Sunday, February 17, 2013

প্রেম করিব তোমার সনে

আজকে ওকে পেয়েছি আমি! ওর একদিন কি আমার একদিন। কি মনে করেছে সে? আমাকে একটা মিথ্যা কথা বলবে আর আমি যাচাই করে দেখবনা? আমাকে ঝেড়ে ফেলা কি এতই সহজ? প্রেম আমি করবই। এত কষ্ট করে ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেলাম। চার বছর কি শুধু লেখাপড়া করেই কাটিয়ে দেব? জীবনের রঙ রূপ গন্ধ স্পর্শ কি উপভোগ করে দেখবনা? ইউনিভার্সিটি ভর্তি হবার আগে থেকেই স্বপ্ন দেখতাম ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দরী আর স্মার্ট মেয়েটাকেই আমার গার্লফ্রেন্ড বানাবো, তাকে নিয়ে পার্কে ঘুরব, চীনাবাদাম খাব, সবাই আমাদের দিকে হিংসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে। ভর্তি পেয়েই এই টার্গেট নিয়ে মাঠে নামলাম। নিজেকে আকর্ষনীয় করে তুলতে হবে- তাই প্রথম দিন থেকেই ভাল ভাল জামাকাপড় পরি,  প্রচুর স্টাইল মারি, মেয়েদের কাছেপিছে দেখলেই উচ্চস্বরে কথা বলি যেন তারা ফিরে তাকায়। কত মেয়ে আমার দিকে আড়চোখে তাকায়, কিছু বলতে চায়, অথচ যার জন্য এতকিছু রপ্ত করছি সে কিনা আমাকে পাত্তাই দেয়না! দাঁড়াও, দেখাচ্ছি মজা!

 
ঐ তো সাদিয়া আসছে! আমাকে দেখেই অন্যদিকে মোড় নিতে যাচ্ছিল, আমি সামনে গিয়ে দাঁড়াই।

‘তুমি আমাকে মিথ্যা কথা বলেছ, আমি খবর নিয়ে জেনেছি তুমি বিবাহিতা নও’।

সে কিছু বলেনা, শীতল দৃষ্টিতে তাকায় আমার দিকে, ‘চল, মাঠে গিয়ে বসি’।

আমার হৃদয়বীনায় ঝঙ্কার ওঠে, যেন মাঠে নয় স্বর্গের উদ্যানে ওর সাথে অনন্তকাল যাপন করার জন্য রওয়ানা হয়েছি আমি!
আমরা মাঠে গিয়ে ঘাসের ওপর মুখোমুখি হয়ে বসি। আহ! কি রোমান্টিক! আবেগে চোখ বন্ধ হয়ে যায় আমার।

চোখ মেলে দেখি সাদিয়ার দু’পাশে ওর দুই বান্ধবী ওর গা ঘেঁষে বসে আছে। হৃদয়ের তানপুরাটায় ছেদ পড়ে।
‘ওরা এখানে কি করছে?’

‘আমাকে যা বলার ওদের সামনেই বলতে হবে’, দৃঢ়ভাবে বলে সাদিয়া।

আমিও দমে যাবার পাত্র নই, বিপদে ডরেনা বীর।

বললাম, ‘তুমি আমাকে মিথ্যা বললে কেন?’

‘তুমি কি জানোনা কেন?’

চুপ করে থাকি।

‘তুমি আসলে কি চাও, বল তো?’

‘তোমাকে ভালোবাসতে চাই’।

‘তারপর?’

‘তারপর আর কি? প্রেম করতে চাই’।

‘তারপর?’

‘তারপর... যদি ইউনিভার্সিটি শেষ করার পর সব ঠিকঠাক থাকে হয়ত আমাদের বিয়ে হবে’।

‘নয়ত?’

‘নয়ত এই স্মৃতিটাই আমাদের জন্য বেদনামধুর হয়ে থাকবে’।

‘আমি এই শর্তে রাজী নই। কারণ এতে প্রাপ্তি আছে দায়বদ্ধতা নেই। তুমি যদি আমাকে বিয়ে করতে চাও, তাহলে তোমার বাবামাকে নিয়ে এসো, আমার বাবামা রাজী হলে শুধু চার বছর কেন সারাজীবন আমি তোমার সাথে থাকব। এর বাইরে একটি মূহূর্তও আমি তোমার সাথে কাটাতে নারাজ’।

‘কিন্তু এখন আমি বিয়ে করব কি করে?! সবে তো মাত্র ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি, এখন কি বাবামা বিয়ে দেবেন? আমার কি কোন ইনকাম আছে? আমি তোমায় রাখব কোথায়, খাওয়াব কি?’

‘তাহলে তুমিই বল, আমি যদি তোমাকে প্রস্তাব দিতাম আমি তোমার কোন দায়িত্ব নেবনা কিন্তু তোমার সাহচর্য উপভোগ করব, এই শর্তে তুমি কি আমরা সাথে থাকতে রাজী হতে?’

চিন্তায় পড়ে গেলাম। ‘হ্যাঁ’ও বলতে পারিনা, ‘না’ও বলতে পারিনা।

 
‘তুমি আমাকে কেন পছন্দ কর?’

যাক, বাঁচা গেল। সহজতর প্রসঙ্গে আলাপ করতে পেরে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলাম।

‘তুমি লম্বা, ফর্সা, সুন্দরী, তোমার চোখ দু’টো অদ্ভুত সুন্দর...’

‘তার মানে আমার মেধা, মনন, চরিত্র কোন ব্যাপার না। এখন ভেবে দেখ, তুমি যে জিনিসগুলোর কথা বললে এগুলো কোনটাই আমার অর্জন নয়, সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত উপহার, তিনি যখন ইচ্ছে ফিরিয়ে নিতে পারেন। আমি যদি অ্যাক্সিডেন্টে পা দু’টো হারিয়ে ফেলি আমার উচ্চতা কমে যাবে, রোদে জ্বলে আমি তামাটে হয়ে যেতে পারি, কয়েকবছরের মধ্যেই এই চামড়া ঝুলে যাবে তারপর কুঁচকে যাবে, আর আমি যদি অন্ধ হয়ে যাই তাহলে আমার চোখ দু’টো আর কাউকে আকর্ষন করতে পারবেনা। তার মানে তখন আর তোমার কাছে আমার কোন মূল্য থাকবেনা। তাইনা? এটাকে কি ভালোবাসা বলা যায়?’

এ কি বিপদে পড়া গেল ভাই! নায়িকারা তো দেখি তাদের সুন্দর বললে আহ্লাদে গদ গদ হয়ে যায়, যেন সৃষ্টিকর্তা তাদের সামনে মডেল উপস্থাপন করে তাদের পছন্দ করতে দিয়েছিলেন, ‘বল, তুমি কেমন হতে চাও’, তাই সুন্দরী হবার কৃতিত্ব তাদেরই! এই মেয়ে তো বড় জ্বালালো!

‘শোন, আমি এজন্যও তোমাকে পছন্দ করি যে তুমি অন্নেক স্মার্ট’।

‘তাই? স্মার্টের দু’টো ডেফিনেশান আছে। একটা হোল যে দেখতে শুনতে স্মার্ট। সেটা নির্ভর করে তার পোশাক আশাক, কথাবার্তা, পসচার এবং চালচলনের ওপর। তার মানে যদি আমি ভাল জুতোজামা পরতে না পারি, কুঁজো হয়ে যাই কিংবা কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি তাহলেও তোমার কাছে আমার কোন মূল্য থাকবেনা!’

কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে করছে আমার!

‘স্মার্টের আরেকটা অর্থ হোল বুদ্ধিমান। আমি মনে করি এই বয়সটা আমার নিজেকে গড়ে তোলার সময়- এখন আমার সবচেয়ে জরুরী কাজ লেখাপড়া করে জ্ঞানার্জন করা, যে বাবামা ভাইবোন আমাকে এতগুলো বছর ছায়াবৃক্ষের মত আগলে রেখেছেন তাদের সম্মানের প্রতি সচেতন হওয়া, সমাজসেবার মাধ্যমে সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখা, সৃষ্টিশীল কাজের মাধ্যেম নিজেকে বিকশিত করা। তোমার কি মনে হয় আমি যদি এই সময়টা অনর্থক পার্কে ঘুরে, চীনাবাদাম খেয়ে ব্যায় করি সেটা স্মার্টনেসের পরিচায়ক হবে? কেন এতগুলো লক্ষ্য বাদ দিয়ে আমরা একটি লক্ষ্যহীন সম্পর্কের পেছনে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেব, বলতে পারো?’

যুক্তি খুঁজে পাচ্ছিনা।

 
‘শোন, তুমি তো আমাকে ভালোবাস, তাইনা?’

‘হ্যাঁ’।

‘তাই যদি হয় তাহলে আমি কি বন্ধু হিসেবে তোমাকে কিছু কথা বলতে পারি?’

‘অবশ্যই’।

‘তুমি একজন স্মার্ট এবং বুদ্ধিমান ছেলে। তোমার সামনে আছে অপার সম্ভাবনা। তোমার বাবামা এই সম্ভাবনার কথা ভেবে নিজেদের অনেক আশা আকাঙ্খা, কষ্ট, ত্যাগ তুচ্ছ জ্ঞান করে তোমাকে সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠে পড়তে পাঠিয়েছেন। অথচ তারা চাইলেই তোমাকে কোন গাড়ীর গ্যারেজে মেকানিক হিসেবে কিংবা কোন অফিসে পিয়নের চাকরী দিয়ে টাকা ইনকাম করতে ঢুকিয়ে দিতে পারতেন! তাহলে তাদের এই ত্যাগের কথা কি তোমার মাথায় রাখা উচিত নয়? লেখাপড়া করে পৃথিবীটাকে জানার মাধ্যমে, নিজেকে গড়ে তুলে আশেপাশের মানুষগুলোর কষ্টে এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে তুমি তোমার বাবামায়ের এই কষ্টের মূল্যায়ন করতে পারো, একজন সফল এবং ভাল মানুষ হবার মাধ্যমে তুমি তাদের সম্মান উচ্চকিত করতে পারো। এভাবে নিজেকে গড়ার সংকল্প নিয়ে নামলে কয়েকটা বছর কোনদিক দিয়ে কেটে যাবে তা তুমি নিজেই টের পাবেনা। তারপর যেদিন তুমি প্রস্তুত হবে সেদিন তোমার মিতা আপনিই তোমার সামনে এসে উপস্থিত হবে, সে আমি হই বা অন্য কেউ’।

আমি মাথা নত করে ভাবতে থাকি।

 
‘জানো, তুমি ভাবছ আমি বিবাহিতা নই, তুমি বিবাহিত নও, তাই এই সময়টা আমরা পরস্পরের সাহচর্য উপভোগ করতে পারি। কিন্তু একটু ভেবে দেখ, কেউ একজন পৃথিবীর কোন এক কোণে আমার জন্য অপেক্ষায় বসে আছে। হয়ত আমাদের দেখা হয়েছে, হয়ত হয়নি। কিন্তু আমরা একদিন পরস্পরের শ্রেষ্ঠ বন্ধু হব, একে অপরকে অনুপ্রাণিত করব নিজেকে অতিক্রম করে যেতে, বিপদের বন্ধু হব, সুখ দুঃখে একে অপরের সাথী হব, অন্যায় হতে একে অপরকে টেনে ধরব এবং অনন্তকাল এক অপরের পাশাপাশি চলব। সেই বন্ধুটির জন্য আমি নিজেকে সেভাবে সংরক্ষণ করতে চাই, সকল প্রলোভন হতে নিজেকে সংবরণ করতে চাই, সমস্ত প্রেম বাঁচিয়ে রাখতে চাই যেন যেদিন আমাদের দেখা হবে সেদিন সে আমাকে তার সর্বস্ব দিয়ে বিশ্বাস করতে পারে, তার সবটুকু আমাকে উজার করে দিয়ে ভালোবাসতে পারে, আমার এই উপহার গ্রহণ করে কৃতার্থ হতে পারে। বল, সেই অদেখা অচেনা অজানা মানুষটির সাথে আমার যে প্রেম তার চেয়ে রোমান্টিক আর কি হতে পারে? এই ভালোবাসাই আমি উপহার দিতে চাই আমার স্বামীকে যেদিন তার সাথে আমার প্রথম সাক্ষাত হবে। তুমিও কি তাই চাওনা?’

কথাবার্তায় তুখোড় বলে আমার একটা সুপ্ত অহংকার ছিল। কিন্তু সাদিয়ার সামনে আমি নিশ্চুপ হয়ে গেলাম। ওর প্রতিটি কথাই তো যুক্তিযুক্ত, তাহলে আমি কোথায় আপত্তি করব? মনে মনে আমিও তো চাই আমার নববধূর জীবনে আমিই হব প্রথম পুরুষ, সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু যাকে সে তার জীবন দিয়ে বিশ্বাস করতে পারবে, অকুন্ঠচিত্তে নিজের সবটুকু উজার করে দিয়ে ভালবাসতে পারবে। কিন্ত এর জন্য যে আমাকেও তার প্রতি বিশ্বস্ত হতে হবে এটা তো মাথায় ছিলোনা! যা আমি দিতে প্রস্তুত নই তা চাইবার অধিকার যে আমার নেই তা তো ভাবিনি!

 
সাদিয়া আর ওর বান্ধবীরা চলে যাচ্ছে। মনটা কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে ওদের প্রতি। ওরা আসলেই অনেক স্মার্ট। যুগের গড্ডালিকা প্রবাহে যেখানে আমি এবং আমরা ভেসে চেলেছি নিজের অজান্তে অচেনা গন্তব্যে, সেখানে ওরাই খুঁজে নিয়েছে আসল শান্তির ঠিকানা।

সেই ছেলেটি

ছেলেটার কথা শুনেছি অনেক, কিন্তু দেখেছি একবারই। রাতের অন্ধকারে বিল্ডিংয়ের সানশেডের নীচে সিঁড়ি থেকে যে সামান্য আলো ঠিকরে পড়ছিল সেই আলো আঁধারীতে বসে পড়াশোনা করছিল। আমাকে দেখেই তড়াক করে উঠে দাঁড়ালো। মাঝারী রকম লম্বা, ফর্সা, টানা টানা দু’টো চোখ, মায়াবী চেহারা, হাল্কা ঢেউ খেলানো চুল কানের দু’পাশ বেয়ে নেমে এসেছে, বয়স বিশ হলেও দেখতে আরো ছোট মনে হয়। সালামের জবাব দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি করছ?’

বলল, ‘ম্যাডাম, ক’দিন পরই বি এ পরীক্ষা, প্রস্তুতি নিচ্ছি’।
আমি বললাম, ‘তাহলে তুমি পড়, আমি আর ডিস্টার্ব না করি। ভাল করে পরীক্ষা দিয়ো’।

আর কোন কথা হোলনা। কিন্তু হাফিজ সাহেব আসতে দেরী হচ্ছিল, খুব অস্বস্তি লাগছিল যে সে আর কিছুতেই আমার সামনে বসলনা, দাঁড়িয়েই রইল যতক্ষণ না আমরা বাইক নিয়ে চলে এলাম।

আমাদের ছোট্ট স্কুলটা দিনে দিনে বড় হতে থাকে। স্কুলের পরিধির সাথে সাথে একসময় কাজের পরিমানও বাড়তে থাকে। দেখা গেল প্রায়ই সন্ধ্যার পর নানাধরনের ট্রেনিং, আলোচনা বা অনুষ্ঠান থাকছে। সারাদিনের কর্মক্লান্ত পিয়নরা সন্ধ্যার পর দ্বিতীয় শিফটে রাত পর্যন্ত কাজ করে পরদিন আবার ভোরে স্কুল খুলতে আসে, এটা তাদের ওপর জুলুম হয়ে যাচ্ছে। তখন একজন নাইটগার্ডের প্রয়োজন দেখা দিল যে সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত গেট খোলাবন্ধ করবে এবং সকালে স্কুল খুলে দেবে। যেহেতু কাজের পরিমান কম তাই এই কাজের জন্য বেতন বরাদ্দ ছিল অল্প। এই বেতনে উপযুক্ত লোক খুঁজে পাওয়াটা ছিল বেশ মুস্কিলের ব্যাপার। কারণ তাকে বিশ্বস্তও হতে হবে। এগিয়ে এলো আমাদের পিয়ন জামশেদ। বলল, ‘আমার ফুপাত ভাই সাইফুল ভাল ছাত্র, টাকার অভাবে ওর পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। ওকে যদি এই কাজ দেয়া হয় তাহলে সে বেতনের টাকা দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে নিতে পারবে, পাশাপাশি পড়াশোনা করার মত যথেষ্ট সময়ও পাবে’। এতে উভয়পক্ষের উপকার হয়। ওর চাকরী হয়ে গেল।

আমাদের নানান কাজে প্রায়ই সন্ধ্যার পর স্কুলে যাওয়া হত। কিন্তু ভীষণ লাজুক এই ছেলেটির সাথে দেখা হতনা খুব একটা। তবে ওর প্রশংসা শুনতাম সবার কাছে। সে নামাজের ব্যাপারে ভীষণ নিয়মিত ছিল, এমনকি তাহাজ্জুদ নামাজ, কিন্তু সে নামাজ একাই পড়তনা, সবাইকে ডেকে ডেকে পড়তে উৎসাহিত করত, সবাই বলতে আমাদের যেসব স্টাফ স্কুলের পেছনে স্টাফ কোয়ার্টারে থাকত, তার মধ্যে ওর মামাত ভাই জামশেদও ছিল। মুখচোরা ছেলেটি দিনের বেলা খুব প্রয়োজন ব্যাতিরেকে রুম থেকে বেরই হতনা। অন্যান্য পিয়নরা অনেকসময় স্কুলের আয়াদের সাথে কথাবার্তা বলত, সে কিছুতেই সামনে আসতনা। রুমের ভেতর ঘাপটি মেরে পড়াশোনা করত আর সন্ধ্যা হলেই নিজের কাজে লেগে যেত।

একদিন সকালে স্কুলে গিয়ে দেখি স্টাফ কোয়ার্টারের ওখানে বেশ ভিড়। বাচ্চাদের বকাঝকা করে ওখান থেকে তাড়া করা হচ্ছে। ব্যাপার কি? ওপরতলায় গিয়ে শুনলাম অদ্ভুত ঘটনা। রাতে গেট বন্ধ করে, খেয়েদেয়ে, গল্পসল্প করে ওরা সবাই ঘুমাতে গেল। মধ্যরাতে জামশেদ বাথরুমে যাবার জন্য উঠে সাইফুলকে ডাক দিল, ‘কি রে, আজ তাহাজ্জুদ পড়বিনা?’ সে কোন সাড়া দিলোনা। জামশেদ ভাবল, হয়ত আজ শরীরটা ভাল নেই, তাই আর কিছু বললনা। ভোরে ফজর নামাজের সময়ও সাইফুল উঠলোনা। জামশেদ ভাবল শরীর মনে হয় নিতান্তই খারাপ, নইলে সে প্রতিদিন ভোরে উঠে নামাজ পড়ে কুর’আন পড়ে। সকালে স্কুল খোলার টাইমেও ওর কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে জামশেদ গিয়ে ধাক্কা দিল। গায়ে হাত দিতেই সে চমকে উঠল। হিম হয়ে আছে সাইফুলের দেহ। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার, প্রিন্সিপাল স্যারসহ অন্যান্য লোকজন মিলে গিয়ে দেখার পর সবাই হতবাক হয়ে গেল, ছেলেটা আসলেই রাতে ঘুমের ভেতর মারা গিয়েছে! বিশ বছর বয়স, কিন্তু ওর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে!

কয়েক ঘন্টার ভেতর গ্রাম থেকে ওর বাবা এলেন। আমাদের ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিলোনা, এমনটা কি করে হতে পারে? স্কুল কর্তৃপক্ষ পোস্ট মর্টেম করতে চাইল। কিন্তু ওর বাবা বললেন, ‘আমার ছেলেটাকে আল্লাহ নিয়ে গিয়েছেন। আমি মেনে নিয়েছি। ওর মৃতদেহটাকে আপনারা আর কষ্ট দিয়েন না। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা ওকে দাফন করতে চাই’। কিন্তু বেচারা দরিদ্র মানুষ, শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত যে লাশ পরিবহন করবেন সেই সামর্থ্য তো তার নেই। তাকে আশ্বস্ত করা হোল, ‘আপনি বাড়ী যান, দাফনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করুন, আমরা লাশ নিয়ে আসছি’। উনি চলে গেলেন। স্কুল ছুটির পর আমরা দু’টো মাইক্রোবাস ভাড়া করে একটাতে ওকে নিলাম, আরেকটাতে প্রিন্সিপাল স্যারসহ আমরা কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষক গেলাম। ওদের গ্রামের বাড়ী পৌঁছতেই চারিদিক থেকে গ্রামবাসী ঘিরে ধরল। ভাল ছেলে হিসেবে সুপরিচিতির কারণে সবাই সাইফুলকে খুব পছন্দ করত। তাই তারা তাকে শেষবারের জন্য এক নজর দেখতে এসেছে।

আমরা গিয়ে ওদের ঘরে প্রবেশ করতেই বাড়ীর মহিলারা ভেতরের ঘরে চলে গেলেন। আমরা মহিলা শিক্ষকরা ভেতরে গিয়ে তাদের সান্তনা দেয়ার বৃথা চেষ্টা করতে লাগলাম। কি বলব সেই মাকে যে বসে ছিল ছেলে বি এ পরীক্ষা দেবে, ভাল চাকরী করবে, তাদের সংসারে অভাব দূর হবে, ছেলেকে সে মনের মত করে খাওয়াতে পারবে, বিয়ে দেবে, নাতিনাতনীদের নিয়ে উঠোনে বসে খেলবে? কি বলে বোঝাব সেই বোনটিকে যে বসে আছে ভাই শহর থেকে তার জন্য খেলনা কিনে আনবে, ভাইকে সে পিঠা বানিয়ে খাওয়াবে? ওদিকে পুরুষমহলেও একই অবস্থা। হৃদয়বিদারক একটি দিন শেষে শ্রান্ত ক্লান্ত আচ্ছন্ন হৃদয়মন নিয়ে বাড়ী ফিরে এলাম।

সাইফুলকে স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা খুব একটা কঠিন ছিলোনা। যে সবসময় নিজেকে লুকিয়ে রাখত তাকে মনে করাটাই তো আসলে কঠিন। শুধু জামশেদ এই স্মৃতি ভুলতে পারলোনা। সে প্রথমে অন্যত্র বাসা নিলো। পরে অন্যত্র চাকরী নিয়ে চলে গেল। তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখত সবসময়।

আর আমরা। কেন যেন এই পরিবারটিকে আমরা ভুলতে পারতাম না। ওরা দরিদ্র ছিল, কিন্তু ওদের ছেলেটিকে ওরা নৈতিক শিক্ষায় দীক্ষিত করেছিল। ভুলতে পারতাম না ওর বাবা কি কঠিন পরিস্থিতিতে কি অসাধারন ধৈর্য্য ধারণ করেছিলেন যেন তার ছেলেটি মৃত্যুর পর কোন কষ্ট না পায়। কি করে ভুলব সেই দুঃখিনী মাকে যে তার প্রথম সন্তান হারিয়ে বাকহারা হয়ে গিয়েছিল? তাই হয়ত প্রতিবছর ঘুরেফিরে সাইফুলের মৃত্যুর সময়টাতে আমরা একবার ওর গ্রামের বাড়ী ঘুরে আসতাম, ওর পরিবারের খোঁজখবর নিতাম। আমাদের কিছুই ছিলোনা ওদের দেয়ার মত। তবু হেলিকপ্টার নামধারী বাইকটা নিয়ে চলে যেতাম সেই সুদূরে, ওদের একনজর দেখে আসতাম। ওরা খুশি হত, আমরাও মনে শান্তি পেতাম।

একবার সাইফুলদের বাড়ীতে যাবার পথে বাইকে বসে দু’জনে কথা বলতে বলতে আমরা ভুল করে ডানে মোড় নেয়ার পরিবর্তে বাঁয়ে মোড় নিয়ে অনেকদূর চলে গেলাম। চারপাশের দৃশ্যাবলী দেখেই সন্দেহ হোল, ‘পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ!’ তবু পথ খুঁজে পাবার ক্ষীণ আশা নিয়ে আরো কিছুদূর যাবার পর সামনে একটা নদী দেখে আমরা নিশ্চিত হলাম ভুল পথে এসে পড়েছি। ঐ মোড় পর্যন্ত পুরোটা পথ ফিরে গিয়ে আবার ডানে মোড় ধরতে হবে। হাফিজ সাহেব বললেন, ‘শোন, যেহেতু এতদূর চলেই এসেছি, চল তোমাকে একটা জিনিস দেখাই। শর্ত একটাই, যতক্ষণ ওখানে থাকবে কোন শব্দ করতে পারবেনা’। একটু অবাক হলাম এমন অদ্ভুত শর্তে, কিন্তু ভাবলাম, ‘যাক, একটা নতুন জায়গা যদি ঘুরে দেখা যায় আর অসুবিধা কি?’  

একটু পর উনি বাইক এক জায়গায় ঢুকিয়ে দিলেন, দেখি এই প্রত্যন্ত গ্রামের ভেতর শত শত লেটেস্ট মডেলের দামী দামী গাড়ী, আমাদের ছোট্ট বাইকখানা রাখার জায়গা পাওয়াই মুস্কিল! তারস্বরে গান বাজছে, পথের দু’ধারে নানারকম জিনিসের পসরা, ভাবলাম হয়ত কোন মেলা বসেছে। ভেতরে গিয়ে দেখি সারিসারি কবর, নতুন কবর, পুরান কবর, বড় কবর, ছোট কবর, ঘেরা দেয়া কবর, ঘেরা ছাড়া কবর। কোন কোন কবরের ওপর দামী ঝালর পাতা কিংবা আরো অনেক কারুকাজ করা, প্রতিটি কবরের পাশেই কেউ না কেউ বসে পয়সা নিচ্ছে, কেউ কেউ বসে কুর’আন পড়ছে, কিছু কিছু জায়গায় দেখলাম বোরকা পরা মহিলারা কবরের সামনে ঝুঁকে সিজদা দিচ্ছে! চোখের সামনে স্পষ্ট শিরক দেখে আমার গা শিউরে উঠল, আমি চিৎকার দিতে যাচ্ছিলাম, ‘কি করছেন আপনারা?’ কিন্তু হাফিজ সাহেব আমার মুখ চেপে ধরলেন, ‘খবরদার, এখানে কোন কথা বলবেনা, শুধু দেখতে থাকো’। ওখান থেকে বের হয়ে দেখলাম কয়েকটা পুকুর, ঐ পুকুরে খোসপাঁচড়া থেকে শুরু করে ক্যান্সারের রোগী নেমে গোসল করছে, আবার কিছু কিছু মানুষ ঐ ‘পবিত্র’ পানি বোতলে ভরে নিয়ে যাচ্ছে রোগাক্রান্ত কাউকে খাওয়ানোর জন্য যেন ওরা ভাল হয়ে যায়। আরেকটা চিৎকার উঠে এলো গলা থেকে, ‘এই পানি খেলে তো সুস্থ মানুষও মারা যাবে!’ চিৎকারটা মাঝ পথে গিলে ফেললাম কিন্তু হজম করতে পারলাম না। হাফিজ সাহেবকে বললাম, ‘এখান থেকে চলেন, আমার দম বন্ধ লাগছে!’

আজও সেই দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠলে স্বাভাবিক হতে পারিনা। হিন্দি মুভিগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় সেইসব মুসলিমদের সাথে তাদের কোন দ্বন্দ্ব নেই, তাদের নিয়ে এদের কোন মাথাব্যাথা নেই যারা কবরপূজা করে। কারণ প্রকৃতপক্ষে তাদের উভয়ের মাঝে পার্থক্য কেবল পূজার জন্য পূজ্য বেছে নেয়ায়, যেই আরাধ্য আল্লাহ নন, এছাড়া আর কিছু নয়।

আল্লাহ তাঁর নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘বলুন, তিনি আল্লাহ, এক। আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। এবং তার সমতুল্য কেউ নেই’ (সুরা ইখলাস)। এর চেয়ে স্পষ্ট আর কি নির্দেশ হতে পারে? তিনিই একমাত্র প্রভু, একমাত্র আরাধ্য, একমাত্র দাতা এবং একমাত্র ক্ষমাকারী। তারপরেও শিক্ষিত অশিক্ষিত, ধনী গরীব সকল ক্যাটাগরীর মানুষ কতগুলো কবরের সামনে কিছু মৃত মানুষের কাছে গিয়ে প্রার্থনা করছে- আমাকে একটি সন্তান দাও, আমাকে একটি চাকরী দাও, আমার পরীক্ষার ফলাফল ভাল করে দাও, আমাকে আরো ধনবান করে দাও, আমার রোগ ভাল করে দাও- অথচ এই অসহায় মানুষগুলোর ক্ষমতা নেই তারা নিজের জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করে, তারা অপরের জন্য কি করবে? ওরা তো দুনিয়ার পাট চুকিয়ে চলে গিয়েছে! কিয়ামতের দিন পর্যন্ত তাদের পৃথিবীর সাথে আর কোন সম্পর্কে নেই সাদকায়ে জারিয়া ছাড়া। আল্লাহ বলেছেন কিয়ামতের দিন ‘আল্লাহ একত্রিত করবেন তাদেরকে এবং তারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করত তাদেরকে, সেদিন তিনি উপাস্যদেরকে বলবেন, তোমরাই কি আমার এই বান্দাদেরকে পথভ্রান্ত করেছিলে, না তারা নিজেরাই পথভ্রান্ত হয়েছিল? তারা বলবে-আপনি পবিত্র, আমরা আপনার পরিবর্তে অন্যকে মুরুব্বীরূপে গ্রহণ করতাম না; কিন্তু আপনিই তো তাদেরকে এবং তাদের পিতৃপুরুষদেরকে ভোগসম্ভার দিয়েছিলেন, ফলে তারা আপনার স্মৃতি বিস্মৃত হয়েছিল এবং তারা ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি। আল্লাহ মুশরিকদেরকে বলবেন, তোমাদের কথা তো তারা মিথ্যা সাব্যস্ত করল, এখন তোমরা শাস্তি প্রতিরোধ করতে পারবে না এবং সাহায্যও করতে পারবে না। তোমাদের মধ্যে যে গোনাহগার আমি তাকে গুরুতর শাস্তি আস্বাদন করাব’ (সুরা ফুরকানঃ আয়াত ১৭-১৯)।

অথচ এই বেচারাদের অনেকেই আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্যের সাথে, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম হিসেবেই শিরক করছেন! যারা তাদের পথ দেখাতে পারত তারা তাদের প্রতারিত করছে, তারা এই সাধারন জনগোষ্ঠীর মূর্খতার সুযোগ নিচ্ছে। কিন্তু এক্ষেত্রে যে প্রতারনা করে এবং যে প্রতারিত হয় উভয়ে সমান অপরাধী। কেননা আল্লাহ আমাদের বিবেক দিয়েছেন, বুদ্ধি দিয়েছেন, বোধশক্তি দিয়েছেন, তারপরেও, ‘অনেক মানুষ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, কিন্তু সাথে সাথে শিরকও করে’ (সুরা ইউসুফঃ আয়াত ১০৬)। কি করে মানুষ কাউকে সৃষ্টিকর্তার সমকক্ষ মনে করতে পারে যখন তিনি বলেই দিয়েছেন তাঁর সমতুল্য কেউ নেই? তবুও কেন মানুষের বোধোদয় না হয়! সামান্য একটু জানার অভাব, জানার চেষ্টা করার অভাব, অন্যের কথায় ফাঁকফোঁকর আছে কিনা তা যাচাই করে দেখার অভাব কত মানুষকে ইসলামের নামে শিরকের পথে নিয়ে যাচ্ছে ভাবতেই অবাক লাগে।

কারো কারো বক্তব্য, ‘আমরা তো তাদের কাছে চাইনা, আমরা তাদের বলি আমাদের পক্ষ হয়ে আল্লাহর সাথে কথা বলতে’। কিন্তু প্রথমত তারা নিজেরাই মৃত, দ্বিতীয়ত আল্লাহর সাথে নিগোশিয়েট করার জন্য আমাদের কোন মাধ্যম প্রয়োজন নেই, তিনি নিজেই বলেছেন, ‘কে আছ এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া?’ (সুরা বাকারাঃ আয়াত ২৫৫)। আমরা দিনে পাঁচবার তাঁর সাথে নিয়মিত এবং এর বাইরে যখন ইচ্ছে তখন অনিয়মিতভাবে যোগাযোগ করতে পারি। বরং মাধ্যম খুঁজতে গিয়েই অনেক জনগোষ্ঠী পথভ্রষ্ট হয়েছে। আল্লাহ তাঁর নবীকে পর্যন্ত সাবধান করে দিয়েছেন, ‘আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে, যদি আল্লাহর শরীক স্থির করেন, তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন হবেন’ (সুরা যুমারঃ আয়াত ৬৫)।

সাইফুলকে হিংসা হয়। এত পঙ্কিলতার মাঝে সে পণ করে নিয়েছিল, ‘ নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কোরবাণী এবং আমার জীবন ও মরন বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য’ (সুরা আনআমঃ আয়াত ১৬২) এবং সে অনুযায়ী নিজের ওয়াদা পূর্ণ করে কোন প্রলোভন কিংবা প্রতারনার দিকে না তাকিয়ে পথের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই সে চলে গিয়েছে। আমরা কি ততটা ভাগ্যবান হতে পারব?

আমি আত্মহত্যা করব

‘জামিল, তুমি যদি আমাকে বিয়ে না কর তাহলে আমি আত্মহত্যা করব’।

খাতা চেক করতে গিয়ে এই একান্ত বার্তাটি চোখে পড়ে যাওয়ায় অত্যন্ত বিব্রত বোধ করলাম। স্পষ্টতই বার্তাটি আমার জন্য লেখা নয়, আমার দৃষ্টির জন্যও নয়, খাতার মধ্যে এলো কিভাবে তাও বোধগম্য নয়। কিন্তু প্রাথমিকভাবে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাবার পর যখন বার্তার বিষয়বস্তু আমার মাথায় উদিত হোল তখন বুঝতে পারলাম এমন একটি বিষয় জানার পরে চুপচাপ খাতা চেক করে ছাত্রীকে ফিরিয়ে দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। শিক্ষক হিসেবে না হোক, মানুষ হিসেবে আমাকে কিছু করতেই হবে।

খাতা দেখা শেষে ছাত্রীকে ডেকে পাঠালাম। সময় নির্বাচন করতে হচ্ছিল এমনভাবে যেন সে সময় আর কেউ রুমে উপস্থিত না থাকে যেহেতু এটি তার একান্ত ব্যাক্তিগত বিষয়। আমার ছাত্রী হলেও বয়সে সে আমার চেয়ে খুব বেশি ছোট নয়, কিন্তু আমার সকল ছাত্রছাত্রীর প্রতি আমার আচরন মাতৃসুলভ। তাই তাদের আদর করতে যেমন কুন্ঠিত হইনা তেমনি বকা দিতেও পিছপা হইনা। সে রুমে প্রবেশ করার সাথে সাথেই ওকে নিয়ে ছুটলাম, ‘তোমরা জীবনটাকে কি মনে কর বল তো? জীবনটা কি এত সস্তা যে ইচ্ছে হোল আর ছুঁড়ে ফেলে দিলে? তোমার বাবামা কত স্বপ্ন নিয়ে তোমাকে এত বছর ধরে পেলেপুষে মানুষ করেছেন, কত আশা নিয়ে এমন ব্যায়বহুল একটি প্রতিষ্ঠানে পড়তে পাঠিয়েছেন। তাদের কথা ভাবলেনা? তোমার ভাইবোনের কি হবে তাও না? একটা ছেলেই কি তবে তোমার জীবনের সব হয়ে গেল? পৃথিবীটা কত বড়! অথচ তুমি এমন একজনের জন্য জীবনটাকে তুচ্ছ মনে করছ যে তোমাকে চায়ই না! এই চিঠি যদি আমার হাতে না পড়ে তোমার বাবামার হাতে পড়ত তাহলে তাদের কি অবস্থা হত ভেবে দেখেছ?’
আমার কথার তোড়ে ঝড়ে পড়া পাখীর মত কোনক্রমে ভেসে থাকার চেষ্টায় ছিল সে। এবার বলল, ‘ম্যাডাম, সরি, আসলে আমার জানা ছিলোনা চিঠিটা খাতার ভেতর ছিল। আসলে ওটা কিছু না’।

এবার মেজাজটা সত্যিই খারাপ হোল। আমি বলি কি আর আমাকে বলে কি? বললাম, ‘ওটা কিছু না মানে? তুমি আত্মহত্যার পরিকল্পনা করছ ওটা কিছু না?’
সে আমাকে জানাল, ‘আসলে ম্যাডাম, সে আমার শিক্ষক ছিল। আমি যখন জানতে পারি বিয়ের কয়েকমাসের মাথায় ওর স্ত্রী মারা যায় তাই সে সারাক্ষণ বিষন্ন থাকে, আমার মাঝে প্রচন্ড সহানুভূতির সৃষ্টি হয়। সহানুভূতি থেকে যে কিভাবে আমি ওকে ভালবেসে ফেললাম তা নিজেও বুঝিনি। ওকে যখন বললাম আমি ওকে বিয়ে করতে চাই, চাই ওর জীবনের বিষন্নতাগুলো সুখের রঙের আড়ালে ঢেকে দিতে, তখন সে শুধু বলল, ‘আমার সাহস হয়না। একবার স্বপ্নভঙ্গের পর আবার ঘর সাজাতে ভয় হয়’। আমি তখন দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম ম্যাডাম। আমি ওকে চাপ দেয়ার জন্য এই চিঠি লিখেছিলাম’।

আমি বললাম, ‘তুমি যদি একান্তই তাকে বিয়ে করতে চাও তাহলে তোমার বাবামায়ের সাথে কথা বল, তাদের মাধ্যমে যা করার কর। আর এই সমস্ত বাজে চিন্তা থেকে দূরে থাকো। ঠিক আছে?’
সে বলল, ‘আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি ম্যাডাম, আমি আর ঐ ধরণের চিন্তা করবনা’।

 
ধরে নেই ওর নাম স্বাতী। আমি আই আই ইউ সি তে যোগ দেই ইংরেজী ডিপার্টমেন্টের উদ্বোধনী শিক্ষকদের একজন হিসেবে। তখন ইংরেজী ডিপার্টমেন্টের অনার্সের একটাই ব্যাচ। এই উদ্বোধনী ব্যাচটি ছিল আমাদের সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং মেধাবী ব্যাচগুলোর একটি। এদের বাবামা এদের যেকোন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করাতে পারতেন কিন্তু শুধুমাত্র মেয়েদের আলাদা ক্যাম্পাস হবার কারণে আই আই ইউ সি তে পড়তে পাঠান। স্বাতী যেমন লেখাপড়ায় ভাল ছিল, তেমনি রবীন্দ্রসঙ্গীত, বিতর্ক, বক্তৃতা, আবৃত্তি, স্মার্টনেস, কনফিডেন্স কোনদিকেই পারদর্শীতার অভাব ছিলোনা। দেখতেও ছিল চমৎকার। এই ঘটনার তিনমাস পর একদিন আই আই ইউ সি র মূল ক্যাম্পাসের গেটে ওর সাথে দেখা। সে বলল, ‘ম্যাডাম, প্লিজ একটু এদিকে আসুন’। ওর সাথে গিয়ে দেখলাম একপাশে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন, মাঝারী গোছের, শ্যামলা। সে বলল, ‘ইনিই জামিল ম্যাডাম, যার কথা আপনাকে বলেছিলাম। কিছুদিন হোল আমাদের বিয়ে হয়েছে’। তাদের অভিনন্দন জানালাম, জামিলের মুখের হাসিটাই জানান দিচ্ছিল স্বাতীর উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। ভাবছিলাম, সবাই যদি এমন মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে বিয়ে করত কত ভালই না হত!

 
এর দু’তিনমাস পর দেখা গেল স্বাতী ইউনিভার্সিটি আসছেনা। ওর বান্ধবীরা কেউ কিছু জানেনা। ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়ার ব্যাপারে গাফলতি করলে আমার প্রচন্ড মেজাজ খারাপ হয়। লেখাপড়াই তো ছাত্রজীবনের পেশা। তাহলে কি এমন জরুরী কাজ থাকতে পারে যার জন্য ওরা লেখাপড়া করতে পারবেনা? আর বিয়ের পর মেয়েরা লেখাপড়ায় ঢিল দিলে একেবারে অসহ্য লাগে। আরে বাবা! তোমার স্বামী কি বিয়ে করে চাকরীবাকরী ছেড়ে দিয়েছে? তাহলে তুমি কেন লেখাপড়া বিসর্জন দিয়ে বসে থাকবে? তাহলে তো একসময় তার মনে হবে, ‘দেখে শুনে তবে কি মূর্খ বিয়ে করলাম?’ এক সপ্তাহ হয়ে গেল ওর কোন খোঁজ নেই।

এ সময় খবর পেলাম আমাদের প্রেসিডেন্সির এক ছাত্র মোহাম্মাদুল্লাহ সপরিবারে অ্যাক্সিডেন্টের শিকার হয়েছে, ন্যাশনাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। সাথে সাথে হাফিজ সাহেব আর আমি ছুটলাম হাসপাতালে। বেচারাদের কেউ অক্ষত নেই। মোহাম্মাদুল্লাহ কোলে ছিল তাই আহত হয়েছে বেশি, নাক জুড়ে সেলাই আর হাতে পায়ে প্লাস্টার। ওদের অবস্থা দেখে খুব কষ্ট হচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম আমাদের দেশে কেন মানুষ অ্যাক্সিডেন্ট করলে ট্রাক জ্বালায়। ওদের দেখে প্যাসেজে এসে দাঁড়িয়েছি, দম নেয়ার চেষ্টা করছি, এই করুণ দৃশ্য কিছুতেই হজম হচ্ছেনা। হঠাৎ দেখি জামিল কোথা থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে এসে হাজির। আমি কিছু বলার আগেই বললেন, ‘ম্যাডাম, স্বাতী খুব অসুস্থ। গত সাতদিন ধরে সে এই হাসপাতালে ভর্তি ছিলো। অথচ বার বার বলছে ম্যাডাম কি মনে করবেন, ওনাকে একটা খবর দাও। এখন আমি কি ওকে দেখব না খবর দিতে যাব বলেন? আপনি যদি ওকে একটু সাহস দিতেন খুব ভাল হত’।

সাথে সাথে সব রাগ ভুলে গেলাম। হাফিজ সাহেব কখনো মহিলা রোগী দেখতে যান না। মহিলাদের দেখতে কোন পুরুষ ভিজিটর গেলে তারা রিল্যাক্স করতে পারেন না, ফলে তাদের প্রয়োজনীয় বিশ্রামে ব্যাঘাত হয়, তাই। ওনাকে জামিলের সাথে কথা বলতে দিয়ে স্বাতীর রুমে গেলাম। ওকে তখন রিলিজ দিয়ে দিচ্ছে। ওর মা জানালেন, গত সাতদিন ধরে পরীক্ষা নীরিক্ষা করে ডাক্তাররা ওর রক্তে এক ধরনের ডিসঅর্ডার লক্ষ্য করেছেন যা পৃথিবীতে অত্যন্ত রেয়ার। তখন পর্যন্ত এমন রোগীর সংখ্যা সারা পৃথিবীতে মাত্র দু’শ জন। এর আপাতত কোন চিকিৎসা নেই। যতটুকু সামলে চলা যায়। ওকে বললাম, ‘বেশি চিন্তা কোরনা, ডাক্তাররা যেভাবে বলেন সেভাবে চল। যদি শরীর ভাল লাগে তাহলে ইউনিভার্সিটি এসো, নইলে যতটুকু সম্ভব আমরা তোমার পড়ার ব্যাপারে সাহায্য করতে চেষ্টা করব’।

সাতদিন পর স্বাতী আবার ইউনিভার্সিটি আসতে শুরু করল। কিন্তু দিন পনেরো আসার পর আবার অসুস্থ হয়ে পড়ল। এভাবেই চলতে লাগল কয়েক মাস যাবত। সুস্থ থাকলে আসে, নইলে অনুপস্থিত থাকে। পরে আবিষ্কার করলাম জামিল আমাদের পরিচিত একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ফলে স্বাতী না এলে ওর স্বামীর কাছ থেকে খবর নিতে পারতাম।

কিছুদিন পর আমাদের এক সহকর্মী হুসনা আপা খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাকে দেখার জন্য ডিপার্টমেন্টে আমার একমাত্র মহিলা সহকর্মী সালমা আপাসহ মেডিকাল কলেজে গেলাম। হুসনা আপাকে দেখে মন খারাপ করে আমরা বেরিয়ে আসছি, এমন সময় খবর পেলাম স্বাতীকেও মেডিকাল কলেজে ভর্তি করা হয়েছে। দু’জনে গেলাম ওকে দেখতে। সে মৃদু হেসে সালাম দেয়ার চেষ্টা করল কিন্তু হাসিটাই বলে দিল ওর কি পরিমাণ কষ্ট হচ্ছে। ওর মা জানালেন সে এখন সার্বক্ষণিক এই অবস্থাতেই আছে, আগে যেমন একটু খারাপ একটু ভাল হত তেমন আর হচ্ছেনা। বিছানা থেকে উঠতেই ওর খুব কষ্ট হয়, কোন কিছুই নিজে নিজে করতে পারেনা। দিনের বেলা ওর মা স্বাতীকে দেখাশোনা করেন। জামিল কাজ শেষে ওর সাথে থাকে। কিন্তু ডাক্তাররা কোন আশার বানী শোনাতে পারছেন না। মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। একটা উনিশ বিশ বছর বয়সী মেয়ে, এই বয়সে ওর হেসেখেলে বেড়ানোর কথা, অথচ সে হাসপাতালের সেই নিরানন্দ রুমটাতে শুয়ে তড়পাচ্ছে। কিছুই করার নেই আমাদের, এমনকি সান্তনা দেয়ার ভাষাও নেই।

এর পর থেকে মাঝে মাঝে ছুটির পর সময় পেলে সালমা আপা আর আমি ওকে দেখতে যেতাম। একবার সালমা আপা ওর রুম থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, ‘আমি আর আসবনা। যতবার আসি ওর মুখখানা দেখে আমার আর ঘুম হয়না। কিছুই তো করতে পারছিনা আমরা ওর জন্য। এসে কি হবে?’

আমি আর একবারই গিয়েছিলাম, একা। মানুষের শরীরের একটা পর্যায়ে তার আর ভদ্রতা রক্ষা করার জন্য একটা হাসি দেয়ারও শক্তি অবশিষ্ট থাকেনা। স্বাতী তখন সে অবস্থায়। ভাবছিলাম আমি কি করতে পারি ওর জন্য? কিছুই না। একটা পর্যায় আসে যখন আর কথাবার্তা দিয়েও কারো ভার লাঘব করা যায়না।

তার কিছুদিন পর। অনার্সের পরীক্ষা চলছিল। আমার সাথে ডিউটিতে আছেন নতুন শিক্ষক ইফতেখারউদ্দীন। ডিপার্টমেন্টে নতুন হলেও হাফিজ সাহেবের জুনিয়র হিসেবে জানাশোনা ছিল আগেই। ইফতেখার বললেন, ‘আপা, আপনি কি স্বাতীর খবর কিছু জানেন?’
আমি বললাম, ‘না ভাই, পরীক্ষার প্রশ্ন প্রস্তুতি সব মিলিয়ে আর যাওয়ার সুযোগ হয়নি। আপনি কিছু জানেন?’

বললেন, ‘জামিল আমাদের বন্ধুশ্রেনীর। তাই ওদের সাথে মাঝেমধ্যেই যোগাযোগ হত। কিছুক্ষণ আগে খবর পেলাম, গতরাতে স্বাতীর অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়। ওরা ওকে অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে ঢাকা রওয়ানা হয়। কিন্তু বেচারী পথেই মারা যায়’।
জানতাম এমনটাই হবার কথা ছিল হয়ত। মনের একটা দিক বলছিল, ‘যাক, অন্তত এর মাধ্যমে সে কষ্ট থেকে মুক্তি পেল’। কিন্তু মনের আরেকটা দিক বলছিল, ‘আহারে! এক সময় সে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। আজ যখন সে বাঁচতে চায় তখন তার সময় ফুরিয়ে গেল! যখন সে সুস্থ ছিল তখন সে জীবনকে তুচ্ছ ভেবেছিল। যখন সে জীবনের মূল্য বুঝতে পারল তখন তার যাবার সময় হয়ে গিয়েছে। কত বকা দিয়েছি ওকে, কিন্তু আমরা নিজেরাই কি জীবনের সর্বোচ্চ হক্ক আদায় করি, একে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাই?’



তারপর বহুবছর কেটে গিয়েছে। কিন্তু স্মৃতিটা যায়নি। মাঝে মাঝে প্রখর স্মৃতিশক্তির জন্য দুঃখ হয়। ভাল মেমোরীর একটা সমস্যা হোল, ভালটা যেমন ভোলা যায়না তেমনি কষ্টগুলোও ম্লান হয়না। ক্যানাডা আসার আগে জামিলের সাথে দেখা হয়েছিল। তিনি আর বিয়ে করেননি। পর পর দু’বার একই দুর্ভাগ্য যার জীবনে হানা দিয়ে যার তার জন্য সাহসের পাখায় ভর করে উড়াল দেয়া কঠিন বটে! স্বপ্ন দেখি একদিন ওরা দু’জন পরস্পরের হাত ধরে জান্নাতের উদ্যানে হেঁটে বেড়াবে, সেখানেই হোক সকল অপ্রাপ্তির পরিপূর্ণ তৃপ্তি, সেটাই তো চিরস্থায়ী!

মৃত্যুচিন্তা

১।

দু’বছর আগে খবর পাই এখানে একজন বাংলাদেশী বোন ক্যান্সারে আক্রান্ত। দু’টি ছোট ছোট সন্তান রেখে তিনি হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় রয়েছেন। তার স্বামী হাসপাতাল আর বাসার মাঝে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন না, সুতরাং ব্যায় থাকলেও আয় বন্ধ। বলাবাহুল্য অধিকাংশ অভিবাসীর মত তাদের এখানে কোন আত্মীয়স্বজন নেই। অসহায় পরিবারটির খবর ছড়িয়ে দিতেই বান্ধবীরা সহযোগিতায় সরব হয়ে ওঠেন, অবশ্যই নীরবে। গত তিন চার দিন আগে দুই বান্ধবীকে নিয়ে তাকে দেখতে যাই, এই আমাদের প্রথম সাক্ষাত।

কথাবার্তার এক পর্যায়ে তিনি চিন্তিত হয়ে বলতে শুরু করেন, ‘যদি সুস্থ হয়ে যাই তাহলে তো আলহামদুলিল্লাহ, আর যদি মরে যাই...’। কথাটা আর আগে বাড়তে দিতে ইচ্ছে হোলনা। এসব বিষয়ে আমার একটু সমস্যা আছে। আমি নেগেটিভিটি একেবারেই সহ্য করতে পারিনা। তার মুখের কথাটা কেড়ে নিয়ে বললাম, ‘মরে গেলে কি হবে আপা? কিছুই হবেনা! কিছুদিন সবাই কান্নাকাটি করবে, তারপর একসময় সবাই সব ভুলে যাবে, পৃথিবী আবার স্বাভাবিক নিয়মে চলতে থাকবে। আপনার স্বামী আবার বিয়ে করবেন, সন্তানরা বড় হবে, আপনি শুধু স্মৃতি হয়ে রয়ে যাবেন। আমাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই এ’কথাটা সত্য। আদম (আ) এর পর আজ অবধি পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ এসেছেন এবং চলে গেছেন। তাদের অনেকের যোগ্যতা, ক্ষমতা, ধনসম্পদ ছিল আকাশচুম্বী। কই, তারা আজ কোথায়? আপনার ক্যান্সার তাই আপনি ভাবছেন আপনি মারা যেতে পারেন, কিন্তু এটা তো একটা এক্সকিউজ মাত্র। আমার তো কিছু হয়নি, কিন্তু আপনি কাল শুনতে পারেন আমি মারা গেছি! মৃত্যু সময়মত যেকোন একটা রূপ নিয়ে চলে আসবে। যা অবশ্যম্ভাবী তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে কি কোন লাভ আছে? বরং যেটুকু সময় আছে তা কাজে লাগানোই যৌক্তিক। আপনি তাঁকেই রোগ নিরাময়ের জন্য অনুরোধ করুন যিনি এই রোগ দিয়েছেন। ভেবে দেখুন আপনি যেভাবে আশা করেন তিনি আপনার কথা শুনবেন সেভাবে আপনি তাঁর কথা শোনেন কিনা। পাশাপাশি স্বামী সন্তানকে সময় দিন। যেটুকু সময় হাতে আছে তাকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে সচেষ্ট হোন যেন আপনি চলে গেলেও আপনার সাফল্যের সাক্ষর রয়ে যায়। এটা কেমন হয়?’

ভেবেছিলাম বান্ধবীরা আমার কথায় মর্মাহত হবেন, বকাও দিতে পারেন। কিন্তু সকলেই সায় দিলেন, অসুস্থ বোনটিও।

 

২।

দু’দিন আগে, দুপুরবেলা সাদিয়া (মুকিম) ফোন করে বলল, ‘আপু, আমি খুব বিপদে পড়েছি। আপনি তাড়াতাড়ি স্কাইপে আসেন’। ওদের ওখানে তখন রাত, তাই বুঝলাম ব্যাপারটা সিরিয়াস। নইলে সে না ঘুমিয়ে স্কাইপে কি করছে?

স্কাইপে রিং দিতেই সাদিয়া জানাল ওদের ওখানে একজন মুসলিম বাংলাদেশী মহিলা মারা গিয়েছেন। যারা সচরাচর মৃতের লাশ গোসল দিয়ে থাকেন তারা সবাই আউট অফ টাউন। সাদিয়ারা মোটামুটি ইসলামের চর্চা করে বিধায় মৃতের পরিবারের সবাই মিলে ওকে অনুরোধ করেছেন এই দায়িত্ব নেয়ার জন্য। সাদিয়া বলল, ‘আপু, আমি তো এই কাজ জীবনে কোনদিন করিনি, কিভাবে করতে হয় তাও জানা নেই, আবার সঠিকভাবে করতে না পারলে আল্লাহর কাছে দায়ী থাকব। এখানে আমার কাছে কোন বইপত্র বা সহায়ক কিছু নেই যা দেখে আমি শিখে নিতে পারি কাজটি কিভাবে করতে হয়। বাংলাদেশে এখন অনেক রাত, সুতরাং এখন ফোন করে যে কাউকে জিজ্ঞেস করব সে উপায় নেই। সকালে আমার কাজ, দুপুরে তাকে গোসল দিতে যেতে হবে। সুতরাং, আমাকে রাতেই জেনে নিতে হবে কিভাবে কি করতে হয়। আপনি কি আমাকে এই ব্যাপারে কোন সাহায্য করতে পারেন?’

বেচারীকে বেশ প্যানিকড মনে হোল। বললাম, ‘আমি পড়েছি কিভাবে কি করতে হয় তবে করিনি কোনদিন। তবুও করার সময় হাতে একটা গাইডলাইন থাকলে সবকিছু নিয়মমাফিকভাবে করাটা সহজ হয়। আচ্ছা, আমাকে একটু সময় দাও, দেখি কি করতে পারি’।

বাংলাদেশে তখন গভীর রাত, তবু খানিকটা আশা নিয়ে ইয়াহুতে গেলাম, না কেউ নেই। ঢুকলাম ফেসবুকে, দেখলাম তখনই আমার এক ছাত্রী ফারাহ একটা স্ট্যাটাস দিল। আমার এই ছাত্রীকে আমি দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে পড়িয়েছি। ইসলামী পরিবারে জন্ম না হলেও সে কিভাবে নিজের চেষ্টায় ইসলাম শিখেছে এবং পালন করেছে এই বিবর্তন চোখের সামনে দেখেছি। সুশিক্ষিত মাত্রেই স্বশিক্ষিত। তাই ওকে পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম। বললাম, ‘ফারাহ, তাড়াতাড়ি আমাকে মৃতের গোসলের মাস’আলাগুলো পাঠাও’। ঠিক দুই মিনিটের ভেতর ও আমাকে দু’টি লিঙ্ক দিল যেখানে ইন্সট্রাকশনগুলো পরিস্কারভাবে দেয়া আছে। ততক্ষণে আমিও একটি চমৎকার লিঙ্ক খুঁজে পেয়েছি যেখানে মৃত্যুসংক্রান্ত সকল প্রক্রিয়ার ব্যাপারে স্টেপ বায় স্টেপ নির্দেশনা দেয়া আছে।

ফারাহকে ধন্যবাদ জানিয়ে সাদিয়াকে কল দিলাম। লিঙ্কগুলো দেয়ার পর ও বলল, ‘আপু, আমরা তো এখানে ইটালিয়ান বলি, ইংরেজীর চর্চা হয়ই না বলতে গেলে। আমার তো ডিকশনারী নিয়ে বসলে রাত কাবার হয়ে যাবে!’ ইংরেজী পড়ার ফায়দাটা আবার হাতে কলমে টের পেলাম। ওকে লিঙ্ক দু’টো বঙ্গানুবাদ করে শোনালাম, ও ঝটপট সব লিখে নিল। অনেক জিনিসপত্র সাথে নিয়ে যেতে হবে, সব জোগাড়যন্ত্র করতে লেগে গেল। বিকেলে কম্পিউটারে বসে দেখি ও তখনো স্কাইপে। ওদের ওখানে তখন গভীর রাত। কল দিয়ে জানলাম আরোহী (রায়হান প্রিয়ন্তি)র বোন আফরোজা (হাসান)ও বেশ কিছু তথ্য জানিয়েছে, মুকিম ভাই নিজেও কিছু লিঙ্ক বের করেছেন, সাদিয়া বেচারী জ্ঞানের ভারে জর্জরিত।

গতকাল ওর অভিজ্ঞতা জানার জন্য যোগাযোগ করলাম। ও বলল, পরশু সে রাত দু’টো পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে, সকালে উঠে আবার চাকরীতে গেছে। কাজ থেকে ফিরেই যেতে হয়েছে লাশের গোসল দিতে। এর ফাঁকেও সে দেশে কয়েকটা ফোন করে জেনে নিয়েছে ওর প্রস্তুতি সঠিক আছে কিনা। প্রথমে খানিকটা আশঙ্কা থাকলেও মৃতের মহিলা আত্মীয়স্বজন এবং আরো দু’জন মহিলার সহযোগিতায় প্রতিটি কাজ সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়। গোসল দিয়ে, কাফন পরিয়ে ওরা যখন লাশ কফিনে পুরে দিল ততক্ষণে ওর মনে হচ্ছিল উনি বুঝি কত পরিচিত, অথচ কালই তার সাথে ওর প্রথম দেখা! সাদিয়া বলল, ‘আপু, এই অভিজ্ঞতা আমাকে জীবন সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে অনুপ্রাণিত করেছে, আমি এখন সবকিছু নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখছি’।

শুধু সাদিয়াই নয়, ওর মাধ্যমে এই পরোক্ষ অভিজ্ঞতা আমার মাঝেও ভাবনাগুলোকে নাড়া দিয়েছে অন্যভাবে। জীবন নিয়ে পাগল আমরা আসলে মৃত্যুর কাছে কত অসহায়! অথচ মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জেনেও এর জন্য আমরা কতটা অপ্রস্তুত ভাবতেই অবাক লাগে! সামান্য টাকাপয়সা আয় করার জন্য আমরা বিশ থেকে ত্রিশ বছর পড়াশোনা করি; মানুষকে ইম্প্রেস করার জন্য আমরা কথাবার্তা, চালচলন, পোশাক আশাক থেকে মানসিকতায় পর্যন্ত আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসি;  কত লক্ষ কোটি টাকা খরচ করে পৃথিবীতে বেহেস্তসদৃশ বাড়ী বানাই, বোরাকসদৃশ গাড়ী কিনি! অথচ যাকে ইম্প্রেস করা সবচেয়ে জরুরী, যার কাছ থেকে এসেছি এবং যার কাছে ফিরে যেতে হবে, তাঁকে খুশি করার জন্য কি করা প্রয়োজন তা জানার জন্য আমরা কতটুকু সময় ব্যায় করি? প্রতিদিন ক’টি কাজ আমরা তাঁর সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি? তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য আমরা কতটুকু প্রস্তুত? মানুষ মারা যাবেই এটা নিশ্চিত। অথচ আমরা জানিই না কিভাবে তাকে গোসল করাতে হবে, কিভাবে কাফন পরাতে হবে, মৃতদেহের সাথে কেমন আচরন করতে হবে! সর্বজ্ঞানী আমাদের সাধারন জ্ঞানের কি ভয়াবহ অভাব!

আমি ভাবছিলাম মৃত ভদ্রমহিলার কথা। সাদিয়া বলছিল, ‘এই শরীরটি তাকে শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে তারুণ্য, তারুণ্য থেকে যৌবন, যৌবন থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত বয়ে নিয়ে এসেছে। কিন্তু আজ এই শরীরটি আরেকজনের হাতের ওপর দিয়ে পরিচ্ছন্ন হয়ে, আরেকজনের কাঁধের ওপর দিয়ে কবরে পৌঁছবে’। একসময় এই দু’টি হাত নেড়ে নেড়ে তিনি কত কথা বলেছেন, এই দু’টি হাত দিয়ে আঁচল টেনে দিয়েছেন লজ্জারাঙ্গা মুখের ওপর, এই দু’টি হাতের ওপর দিয়ে বেড়ে উঠেছে তার সন্তান সংসার, কিন্তু আজ এই নিথর হাত দু’টি দিয়ে তিনি নিজের শরীরের ওপর চাদর টেনে দিয়ে লজ্জা ঢাকতে পারছেন না যদি না কেউ ঢেকে দেয়! এই শরীর একদিন কত ভার বহন করেছে- স্কুলব্যাগ, শাড়ি গহনা, সন্তান, রোগশোক- অথচ আজ একটি মাছির ভার তার শরীরে পাহাড়ের মত অনুভূত হচ্ছে তবু কেউ তার প্রতি দয়ার্দ্র না হলে তিনি ‘উহ’ শব্দটি পর্যন্ত করে ব্যাথার বঃহিপ্রকাশ করতে পারছেন না। এই হৃদয় দিয়ে তিনি কতজনকে কত ভালবেসেছেন, কত ভালোবাসা বিলিয়েছেন চারপাশে- অথচ আজ তার বাবামা, ভাইবোন, স্বামী, সন্তান কেউ তার সঙ্গী হতে নারাজ! এই দিন সবার আসবে, আপনার আমার সবার।

তবু কেন যেন আমাদের মাথায় এই সহজ কথাটা ঢোকেনা। আমাদের মাথায় ক্ষীণভাবে একটা আওয়াজ বলতে থাকে, ‘মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, সুতরাং সবাই মারা যাবে, কিন্তু আমি না, আমি না, আমি না...’।

তাই দিন যায়, কিন্তু আমাদের কোন প্রস্তুতি নেয়া হয়না। হিসেব করা হয়না আমি কাল যা ছিলাম আজ কি তার চেয়ে এক পা এগোতে পেরেছি, পেরেছি কি চিন্তাক্লিষ্ট কারো মুখে হাসি ফোটাতে, স্বার্থপরতা থেকে একটি ধাপ উত্তরন করতে পেরেছি কি, আজ কি কেউ আমার কথায় কষ্ট পেয়েছে, আমি আজ যা করলাম তার জন্য জবাবদিহিতায় কি আমার আটকে যাবার সম্ভাবনা আছে, থাকলে আমি এই ব্যাপারে কি পদক্ষেপ গ্রহন করতে পারি, আমি কিভাবে নিজের আগামীকালকে আমার আজ থেকে উন্নততর করতে পারি?

আজ থেকে বিশ বছর পর আমার কত টাকা চাই, ক’টা বাড়ী চাই, ক’খানা গাড়ী চাই, বৌ কেমন হওয়া চাই, সন্তান কয়জন হওয়া চাই সব পরিকল্পনা আমার মাথায় স্পষ্ট খেলে যায়; দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাই সুটবুট পরে বৌবাচ্চা নিয়ে সোফায় বসে টেবিলে পা তুলে দিয়ে কেক খাচ্ছি আর টিভি দেখছি।

এই চিত্রটা দিনে ক’বার আমাকে নাড়া দেয়?- আজরাইল (আ)এর প্রতিনিধিবর্গ আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, আমার রূহ আমার শরীরের কোণায় ঘুপচিতে আত্মগোপন করার জন্য ছুটোছুটি করছে, আমার শ্বাসরোধ হয়ে আসছে, ওরা আমার রূহকে টেনে টেনে বের করছেন আর মনে হচ্ছে আমার শরীর যেন জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর দিয়ে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আমার চারপাশে এত মানুষজন অথচ কি আশ্চর্য কেউ আমাকে সাহায্য করছেনা কেন, ওরা কি দেখছেনা আমার কি কষ্ট হচ্ছে? ঐ যা, আমার রূহটা তো ওরা নিয়েই গেল! এ কি? আমি এই মানুষগুলোকে এত ভালোবাসি অথচ এরা আমার সব সোনাগহনা, টাকাপয়সা এমনকি আমার পরনের কাপড়টা পর্যন্ত খুলে নিয়ে যাচ্ছে! আচ্ছা বাবা, নিবি নে, তোদের কি একটু মায়াদয়া নেই? অন্তত একটু কৃতজ্ঞতাবোধ কি থাকতে নেই? তোদের মাথা থেকে একটা চুল খসে আমার গায়ে পড়লেও মনে হচ্ছে আমার শরীরের ওপর বুঝি পুরো বিছানাটাই তুলে দিলি অথচ তোরা আমাকে উল্টেপাল্টে ঘসেঘসে গোসল করাচ্ছিস! ক্ষতবিক্ষত এই শরীরটাকে এবার তো শান্তি দে! যাক, শেষপর্যন্ত আবার খাটে শুলাম। এ কি? ফোমের বিছানায় শুয়ে আমার ঘুম হতনা আর এই কাদামাটিতে তোরা আমাকে শুইয়ে দিচ্ছিস কি মনে করে? আরে আরে! আমার গায়ের ওপর মাটি ফেলছিস কেন? নাহ, আমার চিৎকার কেউ শুনলনা, আমাকে এই অন্ধকার কবরে রেখে, গায়ের ওপর এক মন মাটি চাপা দিয়ে সবাই চলে গেল। কি ভয়াবহ দু’জন ফেরেস্তা এসে উপস্থিত! মুনকির নাকির না? ওরা কি প্রশ্ন করবে আমি জানি, কিন্তু আমি কি উত্তর দিতে প্রস্তুত?