Sunday, June 16, 2013

আত্মপরিচয়


১/

গতকাল অফিস থেকে বেরোবার সাথে সাথে হাফিজ সাহেবের ফোন, ‘আমি হয়ত চাকরীটা ছেড়ে দিচ্ছি’।

বুঝলাম কিছু একটা সমস্যা  হয়েছে। জানি উনি অন্যের সমস্যা সমাধান করার জন্য পাহাড় কেটে সমান করে ফেলবেন, কিন্তু নিজের বেলা যদি একটা ‘উহ’ শব্দ করলে জান বাঁচে সেটুকুও করবেন না। বললাম, ‘সমস্যা হলে ছেড়ে দেন, রিজিকের মালিক আল্লাহ, যেখানে রিজিক থাকবে সেখানে ব্যাবস্থা হয়ে যাবে’।
 

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে এলে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি অবস্থা?’
বললেন, ‘সমস্যা মিটে গেছে’।
‘কি হয়েছিল?’
‘জেনারেল ম্যানেজার insist করছিল হোটেলের সমস্ত পণ্য আমাদের ব্যাবহার করে দেখা উচিত যেন আমরা গেস্টদের এর গুনগত মানের ব্যাপারে আশ্বস্ত করতে পারি। যখন সে জানলো আমরা হাতেগোণা কয়েকজন মদ্যপান করিনা তখন সে বলল, ‘অন্তত এক sip খেয়ে দেখ! নইলে বুঝবে কি করে এটার গুনগত মান কেমন?’ এই মহিলার অন্য দেশ বা সংস্কৃতি সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। কে বোঝাবে তাকে কেন আমি এই বস্তু এক sipও পান করে দেখতে পারবনা? আমি তখনই সিদ্ধান্ত নেই কিচ্ছু না বলে চাকরীটা ছেড়ে দেব। কিন্তু আমাদের হোটেলের এক শ্বেতাঙ্গিনী নিকোল এগিয়ে এসে বলল, ‘শোন, আমি একজন practicing ক্রিশ্চান। আমার বয়স ২৪ এবং আমি এখনও কুমারী, কোন পুরুষ আমাকে বিয়ের আগে স্পর্শ করতে পারবেনা। একইভাবে মদ এবং শুকরের মাংস আমাদের জন্য নিষিদ্ধ, কেউ আমাকে এগুলো পান করতে বা খেতে বাধ্য করতে পারবেনা, এক sip কেন এক ফোঁটাও না’। এ’সময় আমাদের আরেক ম্যানেজার ডেভিড এগিয়ে এলো। সে আমাকে গত চারবছর ধরে দেখছে। সে জেনারেল ম্যানেজারকে বোঝালো, ‘শোন, তুমি এই ব্যাপারটা ছেড়ে দাও। হাফিজ এখানে গত চারবছর ধরে কাজ করছে, সে নিজেও একজন ম্যানেজার, এখানকার সব প্রোডাক্ট সম্পর্কে ওর ভাল ধারণা র‍য়েছে, সুতরাং এই একটি বস্তু সে পান করে না দেখলে কোন সমস্যা হবেনা। তাছাড়া তুমি যদি এই ব্যাপারটি নিয়ে বাড়াবাড়ি কর আর ওরা ধর্মীয়ভাবে নিগৃহিত হবার কারণে হোটেলের বিরুদ্ধে মামলা করে দেয় তাহলে আমরা ভীষণ সমস্যায় পড়ে যাব। আর্থিকভাবে কত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে তা না হয় বাদই দিলাম, বদনাম হয়ে গেলে আমাদের হোটেলে আর লোকজন আসবেনা’। এভাবেই জেনারেল ম্যানেজার ঠান্ডা হয়ে গেল, সে আমতা আমতা করতে শুরু করল, ‘আমি তো ওদের বাধ্য করছিলাম না, কেবল বলছিলাম হোটেলের সব প্রোডাক্ট ব্যাবহার করে দেখতে! ওরা না চাইলে কোন সমস্যা নেই।’

 
ডেভিড ধর্মের চর্চা করেনা, কিন্তু অন্যের ধর্মবোধকে শ্রদ্ধা করে। আমার বিগত জীবনের অভিজ্ঞতা এটাই যে আপনি যখন কোন ধর্ম চর্চা করার সিদ্ধান্ত নেবেন, ধর্মকে মনে প্রানে শরীরে এবং জীবনে ধারণ এবং প্রতিষ্ঠিত করতে চাইবেন, তখন বিধর্মীদের সাথে আপনার যতটা না সমস্যা হবে তার চেয়ে বহুগুন বেশি সমস্যা হবে আপনার কাঙ্ক্ষিত ধর্মের সেসব লোকজনের সাথে যারা ধর্মচর্চা করেনা। আপনি হয়ত কেবল আপনার নিজের ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করছেন, প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন যেন আপনার কাজটি ত্রুটিমুক্ত হয়, ঘাটতি কিংবা বাহুল্য দোষে দুষ্ট না হয়, আর কেউ কি করছে না করছে তার প্রতি আপনার দৃকপাত করার সময় বা আকাঙ্খা কোনটিই নেই, কিন্তু তবু সেই ব্যাক্তি  আপনার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে যাবে যে নিজে ধর্মপালন করেনা কিংবা আংশিকভাবে করে, এই ভেবে যে ধর্ম পালন করার মাধ্যমে আপনি তাকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছেন। আপনি তো পুরোই বোকা বনে গেলেন, ‘আমি কি করলাম?!’

 
মাঝে মাঝে মনে প্রশ্নের উদয় হয়, ওরা কি এজন্য এমন করে যে ওরা অন্তরের অন্তঃস্থলে অনুভব করে তাদের নিজেদেরও এই কাজগুলো করা উচিত ছিল কিন্তু পৃথিবীর প্রতি লোভ, মোহ, কামনা তাদের ফিরিয়ে রেখেছে? কিংবা ভাবে আপনার নিষ্ঠা তাদের ফাঁকিবাজিটাকে প্রকাশ করে দিচ্ছে? এজন্যই হয়ত লেজকাটা শেয়াল চায় সব শেয়ালেরই লেজ কাটা যাক। তাই হয়ত আমার অন্তরঙ্গ বান্ধবী শিখা সাহা কিংবা ফ্যাং মে কিংবা ডনা জ্যাকসনের সাথে কোনদিন কোন সমস্যা হয়নি অথচ বানু, খানম আর খাতুনেরা মনে করে শুধু নামাজ পড়া আর নিজেকে আবৃত করাও অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি! এজন্যই হয়ত বিধর্মীরা অন্য ধর্মকে ততটা অবমাননা করেনা যেভাবে সেই ধর্মে জন্মগ্রহনকারী অথচ পালন করতে অনিচ্ছুক ব্যাক্তিরা আক্রমন করে থাকে। তাই যুগে যুগে জন্ম হয় সালমান রুশদী আর তাসলিমা নাসরিনদের। কেন যে তাঁরা ধর্ম পালনে ইচ্ছুক ব্যাক্তিদের তাঁদের মত চলতে দিয়ে নিজেরা নিজেদের মত চলতে পারেন না কে জানে!

 
 

২/

আমার পূর্বতন কর্মস্থলে আমি যখন নামাজের জায়গা খুঁজছি তখন পরিচয় হয় সোমালিয়ার বান্ধবী আয়শার সাথে। সে জানায় এখানে এক ঈজিপশিয়ান ভাই নোমাইর মু’মিন কোম্পানীর সাথে কথা বলে একটি রুম নামাজের জন্য নির্দিষ্ট করে নেন এবং সেখানে জায়নামাজ কিনে জমা করে নামাজের ব্যাবস্থা করেন। আমাদের বাংলাদেশীদের অধিকাংশই হয় নামাজ পড়েনা, কিংবা বাসায় গিয়ে পড়ে অথবা নিজের ডেস্কে বসে পড়ে নেয়। তাই এই রুমে সচরাচর বাংলাদেশীদের আগমন ঘটেনা। আয়শা আমাকে জানায় এই রুমে আগে কেবল পুরুষদের নামাজ হত। এখন মহিলাদের জন্য আলাদা করে সময় নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে এবং এর জন্য উদ্যোগ নিয়েছে ফিয়োনা রোচ। নাম শুনে একটু আশ্চর্য হলাম। বললাম, ‘ওর কি সম্ভাব্য স্বার্থ থাকতে পারে যে সে মহিলাদের নামাজের জন্য আলাদা সময় নির্ধারনের ব্যাপারে উদ্যোগ নিলো?’

আয়শা বলল, ‘কেন, সে নামাজ পড়ে তো!’

আমি তো হতবাক! ফিয়োনা ... রোচ ... নামাজ পড়ে! আমি তো পুরাই কনফিউজড!

ফিয়োনার নাম যেমন তেমনি ওর পোশাক আশাক দেখেও ধারণা করার কোন কারণ নেই যে সে মুসলিম। বুঝলাম, সম্ভবত সে নও মুসলিম এবং ইসলামের সকল ব্যাপারে তার পরিপূর্ণ ধারণা নেই। তবে সে এটুকু বুঝেছে যে নামাজ মুসলিম এবং অমুসলিমদের মাঝে পার্থক্য নির্ণয়কারী। তাই অফিসে সে যেভাবেই চলুক না কেন প্রতিদিন নামাজের সময় হবার সাথে সাথে সে ওজু করে নিজেকে সম্পূর্ন আবৃত করে নেয় এবং অফিসের কে কি ভাবল, কোন দৃষ্টিতে দেখল কোনকিছুর তোয়াক্কা না করে নিজেকে স্রষ্টার সামনে সমর্পন করে দেয়।
 

আমার বর্তমান কর্মস্থলের পাশের বিল্ডিংয়েই মসজিদ। এখানে ওজু করার সুব্যাবস্থার কারণে আমি অফিসে জায়গা থাকা সত্ত্বেও মসজিদে নামাজ পড়তে পছন্দ করি। তাছাড়া জুমার দিন এই মসজিদের খুতবাটাও দারুন হয়। মসজিদে গেলে প্রায়ই দেখি ডাউনটাউনের বিভিন্ন এলাকা যেখানে কাছাকাছি মসজিদ নেই কিংবা যেসব অফিসে নামাজের জায়গা নেই সেখান থেকে মহিলারা হেঁটে আসেন লাঞ্চটাইমে নামাজ পড়ার জন্য। এক ইরাকী মহিলা চারব্লক হেঁটে আসতেন আবার চারব্লক হেঁটে ফিরে যেতেন প্রতি ওয়াক্তে যেটা শীতকালে তিন ওয়াক্তও হতে পারে। ইদানিং আমি যে সময় বের হই তখন এক আফ্রিকান মহিলা আসেন যিনি কোর্টে কাজ করেন। প্রতিদিন দুপুরে যুহরের সময় পৃথিবীর দুই প্রান্ত থেকে আসা দু’টি মানুষ একত্রিত হই একই সত্ত্বার সামনে। এভাবেই আমাদের সকল পার্থক্য ঘুচে গিয়ে কেবল একটা পরিচয়ই অবশিষ্ট থাকে - আমরা দু’জনই একই সত্ত্বাকে ভালোবাসি এবং তাঁরই জন্য পরস্পরকে ভালোবাসি এবং এতটা ভালোবাসি যে একে অপরের জন্য যেকোন কিছু করতে পারি যদিও আমরা একে অপরের নামটিও জানিনা!

 

৩/

কিছুদিন আগে এক বান্ধবীর বাসায় দাওয়াত খেতে গিয়ে দেখি কিছু অতিথি এসেছেন যারা অপরিচিত। তাঁদের দেখে কিছুতেই অনুমান করতে পারলাম না সালাম দেব না আদাব বলব। তাই কোনপ্রকার সম্ভাষনের পরিবর্তে কেবল হাসি দিয়ে আগে বান্ধবীকে খুঁজে বের করলাম। তারপর কানে কানে জিজ্ঞেস করে নিলাম, ‘সালাম দেব না আদাব বলব?’ সে বলল, ‘দেখে বোঝার উপায় না থাকলেও ওরা মুসলিম। আপনি সালাম দিতে পারেন’।

 
এঁরা আশ্চর্যজনক কৃতিত্বের সাথে নিজেদের অস্তিত্ব থেকে তাঁদের ধর্মীয় পরিচয় বাদ দিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের নামধাম, চেহারাসুরত, কথাবার্তা, পোশাক আশাক থেকে সন্তান সন্ততি পর্যন্ত কিছুই দেখে বোঝার উপায় নেই তাঁরা মুসলিম। দাওয়াতে যাবার আগে থেকেই অত্যন্ত ক্লান্ত ছিলাম। দাওয়াতে উপস্থিত সুধীমন্ডলীর সাহচর্যও তেমন স্বস্তিকর ছিলোনা। তাই বান্ধবী এবং আমাদের খুব কাছের এক ভাবীকে বিদায় জানিয়ে বাসায় এসে ঘুমিয়ে সময়ের সদ্ব্যাবহার করলাম।
 

পরে বান্ধবী ফোন করে জানালেন আমাদের ভাবীসাহেবা, যিনি নিজেও আধুনিকা, এক মজার কান্ড করেছেন। ভাবীও এসে আমার মতই কনফিউজড ছিলেন। তবে তিনি এই সমস্যার সমাধান করেছেন অন্যভাবে। গৃহকর্ত্রীর ব্যাস্ততা দেখে তিনি তাঁকে বিরক্ত না করে অতিথিদের সন্তানদের সাথে খানিকক্ষণ কথা বললেন, তাদের নামধাম জিজ্ঞেস করলেন। তারপর তিনি গিয়ে অতিথিদের নমস্কার করেন। খাওয়াদাওয়ার পর গল্প করতে করতে তিনি তাঁদের বার বার বৌদি সম্ভাষন করতে থাকলে তাঁরা অত্যন্ত বিব্রত বোধ করতে থাকেন। তাঁরা গৃহকর্ত্রীকে অনুরোধ করেন ভাবীকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলার জন্য। বান্ধবী নিজেও ভাবীকে এই বিষয়ে বলতে বিব্রত বোধ করতে থাকেন। তাই তিনি ইশারায় বলার চেষ্টার করেন। কিন্তু ভাবী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তাঁকে আশ্বস্ত করেন, ‘না ভাবী, আপনি একদম চিন্তা করবেন না। আমি বাচ্চাদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হয়ে নিয়েছি যে এঁরা হিন্দু। তাঁদের প্রতি আমার ব্যাবহারে আপনি কোন ত্রুটি খুঁজে পাবেন না’।
 

এভাবেই সমাপ্ত হয় বান্ধবীর অভূতপূর্ব দাওয়াতপর্ব!

Saturday, May 25, 2013

অনুগ্রহ

১/

চাকরী পেয়েছি শুনে এক বান্ধবী ফোন করলেন, ‘ভালোই তো, মানুষ ক্যানাডায় এসে ডিগ্রীর পর ডিগ্রী, কোর্সের পর কোর্স করেও চাকরী পায়না। আর আপনি কিচ্ছু না করে, এমনকি চেষ্টাও না করে একের পর এক ক্যানাডার সেরা কোম্পানীগুলোতে কাজ করে চলেছেন!’ ভেবে দেখলাম কথাটা আসলেই ঠিক। আহামরি কোন যোগ্যতা নেই, উচ্চাভিলাষ এবং অধ্যাবসায় উভয়ের অভাব, অথচ কিভাবে কিভাবে যেন রেজুমিটার ওজন বাড়তেই রয়েছে!

ক্যানাডায় এসে CRTP নামে একটা কোর্স করেছিলাম। এই কোর্সের মাধ্যমে তারা নিজের দেশে উচ্চপদে কাজ করে আসা অভিবাসীদের এখানকার কর্মক্ষেত্রে পুণর্বাসিত হবার যোগ্য করে গড়ে তোলে। সে সূত্রে নানান দেশের বেশ কিছু বন্ধুবান্ধবের পাশাপাশি একটি বৃহৎ গ্যাস কোম্পানীতে অ্যাডমিন হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা জুটে যায়। তারপর কিছুদিন ঘাপটি মেরে বসে থাকি বাসায়। আচানক একদিন চাইনিজ বান্ধবী জেনী (ওর চাইনিজ নাম ফ্যাং মে, ওরা বিদেশে আসার আগে নিজেই নিজের একটি ইংরেজী নামকরন করে নেয়) ফোন করে জানায় সে যে বিখ্যাত অয়েল কোম্পানীতে কাজ করে সেখানে একটি পজিশনের জন্য সে তার বসকে আমার কথা বলেছে। বস আমাকে বাসা থেকে ডেকে ইন্টারভিউ নিয়ে চাকরী দিয়ে দেন। মসজিদের পাশে অফিস- কাজ করি, খাই দাই, ঘুরি ফিরি আর মসজিদে নামাজ পড়ি।

তারপর চাকরী ছেড়ে দিয়ে CELTA কোর্স করলাম দেশে ফিরে যাব বলে। কিন্তু কপালে না থাকলে কি আর যাওয়া যায়? সমস্ত সংসার বাক্সে ভরে চলল এক বছর। তারপর একদিন আবার বাক্সপ্যাটরা খুলতে শুরু করলাম। এ’সময় আমার প্রভু সিদ্ধান্ত নিলেন, ‘চল তোকে এবার পৃথিবীর সেরা দশটি কোম্পানীর একটিতে কাজ করিয়ে দেই, দেখি তুই কি করিস!’ কি আর করব? চাকরীতে গিয়ে প্রথমেই তাঁর সামনে মাথা নত করার একটা জায়গা খুঁজে বের করলাম। পৃথিবীব্যাপী মুসলিমদের এক বিশাল সম্পদ সালাম। একটি ‘আসসালামু আলাইকুম’ সম্ভাষন সাদা কালো, এশিয়ান আফ্রিকান ইউরোপিয়ান, বস ক্লিনার সব পার্থক্য নিমিষেই ঘুচিয়ে দিয়ে দু’জন সম্পূর্ন অপরিচিত ব্যাক্তির মাঝে গড়ে তোলে হৃদয়ের বন্ধন অথচ দু’জন একে অপরের নামও জানেনা! এভাবেই বন্ধুত্ব হয় সোমালিয়ার আয়শার সাথে। আয়শার মাধ্যমে পরিচয় হয় নোমাইর ভাইয়ের সাথে। আল্লাহ মিশরীয়দের রহমত করুন। নোমাইর ভাই কোম্পানীর সাথে আলাপসাপেক্ষে একটি রুম স্থায়ীভাবে নামাজের জন্য বুক করে রেখেছেন যেখানে কাবার্ডের ভেতর সারি সারি জায়নামাজ!

ওখানে যেদিন কন্ট্র্যাক্ট শেষ হোল সেদিনই খবর পেলাম আগে যে অয়েল কোম্পানীতে কাজ করতাম সেখানে আবার চাকরী হয়ে গিয়েছে। জেনীর চাপে পড়ে ইন্টারভিউ দিলেও ভরসা ছিলোনা চাকরী হবে কারণ এবারের কাজটা ক্যাল্গেরী অফিসে বসলেও ক্যাল্গেরীর নয়, রেইনবো লেকের। যে দু’জন তাদের পছন্দের তালিকায় ছিল তার মধ্যে আমি ছাড়া অন্যজন রেইনবো লেকে কাজ করেছে তিনবছর। কিন্তু আরেক চাইনিজ বান্ধবী জেইন (ইয়ান জিং) অসাধ্য সাধন করল। ইন্টারভিউর পর পর সে রেইনবো লেকে চলে গেল এবং ওখানকার বস জো’র কাছে আমার যোগ্যতা নিয়ে সত্যমিথ্যা কি বলেছে আমি জানিনা কিন্তু সকল সম্ভাবনার উর্ধ্বে আমার চাকরী হয়ে গেল! আজ মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে পড়তে ভাবছিলাম, মানুষের এই ভালোবাসা পাবার কোন যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও আমার করুণাময় প্রভু আমার চলার পথকে কতই না প্রশস্ত করে দিয়েছেন! অতঃপর আমি আমার প্রভুর কোন কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করব?


২/

ক’দিন আগেই বাসা বদলেছি, এক বছরের লীজ। কিন্তু বাড়ীওয়ালা বেঈমানী করে কোন কথাবার্তা আলাপ না করে বাড়ী বিক্রি করে দিল। আমরা পড়ে গেলাম বিশাল সমস্যায়। ক্যাল্গেরীতে ইদানিংকালে অভিবাসীসহ অন্যান্য এলাকা থেকে চাকরীপ্রত্যাশী এত লোক এসেছে যে এক একটি বাড়ীর জন্য পঁচিশ থেকে একশ আবেদনপত্র জমা পড়ছে, বাড়ীওয়ালারা বিরক্ত হয়ে ফোনই উঠাতে চায়না, উঠালে বলে বাড়ী ভাড়া হয়ে গিয়েছে। দুইমাস ধরে হন্যে হয়ে বাড়ী খোঁজার পর একদিন এক ভাই অনুমতি চাইলেন একটি মুসলিম ওয়েবসাইটে অ্যাড দিতে যে একটি মুসলিম পরিবারের বাসস্থান প্রয়োজন। পরদিন এক লোক ফোন করলেন তাঁর বাড়ীটি দেখতে যাবার জন্য। গিয়ে দেখি এলাকাটি যেমন সুন্দর, বাড়ীটিও তেমনি। বিশাল বাড়ী, ঘাসবিছানো এবং পাকা করা বিরাট আঙ্গিনা, গাছপালা, সর্বত্র যত্নের ছাপ। ভদ্রলোক লেবানিজ, ডাউনটাউনে বিরাট ব্যাবসা। স্ত্রীটিও চমৎকার। ছয় ছয়টি সন্তান একহাতে সামলান, বিশাল ভ্যানে করে বাচ্চাদের আনানেয়া করেন, বাচ্চাদের বয়স আড়াই থেকে এগারো বছরের মধ্যে। সম্পূর্ন পর্দানশীন এই মহিলা কিভাবে ছয় ছয়টি সন্তান সামলে এত বিশাল ঘর এত টিপটপ রাখেন এবং নিজে এত ফিটফাট থাকেন আশ্চর্য হয়ে গেলাম। বাচ্চাগুলো যেমন সভ্যভদ্র তেমনি ঘরটিও বাড়ী খোঁজার প্রচেষ্টায় আমাদের দেখা দুই শতাধিক ঘরের মধ্যে সবচেয়ে পরিস্কার, কোথাও কোন দাগ নেই, গন্ধ নেই, ঝকঝকে তকতকে। কিন্তু এই বাড়ীর ভাড়া আমাদের নাগালের অনেক বাইরে। তাছাড়া আমরা মানুষ মাত্র চারজন। চার বেডরুম, আড়াই বাথরুম, তিনটি ড্রয়িং রুম এবং তিনশ লোকের বসার মত আঙ্গিনা নিয়ে আমরা কি করব বা তা পরিষ্কার রাখব কিভাবে?  আমাদের অপারগতার কথা জানিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ভদ্রলোক নাছোরবান্দা। তিনি ভাড়া কমাতে কমাতে অর্ধেকে চলে এলেন। আমরা খুব আশ্চর্য হলাম। একদিকে আমরা কুকুরের বিষ্ঠা ভরা বাড়ীর বাড়ীওয়ালাদের দেমাগে বাঁচিনা আর ইনি কিনা আমাদের ধরে বেঁধে তাঁর বাড়ীতে রাখতে চান। জিজ্ঞেস করলাম, ‘ঘটনা কি?’  তিনি জানালেন সন্তানদের ইসলামের ওপর গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য ব্যাবসাপাতি বাড়ীঘর রেখে লেবানন চলে যাচ্ছেন। তিনি চান না তাঁর ঘরে কুকুর বিড়াল বা গার্লফ্রেন্ডওয়ালা কিংবা নাস্তিক কেউ থাকুক তা সে যতই ভাড়া দিক। তিনি চান এই ঘরে তাঁর অনুপস্থিতিতেও নামাজ পড়া, ইসলামের চর্চা অব্যাহত থাকুক। এর পরে আর কি বলা যায়? তিনিও কমালেন যতটা তাঁর পক্ষে সম্ভব হোল, আমরাও বাড়ালাম যতটা আমাদের সামর্থ্য। বাড়ীটাও পাওয়া যাবে ঠিক সেদিনই যেদিন আমাদের বর্তমান বাড়ীতে থাকার শেষ সময়সীমা। কি জানি, হয়ত আমার প্রভু চান আমরা কিছুদিন শান শওকতে থাকি! অতঃপর আমি আমার প্রভুর কোন কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করব?


৩/

অফিসে সেলফোন বাজছে দেখে দৌড়ে গিয়ে ধরলাম। ডেন্টিস্টের অফিস থেকে ফোন। জানাতে ফোন করেছে মঙ্গলবার ডাক্তারের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট। বললাম সেদিন কাজ আছে, সুতরাং তারিখ পরিবর্তন করতে হবে। সে আমাকে তারিখ পরিবর্তন করে পরের মাসের এক শনিবার সকাল ন’টায় সময় দিল। কিন্তু আমরা উভয়েই শুনতে পেলাম ডাক্তারের অফিসের অন্য ফোনে অপর রিসেপশনিস্ট আরেক রোগীকে একই তারিখ একই সময় অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিচ্ছে। ঘটনার কাকতালিয়তায় আমরা তিনজনই হকচকিয়ে গেলাম। আমাকে লাইনে রেখে উভয় রিসেপশনিস্ট পরস্পরের সাথে আলাপ করতে লাগল, তারপর জানাল, ‘সব ঠিক আছে’। আমি বললাম, ‘কিভাবে সব ঠিক আছে? অন্য রোগীকে তো সময় পরিবর্তন করে দিলে না’। সে বলল, ‘অন্য রোগীও তুমি’। আমি হতবাক হয়ে বললাম, ‘মানে?’ ‘মানে অন্য লাইনে তোমার হাজব্যান্ড ফোন করেছে তোমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট পরিবর্তন করার জন্য। সুতরাং আমরা দু’জনেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট পরিবর্তন করে একই সময় দিলেও একই রোগীকেই দিয়েছি। সুতরাং, সব ঠিক আছে!’

এমন অদ্ভুত ঘটনায় হাসলাম কিছুক্ষণ সবাই মিলে।


আরেকদিন সন্ধ্যায় মাছ রান্না করব, চুলায় পেঁয়াজ ভাজা হচ্ছে, আমার ছেলে কাঠি দিয়ে পেঁয়াজ নেড়ে নেড়ে রান্নার ভান করছে, আমি মাছ শেষ ধোয়া দিচ্ছি, আমার মেয়ে ধনিয়া পাতা বেছে রেডি করছে। খানিক পর পেঁয়াজ ফুটতে শুরু করল। ছিটকে গায়ে পড়তে পারে বলে পুত্রকে বললাম, ‘বাবা, পেঁয়াজ ফুটছে, এবার তুমি একটু দূরে সরে যাও’। সাথে সাথে শুনি সে বোনকে গিয়ে বলছে, ‘আপু, আম্মু বলেছে the pot is going to explode. চল আমরা দু’জনেই এখান থেকে পালাই!’ প্রথমে থতমত খেয়ে গেলেও পরে বুঝতে পারলাম ইংরেজী boil, sputter, explode এই সবগুলো শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হোল ‘ফুটছে’। সুতরাং, আমার ভাষা সম্পর্কে স্বল্পজ্ঞানী কিন্তু বিজ্ঞান বিষয়ে big+জ্ঞানী পুত্রের কল্পনাবিলাসের ফলাফল  হোল সে ‘ফুটছে’ শব্দের সম্ভাব্য অনুবাদ করেছে ‘explode’! ব্যাপারটা বেশ কিছুদিন আমাদের সবার হাসির খোরাক জোগালো।


জীবনের এই টুকটাক মজার ঘটনা, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আনন্দই জীবনে বৈচিত্র আনে, জীবনকে অর্থবহ করে। ক্ষণে ক্ষণে ঘটমান এসব ঘটনা দেখে ভাবি, অতঃপর আমি আমার প্রভুর কোন কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করব?

Monday, May 20, 2013

গিফট

উফ! ওর ভাইয়াটা যে কি! বড় ভাইটার সব দায়িত্ব নিতে নিতে মুমতাহিনা ক্লান্ত হয়ে গেল। কিচ্ছু হয়না ওকে দিয়ে। বন্ধুর জন্য একটা গিফট কিনবে সেটাও বলে কিনা, ‘মুমি আমার লক্ষ্মী বোন, আমার বন্ধুটার বিয়ে। যা না, একটা গিফট কিনে এনে দে!’ তাই এই সাতসকালে মোমেনা আন্টির তীক্ষ্ণ নজরদারীর সামনে ‘আপন উপহার বিতান’এর বিশাল সম্ভার থেকে কি নেয়া যায় ভাবতে ভাবতে হয়রান হচ্ছে মুমি। মোমেনা আন্টি অবশ্য আসলে অনেক নরম মনের একজন মানুষ, কিন্তু তাঁর চেহারাটাই সৃষ্টিকর্তা এমনভাবে গড়ে দিয়েছেন যে দেখলে মনে হয় তিনি সামনের ব্যাক্তির চেহারাচরিত্র গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। অথচ এই মূহূর্তে তিনি দোকানের পিচ্চিটাকে বসিয়ে ট্রান্সলেশন শেখাচ্ছেন। তিনি চান না সে সারাজীবন পিচ্চিগিরি করে যাক, তাই কাজ দেয়ার পর থেকেই ওকে লেখাপড়া করাচ্ছেন।
 



কার্ডের সেকশনের সামনে এসেই মুমির মাথা খারাপ হয়ে গেল। কি যে সুন্দর সুন্দর কার্ড! আচ্ছা, মানুষ এত দামী দামী গিফট না দিয়ে সুন্দর সুন্দর কার্ড দিতে পারেনা? এই জিনিসটা নষ্টও হয়না, এর আবেদনও সময়ের সাথে কমে যায়না, প্রতিবার কার্ডটা দেখলেই মনের ভেতর জেগে ওঠে এর সাথে সংশ্লিষ্ট সব স্মৃতি।

পাশেই কে যেন ডাক দিল, ‘শুনুন!’ নির্ঘাত ওকে দোকানের স্টাফ ভেবে বসে আছে! ভাবতেই পারে। মুমি প্রায়ই এসে মোমেনা আন্টিকে দোকান সামলাতে সাহায্য করে।

সে বলল, ‘জ্বী, আমি আপনাকে কি সাহায্য করতে পারি?’

লোকটা অল্পবয়সী, সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট পরা, চেহারায় বয়সের ছাপ না থাকায় কেমন যেন স্কুলড্রেস স্কুলড্রেস মনে হচ্ছে, বলল, ‘আমি একটা সমস্যায় পড়েছি। আমি কিছুদিনের মধ্যে বিয়ে করতে যাচ্ছি ইনশাল্লাহ। আমার হবু স্ত্রীর জন্য কিছু একটা উপহার কিনতে চাই। কিন্তু আমি কখনো মেয়েদের গিফট দেইনি, মানে মা খালা ফুপুদের যেসব গিফট দিয়েছি সেটা তো আর ওনাকে দেয়া যাবেনা, আপনি কি কিছু পরামর্শ দিতে পারেন কি কিনতে পারি?’

‘আপনি কি জানেন তিনি কি পছন্দ করেন?’

‘তেমন একটা ধারণা নেই, শুনেছি পড়তে ভালবাসেন, কিছু কিছু লেখালেখিও করেন’।

‘তাহলে আপনি তাঁকে কোন ভাল বই, অথবা ডায়রী বা কলম দিতে পারেন ... সাথে সুন্দর একটা কার্ড (উফ, এইটা যে কেন বলল!) ... আচ্ছা, আপনার বাজেট কেমন?’

‘সে যা চাইতে পারে তার সবটুকু এবং যা না চায় তার একশগুন, যদি আল্লাহ আমাকে সামর্থ্য দেন’, স্মিত হাসল লোকটা।

উত্তর শুনে মুমির চোখ কপালে, বুঝল বিয়ের আগেই প্রেমে পড়ার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে বসে আছে এই লোক, কিন্তু এই অদ্ভুত বাজেটে কি কেনা যায়?

 

লোকটাকে নিয়ে বইখাতা কলমের সেকশনে যাবার পথে জুয়েলারী সেকশনের সামনে এক সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়ায় মুমি। মোমেনা আন্টি ভারী সুন্দর একটা লকেট এনেছে, চারদিকে লতাপাতা ফুল আর মাঝখানে ‘আল্লাহ’ লেখা। ছোট্ট একটা জিনিস, কিন্তু লকেটটা গোল্ডের, ওর সামর্থ্যের অনেক বাইরে, তাই প্রতিদিন তাকিয়ে দেখেই মনের সাধ মেটায় মুমি আর ভাবে কেউ যেন এটা না কেনে, একদিন পয়সা জমিয়ে ঠিক লকেটটা কিনে নেবে সে।

লোকটা একটা মোটা ব্রেসলেট দেখিয়ে বলে, ‘আচ্ছা, এটা কেমন?’

কল্পনার জগত থেকে বাস্তবতায় ফিরে আসে মুমি, ‘উনি যদি খুব ধনলিপ্সু না হন তাহলে এটা তাঁর ভাল লাগবেনা – এটা অনেক বেশি ভারী কিন্তু এর কোন ছিরিছাঁদ নেই। সরি, কথাটা কেমন যেন চাঁছাছোলা টাইপের হয়ে গেল’। নিজের ব্যাবহারে নিজেই লজ্জা পায় মুমি।

‘নাহ, আমি এমনটা পছন্দ করি। সরাসরি কথা বলাই ভাল, কাজের সুবিধা হয়, কনফিউশন হয়না’।

বেচারা ওর লজ্জা ঢাকার জন্য কত যে অনেস্টির বয়ান দিচ্ছে!

লোকটা আরো কয়েকটা জিনিস দেখল। ওর চোখ বারবার চলে যাচ্ছে ছোট্ট লকেটটার দিকে, ওটা আবার না নিয়ে যায়! অবশেষে লোকটা হাত বাড়ালো ওর প্রিয় লকেটটার দিকে, ‘হুমম, আমি এটাই নেব ঠিক করেছি’। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল মুমির, তবে একটা মূহূর্তের জন্য, তারপর মনে হোল, লোকটির স্ত্রী লকেটটা পেয়ে কত খুশি হবে, ছোট্ট একটা জিনিস কিন্তু এটা ধারণ করে আছে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান নামটি!

 

লোকটি বলল, ‘আমি এর সাথে একটি কলম আর একটি কার্ড দিতে চাই, আপনি কি আমাকে সাহায্য করতে পারেন?’

দেখেশুনে একটু পুরোনো ধাঁচের একটি কলম পছন্দ হোল মুমির। এসব কলম আজকাল হয়ত কেউ তাকিয়েও দেখেনা, কিন্তু বহুকাল আগে রাজরাজড়ারা এ’ধরনের কলম ব্যাবহার করতেন। লোকটারও মনে হোল কলমটা খুব পছন্দ হোল। কার্ড কিনতে গিয়ে লোকটা ওর পছন্দ দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি দেখছি দোকানের কোথায় কি আছে বেশ ভালোভাবেই জানেন, আপনি কি এই দোকানে অনেকদিন ধরে কাজ করেন?’

ঠোঁট কামড়ে ধরে মুমি, ‘আমি এই দোকানে কাজ করিনা ভাই, মাঝে মাঝে এসে মোমেনা আন্টিকে সাহায্য করি যখন কাজ খুব বেশি থাকে। কিন্তু আজ এসেছি গিফট কিনতে’।

‘সরি সরি সরি’, ভীষণ লজ্জা পেল লোকটা, ‘আমি তো আরো আপনাকে দোকানের স্টাফ ভেবে ...’, শীঘ্রই সামলে নিলো সে, ‘আচ্ছা, শোধবোধ করে দেই। আপনি কি কিনবেন বলুন, এবার আমার আপনাকে সাহায্য করার পালা’।

মুমি কিছুক্ষণ ‘না, দরকার নেই, কি দরকার’ টাইপের ভদ্রতা করে পরে ভাবল আসলেই তো সে আগে কখনো ছেলেদের জন্য গিফট কেনেনি, বাবা চাচা ভাইদের জন্য যা কেনে তা তো আর একটা লোকের বিয়ের গিফট হতে পারেনা! এক্ষেত্রে একজন পুরুষ হয়ত তাকে ভাল পরামর্শ দিতে পারবে। ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলে সে। লোকটা ঝটপট বলে, ‘আপনার ভাইয়ের বন্ধু কি ধরনের মানুষ? তাঁর রুচিপছন্দ কেমন?’

‘ভাইয়ার বন্ধুদের আমি কেবল নামেই চিনি, তাদের ব্যাপারে তেমন কিছু জানিনা। এই ভদ্রলোক সম্ভবত পড়তে খুব পছন্দ করেন’।

‘তাহলে বই দিন’।

‘কিন্তু কি ধরনের বই দেব? একেকজনের রুচি পছন্দ তো একেক রকম। তাছাড়া ভাইয়া এত্তগুলো টাকা দিয়েছে, একটাকাও ফেরত নেয়া যাবেনা। বইয়ের দাম তো কম। কিভাবে এতগুলো টাকা খরচ করব?’

‘চলুন, আমি দেখাচ্ছি’।

খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল দু’জনে মিলে অল্পকিছুক্ষণের ভেতরেই অনেকগুলো বই একত্রিত করে ফেলেছে। বইয়ের ব্যাপারে লোকটার রুচি বেশ ভাল। কিন্তু এতগুলো বই সে আল্গাতেও পারবেনা, এখানেই রেখে যেতে হবে, পরে ভাইয়া এসে নিয়ে গেলে ভাল, নইলেও ওর দায়িত্ব শেষ। সব হিসবটিশেব করে দেখা গেল সাতটাকা বাকী। ঐ টাকা দিয়ে ভারী সুন্দর একটা কার্ড কিনে নিলো মুমি।

 

কেনাকাটা শেষে লোকটা ওর শখের লকেটটা, ওর পছন্দের কলমটা আর ওর প্রিয় কার্ডটা নিয়ে চলে গেল। মুমি পছন্দ করা বইগুলো মোমেনা আন্টির কাছে জমা রেখে কার্ডটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল, বুকে সামান্য একটু চাপা কষ্ট, কিন্তু মোমেনা আন্টিকে আজ কেন যেন অনেক বেশি উচ্ছ্বল দেখাচ্ছে, এতেই ওর দিনটা সুখময় হয়ে উঠল!

 

পরের কথাঃ

মুমতাহিনাদের বাসায় আজ অনেক মেহমান আসার কথা। একজনকেও সে চেনেনা। কিন্তু সারাদিন কাজ করে করে হয়রান হয়ে গেল। আম্মু বারবার বলছে, ‘তোকে এত কাজ করতে কে বলেছে? যা, তুই তোর রুম গোছগাছ কর’। কিন্তু মা কি আর একা একা এত কাজ সামলাতে পারবে? সে বলে, ‘আম্মু, আমার রুম কি ভাইয়ার রুম পেয়েছ? আমার রুম সবসময় গুছানো থাকে। তোমার ডিম ছিলতে হবেনা। তুমি শুধু ইন্সট্রাকশন দাও, বাকীটা আমি আর রহিমা খালা মিলে করতে পারব’।

 

বিকালে মেহমান এলো। মহিলারা অন্দরমহলে আর পুরুষরা ড্রয়িংরুমে। মোমেনা আন্টি, যিনি কিনা দোকান ছেড়ে এক মূহূর্তের জন্যও নড়েন না, উনিও এলেন! একজন খালাম্মা মুমিকে খুব আদর করে কথাবার্তা বলতে লাগলেন। সন্ধ্যায় মা মুমিকে একদিকে টেনে নিয়ে জানালেন, ‘এরা তোকে দেখতে এসেছিলেন। কিন্তু ওদের তোকে এত পছন্দ হয়েছে যে ওরা আজই আকদ পরিয়ে রাখতে চান। তুই কি বলিস?’

মুমি একটু অবাক হোল, কিন্তু খুশিও হোল। ওর বান্ধবীদের অনেককেই হবু শ্বশুরবাড়ীর লোকজনের সামনে প্যারেড করে নিজের সৌন্দর্য এবং যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে বিয়ে করতে হয়েছে। এরা তো ওকে বুঝতেই দেননি যে ওরা ওকে দেখতে এসেছেন। ওদের বাড়ীর পুরুষরা তো ওকে দেখেইনি! ছেলেটাও না দেখে রাজী হয়ে গেল! ভাল লাগল ওদের আচরন। তাই বলল, ‘তোমরা নিশ্চয়ই আগেই খোঁজখবর সেরে রেখেছ। তোমাদের বিবেচনার ওপর আমার কোন কথা নেই। তবে ছেলে আমাকে না দেখেই রাজী হয়ে গেল?’

মা বললেন, ‘সে তোকে দেখেছে। দেখে অত্যন্ত পছন্দ করেছে। আমি তাহলে যাই, তোর আব্বাকে জানাই’।

মুমি ভাবলো, ‘চেহারা দেখেই পছন্দ করে বসে আছ বাপু! তোমার মাকে ভাল লাগল দেখেই রাজী হলাম, তুমি কি চিজ তা আল্লাহই জানেন!’

 

কিছুক্ষণ পর ওর মা আর হবু শ্বাশুড়ি রুমে ঢুকলেন, ‘এই যে দেখ উনি তোর জন্য কত্ত সুন্দর একটা ড্রেস এনেছেন! চল, পরে নে’।

শ্বাশুড়ি বললেন, ‘মাগো, আমার ছেলেটাকে বলেছিলাম আমার হবু মেয়েটার জন্য একটা আংটি কিনতে, কিন্তু আমার গাধা ছেলেটা এগুলো নিয়ে এসেছে। প্যাকেটটা খুলে দেখ তোমার পছন্দ হয় কিনা। ওকে কিন্তু তোমারই মানুষ করতে হবে মা’।

ওকে পোশাক পরিবর্তনের জন্য তাগাদা দিয়ে দু’জনেই চলে গেলেন। ও জামাটা বদলে ভাবল, বিনা নোটিসেই নতুন জীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছে সে, শেষবারের মত নিজের করে দম নেয়ার জন্য কয়েকটা মূহূর্ত নিলে নিশ্চয়ই ঘোরতর কোন অন্যায় হবেনা! বিছানায় বসতেই হাতে প্যাকেটটা লাগল। আনমনেই র‍্যাপিং পেপারটা খুলতে শুরু করল সে, ‘দেখি বাছাধন তুমি কি বস্তু!’

 

প্যাকেট থেকে বেরোল একটা পুরোনো ধাঁচের কলম, যেমনটা আগেকার দিনে রাজরাজড়ারা ব্যাবহার করতেন, লতাপাতায় ঘেরা একটা লকেট যার মধ্যখানে ‘আল্লাহ’ লেখা, আর একটা কার্ড যেটা আগেও ওর হাতের ছোঁয়া পেয়েছে, তাতে লেখা, ‘আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন, ‘কি বোকা ছেলে রে বাবা! না দেখেই বিয়ে করতে রাজী হয়ে গেল? কিন্তু আমি চাইনি যাকে আমি সবচেয়ে বেশি সম্মানের পাত্রী মনে করি তাকে এমন অযাচিত পরিস্থিতিতে ফেলতে যেখানে সে কষ্ট পেতে পারে, অসম্মানিত বোধ করতে পারে। তাই সৃষ্টিকর্তার বিধান অনুযায়ী আপনার সান্নিধ্যে কিছু সময় কাটালাম, আপনাকে জানার চেষ্টা করলাম, নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। ভাবছেন, কয়েক মিনিট একটা মানুষের সাথে কথা বললেই বুঝি তার ব্যাপারে কোন সম্মক ধারণা করা যায়? আসলে কিন্তু যায়। ঐ অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি বুঝেছি আপনি আল্লাহকে ভালোবাসেন; জীবনের পংকিল দিক আপনাকে কখনো স্পর্শ করেনি তাই আপনি সরলমনে সবাইকে বিশ্বাস করেন এবং সাহায্যের হাত নিয়ে এগিয়ে আসেন; আমার মতই আপনি বই পড়তে ভালোবাসেন এবং পার্থিব সম্পদের প্রতি আপনি নিরাসক্ত; নিজের চাইতে আপনি অপরের সুখকে প্রাধান্য দিতে পারেন এবং আপনার রুচি বেশ উন্নতমানের। কি ঠিক বলিনি? বাকীটাও কিন্তু আমি মিথ্যে বলিনি। আমি আসলেই চাই আমার সামর্থ্যের মধ্যে সবচেয়ে ভালোটুকু আপনাকে দিতে যেহেতু আপনিই মায়া দিয়ে মমতা দিয়ে আমাদের সংসারটাকে বেঁধে রাখবেন; যেহেতু আপনিই ভোরবেলা আমাকে নামাজের জন্য ডেকে তুলবেন; যেহেতু আপনিই আমাকে অন্যায়ের দিকে অগ্রসর হতে দেখলে বাঁধা দেবেন; যেহেতু আপনিই আমার সামর্থ্যের অভাব দেখলে নিজের প্রয়োজনের কথা চেপে যাবেন – তাই আপনাকে আমি তাও দিতে চাই যা আপনি চান, আবার সেটাও দিতে চাই যা আপনি কোনদিন মুখ ফুটে বলবেন না। আপনি কবুল করলে আমি নিজেকেই গিফট করে দিতে চাই! কি, এবার বিয়ে করতে রাজী? না আরো বয়ান দেব?’

বাহ, এই অল্পবয়সী ছেলেটা এত বুদ্ধিমত্তার সাথে ওকে দেখে নিলো যে সে টেরই পেলোনা, এত সুন্দর একটা চিঠি লিখল যে ওর কলমটা তাকে গিফট করে দিতে ইচ্ছে করছে, এত সম্মান করল ওকে যে ওর নিজেকেই গিফট করে দিতে ইচ্ছে করছে! সে মনে মনে লাজুক হাসি হেসে একা একাই বলল, ‘কবুল!’

Wednesday, May 8, 2013

ঐক্য

বাসর রাতের যে সময়টা নবদম্পতিরা সচরাচর প্রেমালাপে বিভোর থাকে সে সময় এক বেরসিক মেয়ে তার সদ্য স্বামীর সাথে আলাপ করছিল, ‘শুনুন, আমরা দু’জন দু’টো ভিন্ন পরিবার থেকে, পৃথক পরিবেশ থেকে এসে একত্রিত হয়েছি। সুতরাং, আমাদের চিন্তা চেতনা, ধ্যানধারণা, কাজ করার ধরণ, সিদ্ধান্ত নেবার পদ্ধতি থেকে প্রতিটা বিষয়ে পার্থক্য থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। আবার এটাও সত্য একসময় আমরা পরস্পরের সাথে এতটাই সিঙ্ক্রোনাইজড হয়ে যাব যে একজন আরেকজনের চেহারা দেখেই বলে দিতে পারব সে কি ভাবছে বা কেমন অনুভব করছে। কিন্তু সে ব্যাপারটা দু’একদিনে ঘটবেনা। এর জন্য সময় লাগবে কয়েক বছর, সারা জীবনও লেগে যেতে পারে। এর মধ্যে খুঁটিনাটি থেকে বড় বড় ব্যাপারগুলো নিয়ে আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হবে, মনোমালিন্য হবে, তর্কাতর্কি হওয়া অস্বাভাবিক নয়, চুলাচুলিও হতে পারে। কিন্তু চলুন একটি ব্যাপারে আমরা সম্মত হই। আমাদের মধ্যে যা হবে তা বন্ধ দরজার এপাশেই রয়ে যাবে। এই দরজা খুলে যখন আমরা পৃথিবীর সামনে বের হব তখন নিজেদের মধ্যে যতই মাথা ফাটাফাটি থাকুক না কেন, জনসমক্ষে আমরা হব পরস্পরের শ্রেষ্ঠ বন্ধু। নইলে তৃতীয় কোন ব্যাক্তি আমাদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করার সুযোগ পাবে। আমরা একত্রিত থাকলেও যে কেউ চেষ্টা করবেনা তা নয়। কিন্তু সেক্ষেত্রে আমরা পরস্পরের সাথে ব্যাপারগুলো আলাপ করে সত্যতা যাচাই করে নেব, তা যতই বেদনাদায়ক হোক না কেন, যেন একে অপরের কাছে স্বচ্ছ থাকতে পারি এবং আমাদের মাঝে বিভ্রান্তির সৃষ্টি না হয়’।

এই পদ্ধতিটি শুধু যে একটি দম্পতি বা একটি পরিবারের মাঝে সৌহার্দ্য রক্ষা করার ক্ষেত্রে কার্যকর তা কিন্তু নয়, বরং এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করে একটি জাতি নিজেদের মধ্যে বিভেদগুলোকে মিনিমাইজ করে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। যেমন মুক্তিযুদ্ধের সময় কেউ ভাবেনি কে বড় কে ছোট, কে মুসলিম কে হিন্দু, সবার মাঝে একটাই চিন্তা কাজ করেছে - যেকোন মূল্যে শত্রুকে প্রতিহত করতে হবে, দেশের বিপন্ন অস্তিত্বকে রক্ষা করতে হবে। কিন্তু যুদ্ধোত্তরকালে আমরা আবার নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যগুলোকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে বিভাজিত হয়ে পড়েছি এবং বিভাজিত হতে রয়েছি। দুঃখজনকভাবে আমাদের চেতনাগুলো আমাদের দেশের স্বার্থে একত্রিত করার পরিবর্তে স্বার্থপর এবং আত্মকেন্দ্রিক করে তুলেছে। আমরা নিজেদের আদর্শকে উদাহরণ এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমুজ্জ্বল করার পরিবর্তে তর্ক এবং মারামারির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছি। আমাদের সচেতনতা ক্রমান্বয়ে অচেতনতার রূপ পরিগ্রহ করেছে। এক পর্যায়ে আমরা এমন অবস্থায় এসে পৌঁছেছি যেখানে আমরা নিজের মতাদর্শের বাইরে অবস্থানকারীদের মানুষ ভাবতেও নারাজ, তাদের মানবিক অধিকার দিতে অনিচ্ছুক, তাদের দমন উৎপীড়ন এবং হত্যা করার মাধ্যমে নিজের মতকে প্রতিষ্ঠিত করতে নির্লজ্জভাবে বদ্ধপরিকর এবং নিজেদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে নিজেদের বিভেদকে বঃহিশত্রুর জন্য প্রবেশপথ বানাতেও দ্বিধাহীন।

এখনো কি প্রশ্ন করার সময় আসেনি আমরা আসলে কি চাই, কোন পথে যাত্রা করেছি, কোথায় আমাদের গন্তব্য?

স্বামী স্ত্রী যতই ঝগড়া করুক না কেন শেষতক তাদের একই ঘরে অবস্থান করতে হয়। তাই নিজেদের প্রশান্তির জন্য, সংসার এবং সন্তানদের খাতিরে, তাদের একটি শান্তপূর্ন সহাবস্থানের উপায় খুঁজে নিতে হয় – এই কাজটি করতে হয় কখনো ছাড় দিয়ে, কখনো সম্পর্কের দাবী প্রতিষ্ঠা করে, কখনো হাত বাড়িয়ে, কখনো অভিমান দিয়ে। একটি দেশের অধিবাসীরা একটি বৃহত্তর পরিবারের অংশ। একটি পরিবারে যেমন কেউ আত্মভোলা হয়, কেউ পরোপকারী হয়, কেউ স্বার্থপর হয়, কেউ বুদ্ধিমান হয়, কেউ বোকা হয়, কেউ ঝগড়াটে হয়, কেউ অভিমানী হয়, কেউ অবুঝ হয়, কেউ সমঝদার হয়, কিন্তু এই পার্থক্যের জন্য কেউ কাউকে ছেড়ে যায়না আবার কেউ কাউকে আলমারীতে পুরে তালাবদ্ধও করে রাখেনা – তেমনি একটি দেশের নাগরিকদেরও প্রয়োজন নিজেদের পার্থক্যগুলোকে জাতীয় ঐক্যের ওপরে স্থান না দেয়া, তা সে যার জন্যই হোক না কেন; উচিত নিজেদের মধ্যকার পার্থক্যগুলোকে সংলাপ এবং যুক্তির মাধ্যমে সমাধান করা; উচিত তর্কের খাতিরে সহিংসতায় না গিয়ে শান্তির খাতিরে সহাবস্থানের উপায় খুঁজে নেয়া। নইলে দেশের মানচিত্রই যে কেবল হুমকির সম্মুখীন হয় তা নয় বরং ঘরের ভেতর আগুন জ্বলে উঠে সেই ধোঁয়া লুটেরাদের দৃষ্টি আকর্ষন করতে পারে।

হেনরিক ইবসেনের ‘দ্য ডলস হাউজ’ নাটকটির প্রধান চরিত্র ছিল নোরা। ওর স্বামী ওকে খুব আদর করত কিন্তু মূল্যায়ন করতনা। ফলে সে নিজের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি স্বামীর অনাসক্তিতে হতাশ হয়ে একদিন সাজানো সংসার ফেলে বেরিয়ে যায়। একটি সংসারে যেমন স্বামী স্ত্রী এবং পর্যায়ক্রমে সন্তানদের অধিকার সমভাবে নিশ্চিত করতে হয়, তেমনি একটি দেশের নাগরিকদের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হয়। কারো কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য যদি অপর পক্ষের কথা বলার অধিকার ছিনিয়ে নেয়া হয় তবে তা এক সময় অভিমান থেকে ক্ষোভ, ক্ষোভ থেকে রাগ, রাগ থেকে সহিংসতার রূপ ধারণ করবে যা কারো জন্য কোনভাবেই কল্যাণকর নয়। সেক্ষেত্রে দোষটা যে রাগ করল তার চেয়েও যে পক্ষপাতিত্ব করে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করল তার ওপর বর্তায়। প্রেশার কুকারের ছিদ্র কুকারের ভেতরের প্রেশারটা ব্যালেন্স করতে সহযোগিতা করে, কিন্তু প্রেশার কুকারের ছিদ্র বন্ধ করে তাকে চুলার ওপর এড়িয়ে দিলে বিস্ফোরণ ঘটবেই। সেটা প্রেশার কুকারের দোষ নয়, দোষ সেই আহাম্মকের যে ছিদ্র বন্ধ করে তাকে চুলায় চড়িয়েছে। অথচ প্রেশারটাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে অনেক কম সময়ে অনেক বেশি রান্না করা যায়!

জর্জ অরওয়েল তাঁর ‘শুটিং অ্যান এলেফ্যান্ট’ গল্পে বার্মায় অবস্থানকালে তাঁর মানসিক অস্থিরতার বর্ণনা দিয়েছেন। একদিকে স্থানীয় জনগণের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের দমনপন্থী আচরন; অপরদিকে স্থানীয়দের প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ যা একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে তাকে প্রতিদিনই মুকাবিলা করতে হচ্ছে। তাঁর ফ্রাস্ট্রেশনের বঃহিপ্রকাশ ঘটেছে এভাবে, ‘I was young and ill-educated and I had to think out my problems in the utter silence that is imposed on every Englishman in the East. I did not know that the British Empire is dying, still less did I know that it is a great deal better than the younger empires that are going to supplant it. All I knew was that I was stuck between my hatred of the empire I served and the rage against the evil–spirited little beasts who tried to make my job impossible. With one part of my mind I thought of the British Raj as an unbreakable tyranny, as something clamped won on prostrate peoples; with another part I though the greatest joy in the world would be drive a bayonet into a Buddhist priest’s guts. Feelings like these are a normal by-product of imperialism; ask any Anglo-Indian official, if you can catch him off duty’. (আমার বয়স ছিল অল্প, লেখাপড়াও ছিল যৎসামান্য এবং আমাকে আমার সমস্যা নিয়ে ভাবতে হত নীরবে যে নীরবতা ছিল পূর্বে কর্মরত প্রতিটি ইংরেজের সঙ্গী। আমি জানতাম না ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তখন মৃত্যুপথযাত্রী, আমার ধারণাও ছিলোনা যে এই সাম্রাজ্য সেসব নব নব সাম্রাজ্যের চেয়ে অনেক ভাল ছিল যেগুলো পরে তাকে প্রতিস্থাপন করবে। আমি কেবল এটাই জানতাম যে আমি এক শাঁখের করাতে আটকে পড়েছিলাম যার একদিকে ছিল সেই সাম্রাজ্যের প্রতি ঘৃণা যার জন্য আমি কাজ করতাম এবং অপরদিকে সেই বজ্জাত নাছোড়বান্দারা যারা আমার কাজ করা অসম্ভব করে তুলছিল। আমার মনের একাংশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে দেখছিল এক অলঙ্ঘ্যনীয় স্বৈরাচার হিসেবে যা নতজানু জনমানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে; অন্য অংশ ভাবছিল পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দের কাজ হত বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পেটের ভেতর বেয়োনেট ঢুকিয়ে দেয়া। এ’ধরনের অনুভূতিগুলো সাম্রাজ্যবাদের স্বাভাবিক ফলাফল, যেকোন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান অফিসারকেই জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন যদি তাকে ডিউটির বাইরে ধরতে পারেন।) কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি বুঝতে পারলেন হাতি মরলে সাম্রাজ্যবাদী বা জনগণ কেউ লাভবান হয়না, তার টুকরোগুলো শকুনে খেয়ে নিঃশেষ করে।

আমাদের দুর্ভাগ্য এই জাতির শত শত বছরের ইতিহাসে আমরা এমন শাসক পাইনি যারা এই দেশকে ভালবেসেছে, দেশের মানুষকে একত্রিত করেছে, দেশের উন্নতিকে জীবনের লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছে, ব্যাক্তিস্বার্থকে পেছনে ফেলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে জনতাকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করতে সমর্থ হয়েছে। আমরা যুগে যুগে স্বৈরাচারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে এতটাই যুদ্ধংদেহী হয়ে গিয়েছি যে বঃহিশত্রু না পেলে আমরা নিজেরাই মারামারি করে মরি। মাঝখানে অন্য কেউ এসে আমাদের খাবার চেটেপুটে লুটে যায় তা আমাদের নজরেই পড়েনা। কি অদ্ভুত এক জাতি আমরা! আত্মকেন্দ্রিকতারও তো একটা সীমা থাকে। আত্মকেন্দ্রিকতার ফলাফল যদি নিজের জন্যই ধ্বংস বয়ে আনে তবে তাকে বর্জন করাই শ্রেয় নয় কি? আনুগত্য ভাল জিনিস, কিন্তু কার আনুগত্য করা হচ্ছে বা কি উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে, সেটা কি যাচাই বাছাইয়ের দাবী রাখেনা?

ছোটবেলায় আবুধাবীতে ছিলাম। স্কুলে ইউ. এ. ই. সোশ্যাল স্টাডিজ নামে একটা বিষয় বাধ্যতামূলক ছিল। পড়ে হতবাক হয়ে গেছিলাম যে তাদের জনসংখ্যার মাত্র ৪% ছিল স্থানীয় জনগণ, বাকী সব অভিবাসী। কিন্তু সবার জন্যই গ্যাস, ইলেক্ট্রিসিটি, পানি ছিল ফ্রি যেহেতু এরা সবাই মিলেই ১৯৭১ এ স্বাধীন হওয়া দেশটিকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। একজন মাহাথির মুহাম্মদ মালয় এবং চৈনিক জাতিগত দাঙ্গায় বিধ্বস্ত একটি দেশকে তুলে নিয়ে পারেন উন্নতির চরম শিখরে। কিন্তু হায়, বাঙ্গালী একাই একশ, কিন্তু একশ বাঙ্গালী কখনো এক হতে পারেনা! দেশের স্বার্থেও না। পলাশীর প্রান্তরে মীরজাফর যা করেছিল আমরা আজও তার পুণরাবৃত্তি করে চলেছি। আজও আমরা নিজের স্বার্থে দেশকে দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলছি, পৃথিবীর সামনে নিজেদের লজ্জা ঢাকার পরিবর্তে নাঙ্গা করে দিচ্ছি, একে অপরের ঘরে আগুন দিচ্ছি, একে অপরকে গুঁতিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করছি, একে অপরকে পিটিয়ে মেরে ফেলছি, ভুলে যাচ্ছি হায়েনারা বসে আছে আমাদের লাশ সাবাড় করার জন্য।

শত শত বছরের বঞ্চনার ইতিহাস আমাদের মাঝে এক আত্মপ্রবঞ্চক, লোভী, স্বার্থান্বেষী চরিত্রের জন্ম দিয়েছে যে নিজের জন্য সব কিছু করতে পারে কিন্তু ভাবেনা অন্যদের ছাড়া নিজের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। নিজের অস্তিত্বের জন্য আমরা যেকোন অন্যায়, যেকোন অনাচার, যেকোন অবিচার করতে এবং মেনে নিতে প্রস্তুত থাকি। কিন্তু আমাদের মাথায় থাকেনা, every action has an equal and opposite reaction. (প্রতিটি ক্রিয়ারই একটি সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে।) যখন আমি একজন মানুষের মৃতুর খবর শুনে আগে ‘আহা’ করে উঠব এবং পরে বাকী তথ্য জানতে চাইব তখন বুঝব আমি মানুষ, কিন্তু যখন আমি একটি মৃত্যুসংবাদ শুনে আগে অনুসন্ধান করব সে কোন দলের বা মতাদর্শের ছিল এবং তারপর ভাবব আমি আদৌ রি-অ্যাক্ট করব কিনা তখন আমার মানবতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে বৈকি। তখন অপর এক ব্যাক্তি যদি আমাকে মারতে আসেন তাকে দোষারোপ করা যাবেনা, কেননা আমি নিজেই অপরের জীবনের কোন মূল্য দেইনি! সুতরাং, এই বিভক্তির শেষফল সমূলে ধ্বংস যা থেকে আমি, তুমি, আপনি, তুই কেউ রেহাই পাবেনা।

এখনো সময় আছে। আমরা কি এভাবেই আমাদের ‘সোনার বাংলা’কে নিঃশেষ হয়ে যেতে দেব, ভবিষ্যত প্রজন্মের সামনে একটি অসহনীয় অসহায় বিরান জীবন রেখে যাব, নাকি সবাই মিলে একটি সত্যিকার ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলব? সিদ্ধান্ত আমার, তোমার, আপনার, তোর। এরপর যে ফল দাঁড়াবে তা কিন্তু সবাইকে মিলেই খেতে হবে। সুতরাং, ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন।

Monday, April 15, 2013

বিদায়, বন্ধু আমার

আজ হতে ঠিক দু’সপ্তাহ আগে এই সময় ওর হাত দু’টো আমার হাতের মুঠোয় ধরা ছিল, আমরা কথা বলছিলাম অন্তরঙ্গভাবে, সে হাতের স্পর্শ এখনো আমার হাতে লেগে রয়েছে, কিন্তু হাত দু’টি এখন সাড়ে তিনহাত মাটির নীচে। আজ সকালে সে মারা গিয়েছে। 

ওর সাথে আমার দেখা হয়েছে সাকুল্যে দু’বার। আমি সুন্দরভাবে কথা বলতে পারিনা, ইমোশনাল পরিস্থিতিতে একেবারেই কথা বলতে পারিনা, মানুষ যে কি করে এত সুন্দর করে কথা বলে তাই বুঝে পাইনা। তাই আড়ালে থেকে পর্যবেক্ষণ করে যাই।
মেয়েটি ছিল সৌভাগ্যবতী। ওর ক্যান্সার হয়েছিল। তার আগে আর দশটা সাধারন মেয়ের সাথে ওর কোন পার্থক্য ছিলোনা। স্বামী, সন্তান, সংসার, জামাজুতোর শখ, সাজগোজ -এর বাইরে ওর কোন পৃথিবী ছিলোনা। কিন্তু ক্যান্সার ওকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনে। ডাক্তাররা বলে দিয়েছিল ক্যান্সার ধরা পড়ার আগেই সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে, প্রাথমিক অবস্থায় ধরা গেলে হয়ত কিছু করা যেত কিন্তু এত দুর্বল শরীরে চিকিৎসা প্রয়োগ করলেও শরীর রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহজনক। তখন থেকেই সে পৃথিবীর মোহমায়া থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছে। প্রভুর সাথে মহামিলনের প্রস্তুতি তখন থেকে শুরু। দেড় বছর কম সময় নয়। এই সময়ে সে নিজের এক একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পাপের জন্য মার্জনা চেয়ে নিয়েছে, জনে জনে ডেকে বুঝিয়েছে, ‘দেখ, আমাকে দেখ। কুড়িটি বছর যখন আমি সুস্থ ছিলাম তখন আমার প্রভুর আদেশ নিষেধের তোয়াক্কা করিনি। আজ যাবার বেলা আমার কাছে তাঁর সামনে ন্যূনতম সম্মানজনক অবস্থান নিয়ে দাঁড়াবার মত কোন সঞ্চয় নেই, হয়ত কেবল মার্জনাটুকুই চাইতে পারব কিন্তু তা নিশ্চিত করার সময়টুকুও নেই। যেকোন দিন আজরাইল (আ) আমার বিছানার পাশে এসে দাঁড়াবেন, আমার বুকের ওপর হাত রেখে আমার রূহকে আহ্বান করবেন, আমার দম বন্ধ হয়ে আসবে, আমি পালিয়ে যাবার চেষ্টা করব কিন্তু আমার শরীর সেদিন আমাকে সহযোগিতা করবেনা, তারপর আমাকে হাজির করা হবে আমার সৃষ্টিকর্তার সামনে। সেই মূহূর্তে তিনি আমার সামনে পরম করুণাময় রূপে বিরাজ করবেন না কি আমাকে দেখে চরম রাগান্বিত হবেন সে কথা ভাবতেই অন্তরাত্মা ভয়ে উড়ে যায়। মনে হয় আমি যদি অদৃশ্য হয়ে যেতে পারতাম, মিশে যেতে পারতাম মাটির সাথে! তোমরা সেই সময়ের আগেই সাবধান হও যা অবশ্যম্ভাবী। তোমরা আমার মত ভুল কোরোনা। তোমরা তার আগেই পরকালের পাথেয় সংগ্রহ কর। এটাই একমাত্র বাস্তবতা। আর সব ভুল। সারাটা জীবন আমরা কেবল ভ্রমে ডুবে থাকি। তোমরা এখনই এই ভুল সংশোধন কর। তোমরা এখনই সাবধান হও’।

ওর মত হাজারটা মেয়ে পৃথিবীর আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কিন্তু সারা ক্যাল্গেরী ওর এই যাত্রায় যেভাবে সঙ্গ দিয়েছে তার তুলনা নেই। প্রথম যখন ওর অসুস্থতা ধরা পড়ে তখন ওর বড় মেয়েটির বয়স মাত্র ছয় বছর, ছোট সন্তানটির মাত্র কয়েক মাস। আত্মীয় পরিজনহীন এই বিদেশ বিভুঁইয়ে স্বামী বেচারা বৌ নিয়ে হাসপাতালে দৌড়াবে না বাচ্চা সামলাবে, চাকরী করবে কিভাবে আর রান্নাই বা করবে কিভাবে তা নিয়ে মহাচিন্তায় পড়ে গেল। ক্যাল্গেরীর ভাবীরা ফেরেস্তার মত নাজিল হলেন এ’সময়। কেউ চেনেন কেউ চেনেন না তাদের, কিন্তু সবাই নির্দ্বিধায় এগিয়ে এলেন। কেউ বাচ্চাদের দেখাশোনা করলেন, কেউ রান্না করে পাঠালেন, কেউ অর্থ সংগ্রহ করলেন যেন ভাই কাজ করার পরিবর্তে স্ত্রী সন্তানদের নিবিড়ভাবে সময় দিতে পারেন। একদিন দু’দিন নয়, দেড়টা বছর নিরবিচ্ছিন্নভাবে তাঁরা সহযোগিতা করে গিয়েছেন এই পরিবারটিকে।
প্রথম যেবার তার সাথে দেখা করার সাহস সংগ্রহ করতে সক্ষম হই সাথে বান্ধবী জেসমিন আপা আর স্বপ্না আপাকে নিয়ে যাই কথা বলার জন্য। সে মাত্র মাস দু’তিন আগের কথা। স্নিগ্ধ হাসিমুখখানা দেখে কে বলবে বেচারী এত অসুস্থ? বাচ্চা দু’টো এসে ওদের আঁকা ছবি দেখাচ্ছে, আধো আধো বোলে কথা বলছে। সে আমাদের বলল, ‘আমি এখন অর্থসহ কু’রআন পড়ছি। কিন্তু বড়ই আফসোস হচ্ছে যে অনেক দেরী করে ফেলেছি। এটা তো আমার প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জনের সহজ রোডম্যাপ। কিন্তু আমি এমন সময় এটা পড়ছি যখন আমার পথ শেষ হয়ে এসেছে। কত ভুল পথ মাড়িয়ে আজ এখানে এসে পৌঁছেছি! যদি শুরু থেকেই এই মানচিত্র অনুসরন করতাম কত সময় বাঁচত আমার, আরো কত দূর অগ্রসর হতে পারতাম, কত ভুলভ্রান্তি এড়িয়ে চলতে পারতাম! আপনারা এই ভুল করবেন না। জীবনটাকে এখনই সংশোধন করুন যেন আমার মত পথের শেষে দাঁড়িয়ে হায় হায় করতে না হয়’। তাকে সাহস দিলাম, ‘ডাক্তার তো আর গড নয়, তুমি সাহস হারিয়োনা। চিকিৎসা চলুক, পাশাপাশি তোমার সৃষ্টিকর্তার সাথে একটা চুক্তি করা যায় কিনা দেখ যে এই মূহূর্ত থেকে তোমার জীবন, মৃত্যু, নামাজ এবং ত্যাগ হবে কেবল তাঁর সন্তুষ্টির জন্য। তিনি রাজী হয়ে গেলে এই রোগ সেরে যাওয়া কোন ব্যাপার নয়। যিনি রোগ সৃষ্টি করেছেন তিনি রোগ নিরাময় করতেও সক্ষম। তিনি আইয়ুব (আ)কেও তো আরোগ্য দান করেছিলেন’।

দু’সপ্তাহ আগে বান্ধবী তাসনীন আপা জানালেন ডাক্তাররা জবাব দিয়ে দিয়েছে, সে বাংলাদেশে চলে যাচ্ছে পরিবার পরিজনের সাথে শেষ সাক্ষাতের জন্য। সবাইকে খবর দেয়ার পর বান্ধবীরা সাহায্যের বন্যা বইয়ে দিলেন। সামনাসামনি সাহায্য দিতে লজ্জা লাগে, তাই তাসনীন আপার মাধ্যমে আরেকজনকে দিয়ে টাকা দেয়ার ব্যাবস্থা করলাম। সকালে ছাত্রছাত্রী ছিল আমার,  তাই বিকালে তাসনীন আপার সাথে যাবার আয়োজন করলাম। বিকালে ফারজানা আপা ফোন করে বললেন তিনি যেতে চান কিন্তু ঠিকানা চেনেন না। উভয়কেই পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি পুরো ক্যাল্গেরীর বাংলাদেশী সমাজের এমন কেউ নেই যে দেখা করতে আসেনি। এদের অনেকেই রবাহূত। চেনেনা, জানেনা কিন্তু শুনে ছুটে এসেছে। কেউ সান্তনা দিচ্ছে, কেউ কাঁদছে। আমাকে দিয়ে দু’টোর একটাও হয়না। তাছাড়া আমি কান্নাকাটি করে রোগীর মনোবল হ্রাস করাটা সঙ্গত মনে করিনা। ওকে দু’জন ডাক্তারের ঠিকানা দিলাম, বললাম, ‘ডাক্তার তো আর গড নয়। বাংলাদেশে গিয়েমাত্র এদের সাথে যোগাযোগ করে দেখ। হয়ত আল্লাহ চাইলে সুস্থ হয়ে যেতে পারো। তবে প্রতিটা মূহূর্ত ইস্তেগফার পড়তে থাকো। যদি যাবার সময় হয়েই যায় তার জন্যও প্রস্তুতি থাকা চাই। যদি তুমি আগে যাও তাহলে আমার পালনকর্তাকে বোলো আমাকে ক্ষমা করে দিতে, তবে এমনটাও বিচিত্র নয় যে গিয়ে দেখলে আমি তোমার আগেই গিয়ে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি’। সে মৃদু হাসল, ‘কথা দু’রকম হয়ে গেলনা আপা?’ কিন্তু এটাই যে বাস্তবতা! উভয় পরিণতির জন্যই তো আমাদের প্রস্তুত থাকতে হয় প্রতিটা মূহূর্ত। ওর মত সৌভাগ্য ক’জনার হয় যে দেড়বছর আগে থেকেই প্রস্তুত হবার সময় পাওয়া যায়?
আজ নববর্ষের প্রথম দিনটিতে, যখন সবাই হাসিখেলায় মত্ত, সে তার মা ভাইবোন, স্বামী সন্তান আর এতগুলো শুভাকাঙ্খীকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল আপন গন্তব্যে। আল্লাহ তাকে তার ধৈর্য্যের জন্য পুরস্কৃত করুন, তার ছোটবড় সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিন, তাঁর জান্নাতে তাকে স্থায়ী করে নিন। পাশাপাশি মৃত্যুর পূর্বমূহূর্ত পর্যন্ত যে সত্যটি সে আমাদের কাছে পৌঁছনোর আপ্রান চেষ্টা করছিল তা আমাদের অনুধাবন এবং অনুসরন করার সামর্থ্য দিন, সকল অন্যায় এবং ভুলভ্রান্তি থেকে আমাদের পবিত্র করে দিন। এটুকু প্রার্থনা। ভাল থেকো বোন আমার, বন্ধু আমার! আমার জন্য অপেক্ষা কোর, আমিও আসছি শীঘ্রই।

Sunday, April 7, 2013

‘আমি’ময় পৃথিবী

দরখাস্তটা রিভিশন দিতে গিয়ে আমার চক্ষুস্থির হয়ে গেল। ছোট ছোট তিনটা প্যারার এইটুকু অ্যাপ্লিকেশনটাতে ‘আমি’ শব্দটা এসেছে সাতবার, ‘তুমি’ শব্দটি নেই একবারও। কি আশ্চর্য! আমি একজনের কাছে কিছু চাইছি, সুতরাং চিঠিটাতে তাকে প্রাধান্য দেয়া উচিত, অথচ এর সর্বত্র ‘আমি’র ছড়াছড়ি! আবার অ্যাপ্লিকেশনটা নিয়ে বসলাম। বেশ কিছু সময় নিয়ে, অনেক অনেক কাটাকুটি আর ভাষার সতর্ক ব্যাবচ্ছেদের পরও তিনটা ‘আমি’ রয়ে গেলে যেগুলো কিছুতেই বাদ দেয়া গেলনা। ঘটনাটায় নিউরনে একটা আলোড়ন খেলে গেল, চরম লজ্জা পেলেও নিজের কাছে স্বীকার করতে বাধ্য হলাম যে মানুষ আসলেই বড় আত্মকেন্দ্রিক এবং স্বার্থপর প্রাণী!

 
কথাটা শুনতে খারাপ শোনালেও আমাদের প্রাত্যহিক বাক্যালাপের দিকে লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় আসলে তত্ত্বটা কতটা সত্য। আমাদের প্রতিদিনকার সংলাপগুলো একত্রিত করলে দেখা যায় এর অধিকাংশ বাক্যই শুরু হয় ‘আমি’ বা ‘আমার’ শব্দটি দিয়ে। আমাদের সংলাপে ‘আমি’র সাথে সংশ্লিষ্টতা ব্যাতীত ‘তুমি’ বা ‘সে’র অভাব প্রকট এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই শব্দগুলো আসে ‘তুমি’ বা ‘সে’ কে নিয়ে ‘আমি’র সমস্যা কিংবা অসন্তুষ্টি কিংবা নালিশ ব্যাক্ত করতে। সংলাপের এই সংকীর্ণতা প্রতিফলিত হয় আমাদের আচরনিক জীবনেও। এই আমিময় পৃথিবীতে ‘তুমি’ বা ‘সে’র প্রতি মমতার অনুপস্থিতি আসলেই আতংকজনক! ‘আমি’র চাওয়া পাওয়া নিবৃত করার জন্য ‘তুমি’ বা ‘সে’র প্রতি নির্দয় হওয়া কিংবা তাকে মিটিয়ে দেয়ার দৃষ্টান্তও বিরল নয়।
 

যখন আমরা ‘তুমি’ বা ‘সে’কে আদৌ মূল্যায়ন করতে প্রস্তুত থাকি তখন বলি, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’। এই কথাটাতেও আত্ম অহমিকাই  প্রকাশিত হয়, কেননা এখানে ‘আমি’র অনুভূতিটাই মুখ্য, ‘তুমি’ বা ‘সে’র অনুভূতিটা গৌণ; বরং ব্যাপারটা এমন যে আমি যে তাকে ভালবাসি তাতেই তার আনন্দিত, বিগলিত, মুগ্ধ এবং কৃতজ্ঞ হয়ে যাওয়া উচিত। কি অদ্ভুত, তাইনা? যাকে মূল্যায়ন করার জন্য এই ভালোবাসা তার চেয়েও এখানে আমার অনুভূতি, আমার চাহিদা, আমার অহমিকাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ! তাই তো আমরা অহরহ দেখি কেউ ভালবাসায় সাড়া না দিলে তাকে অ্যাসিডদগ্ধ করতে কিংবা হত্যা করতেও মানুষ পিছপা হয়না। একে কি আসলে ভালবাসা বলা যায়? ভালবাসা তো সেটাই যেখানে অন্যের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য আনন্দ আমার কাছে নিজের চাহিদার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে, নইলে ‘তুমি’ বা ‘সে’র আর কি মূল্য থাকে?

 
পৃথিবীতে যত সমস্যা তার শুরু এই ‘আমি’ দিয়ে। আমাদের সারাক্ষণ ভাবনা আমি কি চাই, আমার কি পাওয়া উচিত, আমি কি পেলাম, আমার যা চাওয়া ছিল তা কেন পেলাম না। এই যাত্রাপথে আমাদের কখনো মাথায় আসেনা ‘তুমি’ কিংবা ‘সে’ কি চায়, ‘তুমি’ বা ‘সে’র কি পাওয়া উচিত, ‘আমি’ কি ‘তুমি’ বা ‘সে’কে বঞ্চিত করছি কিনা। ব্যাস্ত জীবনের অঙ্গন থেকে কিছু সময় করে নিয়ে কারো সাথে দেখা করতে গেলাম, সে প্রথমেই বলবে, ‘তুমি কি আর আমার খবর রাখো?’ একবারও ভাববেনা, আমিই তো তার সাথে দেখা করতে গেলাম কিংবা এতদিন আমি কেমন ছিলাম বা কেন তার সাথে দেখা করতে পারিনি বা সে তো একদিনও আমার কোন খবর নেয়নি! এখানেও সমস্যা ‘আমি’কে এতটা মুখ্য মনে করা যা ‘তুমি’ বা ‘সে’র সুবিধা অসুবিধা সমস্যা এমনকি তার উপস্থিতিকেও আমলেই নেয়না।


দুনিয়ার যত সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু এই ‘আমি’টা। ‘তুমি কি করে আমার জন্মদিন ভুলে গেলে?’ ‘তোমার সাথে বিয়ে হয়ে আমি কি পেলাম?’ ‘আমার কথা আর কে ভাবে?’ ‘আমি নিজ কানে শুনেছি এই কথা’ ‘আমার ধারণা ব্যাপারটা এমন’ ‘ওর একদিন কি আমার একদিন’ ‘আমি কম যাই কিসে?’ এই ‘আমি’কেন্দ্রিকতার কোন শেষ নেই। এই আমিত্ব আমাদের অনুদার, স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক, অনাস্থাশীল, অহংকারী, প্রতিশোধপ্রবণ এবং বোকার স্বর্গে বসবাসকারী করে তোলে। এই ‘আমি’কে আমরা কতটা অপরিহার্য মনে করি তা আমাদের প্রচলিত বাগধারাতেই প্রকাশ পায়।


আমরা কথায় কথায় বলি, ‘চাচা, আপন পরান বাঁচা’। বস্তুত কথাটার পেছনে স্বার্থপরতার গন্ধটা যে কত উৎকট তা কি আমাদের একটুও নাড়া দেয়না? সবাই যদি নিজের প্রাণ বাঁচাতেই ব্যাস্ত থাকত তাহলে পৃথিবীর ইতিহাস কতটা কলঙ্কময় হত তা কি আমাদের চিন্তায় আসে কখনো? সবাই নিজের প্রান নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়লে কি পৃথিবীতে কোনদিন কোন মহিমান্বিত আত্মত্যাগের ইতিহাস রচিত হত, যুদ্ধ কিংবা মহামারীর সময় সেবা করার কোন লোক পাওয়া যেত,  কেউ মৃত্যুর পারে দাঁড়িয়ে অন্যকে পানি পান করার অগ্রাধিকার দিত, জাহাজডুবির মূহূর্তে কেউ স্ত্রী পুত্র কন্যাকে লাইফবোটে তুলে দিয়ে ডুবন্ত জাহাজে রয়ে যেত, একজন মহামানবকে বাঁচাতে এগারোজন মহাত্মা নিজেদের শরীরকে ঢালে রূপান্তরিত করত, কিংবা একজন মা তার শরীর দিয়ে ঢেকে দিত তার সন্তানকে যেন ভূমিকম্পে ধ্বসে পড়া দেয়াল তাকে থেঁতলে দিলেও সন্তান অক্ষত থাকে?


প্রতিদিন এই পৃথিবীটাকে দেখি, এই পৃথিবীর মানুষগুলোকে দেখি যাদের দিন শুরু হয় ‘আমি’ দিয়ে, দিন শেষ হয় ‘আমি’ দিয়ে। এই ‘আমি’র বাড়ী লাগে, গাড়ী লাগে, খাবার লাগে, পোশাক লাগে, চিকিৎসা লাগে, সম্মান লাগে, ধন সম্পদ ঐশ্বর্য্য লাগে, সমস্ত প্রয়োজন পূরণ হয়ে গেলে আরো লাগে; তবু তার ‘তুমি বা ‘সে’র ন্যূনতম প্রয়োজনগুলি নিয়েও ভাবার সময় হয়না, তাদের দুঃখ কষ্ট বেদনা তাকে নাড়া দেয়না। প্রতিটি ‘আমি’ অমর হতে চায় যেন একজন ‘আমি’ পৃথিবী থেকে চলে গেলে মানবজাতির বিশাল ক্ষতি হয়ে যাবে, অথচ কত কোটি কোটি ‘আমি’ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছে যাদের কেউ মনেই রাখেনি! প্রতিটি ‘আমি’ নিজেকেই সেরা মনে করে যেন পৃথিবীতে কোনদিন কোন শ্রেয়তর মানবের পদচিহ্ন পড়েনি, অথচ এই পৃথিবীর ইতিহাসে হাজার হাজার উজ্জ্বল নক্ষত্র স্বমহিমায় জ্বাজল্যমান! প্রতিটি ‘আমি’র প্রয়োজনগুলি পূরণ করেন একজন ‘আমি’, অথচ সেই ‘আমি’কে কেউ ধন্যবাদ দেয়া দূরে থাক স্বীকার করার পর্যন্ত প্রয়োজন মনে করেনা!


এই বৈচিত্রময় পৃথিবীতে কিছু বিচিত্র মানুষ জীবনের লক্ষ্যস্থির করে নিয়েছেন ‘তুমি’ কিংবা ‘সে’কে নিয়ে ভাবার, তাদের স্বপ্নপূরন করার, নিজের প্রয়োজনগুলিকে সীমিত করে অপরের প্রয়োজনগুলিকে প্রাধান্য দেয়ার। সবাই তাঁদের বোকা বলে। কিন্তু এই আমিময় পৃথিবীর স্বার্থের ঈষদচ্ছ আচ্ছাদনের ভেতরে যেসব জঘন্য কীর্তিকলাপ চলে তার কিঞ্চিৎ পরিমাণ দেখেই আমার কেবল ইচ্ছে হয় এই বোকাদের দলে ভিড়তে। সূর্যের প্রচন্ড টান উপেক্ষা করেও কিছু কিছু উল্কা ছিটকে চলে আসে এই মাটির পৃথিবীতে, এই পৃথিবীর বায়ূমন্ডলের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আগে ক্ষণিকের জন্য জ্বলে ওঠে সেই মহাকাশচারী। একটি জীবনের জন্য একবার জ্বলে ওঠাই কি যথেষ্ট নয়? হাজার হাজার বছর ধরে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে থাকার চেয়ে ঐ এক মূহূর্তের জ্বলে ওঠাই কেন যেন কিছু কিছু মানুষকে বেশি আকর্ষন করে। কেননা ঐ একটি মূহূর্তে সে স্বার্থপরতার উর্ধ্বে উঠে আসতে পারে, আমিত্বের কক্ষপথ থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসতে পারে, অন্যের আকাশটাকে আলোর মালায় সাজিয়ে দিতে পারে, অপরের মধ্য দিয়েই তৈরী করতে পারে নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় – এখানেও ‘আমি’টাই উজ্জ্বল, কিন্তু সংকীর্ণ নয়। এই ‘আমি’টাই হতে ইচ্ছে করে খুব। জানিনা পারব কিনা, কিন্তু চেষ্টা করে দেখতে তো ক্ষতি নেই!