যাক্তিগত অভিমত। শিক্ষক যে বয়সেরই হোক না কেন তাঁকে আমি সবসময়ই পিতৃসম সম্মানার্হ মনে করি। শিক্ষকরা যদি ছাত্রীদের দিকে নজর দেয়া শুরু করেন তাহলে তো সমাজে বিশ্বাসের কোন মূল্য থাকবেনা। তবু যদি তুমি তাকে বিয়ে করতে চাও তাহলে তোমার অবিলম্বে কথা বলা উচিত’।
‘তাহলে কি আমি ওকে প্রপোজ করব?’
‘কাকে?!’
‘মেয়েটিকে’।
এবার সত্যি সত্যি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম।
‘মেয়েটিকে কেন প্রপোজ করবে? মেয়েটিকে কি প্রপোজ করবে?!’
‘বলব তাকে আমার ভাল লাগে, আমি তাকে বিয়ে করতে চাই। এই উদ্দেশ্যে তাকে নিয়ে কিছুদিন ঘুরাঘুরি করে, তার সাথে কথা বলে দেখতে চাই আমাদের কতটুকু বনবে’।
‘বাবারে! এই নিয়ম কোথায় পেলে ভাই? ইসলামের নিয়ম হোল তোমার কাউকে পছন্দ হলে তার বাবা, ভাই বা যিনি অভিভাবক তার সাথে যোগাযোগ করতে হবে। ওরা তোমার সাথে কথা বলে, তোমার এবং তোমার পরিবারের সম্পর্কে খোঁজখবর করে বিবেচনা করে অতঃপর মেয়েকে জানাবেন। তারপর মেয়ের পছন্দ হলে বিয়ে হবে। তারপর তোমরা সারাজীবন ঘুরে ঘুরে প্রেম করতে পারো, দিনরাত কথাবার্তা বলতে পারো মনের সুখে। বিয়ের আগেই কেন সব করে ফেলতে চাও?’  
‘বিয়ের পর না বনলে?’
‘বিয়ের আগে কারো সাথে যতই ঘোরাফেরা কর না কেন তোমাদের উভয়ের উদ্দেশ্য থাকবে পরস্পরকে ইমপ্রেস করা। ক’দিন সুন্দর সুন্দর জামাকাপড় পরে দামী দামী রেস্টুরেন্টে বসে কটা শানিত বুদ্ধিদীপ্ত কথা বললে কি বোঝা যায় সেই মানুষটা কিভাবে রি-অ্যাক্ট করবে যখন তোমার সাথে সংসার করতে গিয়ে তোমার দামী শার্টের নীচে গেঞ্জির বিশাল ফুটোটা ওর চোখে পড়বে, কিংবা যখন ঘরে চিনি ফুরিয়ে গেলে আবার কেনার জন্য পরবর্তী বেতনের অপেক্ষায় বসে থাকতে হবে, কিংবা সে বুঝতে পারবে তুমি একটা বাল্ব পর্যন্ত মিস্ত্রীর সাহায্য ছাড়া নিজে বদলাতে জানোনা? কিন্তু যে মেয়েটা তোমার বৌ হয়ে আসবে সে তোমার ভালমন্দ সবটুকু গ্রহন করার মানসিকতা নিয়েই আসবে। তাকে ইমপ্রেস করার জন্য তোমার প্রতিনিয়ত পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবেনা। বরং তোমার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রচেষ্টা তার সন্তুষ্টির কারণ হবে, তোমার বৃহৎ বৃহৎ ভুলগুলোও সে নিজ চেষ্টায় শুধরে নেবে যেহেতু সে তোমাকে জীবনের একমাত্র অপশন মনে করে’।
‘কিন্তু আপু, তারপরও তো অনেকের বিবাহবিচ্ছেদ হয়’।
‘হুমম, তা হয়। হবেনা কেন? দু’জন মানুষ সম্পূর্ন ভিন্ন দু’টি পরিবার এবং পরিবেশ থেকে এসে একসাথে মিলে যাওয়া কি এতই সহজ? দু’জনের মাঝেই প্রয়োজন ধৈর্য্য, সহনশীলতা, সংবেদনশীলতা এবং অপর ব্যাক্তিটির প্রতি বিশ্বাস ও সহমর্মিতা। আবার ধর, একটি ছেলে বা মেয়ে যে বিয়ের আগেই অনেককে পরখ করে নিয়েছে, সে তার পার্টনারের মাঝে সেই সকল গুন খুঁজবে কিংবা তাকে তাদের সাথে তুলনা করবে অবচেতনেই। তখন বর্তমান পার্টনারের গুনগুলো তার যতটা না চোখে পড়বে বরং তার ঘাটতিগুলোই তার কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়াবে। তখন বিচ্ছেদ হবে বৈকি! কিন্তু কি জানো?’
‘কি?’
‘সামাজিকভাবে বিবাহিতা একটি মেয়ের যদি বিচ্ছেদ হয়ে যায় তবে তার পরিবার তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, আবার বিয়ে দেয় কিংবা প্রয়োজন হলে আজীবন তার দেখাশোনা করে কিংবা অন্তত তার বিপদ আপদে পাশে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু বিয়ের আগে তুমি যদি একটি মেয়ের সঙ্গ উপভোগ করে অতঃপর বনবেনা ভেবে ফিরিয়ে দাও সে পরিবার পরিজন বন্ধুবান্ধব কারো কাছে সহানুভূতি বা সহায়তা পাবেনা, তদুপরি মেয়েটিকে বিয়ে দেয়াও মুশকিল হয়ে যাবে। তুমি যদি কাউকে সত্যিই ভালোবাসো তাহলে তার দায়িত্ব নিতে বা দায়িত্ব নেয়ার উপযোগী হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে তোমার আপত্তি কোথায়? এ’ কেমন প্রেম যেখানে শুধু ভোগ আছে অথচ ত্যাগ নেই?’
‘কিন্তু আমি তো তাকে বিয়ে করতে চাই!’
‘কিন্তু করবে কি’না তা নিশ্চিত নও’।
‘আমার উদ্দেশ্যটা তো তাই’।
‘ভাইরে, শোন। প্রবাদে যাই বলুক না কেন, the end does NOT justify the means. এই যে সমাজে প্রেমের নামে এত বিশৃংখলা আর কষ্টের ছড়াছড়ি – নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পেরে ধর্ষন, নিজের চাহিদায় লাগাম দিতে না পেরে অনাকঙ্খিতভাবে সন্তানধারণ, প্রেমে ব্যার্থ হয়ে আত্মহত্যা, বিয়ের পর প্রাক্তন প্রেমিক প্রেমিকার প্রতি আবেগ উথলে ওঠার কারণে বর্তমান সম্পর্কের প্রতি অমনোযোগী হয়ে সংসারে অশান্তি – এখানে কোনটার উদ্দেশ্য খারাপ ছিল ভাই? কিন্তু এখানে end বা means কোনটি justify করা যায়? আমাদের নিজেদের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণের মাত্রা সম্পর্কেও তো কোন ভুল ধারণা থাকা উচিত না। আমাদের ভেতর থেকে নাফস এবং বাইরে থেকে চিরশত্রু ইবলিস সারাক্ষণ ইন্ধন দিয়ে যাচ্ছে। আমরা তাদের সূঁচ পরিমাণ ছাড় দিলে তারা কোদাল দিয়ে আমাদের কবরের মাটি খুঁড়তে থাকে’।
‘এভাবে তো ভাবা হয়নি!’
‘এখন ভাবো। তুমি যে মেয়েটিকে ভালোবাসো সে তো হবে তোমার সম্মানের পাত্রী যার প্রতি তোমার কল্পনাগুলোও হবে পবিত্র এবং সংযত, সেখানে তোমার আচরনে যদি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায় তাতে কি ভালোবাসার সম্মান রক্ষা হয় ভাই? বিয়ের পর সে হবে তোমার দূর্গ যেখানে তুমি শয়তানের কবল থেকে আশ্রয় খুঁজে পাবে। কিন্তু সেই দূর্গের দ্বার যদি তুমি আজ নিজ হাতে ভেঙ্গে ফেল তাহলে সেই দূর্গের ওপর কি তুমি কোনদিন আর আস্থা রাখতে পারবে?’
অনেকক্ষণ ভাবল সে।
‘ঠিক বলেছেন আপু। তখন আমার কেবল মনে হবে আমার আগে সে কার কার সাথে মিশেছে, ওদের সাথে ওর কতটুকু ভাব ছিল, কাউকে ওর আমার চেয়ে বেশি পছন্দ ছিল কিনা। আমি তার জীবনে একমাত্র পুরুষ হতে চাই। কিন্তু সত্যিই যদি আমি তাই হই তবু আমার মনে হবে সে আমার মন ভোলানোর জন্য এমন বলছে, নিশ্চয়ই সে যেমন আমার সাথে মিশেছে তেমনি অন্য কারো সাথেও মিশে থাকবে’।
‘তাহলে কেন জেনেশুনে একটি সহজসরল মেয়েকে এমন পথে পরিচালিত করতে চাও ভাই যেখানে তার জীবনটা সাজাতে গিয়ে জীবনটা শেষও করে ফেলতে পারো তুমি? তার চেয়ে তুমি ওর বাবার সাথে কথা বল। তুমি বলেছ তিনি তোমাকে বিশ্বাস করেন। তিনিও খুশি হবেন যে তুমি তাঁর বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছ, তিনিই তখন মেয়েটিকে তোমার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে সচেষ্ট হবেন। তুমি তোমার লক্ষ্যে উপনীত হবে নির্ঝঞ্ঝাটে এবং মেয়েটিরও সম্মানের কোন ক্ষতি হবেনা’।
‘কিন্তু আপু, ধরেন আমি প্রস্তাব করলাম কিন্তু ওরা রাজী হলেন না?’
‘শোন ভাই, তুমি কি সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস কর?’
‘অবশ্যই’।
‘তুমি কি বিশ্বাস কর যে তিনি তোমাকে এবং তোমার লাইফ পার্টনারকে জোড়া মিলিয়ে সৃষ্টি করেছেন?’
‘জ্বী’।
‘তাহলে বিশ্বাস রাখো, এই মেয়েটি যদি তোমার নির্ধারিত লাইফ পার্টনার হয় তাহলে সে তোমার কাছেই আসবে। তা নইলে তোমার সততা এবং উত্তম নিয়াতের জন্য আল্লাহ তোমাকে এর চেয়ে ভাল লাইফ পার্টনার দান করবেন’।
‘আমার যদি অন্য কোন মেয়েকে পছন্দ না হয়?’
‘তুমি যদি একজনের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রাখো তাহলে অন্যের দিকে তাকাবে কি করে? তাকে যাচাই করবেই বা কিভাবে? কিন্তু তুমি যদি সাদা মন নিয়ে তার কাছে যাও, তাকে সুযোগ দাও, তাহলে সে তোমার মনের সাদা ক্যানভাসে রঙিন তুলি দিয়ে ছবি আঁকবে, তুমি বুঝতে পারবে তুমি যা চেয়েছিলে তার তুলনায় তুমি কত বেশি পেয়েছ। নইলে তুমি অন্য কারো লাইফ পার্টনারকে নিজের করে নেয়ার প্রচেষ্টায় কি পেয়েছ তা অ্যাপ্রিশিয়েট করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে’।
‘হুমম’।
‘এবার একটু ভেবে দেখ তো তোমার লাইফ পার্টনার নিয়ে অন্য কেউ টানাটানি করছে এমনটা কল্পনা করতে তোমার কেমন লাগছে?’
কিছুক্ষণ ভেবে সে বলল, ‘ভীষণ খারাপ লাগছে আপু। আমি ভাবতেই পারছিনা। কিন্তু আমি কি করে বুঝব যে আসলেই আমার লাইফ পার্টনার আমার প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে আমি তার কাছে পৌঁছনো পর্যন্ত?’
‘একটাই উপায় আছে ভাই। যিনি সর্বস্রষ্টা এবং সর্বদ্রষ্টা তাঁর কাছে প্রার্থনা করতে হবে যেন আমাদের পছন্দের মানুষটি নিজেকে সংরক্ষণ করে কেবল আমাদের জন্যই। সাথে নিজেকেও এমনভাবে সংরক্ষণ করতে হবে যেন আমি তাকে গিয়ে বলতে পারি, ‘এই যে দেখ, আমার সবটুকু আমি বাঁচিয়ে রেখেছি কেবল তোমার জন্য। এর কোথাও কখনো তোমার ছাড়া আর কারো অধিকার ছিলোনা, আজ থেকে আমার সবকিছুর ওপর তোমার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোল’। কি, বল? এটুকু বিশ্বাস রাখতে পারবে তো?’
লাজুক হেসে ভাইটি বলে, ‘জ্বী আপু, এটুকু যে আমাকে পারতেই হবে!’
আসলে আমরা সবাই সৎ উদ্দেশ্য নিয়েই কাজ করতে চাই, কিন্তু অনেকসময় লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং পন্থা মিলাতে পারিনা। এত সীমিত বুদ্ধি এবং ক্ষমতা নিয়ে আমাদের এমন অনিশ্চিত পথে যাত্রা করার চেয়ে যিনি সর্বজ্ঞানী তাঁর জ্ঞানের ওপর ভরসা রেখে তাঁর নির্দেশিত পন্থায় পথ চলাই শ্রেয় নয় কি?
 

Monday, June 24, 2013

প্রেম ১

আমার এক ক্যানাডিয়ান সহকর্মী আলাপ করছিল, ওর বাবামার যখন বিয়ে হয় তখন ওর মায়ের বয়স আঠারো আর বাবার বয়স বিশ। বিয়ের তিনমাসের মাথায় ওর বড়বোনের জন্ম। বোঝাই যায় বিয়েটা ছিল সামাজিকতা রক্ষার তাগিদে, সুখের টানে নয়। বিয়ের পর ওর বাবা সংসারের দায়িত্বের চাপে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে ব্যার্থ হয়, ওর মা পড়াশোনা করে উকিল হন। এক পর্যায়ে এই শিক্ষিতা, স্মার্ট এবং মোটা টাকা উপার্জনকারী মহিলার এই অশিক্ষিত এবং স্বল্প উপার্জনকারী স্বামীকে নিজের সাথে বড় বেমানান মনে হতে থাকে। বিয়ের একুশ বছর পর স্ত্রী এক পুরুষকে এবং স্বামী আরেক মহিলাকে নিয়ে আলাদা হয়ে যান। আমার সহকর্মী মেয়েটির বয়স তখন সতেরো। সতেরো বছর বয়সে সে অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। এ’সময় থেকে সে অসহায়ত্ব এবং একাকীত্ব থেকে মুক্তি পেতে এক বয়ফ্রেন্ড থেকে আরেক বয়ফ্রেন্ডের আশ্রয় নিতে থাকে। তবে গত বারো বছর যাবত সে একজনের সাথে বসবাস করছে। আমার চাইনিজ বান্ধবী জেইন বলল, ‘তুমি তাকে বিয়ে করলেই পারো’। সে বলে, ‘পাগল! আমার মায়ের ডিভোর্স হয়ে যাবার পর আমি কিছুদিন জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি পারিবারিক আইন অফিসে কাজ করেছি। সেখানে আমার বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে এমন সব ভীতিকর অভিজ্ঞতা হয়েছে যে আমি তখনই সিদ্ধান্ত নেই আমি কোনদিন বিয়ে করবনা’। ওর বড়বোনের বিয়ে হোল মাত্র ক’দিন আগে। বিবাহভীতি কাটিয়ে উঠতে উঠতে তাঁর বেয়াল্লিশ বছর বয়স হয়ে যায়। এখন তিনি বিবাহিত হলেও সন্তানধারনে অক্ষম হয়ে পড়েছেন। আমার সহকর্মীরও সন্তান নেয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। এমন উপাখ্যান এখানকার ঘরে ঘরে। সচেতন বাবামায়েরা সন্তানদের চার্চে নিয়ে গিয়ে প্রতিজ্ঞা করান তারা বিয়ের আগে পর্যন্ত কুমারী থাকবে যেন বুঝেশুনে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়ার অবকাশ থাকে এবং এমন দুঃখজনক পরিণতি এড়ানো যায়। কিন্তু প্রচলিত সমাজব্যাবস্থা এবং দৃঢ় নৈতিক বন্ধনের অভাবের কারণে অনেকেই এই প্রতিজ্ঞা শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারেনা। ফলে ভুগতে হয় সারাজীবন।

 

প্রেম একটি অসাধারন এবং মোহময় অনুভূতি। সেদিন দেখলাম এক বুড়ো দাদা যিনি নিজেই সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না, ওষুধের দোকান থেকে বেরিয়ে একহাতে তাঁর বৃদ্ধা স্ত্রীকে শক্ত করে ধরে আরেক হাত মাথার ওপর দিয়ে অতি সাবধানে গাড়ীতে বসিয়ে দিচ্ছেন যেন তিনি পিঠে ব্যাথা না পান, আবার পিঠ সোজা রাখতে গিয়ে মাথায় বাড়ি না খান। একইভাবে আমরা যখন গর্ভবতী স্ত্রীর পাশে চিন্তাক্লিষ্ট স্বামীটিকে অস্থিরভাবে পায়চারী করতে দেখি কিংবা সুন্দরী হবু স্ত্রীর দিকে তাকাতে গিয়েও যুবকটিকে চোখে নামিয়ে নিতে দেখি তাতে যে ভালোবাসা প্রকাশ পায় তা যেকোন হৃদয়কেই আপ্লুত করে।

 

কিন্তু প্রেমের সবটুকুই দৃষ্টিনন্দন নয়। এর একটি পাশবিক দিকও আছে যেটি বন্ধ দরজার আড়ালেই পরিতৃপ্ত করা শ্রেয়। যেমন ক’দিন আগে কাজে যাবার পথে দেখি এক ট্রেন মানুষের সামনে, যেখানে কয়েকমাসের শিশু থেকে কয়েক দশকের বৃদ্ধরাও আছেন, দু’জন যুবক যুবতী নিজেদের একটিমাত্র জ্যাকেট দিয়ে ঢেকে শারীরিক প্রয়োজন পূরণ করছে! ঘটনাটি এতটাই পশুপ্রবৃত্তি প্রকাশক ছিল যে দৃশ্যটি এমনকি কোন নিম্নতর রুচির মানুষের কাছেও উপভোগ্য ছিলোনা বরং সবাই হতভম্ব এবং বিরক্ত হলেও এই ব্যাপারে আইনত কারো কিছু করার নেই বলেই কেউ বাঁধা দিতে পারছিলোনা। ভাবছিলাম, এরা কি করে পারে দাদাদাদীর বয়সী লোকজনের সামনে এত নির্লজ্জ হতে? কিন্তু ব্যাপারটা আসলে সহজবোধ্য।

 

মানুষের বংশরক্ষার তাগিদেই সৃষ্টিকর্তা এই জৈবিক তাড়না মানুষের মাঝে দিয়ে দিয়েছেন। নইলে কে সেধে স্ত্রীপুত্রকন্যার দায়িত্ব মাথায় নিত? কেইবা বুঝেশুনে সারাজীবন ধরে এতগুলো মানুষের জন্য প্রতিবেলা রান্না করা, কাপড় ধোয়া, ঘর পরিস্কার করার কাজ করত? এটি ক্ষুধা কিংবা তৃষ্ণার চেয়ে অধিক বা অস্বাভাবিক কোন ব্যাপার নয়। তবে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে, সমস্ত সৃষ্টিকুল হতে স্বতন্ত্র এবং বিশেষায়িত করে। প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যাপারে আমরা এই পার্থক্য দেখতে পাই। যেমন পশুদের মাঝে পুরুষ প্রানী অধিকতর সুন্দর, মানুষের মাঝে নারী; বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করেছেন পশুরা বাঁহাতি কিন্তু মানুষকে তাদের প্রভু বলে দিয়েছেন ডানহাতে অধিকাংশ কাজ করতে; পশুরা কাঁচা খাবার খায় আর মানুষ খায় সেদ্ধ করে। একইভাবে পশুরা বাড়ীঘর না থাকায় সর্বসমক্ষে কামপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করতে বাধ্য হলেও মানুষকে বলা হয়েছে এর জন্য বিশেষ পন্থা এবং পদ্ধতি অবলম্বন করতে যেন এর মাধ্যমে যে জীবন পৃথিবীতে আগমন করবে তা বেড়ে ওঠার একটি সুস্থ এবং সুষ্ঠু পরিবেশ পায়।

 

এই প্রক্রিয়াকে সহজ এবং স্বাভাবিক করার জন্যই সৃষ্টিকর্তা নির্দেশ দিয়েছেন নিজেকে সর্বসমক্ষে কামনার বস্তুরূপে উপস্থাপন না করে নিজের আকর্ষনী শক্তিকে আড়াল করে রাখতে। চাহিদার সৃষ্টি দৃষ্টি থেকে। আমরা যদি না জানি বাসায় মিষ্টি আছে, আমাদের মিষ্টি না খেলেও দিব্যি দিন কেটে যায়। কিন্তু টেবিলের ওপর মিষ্টি আছে অথচ আমি খাবনা তা কি হয়? যদি বলেন, ‘তোমার ডায়াবেটিস, খেলে ক্ষতি হবে’, উত্তর আসবে, ‘আরে ডাক্তার কি জানে? আগে তো খেয়ে নেই, তারপর দেখা যাবে যা হবার হবে!’ একটি মেয়ের সৌন্দর্য যদি কেউ না দেখে তাহলে কেউ জানবেনা মেয়েটি কতটা আকর্ষনীয় এবং তার সবটুকু আবেদন সংরক্ষিত হবে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিটির জন্য। আবার যে মেয়েটির পুরুষদের সাথে মেলামেশা স্বল্প পরিসরে সে স্বামীর প্রতিটি সদ্গুনকেই অ্যাপ্রিশিয়েট করতে পারবে। কিন্তু যে মেয়েটি বহু পুরুষের সাথে মিশে অভ্যস্ত সে বিয়ের পর প্রতিটি মূহূর্ত মনে মনে তুলনা করবে আমার স্বামী দেখতে অমুকের মত সুন্দর না, তমুকের মত সুন্দর করে কথাবার্তা বলতে জানেনা, অমুকের মত গাইতে জানেনা, তমুকের মত স্মার্ট নয়, অমুকের মত বিত্তশালী নয় কিংবা তমুকের মত শক্তিশালী নয় - তখন মনের আক্ষেপ দূর করে সেই লোককে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা কঠিন ব্যাপার বৈকি!

 

যার আকর্ষনী শক্তি সর্বসাধারনের জন্য উন্মুক্ত সে নিজেও ভুলের জন্য উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। একটি প্রজাপতি উড়ে এলে তার সৌন্দর্য যাচাই বাছাই কিংবা পরখ করে নেয়া যায়, কিন্তু ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপাল উড়ে এলে আর বাছাই করার সুযোগ থাকেনা। প্রজাপতিকে মানুষ যত্ন করে ঘরের দেয়ালে বসতে দেয় কিন্তু কারো ঘরে পঙ্গপাল প্রবেশ করবে তা মানুষ দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেনা। নিজেকে প্রদর্শনীতে দিয়ে সাড়া পেলে প্রথম প্রথম সবারই ভাল লাগে। কিন্তু তারপর যখন ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপাল এসে চারিদিকে ঘিরে ফেলে তখন আর সামাল দিয়ে ওঠা যায়না। তাই এদের জৈবিক তাড়না চরিতার্থ করার কোন নির্দিষ্ট স্থান থাকেনা, কোন বৈধ পন্থাও থাকেনা যেহেতু এরা কেবল ভোগ করতে চায় কিন্তু দায়িত্ব নিতে চায়না। এই চাহিদাপূরনের ফলাফল হিসেবে যে সন্তানের জন্ম হয় তারও কোন নির্দিষ্ট ঠিকানা গড়ে ওঠেনা কারণ সে কেবল একটি জৈবিক প্রক্রিয়ায় ফলাফল, কাঙ্খিত নয় মোটেই। অথচ এই পৃথিবীতে আসার পেছনে বেচারার না হাত ছিল, না ছিল ইচ্ছা। শুরু হয় আরেকটি কষ্টের উপাখ্যান।

 

খুব কম মানুষের বোধের আয়নায় এই সত্য প্রতিফলিত হয় যে প্রেম কেবল জৈবিক তাড়নার বহিঃপ্রকাশ নয় বরং একটি পবিত্র মানসিক বন্ধন। এই বন্ধনকে মজবুত করার জন্য একে একটি সামাজিক রূপ দেয়া জরুরী যাতে উভয়পক্ষের সামাজিক নিরাপত্তা এবং অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান হয়। তাই প্রেমের সৃষ্টিকর্তা প্রনীত এবং সবচেয়ে শ্বাশ্বত রূপ বিয়ে। এর অর্থ এই নয় যে বিয়ে করলে কোন সমস্যাই হবেনা। দু’জন মানবমানবী যারা দু’টি ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গনে পৃথক পৃথক পরিবেশে বেড়ে উঠেছে তারা মিলিত হলেও দু’টি নদীর মতই সমান্তরালে বহমান থাকবে, একীভূত হবেনা। কিন্তু একটি বিবাহিত দম্পতিকে তাদের পরিবার পরিজন বন্ধু বান্ধব থেকে সম্পূর্ন অপরিচিত লোকজন পর্যন্ত একত্রে বসবাস করতে, নিজেদের সমস্যার সমাধান করতে সহযোগিতা করে। অপরদিকে একটি অনৈতিক বন্ধনে জড়িত দুই ব্যাক্তি - যাদের সম্পর্কের কোন গন্তব্য নেই, কোন উদ্দেশ্য নেই শুধু নিজেদের চাহিদা পূরণ করা ব্যাতীত - হাতেগোনা কিছু লোকজন ছাড়া কেউ সাহায্য করেনা। ফলে ঠুনকো সম্পর্কটি জোরদার হবার কোন ভিত্তি খুঁজে পায়না। নাটকে সিনেমায় এমন সম্পর্কগুলোর ট্রাজেডি, কমপ্লিকেশন কিংবা হঠাৎ করে সব মেঘ কেটে গিয়ে সূর্য হেসে ওঠা দেখতে যতই ভাল লাগুক না কেন বাস্তবে কেউ এমন ঘটনার সম্মুখীন হতে চায়না, বাস্তবে এমন আলৌকিকভাবে সমস্যার সমাধান কমই ঘটে।

 

সুতরাং, আমরা সাবধান হই। একটিমাত্র জীবন আমাদের। ক্ষণিকের আনন্দের জন্য আমরা যেন আত্মনিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে পাহাড়ের ওপর থেকে গিরিখাদে ধারালো পাথরের ওপর আছড়ে পড়ে জীবনাবসানকে বেছে না নেই। বরং আমাদের পছন্দগুলোর ভিত্তি হোক মানবিক গুনের সমাহার, বিশ্বাসের একাত্মতা, পারস্পরিক সম্মানবোধ এবং প্রতিকুলতায় বন্ধুত্বের ছায়া যেন বার্ধক্যের দিনগুলোতে আমরা পরস্পরের হাত ধরে অস্তমিত সূর্যের  দিকে হেঁটে যেতে পারি এই প্রগাঢ় বিশ্বাসে যে ওপাড়েও সে আমার হাত ছেড়ে দেবেনা।

Sunday, June 16, 2013

কন্যা ও পুত্রের কীর্তিকলাপ


আমার কন্যার বয়স এখন তেরো আর পুত্রের বয়স ছয়। চেহারায় এবং স্বভাবচরিত্রে দু’জন একেবারেই স্বতন্ত্র। কন্যা পুরোপুরি বাপের মত আর পুত্র উল্টো। স্কুলে সবাই ওদের জিজ্ঞেস করে, ‘তোমাদের দু’জনের চেহারা মোটেই মিলেনা। Are you sure you are brother and sister?’ এতদসত্ত্বেও ওরা দু’জন একজন আরেকজনকে ছাড়া থাকতে পারেনা, দুইজনে ঝগড়া লাগলে যদি বলি আলাদা রুমে যেতে তবু কেউ একে অপরকে রেখে নড়তে চায়না, আবার একজনকে বকা দিলে অন্যজন এসে তার তরফদারী করে। বয়সের অনেক পার্থক্য সত্ত্বেও দু’জনে একসাথে অনেক মজার মজার কান্ড করে। তার কিছু কিছু এখানে শেয়ার করলাম।

 
১/

‘আম্মু, আম্মু’, করে ডাকতে ডাকতে কন্যা আমার রুমে ঢুকে নিজে নিজেই বলল, ‘ওহ! নামাজ পড়ছে। আলহামদুলিল্লাহ, ভাল মেয়ে, লক্ষ্মী মেয়ে!’ ওর কথা শুনে হাসি চেপে রেখে বাকী নামাজটা শেষ করতে খুব কষ্ট হয়েছে!
 

২/

জুতো কিনতে গিয়েছি, সাথে পুত্র এবং কন্যা। কন্যা আমার উপর মহাবিরক্ত, ‘তুমি সব বুড়া মানুষদের জিনিস পছন্দ কর’। বুঝাতে ব্যার্থ হলাম যে আমার বয়স হয়েছে, ওরা মাকে এখনো যথেষ্ট ইয়াং মনে করে। তবে আসল কথা হোল, বুড়ো মানুষের সামগ্রী আরামের কথা খেয়াল রেখে তৈরী করা হয়, আমার মত আরামপ্রিয় মানুষের জন্য এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কি হতে পারে? যাই হোক, এক দোকানে ঢুকে একটা ঘিয়ে রঙের জুতো দেখে হাতে নিলাম। এবার পুত্র সোচ্চার হয়ে উঠল। জুতোটা আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে রেখে দিতে দিতে বলল, ‘No, no, no, definitely not!’ ওর কান্ড দেখে দোকানী পর্যন্ত হাসতে লাগল!

 
৩/

রান্নাঘরে কাজ করছি, কিন্তু ঘাড়ের ব্যাথার জন্য যুৎ করতে পারছিনা। রাদিয়াকে বললাম, ‘ঘাড়ে ক’টা চাপ দে তো মা!’ তো রিহাম কিছুতেই মাতৃসেবা থেকে পিছিয়ে থাকতে রাজী না। রাদিয়াকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে, ঘাড়ের নাগাল পাচ্ছেনা বলে টুল নিয়ে এসে ঘাড় টিপে দিতে প্রস্তুত হয়ে পড়ল। বললাম, ‘বাবা, তুমি এত ছোট্ট ছোট্ট হাত দিয়ে ঠিকমত চাপ দিতে পারবেনা, রাদিয়া আপুকে দিতে দাও’। সে অপমানিত বোধ করল, ‘What do you mean?’  তারপর ঐ পিচ্চি পিচ্চি হাত দু’টো দিয়ে রাদিয়ার চেয়েও জোরে জোরে ঘাড় টিপে দিল! ওর হাত মাশাল্লাহ অনেক ভাল, ঘাড়ের ব্যাথাটা আসলেই সেরে গেছিল!

 
আরেকদিন রাদিয়াকে বললাম মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। সাথে সাথে রিহাম এসে হাজির, ‘রাদিয়া আপু, তুমি সর, আমি আমার আম্মুকে হাত বুলিয়ে দিব’। বললাম, ‘তুমি পারবেনা বাবা, রাদিয়া আপুকে দিতে দাও’। তখন পুত্র বলল, ‘ না আমি দিব’। বললাম, ‘কেন বাবা? রাদিয়া আপু দিক না!’ সে তখন বলল, ‘Because you are My Mummy! I love you!’ এর পর আর কি বলার আছে? এলোমেলো হাত বুলানোর মাঝেই প্রশান্তির ঘুম ঘুমিয়ে পড়লাম!
 

৪/ আমার একটা বদ অভ্যাস হোল, আমার বাচ্চারা যতক্ষণ জেগে থাকে ততক্ষণ আমি ঘুমাতে পারিনা সে ঘুমের যতই ঘাটতি হোক না কেন। এমনকি রাতে ঘুমের মধ্যে ওরা ওদের রুমে বিছানায় পাশ ফিরলেও আমি জেগে উঠি। তবে ইদানিং মাঝে মাঝে রিহামকে রাদিয়ার জিম্মায় দিয়ে বিশ্রাম নেই। সেদিন বিকালে রাদিয়া ঘুমাচ্ছে, তাই আমি বসে আছি রাদিয়া উঠলে রিহামকে ওর তত্ত্বাবধানে রেখে শোব, নইলে এশার নামাজ পর্যন্ত এনার্জি ধরে রাখা মুশকিল হয়ে পড়ে (এখন এখানে এশা রাত সাড়ে এগারোটার পর)। রিহাম এসে বলে কিনা, ‘Mummy, go to sleep, don’t worry about me, I’ll be fine by myself!’ বুড়ো বাবাটার কথা শুনে ভাবলাম উনি যে কবে এত বড় হয়ে গেলেন তা তো টেরই পাইনি!
 

৫/

রাদিয়াকে বিবাহের মাসয়ালাগুলো বুঝাচ্ছিলাম, কাদের বিয়ে করা যাবে, কাদের যাবেনা ইত্যাদি। রিহাম বলে, ‘আম্মু, আপুর সাথে তোমার এত কথা বলার দরকার নেই, তুমি আমার সাথে কথা বল’। রিহাম যখন এমন করে তখন আমি সাধারনত ওর দিকে তাকিয়ে ওর সাথে কথা বলার ভঙ্গীতে রাদিয়ার সাথে কথা চালিয়ে যাই। কিছুক্ষণ মনোযোগসহকারে আলোচনা শোনার পর রিহাম বলল, ‘আম্মু, তুমি এসব কথা আমাকে কেন বলছ? আমি তো এখনো অনেক ছোট, আমি বুঝি এখন বিয়ে করতে পারব?!’
 

৬/

রিহামকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি আল্লাহকে ভালোবাস?’
সে বলল, ‘Of course I do!’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি আল্লাহকে কতটা ভালোবাস?’
সে নির্দ্বিধায় বলল, ‘A lot’.
জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি আল্লাহকে আম্মুর চাইতে বেশি ভালোবাস?’
সে চিন্তা করে জানাল, ‘No, I love you both the same amount.’
বুঝিয়ে বললাম, ‘কিন্তু তোমার আল্লাহকে আব্বু, আম্মু, আপু সবার চাইতে বেশি ভালবাসতে হবে’।
সে কিঞ্চিৎ দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ল। বললাম, ‘তুমি আস্তে আস্তে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসতে শিখবে, ঠিক আছে?’
সে উৎফুল্ল হয়ে বলল, ‘okay!’



৭/

আমার কন্যা নিজের রুমটাকে এত অগোছালো করে রাখে যে গুছাতে বললে আর নিজেই কুলকিনারা করতে পারেনা কোথা থেকে শুরু করবে। একদিন শুদ্ধি অভিযান চালাতে গিয়ে সে মাঝপথে বিছানায় শুয়ে পড়েছে। পুত্র গিয়ে বলে, ‘রাদিয়া আপু, you are not a muslim!’ রাদিয়া তো থ! বলে, ‘কেন? আমি আবার কি করলাম?’ রিহাম বলে, ‘মুসলিমদের ডানপাশে ফিরে শুতে হয়, তুমি বামদিকে ফিরে শুয়েছ!’

 
আজ আমার এক নয় বছর বয়সী ছাত্রী দেখাচ্ছিল সে ডে-কেয়ারে ক্রিসমাস ট্রি বানিয়েছে। পরে সে ভুলে ওর শো পিসটি ডাইনিং টেবিলের ওপর ফেলে রেখে চলে যায়। আমি রিহামকে ভাত মেখে দিয়ে ড্রয়িং রুমে বসে পড়ছি। পুত্র জিজ্ঞেস করল, ‘আম্মু এটা এখানে কে এনেছে?’ বললাম, ‘আমার ছাত্রী’। সে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার ছাত্রী কি মুসলিম?’ বললাম, ‘হ্যাঁ?’ সে বলল, ‘তাহলে সে কি জানেনা মুসলিমরা ক্রিসমাস করেনা?’ বললাম, ‘আব্বু, আসলে ও অনেক ছোট তো, ও বুঝতে পারেনি’। পুত্র অবশ্বাসের সুরে বলে, ‘What?! আমি তো ওর চেয়েও ছোট, কিন্তু আমি তো জানি আমরা ঈদ করি, ক্রিসমাস করিনা!’

এত বিজ্ঞ আলেমদের নিয়ে যে কি করব!

 
এদের দু’জনের জন্য দু’আ করবেন।