Monday, November 8, 2010

ভূমিকম্প

২১শে নভেম্বর, ১৯৯৭, চট্টগ্রাম। মাগরিবের নামাজ পড়ছিলাম। পাশে আমার ছোটভাই মোহাম্মদ। হঠাৎ দে্খি কাপড়ের আলমারীটা ওর গায়ের ওপর পড়ে যাচ্ছে! কিছু বোঝার আগেই একহাতে ধরে ফেললাম আলমারীটা- রিফ্লেক্স। বুঝতে বেশী সময় লাগলোনা যে ভূমিকম্প হচ্ছে; হচ্ছে হয়ত বেশ কিছুক্ষণ ধরেই কিন্তু নামাজের মধ্যে নড়াচড়ায় থাকায় বুঝতে পারিনি। আমাদের বাড়ীটা ছিল ৫০ বছরের পুরনো আর আমি নিজে এর মেরামতর কাজ করিয়েছি তাই আমি জানি এই ধরনের জোরালো ভূমিকম্পে বাড়ী ভেঙ্গে পড়তে পারে যেকোন সময়। কোন কথা না বলে একহাতে আলমারী ধরে রেখেই মোহাম্মদকে নামাজের মধ্যখানে ঠেলে বের করে দিলাম রুম থেকে। তারপর আলমারী ছেড়ে দিয়ে পরের রুমে যেতেই দেখি আরেক ভাই আহমদ জায়নামাজ ভাঁজ করছে। মোহাম্মদকে একহাতে ধরে আরেকহাতে আহমদের কান ধরলাম। তখন কি ধরছি দেখার সময় নেই, ওদের বের করাটাই জরুরী। দুজনকে নিয়ে ডাইনিং রুম হয়ে রান্নাঘরের দরজা দিয়ে বের হয়ে গেলাম। সামনের দিকে যাওয়াটা নিরাপদ মনে হোলনা যেহেতু ড্রয়িং রুমের অধিকাংশই কাঁচের আর ভূমিকম্পের সময় কাঁচ ভেঙ্গে ছিটানোটা একটা বড় বিপদ। পেছনে বের হয়েই শুনি ছোটমামা জোরে জোরে আজান দিচ্ছে। বেচারা ভয়ে পশ্চিম দিকের পরিবর্তে পূর্বদিকে ফিরে আজান দিচ্ছে! মামাকে বললাম, “তুমি প্যাসেজে দাঁড়িয়ে কিসের আজান দিচ্ছ? দু’দিক থেকেই বিল্ডিং ভেঙ্গে পড়তে পারে”। মামাকেও টেনে নিয়ে চললাম আমাদের সাথে সামনের আঙ্গিনায়, আমগাছটার নীচে। এগুলো সবই মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ঘটনা। একটু পর ভূমিকম্প থেমে গেল। তবুও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। যখন মনে হোল এবার ঘরে ঢোকা যেতে পারে, ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকলাম।

আলো জ্বালতেই দেখি ঘরের দেয়ালে বিভিন্ন জায়গায় ফাটল ধরে গিয়েছে। পরে জেনেছি ৬.১ মাত্রার এই ভূমিকম্পে চট্টগ্রামের প্রায় বিল্ডিংযেই সেদিন ফাটল সৃষ্টি হয়েছিল। একটা পাঁচতলা ভবন ধ্বসে পড়ে ২২ জন মারা গেছিল আর বিল্ডিংযের অনেকখানিই মাটিতে দেবে গিয়েছিল। সে ধ্বংসস্তুপের মধ্যে চারবছর বয়সী একটা শিশু আটকা পড়ে কয়েকদিন বেঁচে থাকলেও কেউ তাকে উদ্ধার করতে পারেনি। শিশুটির জন্য মনে হয় সম্পূর্ণ চট্টগ্রাম কেঁদেছে কিন্তু তাতেও তাকে বাঁচানো যায়নি। ভূমিকম্পের সময় মানুষের মাথা ঠিকমত কাজ করেনা। শিশুটির বাবামা ভাইবোন বাড়ী থেকে দৌড়ে বের হয়ে যাওয়ার সময় কারোরই ওর কথা মনে হয়নি। যখন সবাই সুস্থির হোল তখন ওদের ফ্লোর মাটির নীচে চলে গিয়েছে।

আমাদের পাড়ার মসজিদে তখন মাগরিবের নামাজ হচ্ছিলো। নামাজের মধ্যখানে অনেকের সাথে বাবার ছোটবেলার বন্ধু ফরিদ মামা দৌড়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলেন। ভূমিকম্পের পর ইমাম সাহেবের সাথে ওনার ছেলেকে মসজিদ থেকে বের হয়ে আসতে দেখে ওনার মনে পড়লো যে সাথে আসা ছেলেকে রেখেই উনি চলে এসেছেন! আর আমার ভাই আহমদ পরে স্বীকার করল যে সে আগেই নামাজ শেষ করায় বুঝতে পারেছিল যে ভূমিকম্প হচ্ছে কিন্তু সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে জায়নামাজ ভাঁজ করেই বেরোবে! বিপদের সময় মানুষ কত অসহায় হয়ে যায় যে সে সঠিকভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে! আল্লাহর অশেষ রহমত যে তিনি সেদিন আমাকে স্থিরতা দিয়েছিলেন। নইলে আমার বাবামা যখন ইরান থেকে উদ্বিগ্ন হয়ে ফোন করল তখন আমি কি বলতাম?

এরকম আরো অসংখ্য ভূমিকম্প দেখেছি চট্টগ্রামে। এর কিছু কিছু স্মরনীয় হয়ে আছে এর সাথে বিজড়িত স্মৃতির কারণে। ২০০০ সালের দু’টো ভূমিকম্পের কথা মনে পড়ে। একটা বছরের প্রথমদিকে আরেকটা শেষদিকে। প্রথমটির সময় রাত চারটেয় জেগে বসে আছি, শরীর ভালো লাগছিলোনা। হঠাৎ পুরো বিল্ডিং দুলে উঠলো। সাথে সাথে পাশের ঘরের সারি সারি অ্যাকুয়ারিয়ামের পানি ছলাৎ ছলাৎ করে ছলকে পড়তে শুরু করল, স্টিলের র‌্যাকশুদ্ধ এমন গুড়গুড় করে কাঁপতে শুরু করল যে মনে হচ্ছিল সব উপুড় হয়ে উলটে পড়বে। হাফিজ সাহেব দেখি নির্বিকার শুয়ে ঘুমোচ্ছেন! ওনাকে ডাক দিয়ে বুঝতে পারলাম উনি জেগেছেন কিন্তু নড়াচড়া করার প্রয়োজন মনে করছেন না! আমিও ভাবলাম এই পাঁচতলার ওপর থেকে যাব কোথায়? তাই বসেই রইলাম। একটু পরে ভূমিকম্প থেমে গেলে হাফিজ সাহেব উঠে আলো জ্বালিয়ে ওনার গোল্ডফিশ, এঞ্জেলফিশদের দঙ্গল্ দেখে এসে আনন্দের সাথে জানালেন যে ওনার মাছের ব্যাবসা অক্ষত আছে। তারপর ওপাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়লেন! আমি মেজাজ খারাপ করে বসে রইলাম- ওনার হবু সন্তানের মা বমি করে মরে ওনার খবর নেই আর ওনার মাছেরা ভয় পেল কি’না দেখার জন্য উনি কষ্ট করে গাত্রোত্থান করেন!

সে বছরের শেষদিকে। তখন আমি আইআইইউসি তে শিক্ষকতা শুরু করেছি, সাথে আমার কয়েকমাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে যাই। সেদিন বিকেলে ডিপার্টমেন্টের মিটিং ছিল। কি কারণে যেন ডিপার্টমেন্টের বয়োজ্যেষ্ঠ দু’জনের ভীষণ ঝগড়া লেগে গেল। বাকীরা অসহায়ের মত বসে আছি। হঠাৎ দু’জনেই ঝগড়া থামিয়ে দরজার দিকে দৌড় দিলেন, একটু পরে আবার আচমকা ফিরে এলেন। তাঁদের এই আচরণ আমাদের ঝগড়ার চাইতেও অদ্ভুত মনে হোল। জিজ্ঞেস করার পর দু’জনেই খুব লজ্জা লজ্জা মুখ করে বললেন, “ঝগড়ার মধ্যখানে আমাদের হঠাৎ মনে হোল ভূমিকম্প হচ্ছে। তাই তাড়াতাড়ি তোমাদের ফেলেই দৌড় দিলাম। কিন্তু একটু পরে দেখি তোমরা বা বিল্ডিংযের আর কেউই পালানোর কোন চেষ্টা করছেনা। তখন ভুল বুঝতে পেরে ফিরে এলাম”।

২০০৪ সালের সুনামীর সময় আমরা ঢাকায়। সকালে ঘুমের মধ্যে তীব্র ধাক্কায় আমি উঠে বসলাম। সবাই যখন জেগে উঠে আলাপ করছে আমি বললাম ভূমিকম্প আর আমার বাবা আর তার জামাই বলে কি’না বড় ট্রাক যাবার ভাইব্রেশনকে আমি ভূমিকম্প মনে করে ভুল করেছি! পরে তো পৃথিবীব্যাপী সবাই দেখেছে সুনামীর প্রলয়তান্ডব। একদিন বান্ধবী নাহিদ আপার সাথে রিক্সায় করে গ্রীণ রোড দিয়ে আসার সময় আমরা আলাপ করছিলাম যে ঢাকায় যদি চট্টগ্রামের মত ভূমিকম্প হত তাহলে কেউ বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ। মানুষ যাবে কোথায়? এত বড় বড় বিল্ডিং, নামার আগেই তো সব শেষ! আর কেউ যদি নেমেও আসে, দাঁড়ানোর মত নিরাপদ জায়গাটুকুও তো নেই! চারপাশের বিল্ডিং ভেঙ্গে পড়েই সে মারা পড়বে!

২০০৬ সালে একদিন ফজর নামাজ পড়ে ঘুমিয়েছি। বিছানার নড়াচড়ায় বিরক্ত হয়ে আধোঘুমের মধ্যে হাফিজ সাহেবকে বললাম, “উফ! আপনার এই বিশাল দেহ নিয়ে বিছানা নাড়াচ্ছেন কেন?” উনি জবাব দিলেন, “পুরো বিল্ডিং আমি নাড়াই না?” ওনার কথায় ঘুম ছুটে গেল। সত্যিই তো! আমার দ্বিতীয় সন্তানের আসন্ন জন্ম উপলক্ষ্যে আমি খাট বহিষ্কার করেছি, মাটিতে বিছানা পাতা, এই বিছানা উনি নাড়বেন কি করে? পুরো বিল্ডিংই দুলছে!

কুর'আনে বিভিন্ন জায়গায় যে ভূমিকম্পের বর্ণনা এসেছে তার সাথে মিল খুঁজে পাই এইসব অভিজ্ঞতার। কোথাও বলা হয়েছে মানুষ মাতালের মত আচরন করবে যদিও তারা মাতাল হবেনা; কোথাও বলা হয়েছে তারা তর্করত থাকা অবস্থায়ই কেয়ামত শুরু হয়ে যাবে এবং তারা তর্ক থামিয়ে বলবে, “হায় এখন তো আমরা পরিবার পরিজনের কাছেও ফিরে যেতে পারবনা!”; আর কোথাও বলা হয়েছে যে শাস্তি হিসেবে বিভিন্ন জনপদে ভূমিকম্প দিয়ে সব ধুলিস্যাৎ করে দেয়া হয়েছে। মনে হয় আমরা এত দুর্বল- শারিরীক এবং মানসিকভাবে- যে আমাদের শাস্তি দেয়ার জন্য খুব বেশী বিপদ প্রয়োজন হয়না। অথচ বিপদ কেটে গেলেই আমরা এমন একটা ভাব করি যেন আমরা কত শক্তিশালী বা বুদ্ধিমান! যারা বুদ্ধিমান, এই অভিজ্ঞতা তাঁদের জীবনকে পরিবর্তন করে দেয়- তাঁরা তাঁদের জীবনের মূল্য বুঝতে পারেন এবং একে কাজে লাগানোর অন্য সর্বোতভাবে সচেষ্ট হন। কিন্তু যারা নির্বোধ, চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা তাঁদের মধ্যে কোন ভাবান্তর সৃষ্টি করতে পারেনা এবং উদ্দেশ্যহীনভাবেই তাদের দিন কাটতে থাকে।

1 comment:

  1. হাহাহাহহাহাহাহাহাহাহাহোহোহহোহোহোহো
    এই লেখা পড়তে গিয়ে তো পেট ফেটে গেলো আপু!!!!!!!! হাহাহাহাহহাহাহাহাহ................

    এক জায়গায় ভাইয়া মাছ নিয়ে ব্যস্ত, আরেক জায়গায় উনি নিজেই পুরো বিল্ডিং দুলাচ্ছেন ;) lolzzzzzzzzzzzzzzzzzz....... xD

    ReplyDelete