Monday, May 20, 2013

গিফট

উফ! ওর ভাইয়াটা যে কি! বড় ভাইটার সব দায়িত্ব নিতে নিতে মুমতাহিনা ক্লান্ত হয়ে গেল। কিচ্ছু হয়না ওকে দিয়ে। বন্ধুর জন্য একটা গিফট কিনবে সেটাও বলে কিনা, ‘মুমি আমার লক্ষ্মী বোন, আমার বন্ধুটার বিয়ে। যা না, একটা গিফট কিনে এনে দে!’ তাই এই সাতসকালে মোমেনা আন্টির তীক্ষ্ণ নজরদারীর সামনে ‘আপন উপহার বিতান’এর বিশাল সম্ভার থেকে কি নেয়া যায় ভাবতে ভাবতে হয়রান হচ্ছে মুমি। মোমেনা আন্টি অবশ্য আসলে অনেক নরম মনের একজন মানুষ, কিন্তু তাঁর চেহারাটাই সৃষ্টিকর্তা এমনভাবে গড়ে দিয়েছেন যে দেখলে মনে হয় তিনি সামনের ব্যাক্তির চেহারাচরিত্র গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। অথচ এই মূহূর্তে তিনি দোকানের পিচ্চিটাকে বসিয়ে ট্রান্সলেশন শেখাচ্ছেন। তিনি চান না সে সারাজীবন পিচ্চিগিরি করে যাক, তাই কাজ দেয়ার পর থেকেই ওকে লেখাপড়া করাচ্ছেন।
 



কার্ডের সেকশনের সামনে এসেই মুমির মাথা খারাপ হয়ে গেল। কি যে সুন্দর সুন্দর কার্ড! আচ্ছা, মানুষ এত দামী দামী গিফট না দিয়ে সুন্দর সুন্দর কার্ড দিতে পারেনা? এই জিনিসটা নষ্টও হয়না, এর আবেদনও সময়ের সাথে কমে যায়না, প্রতিবার কার্ডটা দেখলেই মনের ভেতর জেগে ওঠে এর সাথে সংশ্লিষ্ট সব স্মৃতি।

পাশেই কে যেন ডাক দিল, ‘শুনুন!’ নির্ঘাত ওকে দোকানের স্টাফ ভেবে বসে আছে! ভাবতেই পারে। মুমি প্রায়ই এসে মোমেনা আন্টিকে দোকান সামলাতে সাহায্য করে।

সে বলল, ‘জ্বী, আমি আপনাকে কি সাহায্য করতে পারি?’

লোকটা অল্পবয়সী, সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট পরা, চেহারায় বয়সের ছাপ না থাকায় কেমন যেন স্কুলড্রেস স্কুলড্রেস মনে হচ্ছে, বলল, ‘আমি একটা সমস্যায় পড়েছি। আমি কিছুদিনের মধ্যে বিয়ে করতে যাচ্ছি ইনশাল্লাহ। আমার হবু স্ত্রীর জন্য কিছু একটা উপহার কিনতে চাই। কিন্তু আমি কখনো মেয়েদের গিফট দেইনি, মানে মা খালা ফুপুদের যেসব গিফট দিয়েছি সেটা তো আর ওনাকে দেয়া যাবেনা, আপনি কি কিছু পরামর্শ দিতে পারেন কি কিনতে পারি?’

‘আপনি কি জানেন তিনি কি পছন্দ করেন?’

‘তেমন একটা ধারণা নেই, শুনেছি পড়তে ভালবাসেন, কিছু কিছু লেখালেখিও করেন’।

‘তাহলে আপনি তাঁকে কোন ভাল বই, অথবা ডায়রী বা কলম দিতে পারেন ... সাথে সুন্দর একটা কার্ড (উফ, এইটা যে কেন বলল!) ... আচ্ছা, আপনার বাজেট কেমন?’

‘সে যা চাইতে পারে তার সবটুকু এবং যা না চায় তার একশগুন, যদি আল্লাহ আমাকে সামর্থ্য দেন’, স্মিত হাসল লোকটা।

উত্তর শুনে মুমির চোখ কপালে, বুঝল বিয়ের আগেই প্রেমে পড়ার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে বসে আছে এই লোক, কিন্তু এই অদ্ভুত বাজেটে কি কেনা যায়?

 

লোকটাকে নিয়ে বইখাতা কলমের সেকশনে যাবার পথে জুয়েলারী সেকশনের সামনে এক সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়ায় মুমি। মোমেনা আন্টি ভারী সুন্দর একটা লকেট এনেছে, চারদিকে লতাপাতা ফুল আর মাঝখানে ‘আল্লাহ’ লেখা। ছোট্ট একটা জিনিস, কিন্তু লকেটটা গোল্ডের, ওর সামর্থ্যের অনেক বাইরে, তাই প্রতিদিন তাকিয়ে দেখেই মনের সাধ মেটায় মুমি আর ভাবে কেউ যেন এটা না কেনে, একদিন পয়সা জমিয়ে ঠিক লকেটটা কিনে নেবে সে।

লোকটা একটা মোটা ব্রেসলেট দেখিয়ে বলে, ‘আচ্ছা, এটা কেমন?’

কল্পনার জগত থেকে বাস্তবতায় ফিরে আসে মুমি, ‘উনি যদি খুব ধনলিপ্সু না হন তাহলে এটা তাঁর ভাল লাগবেনা – এটা অনেক বেশি ভারী কিন্তু এর কোন ছিরিছাঁদ নেই। সরি, কথাটা কেমন যেন চাঁছাছোলা টাইপের হয়ে গেল’। নিজের ব্যাবহারে নিজেই লজ্জা পায় মুমি।

‘নাহ, আমি এমনটা পছন্দ করি। সরাসরি কথা বলাই ভাল, কাজের সুবিধা হয়, কনফিউশন হয়না’।

বেচারা ওর লজ্জা ঢাকার জন্য কত যে অনেস্টির বয়ান দিচ্ছে!

লোকটা আরো কয়েকটা জিনিস দেখল। ওর চোখ বারবার চলে যাচ্ছে ছোট্ট লকেটটার দিকে, ওটা আবার না নিয়ে যায়! অবশেষে লোকটা হাত বাড়ালো ওর প্রিয় লকেটটার দিকে, ‘হুমম, আমি এটাই নেব ঠিক করেছি’। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল মুমির, তবে একটা মূহূর্তের জন্য, তারপর মনে হোল, লোকটির স্ত্রী লকেটটা পেয়ে কত খুশি হবে, ছোট্ট একটা জিনিস কিন্তু এটা ধারণ করে আছে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান নামটি!

 

লোকটি বলল, ‘আমি এর সাথে একটি কলম আর একটি কার্ড দিতে চাই, আপনি কি আমাকে সাহায্য করতে পারেন?’

দেখেশুনে একটু পুরোনো ধাঁচের একটি কলম পছন্দ হোল মুমির। এসব কলম আজকাল হয়ত কেউ তাকিয়েও দেখেনা, কিন্তু বহুকাল আগে রাজরাজড়ারা এ’ধরনের কলম ব্যাবহার করতেন। লোকটারও মনে হোল কলমটা খুব পছন্দ হোল। কার্ড কিনতে গিয়ে লোকটা ওর পছন্দ দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি দেখছি দোকানের কোথায় কি আছে বেশ ভালোভাবেই জানেন, আপনি কি এই দোকানে অনেকদিন ধরে কাজ করেন?’

ঠোঁট কামড়ে ধরে মুমি, ‘আমি এই দোকানে কাজ করিনা ভাই, মাঝে মাঝে এসে মোমেনা আন্টিকে সাহায্য করি যখন কাজ খুব বেশি থাকে। কিন্তু আজ এসেছি গিফট কিনতে’।

‘সরি সরি সরি’, ভীষণ লজ্জা পেল লোকটা, ‘আমি তো আরো আপনাকে দোকানের স্টাফ ভেবে ...’, শীঘ্রই সামলে নিলো সে, ‘আচ্ছা, শোধবোধ করে দেই। আপনি কি কিনবেন বলুন, এবার আমার আপনাকে সাহায্য করার পালা’।

মুমি কিছুক্ষণ ‘না, দরকার নেই, কি দরকার’ টাইপের ভদ্রতা করে পরে ভাবল আসলেই তো সে আগে কখনো ছেলেদের জন্য গিফট কেনেনি, বাবা চাচা ভাইদের জন্য যা কেনে তা তো আর একটা লোকের বিয়ের গিফট হতে পারেনা! এক্ষেত্রে একজন পুরুষ হয়ত তাকে ভাল পরামর্শ দিতে পারবে। ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলে সে। লোকটা ঝটপট বলে, ‘আপনার ভাইয়ের বন্ধু কি ধরনের মানুষ? তাঁর রুচিপছন্দ কেমন?’

‘ভাইয়ার বন্ধুদের আমি কেবল নামেই চিনি, তাদের ব্যাপারে তেমন কিছু জানিনা। এই ভদ্রলোক সম্ভবত পড়তে খুব পছন্দ করেন’।

‘তাহলে বই দিন’।

‘কিন্তু কি ধরনের বই দেব? একেকজনের রুচি পছন্দ তো একেক রকম। তাছাড়া ভাইয়া এত্তগুলো টাকা দিয়েছে, একটাকাও ফেরত নেয়া যাবেনা। বইয়ের দাম তো কম। কিভাবে এতগুলো টাকা খরচ করব?’

‘চলুন, আমি দেখাচ্ছি’।

খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল দু’জনে মিলে অল্পকিছুক্ষণের ভেতরেই অনেকগুলো বই একত্রিত করে ফেলেছে। বইয়ের ব্যাপারে লোকটার রুচি বেশ ভাল। কিন্তু এতগুলো বই সে আল্গাতেও পারবেনা, এখানেই রেখে যেতে হবে, পরে ভাইয়া এসে নিয়ে গেলে ভাল, নইলেও ওর দায়িত্ব শেষ। সব হিসবটিশেব করে দেখা গেল সাতটাকা বাকী। ঐ টাকা দিয়ে ভারী সুন্দর একটা কার্ড কিনে নিলো মুমি।

 

কেনাকাটা শেষে লোকটা ওর শখের লকেটটা, ওর পছন্দের কলমটা আর ওর প্রিয় কার্ডটা নিয়ে চলে গেল। মুমি পছন্দ করা বইগুলো মোমেনা আন্টির কাছে জমা রেখে কার্ডটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল, বুকে সামান্য একটু চাপা কষ্ট, কিন্তু মোমেনা আন্টিকে আজ কেন যেন অনেক বেশি উচ্ছ্বল দেখাচ্ছে, এতেই ওর দিনটা সুখময় হয়ে উঠল!

 

পরের কথাঃ

মুমতাহিনাদের বাসায় আজ অনেক মেহমান আসার কথা। একজনকেও সে চেনেনা। কিন্তু সারাদিন কাজ করে করে হয়রান হয়ে গেল। আম্মু বারবার বলছে, ‘তোকে এত কাজ করতে কে বলেছে? যা, তুই তোর রুম গোছগাছ কর’। কিন্তু মা কি আর একা একা এত কাজ সামলাতে পারবে? সে বলে, ‘আম্মু, আমার রুম কি ভাইয়ার রুম পেয়েছ? আমার রুম সবসময় গুছানো থাকে। তোমার ডিম ছিলতে হবেনা। তুমি শুধু ইন্সট্রাকশন দাও, বাকীটা আমি আর রহিমা খালা মিলে করতে পারব’।

 

বিকালে মেহমান এলো। মহিলারা অন্দরমহলে আর পুরুষরা ড্রয়িংরুমে। মোমেনা আন্টি, যিনি কিনা দোকান ছেড়ে এক মূহূর্তের জন্যও নড়েন না, উনিও এলেন! একজন খালাম্মা মুমিকে খুব আদর করে কথাবার্তা বলতে লাগলেন। সন্ধ্যায় মা মুমিকে একদিকে টেনে নিয়ে জানালেন, ‘এরা তোকে দেখতে এসেছিলেন। কিন্তু ওদের তোকে এত পছন্দ হয়েছে যে ওরা আজই আকদ পরিয়ে রাখতে চান। তুই কি বলিস?’

মুমি একটু অবাক হোল, কিন্তু খুশিও হোল। ওর বান্ধবীদের অনেককেই হবু শ্বশুরবাড়ীর লোকজনের সামনে প্যারেড করে নিজের সৌন্দর্য এবং যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে বিয়ে করতে হয়েছে। এরা তো ওকে বুঝতেই দেননি যে ওরা ওকে দেখতে এসেছেন। ওদের বাড়ীর পুরুষরা তো ওকে দেখেইনি! ছেলেটাও না দেখে রাজী হয়ে গেল! ভাল লাগল ওদের আচরন। তাই বলল, ‘তোমরা নিশ্চয়ই আগেই খোঁজখবর সেরে রেখেছ। তোমাদের বিবেচনার ওপর আমার কোন কথা নেই। তবে ছেলে আমাকে না দেখেই রাজী হয়ে গেল?’

মা বললেন, ‘সে তোকে দেখেছে। দেখে অত্যন্ত পছন্দ করেছে। আমি তাহলে যাই, তোর আব্বাকে জানাই’।

মুমি ভাবলো, ‘চেহারা দেখেই পছন্দ করে বসে আছ বাপু! তোমার মাকে ভাল লাগল দেখেই রাজী হলাম, তুমি কি চিজ তা আল্লাহই জানেন!’

 

কিছুক্ষণ পর ওর মা আর হবু শ্বাশুড়ি রুমে ঢুকলেন, ‘এই যে দেখ উনি তোর জন্য কত্ত সুন্দর একটা ড্রেস এনেছেন! চল, পরে নে’।

শ্বাশুড়ি বললেন, ‘মাগো, আমার ছেলেটাকে বলেছিলাম আমার হবু মেয়েটার জন্য একটা আংটি কিনতে, কিন্তু আমার গাধা ছেলেটা এগুলো নিয়ে এসেছে। প্যাকেটটা খুলে দেখ তোমার পছন্দ হয় কিনা। ওকে কিন্তু তোমারই মানুষ করতে হবে মা’।

ওকে পোশাক পরিবর্তনের জন্য তাগাদা দিয়ে দু’জনেই চলে গেলেন। ও জামাটা বদলে ভাবল, বিনা নোটিসেই নতুন জীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছে সে, শেষবারের মত নিজের করে দম নেয়ার জন্য কয়েকটা মূহূর্ত নিলে নিশ্চয়ই ঘোরতর কোন অন্যায় হবেনা! বিছানায় বসতেই হাতে প্যাকেটটা লাগল। আনমনেই র‍্যাপিং পেপারটা খুলতে শুরু করল সে, ‘দেখি বাছাধন তুমি কি বস্তু!’

 

প্যাকেট থেকে বেরোল একটা পুরোনো ধাঁচের কলম, যেমনটা আগেকার দিনে রাজরাজড়ারা ব্যাবহার করতেন, লতাপাতায় ঘেরা একটা লকেট যার মধ্যখানে ‘আল্লাহ’ লেখা, আর একটা কার্ড যেটা আগেও ওর হাতের ছোঁয়া পেয়েছে, তাতে লেখা, ‘আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন, ‘কি বোকা ছেলে রে বাবা! না দেখেই বিয়ে করতে রাজী হয়ে গেল? কিন্তু আমি চাইনি যাকে আমি সবচেয়ে বেশি সম্মানের পাত্রী মনে করি তাকে এমন অযাচিত পরিস্থিতিতে ফেলতে যেখানে সে কষ্ট পেতে পারে, অসম্মানিত বোধ করতে পারে। তাই সৃষ্টিকর্তার বিধান অনুযায়ী আপনার সান্নিধ্যে কিছু সময় কাটালাম, আপনাকে জানার চেষ্টা করলাম, নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। ভাবছেন, কয়েক মিনিট একটা মানুষের সাথে কথা বললেই বুঝি তার ব্যাপারে কোন সম্মক ধারণা করা যায়? আসলে কিন্তু যায়। ঐ অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি বুঝেছি আপনি আল্লাহকে ভালোবাসেন; জীবনের পংকিল দিক আপনাকে কখনো স্পর্শ করেনি তাই আপনি সরলমনে সবাইকে বিশ্বাস করেন এবং সাহায্যের হাত নিয়ে এগিয়ে আসেন; আমার মতই আপনি বই পড়তে ভালোবাসেন এবং পার্থিব সম্পদের প্রতি আপনি নিরাসক্ত; নিজের চাইতে আপনি অপরের সুখকে প্রাধান্য দিতে পারেন এবং আপনার রুচি বেশ উন্নতমানের। কি ঠিক বলিনি? বাকীটাও কিন্তু আমি মিথ্যে বলিনি। আমি আসলেই চাই আমার সামর্থ্যের মধ্যে সবচেয়ে ভালোটুকু আপনাকে দিতে যেহেতু আপনিই মায়া দিয়ে মমতা দিয়ে আমাদের সংসারটাকে বেঁধে রাখবেন; যেহেতু আপনিই ভোরবেলা আমাকে নামাজের জন্য ডেকে তুলবেন; যেহেতু আপনিই আমাকে অন্যায়ের দিকে অগ্রসর হতে দেখলে বাঁধা দেবেন; যেহেতু আপনিই আমার সামর্থ্যের অভাব দেখলে নিজের প্রয়োজনের কথা চেপে যাবেন – তাই আপনাকে আমি তাও দিতে চাই যা আপনি চান, আবার সেটাও দিতে চাই যা আপনি কোনদিন মুখ ফুটে বলবেন না। আপনি কবুল করলে আমি নিজেকেই গিফট করে দিতে চাই! কি, এবার বিয়ে করতে রাজী? না আরো বয়ান দেব?’

বাহ, এই অল্পবয়সী ছেলেটা এত বুদ্ধিমত্তার সাথে ওকে দেখে নিলো যে সে টেরই পেলোনা, এত সুন্দর একটা চিঠি লিখল যে ওর কলমটা তাকে গিফট করে দিতে ইচ্ছে করছে, এত সম্মান করল ওকে যে ওর নিজেকেই গিফট করে দিতে ইচ্ছে করছে! সে মনে মনে লাজুক হাসি হেসে একা একাই বলল, ‘কবুল!’

Wednesday, May 8, 2013

ঐক্য

বাসর রাতের যে সময়টা নবদম্পতিরা সচরাচর প্রেমালাপে বিভোর থাকে সে সময় এক বেরসিক মেয়ে তার সদ্য স্বামীর সাথে আলাপ করছিল, ‘শুনুন, আমরা দু’জন দু’টো ভিন্ন পরিবার থেকে, পৃথক পরিবেশ থেকে এসে একত্রিত হয়েছি। সুতরাং, আমাদের চিন্তা চেতনা, ধ্যানধারণা, কাজ করার ধরণ, সিদ্ধান্ত নেবার পদ্ধতি থেকে প্রতিটা বিষয়ে পার্থক্য থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আবার এটাও সত্য একসময় আমরা পরস্পরের সাথে এতটাই সিঙ্ক্রোনাইজড হয়ে যাব যে একজন আরেকজনের চেহারা দেখেই বলে দিতে পারব সে কি ভাবছে বা কেমন অনুভব করছে। কিন্তু সে ব্যাপারটা দু’একদিনে ঘটবেনা। এর জন্য সময় লাগবে কয়েক বছর, সারা জীবনও লেগে যেতে পারে। এর মধ্যে খুঁটিনাটি থেকে বড় বড় ব্যাপারগুলো নিয়ে আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হবে, মনোমালিন্য হবে, তর্কাতর্কি হওয়া অস্বাভাবিক নয়, চুলাচুলিও হতে পারে। কিন্তু চলুন একটি ব্যাপারে আমরা সম্মত হই। আমাদের মধ্যে যা হবে তা বন্ধ দরজার এপাশেই রয়ে যাবে। এই দরজা খুলে যখন আমরা পৃথিবীর সামনে বের হব তখন নিজেদের মধ্যে যতই মাথা ফাটাফাটি থাকুক না কেন, জনসমক্ষে আমরা হব পরস্পরের শ্রেষ্ঠ বন্ধু। নইলে তৃতীয় কোন ব্যাক্তি আমাদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করার সুযোগ পাবে। আমরা একত্রিত থাকলেও যে কেউ চেষ্টা করবেনা তা নয়। কিন্তু সেক্ষেত্রে আমরা পরস্পরের সাথে ব্যাপারগুলো আলাপ করে সত্যতা যাচাই করে নেব, তা যতই বেদনাদায়ক হোক না কেন, যেন একে অপরের কাছে স্বচ্ছ থাকতে পারি এবং আমাদের মাঝে বিভ্রান্তির সৃষ্টি না হয়’

এই পদ্ধতিটি শুধু যে একটি দম্পতি বা একটি পরিবারের মাঝে সৌহার্দ্য রক্ষা করার ক্ষেত্রে কার্যকর তা কিন্তু নয়, বরং এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করে একটি জাতি নিজেদের মধ্যে বিভেদগুলোকে মিনিমাইজ করে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। যেমন মুক্তিযুদ্ধের সময় কেউ ভাবেনি কে বড় কে ছোট, কে মুসলিম কে হিন্দু, সবার মাঝে একটাই চিন্তা কাজ করেছে - যেকোন মূল্যে শত্রুকে প্রতিহত করতে হবে, দেশের বিপন্ন অস্তিত্বকে রক্ষা করতে হবেকিন্তু যুদ্ধোত্তরকালে আমরা আবার নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যগুলোকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে বিভাজিত হয়ে পড়েছি এবং বিভাজিত হতে রয়েছিদুঃখজনকভাবে আমাদের চেতনাগুলো আমাদের দেশের স্বার্থে একত্রিত করার পরিবর্তে স্বার্থপর এবং আত্মকেন্দ্রিক করে তুলেছে। আমরা নিজেদের আদর্শকে উদাহরণ এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমুজ্জ্বল করার পরিবর্তে তর্ক এবং মারামারির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছি। আমাদের সচেতনতা ক্রমান্বয়ে অচেতনতার রূপ পরিগ্রহ করেছে। এক পর্যায়ে আমরা এমন অবস্থায় এসে পৌঁছেছি যেখানে আমরা নিজের মতাদর্শের বাইরে অবস্থানকারীদের মানুষ ভাবতেও নারাজ, তাদের মানবিক অধিকার দিতে অনিচ্ছুক, তাদের দমন উৎপীড়ন এবং হত্যা করার মাধ্যমে নিজের মতকে প্রতিষ্ঠিত করতে নির্লজ্জভাবে বদ্ধপরিকর এবং নিজেদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে নিজেদের বিভেদকে বঃহিশত্রুর জন্য প্রবেশপথ বানাতেও দ্বিধাহীন।

এখনো কি প্রশ্ন করার সময় আসেনি আমরা আসলে কি চাই, কোন পথে যাত্রা করেছি, কোথায় আমাদের গন্তব্য?

স্বামী স্ত্রী যতই ঝগড়া করুক না কেন শেষতক তাদের একই ঘরে অবস্থান করতে হয়। তাই নিজেদের প্রশান্তির জন্য, সংসার এবং সন্তানদের খাতিরে, তাদের একটি শান্তপূর্ন সহাবস্থানের উপায় খুঁজে নিতে হয় – এই কাজটি করতে হয় কখনো ছাড় দিয়ে, কখনো সম্পর্কের দাবী প্রতিষ্ঠা করে, কখনো হাত বাড়িয়ে, কখনো অভিমান দিয়ে। একটি দেশের অধিবাসীরা একটি বৃহত্তর পরিবারের অংশ। একটি পরিবারে যেমন কেউ আত্মভোলা হয়, কেউ পরোপকারী হয়, কেউ স্বার্থপর হয়, কেউ বুদ্ধিমান হয়, কেউ বোকা হয়, কেউ ঝগড়াটে হয়, কেউ অভিমানী হয়, কেউ অবুঝ হয়, কেউ সমঝদার হয়, কিন্তু এই পার্থক্যের জন্য কেউ কাউকে ছেড়ে যায়না আবার কেউ কাউকে আলমারীতে পুরে তালাবদ্ধও করে রাখেনা – তেমনি একটি দেশের নাগরিকদেরও প্রয়োজন নিজেদের পার্থক্যগুলোকে জাতীয় ঐক্যের ওপরে স্থান না দেয়া, তা সে যার জন্যই হোক না কেন; উচিত নিজেদের মধ্যকার পার্থক্যগুলোকে সংলাপ এবং যুক্তির মাধ্যমে সমাধান করা; উচিত তর্কের খাতিরে সহিংসতায় না গিয়ে শান্তির খাতিরে সহাবস্থানের উপায় খুঁজে নেয়ানইলে দেশের মানচিত্রই যে কেবল হুমকির সম্মুখীন হয় তা নয় বরং ঘরের ভেতর আগুন জ্বলে উঠে সেই ধোঁয়া লুটেরাদের দৃষ্টি আকর্ষন করতে পারে।

হেনরিক ইবসেনের ‘দ্য ডলস হাউজ’ নাটকটির প্রধান চরিত্র ছিল নোরা। ওর স্বামী ওকে খুব আদর করত কিন্তু মূল্যায়ন করতনা। ফলে সে নিজের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি স্বামীর অনাসক্তিতে হতাশ হয়ে একদিন সাজানো সংসার ফেলে বেরিয়ে যায়। একটি সংসারে যেমন স্বামী স্ত্রী এবং পর্যায়ক্রমে সন্তানদের অধিকার সমভাবে নিশ্চিত করতে হয়, তেমনি একটি দেশের নাগরিকদের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হয়কারো কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য যদি অপর পক্ষের কথা বলার অধিকার ছিনিয়ে নেয়া হয় তবে তা এক সময় অভিমান থেকে ক্ষোভ, ক্ষোভ থেকে রাগ, রাগ থেকে সহিংসতার রূপ ধারণ করবে যা কারো জন্য কোনভাবেই কল্যাণকর নয়। সেক্ষেত্রে দোষটা যে রাগ করল তার চেয়েও যে পক্ষপাতিত্ব করে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করল তার ওপর বর্তায়। প্রেশার কুকারের ছিদ্র কুকারের ভেতরের প্রেশারটা ব্যালেন্স করতে সহযোগিতা করে, কিন্তু প্রেশার কুকারের ছিদ্র বন্ধ করে তাকে চুলার ওপর এড়িয়ে দিলে বিস্ফোরণ ঘটবেই। সেটা প্রেশার কুকারের দোষ নয়, দোষ সেই আহাম্মকের যে ছিদ্র বন্ধ করে তাকে চুলায় চড়িয়েছে। অথচ প্রেশারটাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে অনেক কম সময়ে অনেক বেশি রান্না করা যায়!

জর্জ অরওয়েল তাঁর ‘শুটিং অ্যান এলেফ্যান্ট’ গল্পে বার্মায় অবস্থানকালে তাঁর মানসিক অস্থিরতার বর্ণনা দিয়েছেনএকদিকে স্থানীয় জনগণের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের দমনপন্থী আচরন; অপরদিকে স্থানীয়দের প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ যা একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে তাকে প্রতিদিনই মুকাবিলা করতে হচ্ছে। তাঁর ফ্রাস্ট্রেশনের বঃহিপ্রকাশ ঘটেছে এভাবে, ‘I was young and ill-educated and I had to think out my problems in the utter silence that is imposed on every Englishman in the East. I did not know that the British Empire is dying, still less did I know that it is a great deal better than the younger empires that are going to supplant it. All I knew was that I was stuck between my hatred of the empire I served and the rage against the evil–spirited little beasts who tried to make my job impossible. With one part of my mind I thought of the British Raj as an unbreakable tyranny, as something clamped won on prostrate peoples; with another part I though the greatest joy in the world would be drive a bayonet into a Buddhist priest’s guts. Feelings like these are a normal by-product of imperialism; ask any Anglo-Indian official, if you can catch him off duty’. (আমার বয়স ছিল অল্প, লেখাপড়াও ছিল যৎসামান্য এবং আমাকে আমার সমস্যা নিয়ে ভাবতে হত নীরবে যে নীরবতা ছিল পূর্বে কর্মরত প্রতিটি ইংরেজের সঙ্গী। আমি জানতাম না ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তখন মৃত্যুপথযাত্রী, আমার ধারণাও ছিলোনা যে এই সাম্রাজ্য সেসব নব নব সাম্রাজ্যের চেয়ে অনেক ভাল ছিল যেগুলো পরে তাকে প্রতিস্থাপন করবে। আমি কেবল এটাই জানতাম যে আমি এক শাঁখের করাতে আটকে পড়েছিলাম যার একদিকে ছিল সেই সাম্রাজ্যের প্রতি ঘৃণা যার জন্য আমি কাজ করতাম এবং অপরদিকে সেই বজ্জাত নাছোড়বান্দারা যারা আমার কাজ করা অসম্ভব করে তুলছিল। আমার মনের একাংশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে দেখছিল এক অলঙ্ঘ্যনীয় স্বৈরাচার হিসেবে যা নতজানু জনমানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে; অন্য অংশ ভাবছিল পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দের কাজ হত বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পেটের ভেতর বেয়োনেট ঢুকিয়ে দেয়া। এ’ধরনের অনুভূতিগুলো সাম্রাজ্যবাদের স্বাভাবিক ফলাফল, যেকোন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান অফিসারকেই জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন যদি তাকে ডিউটির বাইরে ধরতে পারেন।) কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি বুঝতে পারলেন হাতি মরলে সাম্রাজ্যবাদী বা জনগণ কেউ লাভবান হয়না, তার টুকরোগুলো শকুনে খেয়ে নিঃশেষ করে।

আমাদের দুর্ভাগ্য এই জাতির শত শত বছরের ইতিহাসে আমরা এমন শাসক পাইনি যারা এই দেশকে ভালবেসেছে, দেশের মানুষকে একত্রিত করেছে, দেশের উন্নতিকে জীবনের লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছে, ব্যাক্তিস্বার্থকে পেছনে ফেলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে জনতাকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করতে সমর্থ হয়েছে। আমরা যুগে যুগে স্বৈরাচারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে এতটাই যুদ্ধংদেহী হয়ে গিয়েছি যে বঃহিশত্রু না পেলে আমরা নিজেরাই মারামারি করে মরিমাঝখানে অন্য কেউ এসে আমাদের খাবার চেটেপুটে লুটে যায় তা আমাদের নজরেই পড়েনা। কি অদ্ভুত এক জাতি আমরা! আত্মকেন্দ্রিকতারও তো একটা সীমা থাকে। আত্মকেন্দ্রিকতার ফলাফল যদি নিজের জন্যই ধ্বংস বয়ে আনে তবে তাকে বর্জন করাই শ্রেয় নয় কি? আনুগত্য ভাল জিনিস, কিন্তু কার আনুগত্য করা হচ্ছে বা কি উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে, সেটা কি যাচাই বাছাইয়ের দাবী রাখেনা?

ছোটবেলায় আবুধাবীতে ছিলাম। স্কুলে ইউ. এ. ই. সোশ্যাল স্টাডিজ নামে একটা বিষয় বাধ্যতামূলক ছিল। পড়ে হতবাক হয়ে গেছিলাম যে তাদের জনসংখ্যার মাত্র ৪% ছিল স্থানীয় জনগণ, বাকী সব অভিবাসী। কিন্তু সবার জন্যই গ্যাস, ইলেক্ট্রিসিটি, পানি ছিল ফ্রি যেহেতু এরা সবাই মিলেই ১৯৭১ এ স্বাধীন হওয়া দেশটিকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। একজন মাহাথির মুহাম্মদ মালয় এবং চৈনিক জাতিগত দাঙ্গায় বিধ্বস্ত একটি দেশকে তুলে নিয়ে পারেন উন্নতির চরম শিখরে। কিন্তু হায়, বাঙ্গালী একাই একশ, কিন্তু একশ বাঙ্গালী কখনো এক হতে পারেনা! দেশের স্বার্থেও না। পলাশীর প্রান্তরে মীরজাফর যা করেছিল আমরা আজও তার পুণরাবৃত্তি করে চলেছি। আজও আমরা নিজের স্বার্থে দেশকে দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলছি, পৃথিবীর সামনে নিজেদের লজ্জা ঢাকার পরিবর্তে নাঙ্গা করে দিচ্ছি, একে অপরের ঘরে আগুন দিচ্ছি, একে অপরকে গুঁতিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করছি, একে অপরকে পিটিয়ে মেরে ফেলছি, ভুলে যাচ্ছি হায়েনারা বসে আছে আমাদের লাশ সাবাড় করার জন্য।

শত শত বছরের বঞ্চনার ইতিহাস আমাদের মাঝে এক আত্মপ্রবঞ্চক, লোভী, স্বার্থান্বেষী চরিত্রের জন্ম দিয়েছে যে নিজের জন্য সব কিছু করতে পারে কিন্তু ভাবেনা অন্যদের ছাড়া নিজের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। নিজের অস্তিত্বের জন্য আমরা যেকোন অন্যায়, যেকোন অনাচার, যেকোন অবিচার করতে এবং মেনে নিতে প্রস্তুত থাকি। কিন্তু আমাদের মাথায় থাকেনা, every action has an equal and opposite reaction. (প্রতিটি ক্রিয়ারই একটি সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে।) যখন আমি একজন মানুষের মৃতুর খবর শুনে আগে ‘আহা’ করে উঠব এবং পরে বাকী তথ্য জানতে চাইব তখন বুঝব আমি মানুষ, কিন্তু যখন আমি একটি মৃত্যুসংবাদ শুনে আগে অনুসন্ধান করব সে কোন দলের বা মতাদর্শের ছিল এবং তারপর ভাবব আমি আদৌ রি-অ্যাক্ট করব কিনা তখন আমার মানবতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে বৈকি। তখন অপর এক ব্যাক্তি যদি আমাকে মারতে আসেন তাকে দোষারোপ করা যাবেনা, কেননা আমি নিজেই অপরের জীবনের কোন মূল্য দেইনি! সুতরাং, এই বিভক্তির শেষফল সমূলে ধ্বংস যা থেকে আমি, তুমি, আপনি, তুই কেউ রেহাই পাবেনা।

এখনো সময় আছে। আমরা কি এভাবেই আমাদের ‘সোনার বাংলা’কে নিঃশেষ হয়ে যেতে দেব, ভবিষ্যত প্রজন্মের সামনে একটি অসহনীয় অসহায় বিরান জীবন রেখে যাব, নাকি সবাই মিলে একটি সত্যিকার ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলব? সিদ্ধান্ত আমার, তোমার, আপনার, তোর। এরপর যে ফল দাঁড়াবে তা কিন্তু সবাইকে মিলেই খেতে হবে। সুতরাং, ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন।

Monday, April 15, 2013

বিদায়, বন্ধু আমার

আজ হতে ঠিক দু’সপ্তাহ আগে এই সময় ওর হাত দু’টো আমার হাতের মুঠোয় ধরা ছিল, আমরা কথা বলছিলাম অন্তরঙ্গভাবে, সে হাতের স্পর্শ এখনো আমার হাতে লেগে রয়েছে, কিন্তু হাত দু’টি এখন সাড়ে তিনহাত মাটির নীচে। আজ সকালে সে মারা গিয়েছে। 

ওর সাথে আমার দেখা হয়েছে সাকুল্যে দু’বার। আমি সুন্দরভাবে কথা বলতে পারিনা, ইমোশনাল পরিস্থিতিতে একেবারেই কথা বলতে পারিনা, মানুষ যে কি করে এত সুন্দর করে কথা বলে তাই বুঝে পাইনা। তাই আড়ালে থেকে পর্যবেক্ষণ করে যাই।
মেয়েটি ছিল সৌভাগ্যবতী। ওর ক্যান্সার হয়েছিল। তার আগে আর দশটা সাধারন মেয়ের সাথে ওর কোন পার্থক্য ছিলোনা। স্বামী, সন্তান, সংসার, জামাজুতোর শখ, সাজগোজ -এর বাইরে ওর কোন পৃথিবী ছিলোনা। কিন্তু ক্যান্সার ওকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনে। ডাক্তাররা বলে দিয়েছিল ক্যান্সার ধরা পড়ার আগেই সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে, প্রাথমিক অবস্থায় ধরা গেলে হয়ত কিছু করা যেত কিন্তু এত দুর্বল শরীরে চিকিৎসা প্রয়োগ করলেও শরীর রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহজনক। তখন থেকেই সে পৃথিবীর মোহমায়া থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছেপ্রভুর সাথে মহামিলনের প্রস্তুতি তখন থেকে শুরু। দেড় বছর কম সময় নয়। এই সময়ে সে নিজের এক একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পাপের জন্য মার্জনা চেয়ে নিয়েছে, জনে জনে ডেকে বুঝিয়েছে, ‘দেখ, আমাকে দেখ। কুড়িটি বছর যখন আমি সুস্থ ছিলাম তখন আমার প্রভুর আদেশ নিষেধের তোয়াক্কা করিনি। আজ যাবার বেলা আমার কাছে তাঁর সামনে ন্যূনতম সম্মানজনক অবস্থান নিয়ে দাঁড়াবার মত কোন সঞ্চয় নেই, হয়ত কেবল মার্জনাটুকুই চাইতে পারব কিন্তু তা নিশ্চিত করার সময়টুকুও নেই। যেকোন দিন আজরাইল (আ) আমার বিছানার পাশে এসে দাঁড়াবেন, আমার বুকের ওপর হাত রেখে আমার রূহকে আহ্বান করবেন, আমার দম বন্ধ হয়ে আসবে, আমি পালিয়ে যাবার চেষ্টা করব কিন্তু আমার শরীর সেদিন আমাকে সহযোগিতা করবেনা, তারপর আমাকে হাজির করা হবে আমার সৃষ্টিকর্তার সামনেসেই মূহূর্তে তিনি আমার সামনে পরম করুণাময় রূপে বিরাজ করবেন না কি আমাকে দেখে চরম রাগান্বিত হবেন সে কথা ভাবতেই অন্তরাত্মা ভয়ে উড়ে যায়। মনে হয় আমি যদি অদৃশ্য হয়ে যেতে পারতাম, মিশে যেতে পারতাম মাটির সাথে! তোমরা সেই সময়ের আগেই সাবধান হও যা অবশ্যম্ভাবীতোমরা আমার মত ভুল কোরোনা। তোমরা তার আগেই পরকালের পাথেয় সংগ্রহ কর। এটাই একমাত্র বাস্তবতা। আর সব ভুল। সারাটা জীবন আমরা কেবল ভ্রমে ডুবে থাকি। তোমরা এখনই এই ভুল সংশোধন কর। তোমরা এখনই সাবধান হও’।

ওর মত হাজারটা মেয়ে পৃথিবীর আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেকিন্তু সারা ক্যাল্গেরী ওর এই যাত্রায় যেভাবে সঙ্গ দিয়েছে তার তুলনা নেই। প্রথম যখন ওর অসুস্থতা ধরা পড়ে তখন ওর বড় মেয়েটির বয়স মাত্র ছয় বছর, ছোট সন্তানটির মাত্র কয়েক মাস। আত্মীয় পরিজনহীন এই বিদেশ বিভুঁইয়ে স্বামী বেচারা বৌ নিয়ে হাসপাতালে দৌড়াবে না বাচ্চা সামলাবে, চাকরী করবে কিভাবে আর রান্নাই বা করবে কিভাবে তা নিয়ে মহাচিন্তায় পড়ে গেল। ক্যাল্গেরীর ভাবীরা ফেরেস্তার মত নাজিল হলেন এ’সময়। কেউ চেনেন কেউ চেনেন না তাদের, কিন্তু সবাই নির্দ্বিধায় এগিয়ে এলেন। কেউ বাচ্চাদের দেখাশোনা করলেন, কেউ রান্না করে পাঠালেন, কেউ অর্থ সংগ্রহ করলেন যেন ভাই কাজ করার পরিবর্তে স্ত্রী সন্তানদের নিবিড়ভাবে সময় দিতে পারেন। একদিন দু’দিন নয়, দেড়টা বছর নিরবিচ্ছিন্নভাবে তাঁরা সহযোগিতা করে গিয়েছেন এই পরিবারটিকে।
প্রথম যেবার তার সাথে দেখা করার সাহস সংগ্রহ করতে সক্ষম হই সাথে বান্ধবী জেসমিন আপা আর স্বপ্না আপাকে নিয়ে যাই কথা বলার জন্য। সে মাত্র মাস দু’তিন আগের কথা। স্নিগ্ধ হাসিমুখখানা দেখে কে বলবে বেচারী এত অসুস্থ? বাচ্চা দু’টো এসে ওদের আঁকা ছবি দেখাচ্ছে, আধো আধো বোলে কথা বলছে। সে আমাদের বলল, ‘আমি এখন অর্থসহ কু’রআন পড়ছি। কিন্তু বড়ই আফসোস হচ্ছে যে অনেক দেরী করে ফেলেছি। এটা তো আমার প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জনের সহজ রোডম্যাপ। কিন্তু আমি এমন সময় এটা পড়ছি যখন আমার পথ শেষ হয়ে এসেছে। কত ভুল পথ মাড়িয়ে আজ এখানে এসে পৌঁছেছি! যদি শুরু থেকেই এই মানচিত্র অনুসরন করতাম কত সময় বাঁচত আমার, আরো কত দূর অগ্রসর হতে পারতাম, কত ভুলভ্রান্তি এড়িয়ে চলতে পারতাম! আপনারা এই ভুল করবেন না। জীবনটাকে এখনই সংশোধন করুন যেন আমার মত পথের শেষে দাঁড়িয়ে হায় হায় করতে না হয়’। তাকে সাহস দিলাম, ‘ডাক্তার তো আর গড নয়, তুমি সাহস হারিয়োনা। চিকিৎসা চলুক, পাশাপাশি তোমার সৃষ্টিকর্তার সাথে একটা চুক্তি করা যায় কিনা দেখ যে এই মূহূর্ত থেকে তোমার জীবন, মৃত্যু, নামাজ এবং ত্যাগ হবে কেবল তাঁর সন্তুষ্টির জন্য। তিনি রাজী হয়ে গেলে এই রোগ সেরে যাওয়া কোন ব্যাপার নয়। যিনি রোগ সৃষ্টি করেছেন তিনি রোগ নিরাময় করতেও সক্ষমতিনি আইয়ুব (আ)কেও তো আরোগ্য দান করেছিলেন’

দু’সপ্তাহ আগে বান্ধবী তাসনীন আপা জানালেন ডাক্তাররা জবাব দিয়ে দিয়েছে, সে বাংলাদেশে চলে যাচ্ছে পরিবার পরিজনের সাথে শেষ সাক্ষাতের জন্য। সবাইকে খবর দেয়ার পর বান্ধবীরা সাহায্যের বন্যা বইয়ে দিলেন। সামনাসামনি সাহায্য দিতে লজ্জা লাগে, তাই তাসনীন আপার মাধ্যমে আরেকজনকে দিয়ে টাকা দেয়ার ব্যাবস্থা করলাম। সকালে ছাত্রছাত্রী ছিল আমার,  তাই বিকালে তাসনীন আপার সাথে যাবার আয়োজন করলামবিকালে ফারজানা আপা ফোন করে বললেন তিনি যেতে চান কিন্তু ঠিকানা চেনেন নাউভয়কেই পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি পুরো ক্যাল্গেরীর বাংলাদেশী সমাজের এমন কেউ নেই যে দেখা করতে আসেনি। এদের অনেকেই রবাহূত। চেনেনা, জানেনা কিন্তু শুনে ছুটে এসেছে। কেউ সান্তনা দিচ্ছে, কেউ কাঁদছে। আমাকে দিয়ে দু’টোর একটাও হয়না। তাছাড়া আমি কান্নাকাটি করে রোগীর মনোবল হ্রাস করাটা সঙ্গত মনে করিনা। ওকে দু’জন ডাক্তারের ঠিকানা দিলাম, বললাম, ‘ডাক্তার তো আর গড নয়। বাংলাদেশে গিয়েমাত্র এদের সাথে যোগাযোগ করে দেখ। হয়ত আল্লাহ চাইলে সুস্থ হয়ে যেতে পারো। তবে প্রতিটা মূহূর্ত ইস্তেগফার পড়তে থাকো। যদি যাবার সময় হয়েই যায় তার জন্যও প্রস্তুতি থাকা চাই। যদি তুমি আগে যাও তাহলে আমার পালনকর্তাকে বোলো আমাকে ক্ষমা করে দিতে, তবে এমনটাও বিচিত্র নয় যে গিয়ে দেখলে আমি তোমার আগেই গিয়ে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি’। সে মৃদু হাসল, ‘কথা দু’রকম হয়ে গেলনা আপা?’ কিন্তু এটাই যে বাস্তবতা! উভয় পরিণতির জন্যই তো আমাদের প্রস্তুত থাকতে হয় প্রতিটা মূহূর্ত। ওর মত সৌভাগ্য ক’জনার হয় যে দেড়বছর আগে থেকেই প্রস্তুত হবার সময় পাওয়া যায়?
আজ নববর্ষের প্রথম দিনটিতে, যখন সবাই হাসিখেলায় মত্ত, সে তার মা ভাইবোন, স্বামী সন্তান আর এতগুলো শুভাকাঙ্খীকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল আপন গন্তব্যে। আল্লাহ তাকে তার ধৈর্য্যের জন্য পুরস্কৃত করুন, তার ছোটবড় সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিন, তাঁর জান্নাতে তাকে স্থায়ী করে নিন। পাশাপাশি মৃত্যুর পূর্বমূহূর্ত পর্যন্ত যে সত্যটি সে আমাদের কাছে পৌঁছনোর আপ্রান চেষ্টা করছিল তা আমাদের অনুধাবন এবং অনুসরন করার সামর্থ্য দিন, সকল অন্যায় এবং ভুলভ্রান্তি থেকে আমাদের পবিত্র করে দিন এটুকু প্রার্থনা। ভাল থেকো বোন আমার, বন্ধু আমার! আমার জন্য অপেক্ষা কোর, আমিও আসছি শীঘ্রই।

Sunday, April 7, 2013

‘আমি’ময় পৃথিবী

দরখাস্তটা রিভিশন দিতে গিয়ে আমার চক্ষুস্থির হয়ে গেল। ছোট ছোট তিনটা প্যারার এইটুকু অ্যাপ্লিকেশনটাতে ‘আমি’ শব্দটা এসেছে সাতবার, ‘তুমি’ শব্দটি নেই একবারও। কি আশ্চর্য! আমি একজনের কাছে কিছু চাইছি, সুতরাং চিঠিটাতে তাকে প্রাধান্য দেয়া উচিত, অথচ এর সর্বত্র ‘আমি’র ছড়াছড়ি! আবার অ্যাপ্লিকেশনটা নিয়ে বসলাম। বেশ কিছু সময় নিয়ে, অনেক অনেক কাটাকুটি আর ভাষার সতর্ক ব্যাবচ্ছেদের পরও তিনটা ‘আমি’ রয়ে গেলে যেগুলো কিছুতেই বাদ দেয়া গেলনা। ঘটনাটায় নিউরনে একটা আলোড়ন খেলে গেল, চরম লজ্জা পেলেও নিজের কাছে স্বীকার করতে বাধ্য হলাম যে মানুষ আসলেই বড় আত্মকেন্দ্রিক এবং স্বার্থপর প্রাণী!

 
কথাটা শুনতে খারাপ শোনালেও আমাদের প্রাত্যহিক বাক্যালাপের দিকে লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় আসলে তত্ত্বটা কতটা সত্য। আমাদের প্রতিদিনকার সংলাপগুলো একত্রিত করলে দেখা যায় এর অধিকাংশ বাক্যই শুরু হয় ‘আমি’ বা ‘আমার’ শব্দটি দিয়ে। আমাদের সংলাপে ‘আমি’র সাথে সংশ্লিষ্টতা ব্যাতীত ‘তুমি’ বা ‘সে’র অভাব প্রকট এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই শব্দগুলো আসে ‘তুমি’ বা ‘সে’ কে নিয়ে ‘আমি’র সমস্যা কিংবা অসন্তুষ্টি কিংবা নালিশ ব্যাক্ত করতে। সংলাপের এই সংকীর্ণতা প্রতিফলিত হয় আমাদের আচরনিক জীবনেও। এই আমিময় পৃথিবীতে ‘তুমি’ বা ‘সে’র প্রতি মমতার অনুপস্থিতি আসলেই আতংকজনক! ‘আমি’র চাওয়া পাওয়া নিবৃত করার জন্য ‘তুমি’ বা ‘সে’র প্রতি নির্দয় হওয়া কিংবা তাকে মিটিয়ে দেয়ার দৃষ্টান্তও বিরল নয়।
 

যখন আমরা ‘তুমি’ বা ‘সে’কে আদৌ মূল্যায়ন করতে প্রস্তুত থাকি তখন বলি, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’। এই কথাটাতেও আত্ম অহমিকাই  প্রকাশিত হয়, কেননা এখানে ‘আমি’র অনুভূতিটাই মুখ্য, ‘তুমি’ বা ‘সে’র অনুভূতিটা গৌণ; বরং ব্যাপারটা এমন যে আমি যে তাকে ভালবাসি তাতেই তার আনন্দিত, বিগলিত, মুগ্ধ এবং কৃতজ্ঞ হয়ে যাওয়া উচিত। কি অদ্ভুত, তাইনা? যাকে মূল্যায়ন করার জন্য এই ভালোবাসা তার চেয়েও এখানে আমার অনুভূতি, আমার চাহিদা, আমার অহমিকাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ! তাই তো আমরা অহরহ দেখি কেউ ভালবাসায় সাড়া না দিলে তাকে অ্যাসিডদগ্ধ করতে কিংবা হত্যা করতেও মানুষ পিছপা হয়না। একে কি আসলে ভালবাসা বলা যায়? ভালবাসা তো সেটাই যেখানে অন্যের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য আনন্দ আমার কাছে নিজের চাহিদার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে, নইলে ‘তুমি’ বা ‘সে’র আর কি মূল্য থাকে?

 
পৃথিবীতে যত সমস্যা তার শুরু এই ‘আমি’ দিয়ে। আমাদের সারাক্ষণ ভাবনা আমি কি চাই, আমার কি পাওয়া উচিত, আমি কি পেলাম, আমার যা চাওয়া ছিল তা কেন পেলাম না। এই যাত্রাপথে আমাদের কখনো মাথায় আসেনা ‘তুমি’ কিংবা ‘সে’ কি চায়, ‘তুমি’ বা ‘সে’র কি পাওয়া উচিত, ‘আমি’ কি ‘তুমি’ বা ‘সে’কে বঞ্চিত করছি কিনা। ব্যাস্ত জীবনের অঙ্গন থেকে কিছু সময় করে নিয়ে কারো সাথে দেখা করতে গেলাম, সে প্রথমেই বলবে, ‘তুমি কি আর আমার খবর রাখো?’ একবারও ভাববেনা, আমিই তো তার সাথে দেখা করতে গেলাম কিংবা এতদিন আমি কেমন ছিলাম বা কেন তার সাথে দেখা করতে পারিনি বা সে তো একদিনও আমার কোন খবর নেয়নি! এখানেও সমস্যা ‘আমি’কে এতটা মুখ্য মনে করা যা ‘তুমি’ বা ‘সে’র সুবিধা অসুবিধা সমস্যা এমনকি তার উপস্থিতিকেও আমলেই নেয়না।


দুনিয়ার যত সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু এই ‘আমি’টা। ‘তুমি কি করে আমার জন্মদিন ভুলে গেলে?’ ‘তোমার সাথে বিয়ে হয়ে আমি কি পেলাম?’ ‘আমার কথা আর কে ভাবে?’ ‘আমি নিজ কানে শুনেছি এই কথা’ ‘আমার ধারণা ব্যাপারটা এমন’ ‘ওর একদিন কি আমার একদিন’ ‘আমি কম যাই কিসে?’ এই ‘আমি’কেন্দ্রিকতার কোন শেষ নেই। এই আমিত্ব আমাদের অনুদার, স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক, অনাস্থাশীল, অহংকারী, প্রতিশোধপ্রবণ এবং বোকার স্বর্গে বসবাসকারী করে তোলে। এই ‘আমি’কে আমরা কতটা অপরিহার্য মনে করি তা আমাদের প্রচলিত বাগধারাতেই প্রকাশ পায়।


আমরা কথায় কথায় বলি, ‘চাচা, আপন পরান বাঁচা’। বস্তুত কথাটার পেছনে স্বার্থপরতার গন্ধটা যে কত উৎকট তা কি আমাদের একটুও নাড়া দেয়না? সবাই যদি নিজের প্রাণ বাঁচাতেই ব্যাস্ত থাকত তাহলে পৃথিবীর ইতিহাস কতটা কলঙ্কময় হত তা কি আমাদের চিন্তায় আসে কখনো? সবাই নিজের প্রান নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়লে কি পৃথিবীতে কোনদিন কোন মহিমান্বিত আত্মত্যাগের ইতিহাস রচিত হত, যুদ্ধ কিংবা মহামারীর সময় সেবা করার কোন লোক পাওয়া যেত,  কেউ মৃত্যুর পারে দাঁড়িয়ে অন্যকে পানি পান করার অগ্রাধিকার দিত, জাহাজডুবির মূহূর্তে কেউ স্ত্রী পুত্র কন্যাকে লাইফবোটে তুলে দিয়ে ডুবন্ত জাহাজে রয়ে যেত, একজন মহামানবকে বাঁচাতে এগারোজন মহাত্মা নিজেদের শরীরকে ঢালে রূপান্তরিত করত, কিংবা একজন মা তার শরীর দিয়ে ঢেকে দিত তার সন্তানকে যেন ভূমিকম্পে ধ্বসে পড়া দেয়াল তাকে থেঁতলে দিলেও সন্তান অক্ষত থাকে?


প্রতিদিন এই পৃথিবীটাকে দেখি, এই পৃথিবীর মানুষগুলোকে দেখি যাদের দিন শুরু হয় ‘আমি’ দিয়ে, দিন শেষ হয় ‘আমি’ দিয়ে। এই ‘আমি’র বাড়ী লাগে, গাড়ী লাগে, খাবার লাগে, পোশাক লাগে, চিকিৎসা লাগে, সম্মান লাগে, ধন সম্পদ ঐশ্বর্য্য লাগে, সমস্ত প্রয়োজন পূরণ হয়ে গেলে আরো লাগে; তবু তার ‘তুমি বা ‘সে’র ন্যূনতম প্রয়োজনগুলি নিয়েও ভাবার সময় হয়না, তাদের দুঃখ কষ্ট বেদনা তাকে নাড়া দেয়না। প্রতিটি ‘আমি’ অমর হতে চায় যেন একজন ‘আমি’ পৃথিবী থেকে চলে গেলে মানবজাতির বিশাল ক্ষতি হয়ে যাবে, অথচ কত কোটি কোটি ‘আমি’ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছে যাদের কেউ মনেই রাখেনি! প্রতিটি ‘আমি’ নিজেকেই সেরা মনে করে যেন পৃথিবীতে কোনদিন কোন শ্রেয়তর মানবের পদচিহ্ন পড়েনি, অথচ এই পৃথিবীর ইতিহাসে হাজার হাজার উজ্জ্বল নক্ষত্র স্বমহিমায় জ্বাজল্যমান! প্রতিটি ‘আমি’র প্রয়োজনগুলি পূরণ করেন একজন ‘আমি’, অথচ সেই ‘আমি’কে কেউ ধন্যবাদ দেয়া দূরে থাক স্বীকার করার পর্যন্ত প্রয়োজন মনে করেনা!


এই বৈচিত্রময় পৃথিবীতে কিছু বিচিত্র মানুষ জীবনের লক্ষ্যস্থির করে নিয়েছেন ‘তুমি’ কিংবা ‘সে’কে নিয়ে ভাবার, তাদের স্বপ্নপূরন করার, নিজের প্রয়োজনগুলিকে সীমিত করে অপরের প্রয়োজনগুলিকে প্রাধান্য দেয়ার। সবাই তাঁদের বোকা বলে। কিন্তু এই আমিময় পৃথিবীর স্বার্থের ঈষদচ্ছ আচ্ছাদনের ভেতরে যেসব জঘন্য কীর্তিকলাপ চলে তার কিঞ্চিৎ পরিমাণ দেখেই আমার কেবল ইচ্ছে হয় এই বোকাদের দলে ভিড়তে। সূর্যের প্রচন্ড টান উপেক্ষা করেও কিছু কিছু উল্কা ছিটকে চলে আসে এই মাটির পৃথিবীতে, এই পৃথিবীর বায়ূমন্ডলের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আগে ক্ষণিকের জন্য জ্বলে ওঠে সেই মহাকাশচারী। একটি জীবনের জন্য একবার জ্বলে ওঠাই কি যথেষ্ট নয়? হাজার হাজার বছর ধরে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে থাকার চেয়ে ঐ এক মূহূর্তের জ্বলে ওঠাই কেন যেন কিছু কিছু মানুষকে বেশি আকর্ষন করে। কেননা ঐ একটি মূহূর্তে সে স্বার্থপরতার উর্ধ্বে উঠে আসতে পারে, আমিত্বের কক্ষপথ থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসতে পারে, অন্যের আকাশটাকে আলোর মালায় সাজিয়ে দিতে পারে, অপরের মধ্য দিয়েই তৈরী করতে পারে নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় – এখানেও ‘আমি’টাই উজ্জ্বল, কিন্তু সংকীর্ণ নয়। এই ‘আমি’টাই হতে ইচ্ছে করে খুব। জানিনা পারব কিনা, কিন্তু চেষ্টা করে দেখতে তো ক্ষতি নেই!

Wednesday, March 27, 2013

ভালোবাসার স্বভাব, ভালোবাসার অভাব

১/

 কাজ থেকে ফিরছিলাম। ট্রেন স্টেশন থেকে বেরোবার পথে বেশিরভাগ মানুষ ডানদিকে চলে গেল, বামদিকে আমার সামনে কেবল এক মহিলা ছাড়া আর কেউ নেই। আমি সাধারনত খুব দ্রুত হাঁটি, এই মহিলা বুঝলাম আমার চেয়েও দ্রুত হাঁটছেন, কারণ পেছন থেকে কেবল তাঁর ঋজু দেহখানা দেখতে পাচ্ছি, চেহারা দেখছিনা। দু’জনেই বাঁয়ে মোড় ঘুরলাম। দেখি মহিলার হাঁটার গতি আরো বেড়ে গেল। রাস্তার পাশে একখানা লাল গাড়ী, স্টিয়ারিং উইলে এক বৃদ্ধ দাদামশায় উৎসুক ভঙ্গিতে বসে আছেন, মুখের হাতের চামড়ায় কুঁচকানো দেখে বোঝা যাচ্ছে ভালোই বয়স হয়েছে। মহিলা দ্রুত হেঁটে গাড়িতে ওঠার পর খেয়াল করলাম তিনি হলেন দাদামশায়ের স্ত্রী, মাথার সব চুলই শ্বেতবর্ণ ধারণ করেছে, আজন্ম স্নো ক্রীমে লালিত মুখখানাতেও ভাঁজ পড়েছে ভালই। দাদীমা গিয়ে বসতেই দাদামশায় একগাল হাসি দিয়ে গাড়ীতে স্টার্ট দিলেন, দাদীর মুখ থেকে সারাদিনের ক্লান্তির সব চিহ্ন উবে গেল। তাঁদের এই চৌম্বকীয় ভালোবাসার দৃশ্যের সাক্ষীটির মনটা পরম মমতায় ভরে উঠল। আজকের যুগের দেহসর্বস্ব ভালোবাসার ভিড়ে এমন নিখাদ ভালোবাসার গভীরতা পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ কি প্রতিদিন মেলে?  

২/
কেউ ভাবেনি বিয়েটা টিকবে। মেয়েটি নিজেও না। স্বামী প্রবাসী, বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে কিন্তু স্ত্রীকে নিতে পারছেনা। মেয়েটি অত্যন্ত মেধাবী, যতদিনে স্বামীর তাকে নেয়ার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হোল ততদিনে সে লেখাপড়ার মধ্যাবস্থায়, পড়াশোনা শেষ না করে সে কিছুতেই যাবেনা। স্বামী বলতে শুরু করল সে আবার বিয়ে করবে, মেয়েটি বলল, ‘তাহলে আমি আর গিয়ে কি করব?’ স্বামী ছুটিতে দেশে এসেছে, স্ত্রী যাবেনা। আত্মীয়স্বজন ভাবছে এই বিয়ে কিছুতেই টিকবেনা। এমন এক অবস্থায় ওরা দু’জনেই এলো আমার কাছে। মেয়েটিকে বললাম সবকিছু ছেড়ে চলে যাও।

সে হতবাক হয়ে বলল, ‘আপনি একজন শিক্ষক হয়ে কি করে এমন একটি কথা বলতে পারলেন?’
বললাম, ‘শোন, শিক্ষক বলেই এ’কথা বলতে পারলাম। তোমার মেধা আছে। এই মেধা কেউ কেড়ে নিতে পারবেনা। আমি জানি একদিন তোমার লেখাপড়া ডিগ্রী ভবিষ্যত সব হবে কিন্তু সেদিন এই সম্পর্কের জন্য তোমার আফসোস হবে, ‘যদি আমি চেষ্টা করতাম, হয়ত আমার সংসারটা টিকত!’

সে বলল, ‘কিন্তু সে তো বলছে সে আবার বিয়ে করবে, তাহলে ওর সাথে গিয়ে আমার লাভ কি?’
বললাম, ‘রাগের মাথায় মানুষ অনেক কথাই বলে। তুমি পাশে নেই তাই তোমাকে ভয় দেখিয়ে সাথে নিতে চায়। এগুলো ভালোবাসাপ্রসূত অভিমান, বদনিয়ত নয়’।

সে আমার কথা বিশ্বাস করল। আমি আত্মীয় নই, স্বজন নই, নই কিছুই। কিন্তু সে আমার কথার ওপর ভরসা করে এত সাধের লেখাপড়া অসম্পূর্ন রেখে চলে গেল প্রবাসে, স্বামীর সাথে থাকার জন্য।

ক’দিন আগে সে জানালো সে দেশের এক বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে সে ভর্তি পেয়েছে। ফেসবুক প্রোফাইলে ওর ফুটফুটে সন্তান দু’টির মুখচ্ছবি সাক্ষ্য দিচ্ছে আজ সে সব পেয়েছে- স্বামী, সন্তান, শিক্ষার সুযোগ, সাফল্য, সুখ। সামান্য একটু ধৈর্য্য, সামান্য একটু অপেক্ষা, অনেক অনেক বিশ্বাস- এটাই ওর সাফল্যের চাবিকাঠি ছিল। কিন্তু আমরা অনেকেই এই ধৈর্য্যটুকু রাখতে পারিনা, যা চাই তার জন্য অপেক্ষা করতে রাজী থাকিনা, ভাবতে পারিনা যে অনেকসময় ভালোটুকু পাওয়া যায় খারাপের পরেই- এ’টুকু সময় স্থির থাকতে পারলে হয়ত আমরা অনেক কিছুই অর্জন করতে পারতাম যা অনেকে আজীবন সাধনা করেও অর্জন করতে পারেনা।

 ৩/
সেই চেনা পরিচিত রোগগুলো আবার ফিরে আসছিলভোরে অ্যালার্ম বাজবে বলে অ্যালার্ম বাজার আগেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। স্কুলে যখন বীজগণিত করতাম, কোন অংক না মিললে ঘুমের ভেতরেও মগজ অংক কষতে থাকত। ঘুমের মধ্যে সব অংক ঠিক ঠিক মিলে যেত, অনেক সময় ঘুম থেকে উঠে সেভাবে অংক করলে সত্যিই মিলে যেত! এখন ঘুমের মধ্যে কেবল কোম্পানীর ফাইলপত্র ঘাটতে থাকি, ঘুম শেষ হয়ে যায় কিন্তু কিছুতেই সব কাজ গুছানো শেষ হয়না।

 
প্রথম যেদিন কাজে গেলাম, অ্যাসিস্ট্যান্ট কন্ট্রোলার ডেভ বলল, ‘তোমাকে মাটিতে অবতরণ করার আগেই দৌড় শুরু করতে হবে বলে আমি দুঃখিত, কিন্তু আমরা খুব বেকায়দায় পড়ে গেছি, তোমার সাহায্য আমাদের খুব প্রয়োজন’।
সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘এখানে আমাদের জাতিসংঘের মত সব দেশের প্রতিনিধিই আছে।  সবাই তোমাকে সাহায্য করবে’।

তবু অনেক অনেকদিন পর কাজ শুরু করেছি, নতুন জায়গা- শরীরের ওপর, মনের ওপর চাপ যাচ্ছিল। তাই রোগগুলো প্রভাব বিস্তার করছিল বেশ।

 
প্রথমদিনই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এসেছিলো ক্যানাডার জর্ডান, হং কং- এর নেলসন আর পাকিস্তানের ফ্র্যান্সেসকা। লাজুক স্বভাবের ভারতীয় জেকব থাকে আশেপাশেই, প্রয়োজন হলেই এগিয়ে আসে, তারপর আবার ঢুকে পড়ে নিজের গর্তে। ক’দিনের মধ্যেই ভাব জমে গেল ভারতের স্বর্না, ঘানার জেরাল্ড, চীনের সানি, ক্যানাডার ডনার সাথে। অন্যরা থাকে আশেপাশেই, সুযোগ এলেই এগিয়ে আসে।

আজ সকালে গ্রুপলিডার লিন বলল, ‘আমরা কিছুদিনের মধ্যেই তোমাকে একজন সহযোগী দিতে যাচ্ছি। সে পর্যন্ত একটু কষ্ট করে চালিয়ে যাও’।

কিন্তু বেশিক্ষণ চালাতে হোলনা। কিছুক্ষণ পরই জেরাল্ড, নেলসন আর ফ্র্যান্সেসকা মিলে আমার বাকী কাজগুলো ভাগ করে নিয়ে বলল, ‘আজ তুমি বিশ্রাম নাও, কাজ আমরা করছি’। আস্তে আস্তে রোগমুক্ত হয়ে যাচ্ছি নিজের অজান্তেই!

এই বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্বের রূপ দেখে ভাবি, যে ফুলটিকে বাঁচাব বলে আমরা একদিন রক্ত ঝরিয়েছিলাম সে ফুলটিকে আজ আমরা নিজেরাই রক্তাক্ত ছিন্নভিন্ন করে ফেলছি। পৃথিবীর সকল প্রান্ত থেকে এসে একটি ভিনদেশে আমরা একত্রিত হতে পারি, অথচ নিজের দেশে নিজের মাটিতে আমরা ভাই ভাই এক হতে পারিনা! হা কপাল!

Sunday, March 3, 2013

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার কাছে একটি উপহার চাই

আমার কন্যা ঝালমুড়ি খাবে বলে বায়না করছিল। ঝালমুড়ি বানিয়ে এনে দেখি আমার বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ডাকলাম। বলল, ‘পরে খাব’। এখন আমি ওর পাশে বসে কম্পিউটারে খুটখাট আওয়াজ তুলে কাজ করছি, ওর কোন খবরই নেই। মায়ের পাশে শুয়ে আছে এটাই যেন মহাশান্তি!

 
কিছুদিন যাবত আমার মেয়ে আমার জামাকাপড় পরা শুরু করেছে। যখন ইচ্ছে হয় তখন সে আমার জামাকাপড় থেকে যেটা পছন্দ নিয়ে পরে। আবার কিছু খুব পছন্দ হলে নিয়ে নেয়। কি যে ভাল লাগে তখন! আর মাত্র ক’দিন পর আমার মেয়ের বয়স তেরো হবে। তেরো বছর আগে স্বাধীনতা দিবসের পরদিন সে নিজেও স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়ে পৃথিবীতে এসে পৌঁছুল। ও আমার বন্ধনমুক্ত হবার সাথে সাথে ডাক্তার নাহিদ আপা আমার সামনে ধরে বললেন, ‘দেখ, তোমার মেয়ে হয়েছে!’ ওর দিকে তাকিয়ে দেখি, ‘এ কি! জন্মালো আমার ভেতর থেকে, অথচ চেহারা সুরত এমনকি দেহের প্রতিটি ভাঁজ পর্যন্ত হাফিজ সাহেবের! অন্যায়, মহা অন্যায়!’ জন্মের সময় ওর দৈর্ঘ্য আমার কনুই থেকে হাতের সমানও ছিলোনা, কোলে নিতে ভয় পেতাম, মনে হত এত নরম, আঙ্গুল ভেঙ্গে যাবে হয়ত, কিংবা হাতের ফাঁক গলে পড়ে যাবে। আমার স্বাস্থ্য ভাল ছিলোনা কিন্তু কন্যা ছিল স্বাস্থ্যবতী। ওর ছিল চরম ক্ষুধা, একবার খেয়েই আবার ক্ষিদে লেগে যেত। নিজের অক্ষমতায় তখন চোখ ফেটে কান্না আসত। ননদিনীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তুমি কি ওর দুধ মা হবে?’ সাড়ে চার মাস থেকে বাধ্য হয়ে অল্প অল্প ডিম, কলা ইত্যাদি খাবার দিতে শুরু করলাম।

 ওর দু’মাস বয়সে যখন কাজে ফিরে যেতে হোল তখন একবার ভাবলাম চাকরী ছেড়ে দেই, যখন দেখলাম সম্ভব নয় তখন ঠিক করলাম ওকে সাথে নিয়ে যাব। শিক্ষকতার সুবিধা হোল ফাঁকে ফ্রি পিরিয়ড থাকে। তখন গিয়ে ওকে গোসল করিয়ে খাইয়ে আসতে পারতাম। বাকী সময় সে নিজে নিজে খেলত, সাথে থাকত পিয়ন রুবি, সাজেদা, সালেহা, মোমেনা আপা কিংবা দারোয়ান ভাই। ফ্রি পিরিয়ডে মেয়ের পেছনে সময় দেয়ার ফলে যখন বাসায় ফিরতাম তখন স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের খাতা জমে যেত দুই তিন প্যাকেট, রাদিয়ার জামাকাপড়ের ব্যাগ দু’টো, আমার ব্যাগ আর রাদিয়া মিলে ছয় সাতটা প্যাকেট। বাসায় তখন সবাই ভাতঘুমে অচেতন। প্রতিদিন ওদের ঘুম ভাঙ্গিয়ে দরজা খোলাতে আমার খুব খারাপ লাগত। কেউ ঘুমোলে এত মায়া লাগে, মনে হয় কারো ঘুম ভাঙ্গানো অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ। তবে কেউ জেগে ওঠা পর্যন্ত ঐ দশ পনেরো মিনিট এতগুলো প্যাকেট নিয়ে দরজার বাইরে অপেক্ষা করার পর মনে হত হাত দু’টো খসে পড়ে যাবে। যে দরজা খুলে দিত তাকে চুমো দিতে ইচ্ছে করত। কখনো কখনো আব্বা মসজিদে যাবার পথে আমাকে দেখে আধাপথ থেকে ফিরে আসতেন। রাদিয়াকে কোলে নিয়ে তিনতলায় উঠে চাবি দিয়ে দরজা খুলে আমাকে বাসায় ঢুকিয়ে দিয়ে আবার রওয়ানা হতেন। তখন আব্বাকে মনে হত যেন আকাশ থেকে নেমে আসা ফেরেস্তা।

এই কঠিন দিনও একসময় কেটে গেল। স্কুল ছেড়ে ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করলাম, খাতা টানাটানি বন্ধ হোল। আমার মেয়ে হাফিজ সাহেবের মতই হৃষ্টপুষ্ট আকার ধারণ করল। হামাগুড়ি দিতে দিতে একদিন হুট করে হাঁটতে শুরু করল। দেড় বছর বয়সেই নিজের হাতে ভাত খেতে শিখে গেল, দু’বছর বয়সে কাপড় পরা। তিন বছর বয়স হতে না হতেই সে মাতৃরূপে আবির্ভূত হোল। আমি খেতে বসলে চামচ দিয়ে তরকারী বেড়ে দেয়, খেলনা দিয়ে খেলা শেষ করে নিজেই তুলে রাখে, মাথা ব্যাথা করলে চুপচাপ পাশে বসে থাকে যদি কিছু প্রয়োজন হয়। এত লক্ষ্মী ছিল বলেই আমরা ওর দু’বছর বয়সে ওকে নিয়ে মটরসাইকেলে চট্টগ্রাম থেকে বরিশাল, চট্টগ্রাম থেকে টেকনাফ ঘুরে আসার সাহস করতে পেরেছিলাম। একদিন বিছানা গুছানোর পর ও বিছানায় বসে খেলছিল, আমি ঘর পরিস্কার করছিলাম। কাজ শেষে ওকে বললাম, ‘চাদরটা টেনে ঠিক করে দাও। তারপর চল নীচতলায় দাদুর বাসায় যাই’। সে বলল, ‘আম্মু, বেহেস্তে গেলে কি বিছানা গুছাতে হবে?’ বললাম, ‘না মা, ওখানে সব অটোমেটিক হবে, আমাদের কোন কাজ করতে হবেনা’। সে বলল, ‘তাহলে আব্বুকে বলনা আমরা মটরসাইকেলে করে বেহেস্তে চলে যাই! তাহলে তোমার কোন কষ্ট করতে হবেনা, আমারও অগোছালো করলে আর গুছাতে হবেনা’। তিন বছরের কন্যার কথা শুনে তো আমি থ!

 ওর ছ’বছরের সময় রিহামের অস্তিত্ব টের পেলাম। ছোট ভাইটার আগমনের আগেই আমার কন্যা দায়িত্বশীল বড়বোনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হোল। রিহাম আমার ভেতর বেশি নড়াচড়া করলে বলত, ‘বেবি, তুমি এত নড়াচড়া কর কেন? আম্মুর কষ্ট হয় তো!’ সারাদিন কাজ শেষে ঘরে ফিরলে হাত পা জ্বালা করত। অস্থির হয়ে যেতাম, কিন্তু বুঝতে পারতাম না কি করলে ভাল লাগবে। আমার ঐ অত্তটুকুন মেয়ে একদিন আমার হাতে পায়ে লোশান লাগিয়ে দিয়ে বলল, ‘দেখ আম্মু, এখন তোমার আরাম লাগবে’। সত্যিই আরাম পেলাম। তারপর থেকে আমার মেয়ে বাসায় ফিরেই আমার সেবায় লেগে যেত। সেই কন্যা এখন মায়ের মতই আমাকে খাবার সময় খেতে মনে করিয়ে দেয়, কাজে ডুবে থাকলে নামাজের জন্য বকা দেয়, ব্যাস্ত থাকলে রিহামকে নিজের সাথে ব্যাস্ত রাখে। মেয়ে যত বড় হচ্ছে ততই আনন্দের সাথে সাথে কষ্টের মাত্রাটাও বাড়ছে।

 যে মূহূর্তে আমার মেয়ে জন্ম নিলো সে মূহূর্ত থেকেই একটা ভাবনা আমার ভেতর কখনো জাগ্রত কখনো ঘুমন্ত অবস্থায় বড় হচ্ছে। আমার মেয়েটিকে আমি এত কষ্ট করে বড় করে একদিন কারো হাতে তুলে দেব। হয়ত সে আমার মেয়েকে আমার মত ভালোবাসবে না, যত্ন করবে না কিংবা মূল্যায়ন করবেনা। এটি এমন এক ক্ষেত্র যেখানে ওর লেখাপড়া, যোগ্যতা বা অন্য কোন মাপকাঠিই ওর সম্মান নিশ্চিত করতে পারবেনা যদি না তারা ওকে ভালবেসে আপন করে নেয়। আমার এত আদরের মেয়েকে কেউ কষ্ট দেবে তা ভাবতেই হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। অনেকেই সাহস দেন, ‘কি যে বলেন আপা, ও কত লক্ষ্মী মেয়ে! দেখবেন ওকে ওর স্বামী খুব আদর করবে’। কিন্তু একটা মেয়ের কি কেবল একটা ছেলের সাথে বিয়ে হয়? একটা মেয়ের তো বিয়ে হয় পুরো পরিবারটার সাথেই। একজন মানুষ কি এতগুলো মানুষকে সন্তুষ্ট করার ক্ষমতা রাখে? সবাই যদি সহনশীল এবং সহানুভূতিশীল না হয় তাহলে স্বামী ভাল হলেও কি কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়া যায়? এমন অনেক ভাবনাই তাড়িত করে আমাকে।

তবুও মেয়ে যত বড় হচ্ছে, মনে হয় যেন ওকে নিয়ে আমার পরিশ্রম আর স্বপ্ন ততই পূর্ণতার কাছাকাছি এগিয়ে যাচ্ছে। ও যখন আমার জামা পরে তখন এর মধ্য দিয়ে আমি এই পূর্ণতার প্রতিবিম্ব অবলোকন করেই হয়ত আনন্দে উদ্বেল হই। ভাবছিলাম একজন সরকারপ্রধান, বিশেষ করে যিনি নিজে একজন মা, যিনি তাঁর সকল নাগরিকের প্রতি সমভাবে মাতৃসুলভ, তিনি এই দেশের কল্যাণ এবং উন্নয়নশীল কর্মকান্ডে কতটা আবেগাপ্লুত হবার কথা! কিন্তু গত কয়েক মাসে আমার জন্মভূমিতে যে অগণিত মা সন্তানহারা হয়েছেন, অকালে বিনষ্ট হয়েছে অসংখ্য সম্ভাবনাময় জীবন এটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? তেরো বছর বয়সের কন্যাকে নিয়ে আমার কত স্মৃতি, কত স্বপ্ন, কত পরিকল্পনা! তাহলে যে সন্তানদের মায়েরা এতগুলো বছর ধরে তাঁদের সন্তানদের নিয়ে না জানি কত স্বপ্ন বুনেছিলেন, কত আশার প্রাসাদ গড়ে তুলেছিলেন তাদের কেমন লাগছে? যে পুলিশ ভাইটি মারা গেলেন তিনি যেমন এই বাংলা মায়ের সন্তান যে ছেলেটি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের ভালোবাসায় উদ্বেল হয়ে প্রতিবাদমুখর হতে গিয়ে মারা পড়ল সেও তো এই বাংলা মায়ের সন্তান। তাহলে ওরা কেন পরস্পরকে মারছে? কেন ভাবছেনা ওরা তো আমারই দেশবাসী, আমার ভাই, পাড়া প্রতিবেশী বন্ধু বান্ধব?!

মনুষ্যত্বের মৃত্যু মানুষের মৃত্যুর চাইতে অনেক বেশি ভয়ানক, পীড়াদায়ক।  আদর্শের মৃত্যু তার চেয়েও বেশি হৃদয়বিদারক। মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষের মাঝে যে চেতনা কাজ করেছে তা ছিল যেকোন মূল্যে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে হবে। স্বাধীনতার পর শেখ সাহেব সরকারপ্রধান ছিলেন, তিনি তালিকার পর তালিকা করার পরেও কেন রাজাকারের শাস্তির ব্যাবস্থা করেননি? কারণ স্বাধীনতার পর অধিকাংশ রাজাকারদের স্থানীয় জনগণই মেরে ফেলে। পাতি রাজাকারদের নিয়ে বাড়াবাড়ি করার পরিবর্তে তিনি চেয়েছিলেন জাতীয় ঐক্য এবং সংহতিকে সমুন্নত করতে। তাঁর এই সিদ্ধান্তের ফলে পরবর্তী চল্লিশ বছর আমরা একটি এক ও অভিন্ন জাতি হিসেবে মিলেমিশে থেকেছি।

তবে আজ চল্লিশ বছর পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আবার কেন জেগে উঠল? কারণ আজ তাঁর কন্যার পরিস্থিতির কাছে তাঁর আদর্শ পরাজিত হয়েছে। তিনি তাঁর দলীয় নেতাকর্মীদের অন্যায় অত্যাচার অনাচার নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যার্থ্য হয়ে দমন নীতি এবং বাকস্বাধীনতা রহিত করার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর দলের লোকজন জানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের মাঝে কত তীক্ষরূপে বিদ্যমান। এর ধুয়া তুলে তারা একদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করতে পারেন, অপরদিকে দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়ে মানুষকে মূল প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা থেকে দূরে রাখতে পারেন। নইলে প্রধানমন্ত্রী নিজে সবার আগে দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁর কন্যাকে রাজাকার বেয়াইয়ের ছেলের সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ করিয়ে নিতেন, উদাহরণ স্থাপন করার উদ্দেশ্যে সবার আগে বেয়াইয়ের বিচার শুরু করতেন, তিনি নিজেই স্বীকার করতেন দেশের সমস্ত রাজাকার কেবল তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দলের সদস্য হতে পারেনা এবং কয়েকজন বুড়োকে ফাঁসি দিলেই বাংলাদেশের ঘাড়ে যে কোটি টাকার ঋণ, আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি কিংবা দেশের উন্নয়নে যে বার বার বাঁধা আসছে তার কোনটাই সমাধান হবেনা । কিন্তু দেশপ্রেমের ধ্বজাধারীরা দেশের আইন শৃংখলাকে কাঁচকলা দেখিয়ে আদালত অমান্য করে, আল্লাহ রাসূল এবং ইসলামকে হেয় করে দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে বসল। তাদের সামাল দিতে পুলিশ বাহিনীকে নিয়োগ দিতে গিয়ে দেশে গণহত্যা শুরু হয়ে গেল। আমি নিশ্চিত তিনি কিছুতেই এই পরিস্থিতি চাইতে পারেন না। কারণ তিনি তো শুধু নিজের দুই সন্তানের মা নন, এই মূহূর্তে তিনি পুরো জাতির মায়ের দায়িত্বে সমাসীন!

তাই ভাবি, আমরা কেন বুঝতে পারছিনা এদিকে আমরা মারামারি করে মরছি আর ওদিকে এমন কেউ ফায়দা লুটে যাচ্ছে যারা এই দেশটাকে ভালই বাসেনা? কেন আমরা এক হয়ে দেশটার জন্য কাজ করতে সংকল্পবদ্ধ হচ্ছিনা? কেন আমরা আমাদের ভাই বন্ধু আত্মীয় স্বজনের সাথে এমন বিষাক্ত আচরন করছি? কেন অকালে ঝরে যাচ্ছে এমন সব তাজা প্রাণ যাদের একাত্তরে জন্মই হয়নি, যারা এই দেশটাকে ভালোবাসতে শিখেছে কেবল, প্রশ্ন করতে শেখেনি?

ছোটবেলা থেকে বিদেশে বিদেশে কেটেছে। তন্মধ্যে ইন্ডিয়া ছিলাম বেশ কয়েক বছর। দেশের রাজনীতির ব্যাপারে কিছু জানা ছিলোনা, কিন্তু ছোটবেলা থেকে বাবা চাচা দাদার মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতে শুনতে দেশটাকে ভালবাসতাম প্রচন্ডভাবে। সাথে ছিলো আমার বামপন্থী পরিবারের আদর্শ- আগে চাই বাংলাভাষার গাঁথুনী, তারপরে ইংরেজী শিক্ষার গোড়াপত্তন। তাই দেশ থেকে বই আসত ভুরি ভুরি- গল্প, উপন্যাস, কবিতা, বিজ্ঞান, ইতিহাস আর মুক্তিযুদ্ধের বই, মুক্তিযুদ্ধের অনেক অনেক বই- পড়তে পড়তে মনে হত আমিও স্টেনগান নিয়ে যুদ্ধ করছি শত্রুপক্ষের সাথে, কচুরীপানার নীচে লুকিয়ে গাদাবন্দুক উঁচিয়ে রেখেছি শত্রুর দিকে তাক করে! সেই আমাকে একদিন আমার ভারতীয় প্রতিবেশি, বান্ধবী অর্চনা এসে খুব খুশি হয়ে বলল, ‘জানো, আমরা তোমাদের ফারাক্কায় পানি দেয়া বন্ধ করে দিয়েছি। আমরাই তো বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি, তাই এটা আমাদের অধিকার!’ হঠাৎ আমার চেহারার দিকে নজর পড়ায় সে ভয় পেয়ে গেল, ‘সরি, তুমি প্লিজ আমার ওপর রাগ কোরনা। এগুলো আমাদের ক্লাসে শেখানো হয়েছে। আমি ভেবেছি তুমিও জেনে খুশি হবে!’

আমি দেশকে ভালোবাসি, তাই দেশের এই অবস্থা সহ্য করতে পারিনা যেখানে এক ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত হয় আরেক ভাইয়ের হাত, যেখানে নিত্য ঝরে পড়ে মুকুলিত প্রাণ, যেখানে কেবল শ্বাপদের হুঙ্কার আর পশুত্বের জয়জয়কার, যে দৃশ্য দেখে দূর হতে হায়ানারা হাসে। আমি চাই একদিন আমার সন্তানরা দেশে ফিরে যাবে। সেখানে থাকবে মনুষ্যত্বের জয়জয়কার, আমরা সবাই এক হব দেশটাকে গড়ে তোলার জন্য মালয়শিয়া কিংবা সংযুক্ত আরব আমীরাতের মত, আমাদের আদর্শ হবে সমুন্নত এবং আমাদের বিশ্বাস হবে অপরাজিত। একটি দরদী নেতৃত্বই আমাদের সন্তানদের জন্য এমন একটি জন্মভূমি উপহার দিতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দেবেন কি এমন একটি জন্মভূমি আমাদের?