জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে নীনা, কিসের দিকে বা কতক্ষণ তা সে নিজেও জানেনা। গত একটা বছর ওর জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে এই জানালাটার পাশে। দিনরাত সে কি ভাবে সে নিজেই জানেনা। বেশিরভাগ সময় সে মনে করার চেষ্টা করে ঠিক কি ঘটেছিল সেদিন, কিন্তু স্পষ্ট করে কিছুই মনে করতে পারেনা। যতটুকু মনে পড়ে খুব নগন্য কিছু একটা বিষয় নিয়ে তুমুল তর্ক বেঁধে যায় রাশেদের সাথে। কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে আচমকা ঐ তিনটি নিষিদ্ধ শব্দ উচ্চারণ করে বসে রাশেদ, বাকহারা হয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে নীনা, হঠাৎ ওর খেয়াল হয় রাশেদের দিকে তাকাবার অধিকার হারিয়ে ফেলেছে সে, দ্রুত মাথায় কাপড় দিয়ে সরে পড়ে অন্যঘরে। সেদিনই মা বাবা গিয়ে ওকে এই বাসায় নিয়ে আসে, আর সেদিন থেকেই এই জানালাটা হয়ে যায় ওর দিনরাতের সঙ্গী।
ও জানে ওকে নিয়ে বাবামার চিন্তার অন্ত নেই, কিন্তু কেন যেন নিজেকে দিন দিন হারিয়ে ফেলছে নীনা, এখন আর স্বাভাবিক হবার চেষ্টাও করতে ইচ্ছে করেনা। কানে এসেছে রাশেদ আবার বিয়ে করেছে, মাস তিনেক হবে। এবার তো সে ওকে ভুলে যেতে পারে, জীবনের পাতা উল্টে নতুন ছবি আঁকা শুরু করতে পারে, কিন্তু কেন যেন কিছুই করা হয়না ওর। সে ভেবে অবাক হয় কেন রাশেদের ওপর ওর কোন রাগ হয়না। আরো অবাক হয় কেন ওর সব ক্ষোভ বিতৃষ্ণার রূপ ধারণ করে রাশেদের নতুন বৌয়ের প্রতি যে রাশেদের জীবনে ওর স্থান দখল করে নিয়েছে। সে মেয়েটার নামও জানেনা, কিন্তু তাকে মনে মনে ঘৃণা করে। ভাবে হবে হয়ত কোন গরীব বাপের অশিক্ষিত কালো কুৎসিত মেয়ে, নইলে এমন ছেলের কাছে বিয়ে দেবে কেন যার আগে একটা বৌ ছিল? কিন্তু এতেও মনের ভেতর আগুনটা প্রশমিত হয়না।
মা ঘরে ঢুকেছেন বুঝতে পারে নীনা, কিন্তু জানালার দিক থেকে চোখটা ফেরাতে ইচ্ছে হয়না।
‘নীনা’, আদর করে ডাকেন মা, সাড়া দিতে ইচ্ছে হয়না।
এবার মা সামনে এসে দাঁড়ান, হাতে এক গুচ্ছ তাজা টকটকে লাল গোলাপ। এক ঝলক তাকিয়ে আবার জানালার দিকে চোখ ফেরায় নীনা।
‘নীনা, দেখ, এইমাত্র ফুলের দোকান থেকে ডেলিভারী দিয়ে গেল এই তোড়াটা’।
হাসার চেষ্টা করতে গিয়ে মুখটা সামান্য বাঁকা হয় নীনার, কিন্তু এর বেশি আর ম্যানেজ করতে পারেনা সে।
‘তোর জন্য’, বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তোড়াটা নীনার কোলে রেখে চলে যান মা।
কতক্ষণ কেটে যায় বলতে পারেনা নীনা, বাথরুমে যাবার জন্য উঠতে গিয়ে কোলের ওপর গোলাপের তোড়াটার অস্তিত্ব টের পায়, অলসভাবে টেবিলের ওপর সরিয়ে রাখতে গিয়ে চোখে পড়ে তোড়ার নীচে যেখানটায় প্লাস্টিকের র্যাপিং পেপার মোড়ানো ওখানে একটা ছোট কার্ড। কার্ডটা খোলাই আর তাতে লেখা, ‘নীনার জন্য- ইতি, এক শুভাকাঙ্খী’। তার মানে ফুলগুলো মা দেননি? তাহলে কে হতে পারে এই শুভাকাঙ্খী? কেন সে নিজের নাম লেখেনি? কেনই বা এতদিন পর কোন উপলক্ষ্য ছাড়াই নীনাকে ফুল পাঠাল সে? তাও আবার একগুচ্ছ টকটকে লাল গোলাপ? সামান্য একটু কৌতুহল জাগে নীনার মনে। বাথরুমে যাবার সময় হঠাৎ আয়নায় চোখ পড়ে যায়। আয়নাটা গত একবছর ঐখানেই ছিল, তাকানো হয়নি কোনদিন। আজ আয়নায় দেখা চেহারাট চিনতে পারেনা নীনা। কে এই মেয়েটা? শুকনো চেহারা, চোখের চারপাশে গভীর কালো দাগ, চুলগুলো উস্কোখুস্কো - মা গতকাল আঁচড়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু সংসারের তাবৎ ব্যাস্ততার মাঝে ওর সকল পরিচর্যা করার সময় করে কুলিয়ে উঠতে পারেন না তিনি।
মনটা খুব খারাপ নাসরিন বেগমের। মেয়েটা দিন দিন অস্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। যা ঘটেছে তা ছিল নেহাৎ একটা দুর্ঘটনা, রাশেদ নিজেও এতে এতটা শকড হয়ে গেছিল যে তিনি ওকেও কোনপ্রকার দোষ দিতে পারেন না। তার ওপর আজ এই উটকো ঝামেলা, কে যে ফুল পাঠাল নীনাকে! যেই পাঠাক, তিনি ভেবেছিলেন এতে সে কিছুটা আশ্চর্য হবে, হয়ত খুশিও হতে পারে, অথচ সে কোনভাবে রিঅ্যাক্টই করল না! সংসারের এত দায়িত্বের মাঝে ওকে একটা শিশুর মত করে দেখাশোনা করা এই বয়সে তাঁর জন্যও কঠিন ব্যাপার, ভবিষ্যতে কি হবে এই চিন্তা তো আছেই। কিছুই খায়না মেয়েটা, তাই একটু দুধ নিয়ে ওর রুমের দিকে যান তিনি, যদি আধ গ্লাস খাওয়াতে পারেন। রুমের দরজা খুলে থমকে যান তিনি, দু’চোখ বেয়ে অশ্রুধারা নেমে আসে দরদর করে- আজ একবছর পর নীনা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনভ্যস্ত হাতে চুল আঁচড়াচ্ছে!!
তিনমাস পর
কে যেন প্রতিদিন ফুল পাঠায় নীনাকে! প্রতিদিনই এক গুচ্ছ তাজা টকটকে লাল গোলাপ। অনেক খোঁজখবর করেছে ওর বাবা মা ভাইরা, ফুলের দোকানেও গেছিল, ওরা কিছুই বলতে পারলোনা। কিন্তু এতে যে নীনার কি পরিবর্তন হচ্ছে তা দেখে তাঁরা হতভম্ব হয়ে যাচ্ছেন। এই তিনমাসে নীনা স্বাভাবিক খাওয়াদাওয়া, নিজের পরিচর্যা, টুকটাক কথা বলা, বাসায় মা ভাবীদের সামান্য সাহায্য করা শুরু করেছে; পড়াশোনা প্রায় ভুলতে বসেছিল, নিজের নামটাও লিখতে কষ্ট হত, এখন সে বিভিন্ন জায়গায় চাকরীর জন্য দরখাস্ত পাঠাচ্ছে। নাসরিন বেগম ছেলেদের মানা করে দিলেন ফুলের ব্যাপারে অনুসন্ধান করতে- ফুল যেই পাঠাক তাঁর মেয়ে সুস্থ হয়ে উঠছে, এর বেশি তিনি আর কিছু চান না।
ছয়মাস পর
দু’মাস হোল নীনা চাকরী করতে শুরু করেছে। ওর সহকর্মীরা সবাই অবাক হয় যে সে প্রতিদিন সকালে এক গুচ্ছ টকটকে লাল গোলাপ হাতে নিয়ে অফিসে আসে। লায়লা আপা তো একদিন বলেই ফেলেন, ‘তোমার বুঝি লাল গোলাপ খুব প্রিয়? প্রতিদিন সকালে তুমি কোথায় পাও এমন তাজা তাজা গোলাপ?’
নীনা হাসে, ‘লাল গোলাপ আমার প্রিয় ফুল আপা, কিন্তু এগুলো আমি কিনিনা, আমাকে কে যেন পাঠায়’।
খুব অবাক হন লায়লা, ‘মানে? কে পাঠায়?’
‘আমি নিজেও জানিনা আপা, আমার পরিবার ফুলের দোকানে গিয়েও খোঁজখবর করেছিল, ওরাও কিছু বলতে পারেনা। কিন্তু বৃষ্টি হোক বা বর্ষা, হোক কাঠফাটা রোদ কিংবা কনকনে শীত- প্রতিদিন সকালে আমার দরজায় ফুল হাজির, আজ অবধি একদিনও এর ব্যাতিক্রম ঘটেনি’।
‘কোনো সিক্রেট অ্যাডমায়ারার নয়তো?’, চোখ টিপে হেসে ফেলেন লায়লা আপা।
মাথা নাড়ে নীনা, ‘নাহ আপা, কার্ডে লেখা থাকে ‘তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী’, আর কিছুই না। আমি নিজেও খুব অবাক এই ব্যাপারটাতে। স্পষ্টতই যে ফুল পাঠায় সে আমার কাছে কিছু চায়না, কিন্তু যে আমার এত উপকার করল সে কেন নিজের পরিচয় দিতে চায়না তা আমার বোধগম্য না’।
কাজের সময় হয়ে যায়। কাজের ব্যাস্ততার মাঝে হারিয়ে যায় রহস্যময় শুভাকাঙ্খীর ব্যাপারে সকল কৌতুহল।
একবছর পর
শেষ পর্যন্ত সফল হলেন লায়লা আপা। বৌ মরা ছোট ভাইটার জন্য প্রথম দিন দেখেই নীনাকে পছন্দ হয়ে যায় ওনার। মেয়েটা সবসময় চুপচাপ থাকে, মনে হয় যেন কি এক আঘাত তাকে ঝড়ে নুয়ে পড়া নারকেল গাছের মত বিধ্বস্ত করে ফেলেছিল, মাত্র সে উঠে দাঁড়াতে শুরু করেছে। তারপর ওর সাথে বন্ধুত্ব, ওর কাছাকাছি আসা আর ওর একগুচ্ছ লালগোলাপের অদ্ভুত কাহিনী। ওর ঘটনা জানার পর তিনি ভাবেন এই মেয়েই তার ভাইয়ের জন্য পার্ফেক্ট কারণ দু’জনই জীবনে কঠিন আঘাতে বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে। তিনি ভাবেন এই দু’জন পরস্পরের দুঃখের সাথী হতে পারবে কারণ দু’জনই জানে দুঃখ কি জিনিস। মধ্যখানে ওর লাল গোলাপের কাহিনী শুনে তার সন্দেহ হয় এর পেছনে কোন পুরুষ আছে কি’না, কারণ যে এত কষ্ট করে মেয়েটিকে সুস্থ করে এনেছে তার কাছ থেকে তিনি ওকে কেড়ে নিতে চান না। কিন্তু এক সময় তাঁর প্রতীতি জন্মায় যে ফুলপ্রেরক আসলেই কিছু চায়না যদিও তাঁর কাছে স্পষ্ট নয় সে কেন ফুল পাঠায়। তখন তিনি একদিন সুযোগ বুঝে নীনার কাছে তাঁর ভাইয়ের কথাটা পাড়েন। ওর চেহারা দেখেই তিনি বুঝতে পারেন ওর ভয় এখনও কাটেনি। তাই তিনি ওকে আর না ঘাটিয়ে ওর বাবামার সাথে যোগাযোগ করেন। ওর পরিবারের সহযোগিতায় এবং তাঁর সহমর্মী আচরনে তিনমাস পর শেষপর্যন্ত নীনা বিয়েতে রাজি হয়।
আজ নীনার বিয়ে, ভোর থেকে সে অস্থিরভাবে পায়চারী করছে, সে নিজেই বুঝতে পারছেনা সে কি করতে যাচ্ছে, কেনই বা সে আরেকবার নিজের মনকে এমন পরিস্থিতিতে যেতে দিচ্ছে যেখানে সে ভেঙ্গে খান খান হয়ে যেতে পারে। সকাল আটটায় নিয়মমাফিক দরজায় বেল বাজল, দৌড়ে গেল নীনা। খুব অবাক হয়ে সে দেখল আজ ফুলের তোড়াটা বিশাল, তাতে হরেক রঙের গোলাপ, আরো নানা জাতের ফুলের মিশেল। আজ কার্ডটাও অনেক বড়, কিন্তু আজকের কার্ডটা খামে বন্ধ। নীনা তোড়াটা নিজের রুমে নিতে নিতে বিয়ের আয়োজনে ব্যাস্ত ভাবীদের চোখমুখ হা হয়ে গেল আজকের ফুলগুলো দেখে- হবেই না বা কেন, একবছর ধরে প্রতিদিন ঠিক সাতটা ফুলের একগুচ্ছ টকটকে লাল গোলাপ আসছিল, একটা ফুলও কম না, একটা ফুলও বেশি না, কিন্তু আজ তো হুলস্থুল অবস্থা! তার মানে যে ফুল পাঠায় সে জানে আজ ওর বিয়ে!
রুমের ভেতর ত্রস্তে খাম খুলে কার্ড বের করে নীনা, বিরাট কার্ডের মধ্যখানে সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা, ‘দু’আ করি তোমার আগামী জীবন সুখের হোক, দু’জনে মিলে যেন পৃথিবীতে স্বর্গ রচনা করতে পারো এবং পরবর্তীতে একসাথে জান্নাতে বসবাস করতে পারো’, সেই একই হাতের লেখা, তাড়াতাড়ি কার্ডের নীচে তাকায় নীনা যেখানে লেখা, ‘শুভকামনায়...’- নাহ, আজও লেখা, ‘তোমার শুভাকাঙ্খী’। কিন্তু কেন যেন সবকিছু ছাপিয়ে ওর মাঝে বিশ্বাস জন্মায় ও পারবে ওর নতুন সংসারে স্বর্গ রচনা করতে, যদি না পারে তবু সে একা নয়, সাথে আছে কোন এক শুভাকাঙ্খী যাকে সে চেনেনা কিন্তু যে সর্বাবস্থায় ওর ভাল চায়।
পঁচিশ বছর পর
হাসিবের সাথে নীনার বিয়েটা যদিও উভয়ের জন্যই ছিলো কিছুটা সংশয়ের ব্যাপার, কিন্তু পরবর্তীতে উভয়ই অত্যন্ত সুখি হয়। এই বিয়ের মাধ্যমে উভয়ের জীবনে আসে পজিটিভ কিছু পরিবর্তন। নীনা ওর আদরযত্ন দিয়ে হাসিবের জীবনে আবার হাসি আনন্দ ফিরিয়ে আনে, সে হাসিবকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে ওর প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর কথা স্মরন করে সার্বক্ষণিক দুঃখবোধ করার পরিবর্তে ওদের একসাথে থাকার সময়টুকুকে একটি সুখকর স্মৃতি হিসেবে স্মরন করা শ্রেয়। হাসিবও একইভাবে নীনার প্রতি সহনশীল এবং উৎসাহমূলক আচরন করার মাধ্যমে ওর আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। নীনা আবার পড়াশোনা শুরু করে। পরবর্তীতে ওর দুই ছেলে আর এক মেয়ের জন্মের পর সে একটি কলেজে প্রফেসর হিসেবে যোগ দেয় যেন সন্তানদের যথেষ্ট সময় দিতে পারে। সত্যি সত্যিই স্বর্গীয় সুখে ভরে ওঠে নীনার ছোট্ট সংসার। কিন্তু মাঝে মধ্যেই সে কল্পনা করার চেষ্টা করে কে তাকে ফুল পাঠাত, কেনই বা পাঠাত, কি করে সে জানল কবে ওর বিয়ে, আর কেনই বা সে কোনদিন সামনে এলোনা। ওর বিয়ের দিনই শেষ ফুলের তোড়াটা আসে। তারপর আর কোনদিন আসেনি।
এক গাদা খাতা নিয়ে বসেছে নীনা। মাঝে মাঝে মনে হয় কলম দিয়ে না কেটে বটি দিয়ে খাতা কাটা গেলে ভালই হত! একটা খাতা দেখতে পায় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, মুক্তোর মত হাতের লেখা, কেমন যেন পরিচিত পরিচিত ধাঁচের। এই খাতাটা দিয়েই শুরু করে সে। বাহ! মেয়েটার ব্যাকরণে কোথাও কোন ভুল নেই! এমন খাতা দেখতেও ভাল লাগে! পর্যায়ক্রমে রচনা আসে খাতার শেষে। বেশ দীর্ঘ রচনা লিখেছে মেয়েটা। মাকে নিয়ে লিখতে দিলে এমনিতেই কেন যেন ছাত্রছাত্রীদের রচনার দৈর্ঘ্য বেড়ে যায়, কিন্তু এই খাতাটা দেখে মনে হচ্ছে বাকি প্রশ্নোত্তর তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাওয়াতেই সময় নিয়ে রচনা লেখা হয়েছে- মেধাবী মেয়ে! মেয়েটা লিখেছে ওর মা দীঘলদেহী, সুন্দরী, শিক্ষিতা, মেধাবী নারী কিন্তু তাঁর বিশ্বাসের দৃঢ়তা তাঁর সৌন্দর্য্যের আসল উৎস। অনেকেই মায়ের অনেকরকম প্রশংসা করে কিন্তু এমন প্রশংসা সে কোনদিন পড়েনি, রচনাটা ওর কৌতুহল উদ্রেক করে। সে পড়তে থাকে, মেয়েটার মা অত্যন্ত বড়লোকের মেয়ে হওয়ায় তাঁর জন্য অনেক ভাল ভাল প্রস্তাব আসে কিন্তু তিনি এমন জায়গায় বিয়ে করতে আগ্রহী হন যেখানে তিনি কিছু অবদান রাখতে পারবেন। তাই তিনি এমন এক ব্যাক্তিকে বিয়ে করেন যে নিজের একটি কৃতকর্মের জন্য মানসিকভাবে বিধ্বস্ত ছিল। বিয়ের পর তিনি ওর বাবাকে স্বাভাবিক করে তোলেন। এক পর্যায়ে তিনি জানতে পারেন ওর বাবার আগের স্ত্রী মানসিকভাবে অত্যন্ত অসুস্থ। তখন তিনি তাকে প্রতিদিন ফুল পাঠাতে শুরু করেন, এভাবে তিনি তাঁর আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলেন, তিনি সুস্থ হয়ে যান এবং আবার বিয়ে করেন। ওর মা ওর আদর্শ এবং এই আদর্শই সে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় নিজের জীবনে। এমন মহীয়সী মায়ের সন্তান হিসেবে জন্মাতে পেরে সে অত্যন্ত সৌভাগ্যবতী। রচনা পড়ে স্থির হয়ে যায় নীনা। কেমন যেন অস্বস্তি লাগে ওর।
পরদিন সে রোল নাম্বার ধরে মেয়েটিকে ডেকে পাঠায়। আধঘন্টা পর পিয়ন এসে বলে মেয়েটি আজ কলেজে আসেনি। অস্থির লাগে নীনার। সে ঐ ক্লাসের এমন কাউকে ডেকে আনতে বলে যে মেয়েটিকে চেনে। কিছুক্ষণ পর সোনিয়া এসে হাজির হয়। ‘আচ্ছা, এই রোল ১২৭ কে বল তো?’, খাতার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে নীনা যেন ওর অস্বস্তিটা চোখে না পড়ে।
সোনিয়া বলে, ‘ম্যাডাম, এটা তো আয়শার নাম্বার’।
বুকটা ধক করে ওঠে নীনার। আয়শাকে সে ভালই চেনে- লম্বা, ফর্সা, মেধাবী, হাসিখুশি, স্মার্ট মেয়েটা কলেজের প্রথমদিন এসেই ওর সাথে দেখা করে, ‘ম্যাডাম, এখানে নাকি মেয়েদের নামাজের কোন জায়গা নেই! আমাদের একটি রুম দিন যেন আমরা যারা আগ্রহী তারা নামাজ পড়তে পারি’।
শিক্ষকদের কক্ষের পাশে একটি খালি রুম ছিল, সেটা খুলে দেয়ার ব্যাবস্থা করে দেয় নীনা। তারপর থেকে ক্লাসেও সে লক্ষ্য করে মেয়েটি লেখাপড়া, শিষ্টাচার, যেকোন কাজে এগিয়ে আসা সবদিক থেকেই চোখে পড়ার মত। খুব মনোযোগের ভঙ্গীতে খাতার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে নীনা, ‘আমার ওর ব্যাপারে কিছু জানা প্রয়োজন ছিল... উমম... অফিসিয়াল ব্যাপার... তুমি কি জান ওর বাবার নাম কি?’
সোনিয়া হেসে বলে, ‘জ্বি ম্যাডাম, ওর বাবার নাম রাশেদ চৌধুরী’।
পৃথিবীটা দুলে ওঠে নীনার।
‘ওর মা?’
‘আন্টির নাম সিতারা জাহান’।
‘সিতারা, সিতারা’, মনে মনে বিড়বিড় করে নীনা,। ‘আচ্ছা যাও’, পরক্ষণেই মনে হয় শিক্ষক হিসেবে ওর জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল আয়শা কেন অনুপস্থিত তাই সোনিয়াকে ডাক দিয়ে বলে, ‘আচ্ছা, ও আজকে আসেনি কেন?’
সোনিয়া যেতে যেতে বলে, ‘ম্যাডাম, গতকাল সকালে হঠাৎ ওর মা মারা গেছেন। ওরা মনে হয় বাড়ী চলে যাবে, এখানে আর থাকবেনা’।
নীনার কেমন যেন লাগে। ওর মনে হয় ওর আকাশে একটা তারা ছিল- তারাটাকে সে কোনদিন চিনতে পারেনি, কিন্তু তার আলো সবসময় ওকে পথ দেখাত; তারাটার কোন নাম ছিলোনা, কিন্তু আজ তারাটা হঠাৎ নিভে গেছে- যার অস্তিত্বই সে কোনদিন জানতনা তার অনুপস্থিতি কেন তাকে এত ব্যাথা দেয়?
Sunday, December 9, 2012
স্বপ্নময় তিনটি দিন
যেবার প্রথম ক্যাল্গেরী আসি (অগাস্ট ২০০৮) তার দু’তিনদিনের ভেতর খবর পাই এখানে একটি ইসলামী কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, বক্তাদের মধ্যে Peace TV খ্যাত আব্দুর রাহীম গ্রীন সাহেবও আছেন। খুব ইচ্ছে ছিল যাওয়ার। কিন্তু তখন নতুন এসেছি, পথঘাট চিনিনা, চাকরী বাকরি হয়নি, টাকাপয়সাও গুনে হিসেব কষে খরচ করতে হচ্ছে। খুব মন খারাপ হলেও এই কথা শুনে আশান্বিত হলাম যে এখানে প্রায়ই এমন কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। তারপর একে একে তিনটি বছর অতিবাহিত হয়ে গেল, বহু কনফারেন্স এল গেল, কিন্তু নানাবিধ কারণে কোনটাতেই যাওয়া হয়ে ওঠেনি। কখনো বক্তাদের তালিকা impressive মনে হয়নি, কখনো সময় মিলাতে পারিনি, কখনো বা নিজেদের গাফলতির খেসারত দিয়ে যাওয়া হয়নি।
এবার যখন Power of Unity কনফারেন্সের খবর পেলাম এবং দেখলাম বক্তাদের তালিকায় আছেন ডঃ আবু আমিনা বিলাল ফিলিপস, ইয়াসির ফাজাগার মত পরিচিত মুখ এবং বিখ্যাত Activist, বক্তা এবং লেখক ম্যালকম এক্সের কন্যা অ্যাম্বাসেডর শাবাজ তখন চিন্তা করলাম এবার যে করেই হোক যেতেই হবে। টিকেট পাওয়া যাচ্ছিল আমাদের মসজিদে, অনলাইনে এবং আরো বহু জায়গায়। ছোটবোন জয়া বলল পরিচিত একজনের মাধ্যমে টিকেট নেবে, ভাবলাম এতে হয়ত টিকেটবিক্রেতার কিছু লাভ হতে পারে, তাই বললাম নিজের জন্য টিকেট নেয়ার সময় আমার জন্য একটা নিয়ে নিতে, আমি টাকা দিয়ে দেব। কিন্তু জয়া চালাকি করে অনলাইনে দু’খানা টিকেট কিনে একখানা আমাকে গিফট করে দিল সাওয়াবের আশায়। আমার কোন প্রতিবাদে কোন কাজ হোলনা।
অনুষ্ঠান সাজানো হয়েছিল ক্যানাডা দিবসের ছুটিসহ long weekend কে মাথায় রেখে শুক্রবার (২৯শে জুন) থেকে রবিবার (১লা জুলাই) যেন মঙ্গলবার কাজে ফিরে যাবার আগে সোমবার সবাই বিশ্রাম নিতে পারে। ভেন্যু ছিল তিনটি- আমাদের জুমা মসজিদ (আকরাম জুমা মসজিদ), কোস্ট প্লাজা হোটেল এবং আবু বাকর ইসলামিক সেন্টার। অনুষ্ঠান ছিল দিনব্যাপী। তিনদিনের জন্য টিকেটের শুভেচ্ছামূল্য ছিল মাত্র ২৫ টাকা। একই টিকেটে তিনদিনে যেকোন সময় যেকোন ভেন্যুতে যাওয়া যাবে। খাবার এবং বাচ্চাদের দেখাশোনাও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। বক্তা ছিলেন চারজন মহিলাসহ মোট একুশজন। বক্তাদের বক্তৃতার বিষয়সহ শিডিউল দেয়া ছিল অনলাইনে যেন শ্রোতারা নিজের পছন্দমত ভেন্যু এবং সময় বেছে নিতে পারেন। পাশাপাশি অনুষ্ঠান হলের বাইরে পাওয়া যাচ্ছিল শিডিউল এবং বক্তাদের পরিচিতি সম্বলিত বুকলেট।
শুক্রবার working day হওয়াতে অনুষ্ঠান হবার কথা ছিল সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত। ভাগ্যক্রমে তার আগেরদিন আমার দাদার ছোটভাই- আমার প্রিয় ছোটদাদা, যিনি আমার জ্ঞানের দিগন্ত প্রসারিত হবার পেছনে অনেক অবদান রেখেছেন- চারদিনের সফরে আমেরিকা থেকে ক্যাল্গেরী আসছিল। শনি রবি আমি কিছুতেই মিস করবনা তাই দাদাকে উপলক্ষ্য করে প্রায় ২০-২৫ জনকে দাওয়াত দেয়া হোল শুক্রবার রাতে। ঠিক করলাম অনুষ্ঠানে যেতে না পারলেও জুমা কিছুতেই মিস করবনা। দাদা স্বাভাবিক খাবার খেতে পারেনা, তাই বৃহস্পতিবার বাবাকে দিয়ে দাদার জন্য এবং দাওয়াতের জন্য মিলিয়ে তিনখানা আইটেম রান্না করিয়ে রাখলাম। উল্লেখ্য, প্রায় দু’মাস হোল বাবামা আমার বাসায় আছে। আমাদের পরিবারের বৈশিষ্ট্য হোল আমরা শুয়েবসে থাকতে পারিনা, উপরন্তু আমাদের বাসায় নারীপুরুষ সবাই সবধরনের কাজ করতে পারে, তদুপরি বাবার রান্না অসম্ভব মজাদার আর হাফিজ সাহেবের মত বাবাও সবাইকে রেঁধে খাইয়ে প্রশংসা কুড়াতে ভালবাসে, আমি এর সুযোগ নিলাম আর কি! হাফিজ সাহেব দ্বিবিধ মিষ্টি বানালেন- রসগোল্লা আর চমচম। আর শুক্রবার সকালে উঠে আমি বিরিয়ানি চাপিয়ে দিয়ে দ্রুত ঘর গুছিয়ে ফেললাম। দৌড়ের ওপর কাজ শেষ করে হাজির হলাম মসজিদে।
সেদিন ক্যাল্গেরীর সাতটি মসজিদে সাতজন বক্তা খুতবা দিচ্ছিলেন, তন্মধ্যে আমাদের মসজিদে খুতবা দিলেন ডঃ আবু আমিনা বিলাল ফিলিপস। আমাদের মসজিদে প্রতি শুক্রবারেই প্রচুর লোক হয়, অনেক সময় একহাজার লোকের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন মসজিদ, মসজিদসংলগ্ন gym সব ভর্তি হয়ে বাইরে রাস্তার ওপরেও লোক দাঁড়াতে হয়- সেদিনও মনে হোল মানুষের ঢল নেমেছে। সৌভাগ্যক্রমে সামনেই জায়গা পেয়ে গেলাম। আমরা দুই রাকাত নামায শেষ করতে না করতেই খুতবার সময় হয়ে এলো। ডঃ ফিলিপস প্রথমেই প্রশ্ন করলেন গত এক সপ্তাহে কে কে কোন না কোন একসময় শুকরিয়া করে সিজদা করেছে। হাত উঠল দশখানা। মহিলারা ওপরতলায় দৃষ্টির আড়ালে তাই এদিকে কি অবস্থা বোঝা গেলনা। তারপর তিনি শুকরিয়ার গুরুত্ব নিয়ে আধঘন্টাখানেক খুতবা দিলেন যার মূল কথা ছিল আমাদের শুকরিয়া আল্লাহর নিষ্প্রয়োজন, কিন্তু কৃতজ্ঞতাবোধ আমাদের মধ্যস্থিত অনেক ব্যাধির মহৌষধ, তাই এই অনুভূতি আমাদের নিজেদের স্বার্থেই জরুরী। কৃতজ্ঞতার সাথে লক্ষ্য করলাম আমার বারো বছর বয়সী কন্যা খুতবা গোগ্রাসে গিলছে যদিও অনেক সময় খুতবার প্রতি মনোযোগ আকৃষ্ট করার জন্য আমার ওকে তাগাদা দিতে হয়।
খুতবার পর জুমার নামায পড়ালেন ডঃ ফিলিপস। বিশুদ্ধ উচ্চারণে চমৎকার ক্বির’আতসহকারে নামায পড়ালেন তিনি। তখন চিন্তা করলাম কত নারীপুরুষ দেখি যারা মাস্টার্স পিএইচডি করে ফেলেছেন অথচ শুদ্ধভাবে কুর’আন পড়তে পারেন না। অন্যদিকে এই ভদ্রলোক যিনি জীবনের বৃহদাংশ ইসলাম সম্পর্কে জানতেন না অথচ ইসলাম গ্রহণ করার সাথে সাথে বিশুদ্ধভাবে কুর’আন পড়তে শিখে গেছেন, এমনকি লোকমুখে শোনার পরিবর্তে নিজেই ইসলাম সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞানলাভ করার জন্য তিনি এই বিষয়ে পিএইচডি করে ফেলেন! এ’থেকে বোঝা যায়, কিছু শেখার জন্য সদিচ্ছা এবং অধ্যাবসায়ই যথেষ্ট যদি আমরা তাকে যথাযথ গুরুত্ব দেই।
এর পর ছিল মুতাহ বীল নামে একজন নও মুসলিমের বক্তৃতা, তাঁর ইসলাম গ্রহণের কারণ নিয়ে। তিনি গায়ক টুপাক শাকুরের Outlaws দলের একজন সদস্য ছিলেন কিন্তু এই জগতের নোংরা দিকগুলো তাঁকে ভাবিয়ে তোলে, তিনি সত্যের অনুসন্ধানে ব্রতী হন এবং এক পর্যায়ে তিনি ইসলামের মাঝে উত্তম আদর্শ খুঁজে পেয়ে এই পথে চলে আসেন। বার বার ছোটভাই মুহাম্মদের শ্বশুরবাড়ী থেকে ফোন আসছিল, দুপুরে সবার দাওয়াত ঐ বাসায়, আমরা ছাড়া আর সবাই উপস্থিত। অনিচ্ছাসত্ত্বেও বক্তৃতা না শুনে ওখানে হাজিরা দিতে হোল। একমাত্র সান্তনা ছিল ছোটদাদার সাথে চারবছর পর দেখা হওয়া, গল্প করা আর দাওয়াতীর সংখ্যা আরো কিছু বৃদ্ধি পাওয়া। সন্ধ্যায় মেহমান আসার আগেই বাড়তি মেহমানদের জন্য আবার রান্না চড়াতে হবে। তাই আবার ছুট। বাসায় ফেরার পথে আল মদীনা হালাল মিট থেকে মুরগী নিয়ে বাসায় এসেই দিলাম চড়িয়ে আরো এক হাঁড়ি বিরিয়ানী। সন্ধ্যা সাতটা থেকে মেহমান আসতে শুরু করল, সবাই যেতে যেতে রাত সাড়ে বারোটা। বাচ্চাদের শুইয়ে দিয়ে গেলাম সব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে সামলে রাখতে কারণ পরদিন বাসায় থাকবনা। সব গুছিয়ে রাত দু’টোয় ভাবলাম এখন ঘুমালে দেড় ঘন্টা পর ফজরের নামায, ক্লান্ত শরীরে হয়ত উঠতে পারব না। তাই অপেক্ষা করতে লাগলাম। ঘুমালাম চারটায়।
সাড়ে সাতটায় হাফিজ সাহেব night duty থেকে ফিরে জাগাতে চেষ্টা করলে দিলাম এক বকা, ‘অনুষ্ঠান দশটায়, আমি আগে ঘুমাই!’ পৌনে দশটায় বান্ধবী মোনালিসা আপা ফোন করলেন উনি কোস্ট প্লাজা হোটেলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হচ্ছেন, আমি যাব কিনা। যাব কি’না মানে?! ওনাকে আসতে বললাম কিন্তু চোখ কিছুতেই খুলে রাখতে পারছিনা, গায়ে মাথায় পানি ঢেলে চোখ থেকে ঘুমের আঠা ছাড়ালাম। দশ মিনিটের ভেতর তৈরী হয়ে ওনার সাথে কনফারেন্স হলে পৌঁছলাম। শনিবার আকরাম জুমা, কোস্ট প্লাজা আর আবু বাকর সেন্টার সব জায়গাতেই অনুষ্ঠান চলছিল। কোস্ট প্লাজা আমার বাসা থেকে দেখা যায়, পাশাপাশি এখানে বক্তৃতার বিষয়গুলোও আমার খুব পছন্দের ছিল। গিয়ে দেখি গতদিন সবাই রাত এগারোটা পর্যন্ত বক্তব্য শুনে সকালে আর আসতে পারেনি। বক্তারা ঘুরাঘুরি করছেন কিন্তু শ্রোতারা অনু্পস্থিত, তাই দশটার পরিবর্তে অনুষ্ঠান শুরু হোল এগারোটায়। অনুষ্ঠানের শুরুতে আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেব একটা হাদিস বললেন যার মর্মার্থ হচ্ছে রাসূল (সা) বলতেন সেই অনুষ্ঠানে কোন বরকত হয়না যেখানে শ্রোতারা পরস্পর বাক্যালাপ করতে থাকে। মোনালিসা আপা এবং আমি দু’জনই অত্যন্ত খুশি হলাম এই হাদিসটি পেয়ে কারণ আমাদের জ্ঞানানুসন্ধানমূলক বৈঠকগুলিতে বান্ধবীরা অনেকসময় জ্ঞানের কথা বাদ দিয়ে গল্পগুজবে মেতে ওঠেন। এবার আমাদের হাতে রয়েছে শক্ত দলিল!
অনুষ্ঠান শুরু হোল ক্কারী মুহাম্মাদ আহমাদ ইউসুফের সুললিত কুর’আন পাঠের মাধ্যমে। দেখে ভাল লাগল যে অনুষ্ঠান দেরিতে শুরু হবার ফলে বক্তাদের বক্তৃতার সময় কমিয়ে দেয়ার পরিবর্তে আয়োজকরা তাদের নিজেদের বক্তৃতা বাদ দিয়ে দিলেন। উপস্থাপক প্রতিটি বক্তাকে আহ্বান জানানোর আগে এবং পরে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কুর’আনের একটি আয়াত বা একটি হাদিস বা কোন উক্তি ইত্যাদি দিয়ে অনুষ্ঠানকে গতিশীল এবং উপভোগ্য করে তুলছিলেন। আরো ভাল লাগল দেখে যে বক্তারা একই বক্তৃতায় তাদের তাবৎ জ্ঞানের প্রদর্শনী দিতে তৎপর হবার পরিবর্তে বক্তব্য নির্দিষ্ট বিষয়েই সীমাবদ্ধ রাখেন এবং আয়োজক কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতি দুই মিনিট অন্তর চিরকুট দিয়ে বিরক্ত করার পরিবর্তে সময় শেষ হবার পাঁচ মিনিট আগে একটি ছোট্ট বাতি জ্বালিয়ে দেন যেন তাঁরা নিজেদের বক্তব্য গুটিয়ে আনতে পারেন।
প্রথম বক্তা হিসেবে মঞ্চে এলেন শাইখ ইয়াসির ফাজাগা। তাঁর বক্তব্যের বিষয়বস্তু ছিল, Providing a roadmap for Muslim Community to be actively involved in Social Service. তিনি বলেন আমরা মুসলিমরা যদি আমাদের আদর্শ অন্যের সামনে তুলে ধরতে চাই তাহলে আমাদের বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রগুলোতে involved হতে হবে এবং সমাজের অন্যদের সুবিধা অসুবিধার প্রতি নজর রাখার মাধ্যমে একটি উত্তম উদাহরণ স্থাপন করতে হবে। কার্যত দেখা যায় অধিকাংশ মুসলিম social service বা volunteer service এর মত ক্ষেত্রগুলোতে involved হয়না। ফলে আমাদের ব্যাপারে লোকজনের একটা negative ধারণা জন্মায় যে আমরা শুধু নেয়ার বেলায় আছি, দেয়ার বেলায় নেই। অথচ আমাদেরই তো পরের জন্য করার আদর্শে উজ্জিবীত হয়ে এগিয়ে আসার ঐতিহ্য রয়েছে, তাহলে আমরা কিভাবে এত স্বার্থপর হয়ে গেলাম? তিনি আরো বলেন যে আমরা প্রায়ই ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধের পরিবর্তে আঞ্চলিকতাকে প্রাধান্য দেই যার কারণে অন্যান্য ধর্মের লোকজন দূরে থাক, অন্যান্যা দেশের মুসলিমরাও আমাদের কাছে ভিড়তে স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করেনা। যেমন তিনি বললেন বর্তমানে নর্থ আমেরিকার ৬০% মুসলিম স্থানীয়, ৪০% অভিবাসী। কিন্তু নও মুসলিমদের প্রতি অধিকাংশ জন্মগত মুসলিমদের সদাচরনের অভাব তাদের আমাদের কাছ থেকে দুরে সরিয়ে দেয়। এই বাঁধার প্রাচীর কাটিয়ে ওঠার প্রথম ধাপ হিসেবে তিনি পরিচিত অপরিচিত সবার মাঝে সালামের প্রচলন করার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন। তাঁর বক্তব্যের যে দিকটি আমাকে সবসময় আকর্ষন করত তা হোল তিনি অত্যন্ত নম্রভাব কথা বলেন, বক্তার মত নয় বন্ধুর মত। আরেকটি ব্যাপার হোল তিনি এত মজা করে কথা বলেন যে মনেই হবেনা তিনি একটি ভাবগম্ভীর বিষয়ে নিয়ে আলোচনা করছেন কিন্তু পরিশেষে তাঁর প্রতিটি কথা আনন্দদায়ক হবার কারণেই মনে গেঁথে যায়।
দ্বিতীয় বক্তা ছিলেন ডাক্তার আব্দুল্লাহ ইদ্রিস। ক্যানাডায় ইসলামের প্রচার এবং প্রসারে তাঁর অতুলনীয় অবদানের পরিপ্রেক্ষিতে ইমাম সাহেব তাঁর পরিচিতি দিতে গেলে এক মজার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ইমাম সাহেব যতই তাঁর ব্যাপারে বলার চেষ্টা করতে থাকেন তিনি ততই তাঁকে ঠেলে মাইক থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে থাকেন যতক্ষণ না ইমাম সাহেব পরিচিতি অসমাপ্ত রেখে মঞ্চ থেকে নেমে যান। নিজের প্রশংসায় তিনি এত লজ্জা পাচ্ছিলেন যেন কেউ তাঁর বদনাম করছে! তাঁর বক্তব্যের বিষয়বস্তু ছিল, How to develop Islamic personalities in secualr Canada. এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেননা অনেকেই এখানে এসে এখানকার সমাজে মিশে যেতে গিয়ে মাত্রাটা ঠিক বুঝে পান না। ফলে কেউ কেউ এই দেশে থেকেও এই দেশের সাথে সম্পর্কহীন থেকে যান যেমন ইয়াসির ফাজাগা সাহেব বলে গেলেন, আর কেউ কেউ এতটাই মিশে যান যে নিজের মুসলিম পরিচয়টা পর্যন্ত খুইয়ে বসেন। তিনি কিছু পরামর্শ দেন কিভাবে এবং কোথায় আমরা এই দেশের বা এই পরিবেশের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে পারি এবং কোথায় নিজের স্বাতন্ত্র বজায় রাখা জরুরী। তিনি পাচ পাঁচটি সন্তান এই দেশে মানুষ করেছেন উত্তম মুসলিম হিসেবে এবং অতঃপর তাদের পাঠিয়ে দিয়েছেন আফ্রিকায় জনসেবার্থে। অভিজ্ঞতার আলোকে যে জ্ঞান অর্জিত হয় তার বিকল্প কিছু হতে পারেনা। সুতরাং, ভাল লাগে তাঁর শিক্ষনীয় বক্তব্য।
পরবর্তীতে স্বরচিত কবিতা উপহার দেয় বুনা মুহাম্মাদ। ছেলেটি কি সুন্দর করে বলল, আমরা সবাই একই রক্তের ধারাবাহিকতায় এসেছি, একই মাঠে আবার মিলিত হব, এক আল্লাহর সামনে- তোমরা মুখে বল ‘তুমি আমার ভাই’ কিন্তু যখন আমি তোমার মেয়েকে বা বোনকে বিয়ে করতে চাই তখন তুমি কেবল আমার চামড়ার রংটাই দেখতে পাও কিংবা আমার জাতীয়তা ; তুমি বল তুমি তোমার সন্তানকে একটি ইসলামপ্রিয় মেয়ে বিয়ে করাতে চাও অথচ একটি মুসলিমা মেয়েকে তুমি তোমার ছেলের জন্য অনুপযুক্ত মনে কর কারণ তার ঠোঁট দু’টো তোমার অতিরিক্ত মোটা মনে হয়, এটা কবে থেকে বিয়ের criteria হোল? এইটুকু একটি ছেলের কবিতায় যে জীবনবোধ এবং ইসলামের মূলনীতির ব্যাপারে যে স্বচ্ছ ধারণা তা সকলের হৃদয় স্পর্শ করল। মোনালিসা আপা তাঁর মেয়েদের শোনানোর জন্য বুনার কবিতার সিডি কিনে নিলেন।
তারপর মঞ্চে এলেন ডাক্তার ইজ্জেলদিন আবুলেইশ, বক্তব্যের বিষয় Life changing stories in the Holy Land, a Canadian Perspective. বুঝতে পারছিলাম তিনি প্যালেস্টাইনের কথা বলবেন কিন্তু তিনি যা শোনালেন তাতে পাঁচ পাঁচটি রুমে যারা তাঁর বক্তব্য শুনেছেন কারো চোখ শুকনো ছিলোনা। তিনি কেবল তাঁর নিজের জীবনের গল্প বললেন। স্ত্রী মারা গেছেন কিছুদিন আগে। তিনি তাঁর চার মেয়ে এবং এক ভাগ্নীর সাথে তাদের রুমে বসে গল্প করছিলেন। কথা শেষ করে রুম থেকে বেরিয়ে যাবার পাঁচ সেকেন্ডের মাথায় প্রচন্ড বিস্ফোরণের শব্দে তিনি ছুটে যান তাঁর মেয়েদের রুমে। গিয়ে দেখেন ইসরাইলী কামানের বেপরোয়াভাবে ছুঁড়ে মারা গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে তাঁর তিন মেয়ে এবং ভাগ্নী। দালানের ধ্বংসাবশেষ আর চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মাংসপিন্ডের মাঝে বোঝার কোন উপায় নেই কোনটা তাঁর বড় মেয়ে বিসান (২০), কোনটা মায়ার (১৫), কোনটা আয়াহ (১৩), কোনটাই বা তাঁর ভাগ্নী নূর (১৪) এর লাশের টুকরো। একটি মেয়ে শাথাহ (১৬)আলৌকিকভাবে বেঁচে যায় যদিও তার একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়, ডানহাতের দু’টি আঙ্গুল পাওয়া যায়নি এবং extensive injury র কারণে তাকে বছরের পর বছর চিকিৎসাধীন থাকতে হয়। তিনি বার বার নিজেকে প্রশ্ন করতে থাকেন এদের কি দোষ ছিল? সেদিন ছিল জুমার দিন। মেয়েরা সকালে সবাই সুরাহ কাহফ পড়েছে, জুমার নামায আদায় করেছে, আসরের একটু আগে সবাই বসে নামাজের সময়ের অপেক্ষা করছিল। তিনি বার বার প্রশ্ন করতে থাকেন এরা তো ছিল মেয়ে, ওরা তো কখনোই ইসরাইলীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যেতনা, তাহলে ওদের এমন নির্মমভাবে হত্যা করল যে ইসরাইলী সে কিভাবে পারল এমন করতে, কি অন্যায়ের কারণে সে কেড়ে নিলো এতগুলো তাজা প্রাণ? তিনি চিন্তা করছিলেন তার ১২ বছর বয়সী ছেলেটি ক’দিন আগে মাকে হারিয়েছে, এখন মায়ের মত যত্ন নেয়া তিন তিনটি বোনকে একসাথে হারিয়ে সে কিভাবে স্বাভাবিক থাকবে? এই অবস্থায় তাঁর ছেলেটি এগিয়ে এসে বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘বাবা, তুমি ভাবছ কেন, ওরা তো শাহিদ হয়ে গিয়েছে! ওরা সবাই এখন মায়ের কাছে থাকবে, মা’র আর একাকী লাগবেনা!’ তিনি বর্ণনা করেন এই অবস্থায় তাঁর বেঁচে যাওয়া মেয়েটি পরীক্ষা দিয়ে ৯৬% মার্কস নিয়ে পাস করে। পরবর্তীতে অবশিষ্ট সন্তানদের মানুষ করার জন্য তিনি স্বদেশ ছেড়ে ক্যানাডায় পাড়ি জমান। এই ঘটনার পুনর্বিবেচনায় তিনি একটি বই লেখেন, I Shall Not Hate. বইটিতে তিনি পর্যালোচনা করেন কিভাবে জাবালিয়া রিফিউজি ক্যাম্পের মত জায়গা থেকে আল্লাহ তাঁকে এতবড় ডাক্তার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন; এত বড় মানসিক আঘাতের মাঝে আল্লাহ কিভাবে একটি ছোট্ট ছেলের মাধ্যমে তাকে সান্তনা দান করেন; যে প্রতিশোধ নয় নিজেকে গড়ে তোলাই এই যুদ্ধে জেতার উপায়; এবং যারা এই নরক থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছে তাদের সার্বিক প্রচেষ্টা থাকতে হবে নিজের জন্য কিছু করার আগে যারা পেছনে রয়ে গেছে তাদের কথা চিন্তা করা। তিনি জানান এই বই লেখার পর তাঁর মেয়েটি তাকে ইমেল করে জানায় সে কতটা অবাক হয়েছে যে ওর বাবা ওর বোনদের এতটা অনুভব করে। সেই প্রথম তিনি realize করেন যদিও তিনি ধরেই নিয়েছিলেন তাঁর সন্তানরা তাঁকে বোঝে, কিন্তু একই ঘরে থেকেও তারা কোনদিন তাঁর আবেগ বুঝতে পারেনি কারণ তিনি কখনো এর বঃহিপ্রকাশ ঘটাননি। তাই তিনি বাবামাদের পরামর্শ দেন তাদের অনুভূতিগুলো নিজের মাঝে লুকিয়ে না রেখে সন্তানদের সাথে খোলাখুলিভাবে শেয়ার করতে।
শেষ বক্তা ছিলেন ফাতিমা খামিসা, বক্তব্যের বিষয়, What would Khadijah (R) do today? How to use her as a model in our life today? তাঁর কথায় উঠে আসে খাদিজা (রা) কেবল তাঁর যুগেই নয়, সর্বযুগের সর্বাপেক্ষা স্মার্ট নারী ছিলেন। তাঁর মেধা এবং confidence আজকের যুগের নারীদের জন্যও একটি অনুকরণীয় আদর্শ কেননা তিনি ছিলেন একাধারে তুখোড় ব্যাবসায়ী, বুদ্ধিমতি এবং সাহসী নারী, উত্তম স্ত্রী, শ্বশুরকুলের প্রতি দায়িত্বশীলা বধু, আদর্শ মা, বিপদে ধৈর্য্যধারণকারী এবং উত্তম পরামর্শদানকারী বন্ধু। এমন বহুগুণে গুণান্বিতা দূরে থাক, এমন সাহসী মহিলা আজকের যুগেও পাওয়া যায়না যখন মেয়েরা দাবী করছে তারা পুরুষের সমকক্ষতা অর্জন করেছে। সুতরাং, আজকের কোন নারী নয় বরং খাদিজা (রা) ই হোক মুসলিম নারীদের আদর্শ।
এই অধিবেশনের সমাপ্তিতে এক ঘন্টার জন্য বাসায় এলাম আমরা, নামায পড়লাম এবং খাওয়াদাওয়া করে আবার রওয়ানা দিলাম।
বিকালে মহিলাদের জন্য আলাদা একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় কোস্ট প্লাজায়। দু’টি বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করেন কেনিয়ার একটি অঞ্চলের crown prince এর স্ত্রী ফওজিয়া মুহাম্মাদ। বিষয় দু’টি ছিল, Did Allah Almighty make a mistake in placing you where you are? এবং Even we can do it, empowering our sisters towards a successful community and civic engagement. তাঁর উপস্থাপনার স্টাইলটি ছিল মূলত interactive. তিনি বিভিন্ন বিষয়গুলো আমাদের সাথে আলোচনা আকারে উপস্থাপন করেন, কখনো তাঁর সাথে এবং কখনো নিজেদের মধ্যে। আলোচনায় যে ব্যাপারগুলো উঠে আসে তা হোল মুসলিম মহিলারা ইসলামকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে মুসলিম পুরুষদের মত সক্রিয় নয়। আমাদের ক্ষেত্রগুলো আলাদা হতে পারে কিন্তু নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ খুঁজে নেয়াটা আমাদের দায়িত্ব। যেমন তিনি উদাহরণ দেন, ক্যানাডায় প্রথম এসে তিনি যে অফিসে কাজ নেন সেখানে এক লোক তাঁকে দেখে অত্যন্ত কৌতুহলী হয়ে ওঠে। সে নানান সময় জিজ্ঞেস করত, ‘তুমি ছেলেদের সাথে হ্যান্ডশেক করনা কেন?’, ‘তোমার কি মাথায় চুল নেই? তাহলে তুমি মাথা ঢেকে রাখ কেন?’, ‘তুমি প্রতিদিন দুপুরে বাথরুমে গেলে হাত মুখ ভিজিয়ে কি কর?’, ‘তুমি এই মাসে খাবার পানি কিছু খাওনা কেন?’ ইত্যদি ইত্যাদি। তিনি বিরক্ত না হয়ে তাকে উত্তর দিতেন, বুঝিয়ে দিতেন। পরে সেই লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। আবার পরবর্তীতে তিনি অফিসের কাজ ছেড়ে একটি নতুন কাজ শুরু করেন। তিনি এখন ডঃ আবু আমিনা বিলাল ফিলিপসসহ পঁচিশজন বক্তার mail এর জবাব দেয়া থেকে তাদের শিডিউল ঠিক করা, তাদের travel arrangements তৈরী করা, তাদের হোটেল বুকিং করা ইত্যাদি যাবতীয় কাজ ঘরে বসেই করে থাকেন। তিনি বলেন এভাবে মহিলারা নানান দিকে ইসলামের কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারে। এই আলোচনা অনুষ্ঠানেরই এক পর্যায়ে আমার পরিচয় ঘটে ক্যানাডিয়ান নও মুসলিমা অ্যাশলীর সাথে যে ছোটবেলা থেকে খুঁজতে খুঁজতে বছর তিনেক আগে ইসলামের সন্ধান পায়। আর আমরা automatically পেয়েছি বলে হয়ত আমাদের কাছে এর কোন কদর নেই।
তাঁর বক্তব্যের পর ফাতিমা খামিসা, বুনা মুহাম্মাদ এবং মুসলেহ খান শ্রোতাদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। শনিবারের অধিবেশন এর মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়।
পরদিন ঘুমাচ্ছিলাম বেঘোরে। জানালা দিয়ে প্রবল আলো ঘরে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে দেখে বিরক্ত হয়ে ঘড়ির দিকে উঁকি দিলাম আর ঘুমটা গেল নষ্ট হয়ে। বাজে সাড়ে ন’টা। রবিবার আমার বান্ধবীরা সবাই সপরিবারে পিকনিকে গেল। পিকনিকের উদ্যোক্তা ছিলেন হাফিজ সাহেব। কিন্তু রবিবার কনফারেন্সের কথা শুনে উনি বললেন, ‘জীবনে অনেক পিকনিকে যাওয়া যাবে, তুমি কনফারেন্সে যাও, বাচ্চাদের আমি দেখব’। তারপর যদি ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করি! নিজে উঠে জয়াকে ফোন করে ঘুম থেকে জাগালাম। বেচারী টিকেট করেও গত দু’দিনের একদিনও যেতে পারেনি, ভয় পাচ্ছিল রাস্তা চিনবে কিনা। পথের ডাইরেকশন দিয়ে রেডি হয়ে বাসার সামনের স্টেশনে ট্রেনে উঠলাম। পরের স্টেশনে নেমে হাঁটা দিলাম কোস্ট প্লাজার উদ্দেশ্যে। আমার সামনেই হাঁটছিলো এক capri পরিহিতা নারী, বোঝাই যাচ্ছিল সে ছোট প্যান্ট পরা উপলক্ষ্যে সদ্য পায়ের লোম উৎপাটন করেছে, বেচারীর পাগুলো দেখাচ্ছিল ঠিক ছিলা মুরগীর চামড়ার মত। খুব দুঃখ পেলাম যে কতগুলো পরপুরুষ আমাদের dictate করছে আমাদের কি পরা উচিত, কিভাবে সাজগোজ করা উচিত, কোথায় লোম তোলা উচিত আর আমরা ঠিক সেই মত চলার জন্য জীবনপাত করে ফেলছি অথচ পুরুষগুলো ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি মাখেনা, রঙ মেখে সং সাজেনা, সাইজের তোয়াক্কা করেনা কিংবা ভুরুও তোলেনা!
যাই হোক, যদিও ঠিক করে রেখেছিলাম কোথায় বসব, শুধু কোস্ট প্লাজাতেই তখন একসাথে ছয়টা অনুষ্ঠান চলছে। তার একটা আরবী আর একটা উর্দু। এগুলো যদি বাদ দেই তবু বাকি চারটাতে হুলস্থুল কম্পিটিশন চলছে মনের ভেতর। শেষমেশ চোখমুখ বন্ধ করে বসে পড়লাম ডঃ আবু আমিনা বিলাল ফিলিপসের আসরে। তাঁর প্রথম বিষয় ছিল Dialogue with an Atheist. Does God exist and Who is God? আমার পরিবার এবং বন্ধুবান্ধবের মাঝে এদের সংখ্যা অনেক, তাই এই বিষয়ে আগ্রহ ছিল। দেখলাম আমি যা জানি তাই তিনি বললেন তাঁর বক্তব্যে। তবে তাঁর একটি কথায় আশ্বস্ত হলাম যে ওদের সংশোধন করা আমার এমনকি তাঁরও সাধ্যাতীত। তিনি বললেন এদের কোন যুক্ত তর্ক দিয়ে বোঝানো সম্ভব না কারণ আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে এদের বিন্দুমাত্র সন্দেহ বা সংশয় নেই, কিন্তু জীবনের কোন এক পর্যায়ে হয়ত তারা কিছু চেয়ে পায়নি, ব্যাস হয়ে গেল নাস্তিক। অথবা বিশ্বাস করতে তাদের আপত্তি নেই কিন্তু বিশ্বাস প্রমাণ করার জন্য যে কাজগুলো করতে বলা হয়েছে তা করতে তাদের অনীহা, তো বনে গেল নাস্তিক। যে বোঝেনা তাকে বোঝানো যায়, কিন্তু যে না বুঝতে বদ্ধপরিকর তাকে আপনি বোঝাবেন কোন যুক্তি দিয়ে? আধঘন্টার মত প্রশ্নোত্তর পর্বের পর তিনি মুসলেহ খানকে মঞ্চ ছেড়ে দিলেন। ততক্ষণে জয়া এসে পৌঁছেছে।
Multiculturalism vs Polyculturalism এর ওপর বক্তব্যটি আসলে দেয়ার কথা ছিল ডঃ মুনীর আল কাসিমের। কিন্তু তাঁকে সেদিন ভোরেই emergency টরোন্টো ফিরে যেতে হয় আর তিনি দায়িত্ব দিয়ে যান তাঁর ছাত্র মুসলেহ খানকে। মোনালিসা আপার কাছে তাঁর প্রশংসা শুনেছিলাম এবং গতদিন তাঁর প্রশ্নোত্তর পর্বেও উপস্থিত ছিলাম। তাঁর বক্তৃতার মূল বৈশিষ্ট্য যা অনেকের ভাল লাগে তা হোল তিনি খুব অল্প কথায় to the point আলোচনা করেন। মুসলেহ খান মূলত সমস্যাগ্রস্ত মুসলিমা বোনদের সমস্যা নিরসন করে থাকেন, তাই বলাবাহুল্য সেটাই তাঁর মূল আলোচনার বিষয়। এই দিন তিনি গতদিন ডাক্তার আবদুল্লাহ ইদ্রিস যা আলোচনা করেছিলেন অনেকটা সেই আদলেই আলোচনা করলেন। কিন্তু আমার যে বিষয়টি সবচেয়ে ভাল লাগল তা হোল তাঁর সরল স্বীকারোক্তি যে তাঁর শিক্ষকের বক্তব্যটি তাঁকে উপস্থাপন করতে হবে জেনেই তিনি ভীষণ মুষড়ে পড়েন এবং তাঁর মাথায় কিছুই ঢুকছিলোনা। তখন তাঁর স্ত্রী তাকে সাহস দেন যে তিনি চেষ্টা করলেই পারবেন ইনশাল্লাহ এবং তখন তিনি সাহস ফিরে পান। তিনি বলেন এমন স্ত্রী আল্লাহর পক্ষে থেকে উপহারস্বরূপ। পাশাপাশি তিনি বলেন অনেক সময় মহিলারা রেগে গিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করেন কারণ তাদের মনে হয় তাদের সংসারে যথেষ্ট মূল্যায়ন করা হচ্ছেনা। কিন্তু সে সময় যদি স্বামী রত্নটি চুপ করে থেকে ঝড় সামাল দিতে পারেন তাহলে প্রায়ই দেখা যায় কয়েকমিনিটের ভেতর স্ত্রীর আপনিই মাথা ঠান্ডা হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে এমন ধৈর্য্যশীল স্বামীটিকে তিনি জীবনের জন্য আঁকড়ে ধরার পরামর্শ দেন। আকরাম জুমায় তাঁর আরেকটি বক্তব্য থাকায় তিনি প্রশ্নোত্তর পর্ব বাদ দিয়েই ছুটতে বাধ্য হন। আমরা ছুট দেই নির্ধারিত কক্ষে যুহরের নামায পড়তে।
এবার আবার ডঃ ফিলিপস ফিরে আসেন বিদ’আতের ওপর একটি চমৎকার আলোচনা নিয়ে। এই আলোচনাটি সবার শোনা দরকার কেননা এটি এমন এক বিষয় যা নিয়ে আমাদের সমাজে প্রচুর ভুল ধারণার প্রচলন রয়েছে অথচ প্রতিটি জুমার খুতবায় বলা হয় প্রতিটি বিদ’আতই misguided এবং প্রত্যেক misguidance এর শেষফল জাহান্নাম। আমাদের সৌভাগ্য তাঁর পর আর কোন বক্তা ছিলোনা, কারো এই রুম প্রয়োজন ছিলোনা এবং সন্ধ্যা ছ’টা পর্যন্ত আর কোন অনুষ্ঠান ছিলোনা। তিনি সানন্দে আমাদের প্রশ্নোত্তর পর্বের শেষে আরো দেড়ঘন্টা সময় দেন- প্রশ্নোত্তরের বন্যা বয়ে যায়। এ’সময় তাঁর দু’টি জিনিস আমার খুব ভাল লাগে। একটি হোল তিনি খেয়াল করেন শ্রোতৃমন্ডলী তাঁর কথা বুঝতে পারছে কি’না এবং প্রয়োজনমত একাধিকবার বা অন্যভাবে বিষয়টি পুণরায় ব্যাখ্যা করেন। হলে লোকসংখ্যা বাড়ার এক পর্যায়ে অনেক মহিলাদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় যেহেতু মহিলাদের বসার জন্য কেবল একটি সারি নির্ধারিত ছিল, পুরুষদের দু’টি। তিনি বক্তৃতায় বিরতি দিয়ে ভাইদের অনুরোধ করেন সরে গিয়ে বোনদের জন্য কিছু সারি ছেড়ে দিতে। অনেক বক্তাই দেখা যায় নিজের মহিমায় এত মশগুল থাকেন যে তাঁদের শ্রোতাদের দিকে তাকানোরই সুযোগ হয়না।
প্রতিটি অনুষ্ঠানেই বেশ কিছু ক্যানাডিয়ান উপস্থিত ছিল। এই আসরে একটি পরিবার আসে যারা সম্ভবত ইসলাম কবুল করার পথে এবং খুঁটিনাটি অনেক বিষয় তারা জানতে চায়। পরিশেষে তারা ডঃ ফিলিপসের অনলাইন ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির তথ্য সংগ্রহ করে নেয়। এখানে ডিপ্লোমা এবং অনার্স উভয়প্রকার কোর্স আছে, মদীনা ইউনিভার্সিটি এবং এদের সিলেবাস একই কেবল এখানে পড়ানো হয় ইংরেজি মিডিয়ামে, রেজিস্ট্রেশন ফি ছাড়া কোর্স সম্পূর্ণ ফ্রি এবং পুরোপুরি অনলাইনে করা যায়। চারবছরে তাদের ডিপ্লোমা স্টুডেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে বিশ হাজার এবং অনার্সে ছাত্রসংখ্যা তিন হাজার।
বিকালে বিদায়ী অধিবেশনের জন্য সকালের ছয়টি কক্ষকে পার্টিশন সরিয়ে একত্রিত করে দেয়া হয়। বিদায়ী সেশন হওয়াতে প্রচুর বক্তা বক্তব্য রাখেন কিন্তু মজার বিষয় সবাই নির্ধারিত সময়ের মাঝেই বক্তব্য শেষ করেন যার ফলে মাগরিবের নামাজের আগেই (দশটা বাজে) অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়ে যায়। এই অধিবেশনের বেশ কয়েকটি হাইলাইট ছিল। একটি ছিল উপস্থাপকের একটি মজার কাজ। তিনি সবাইকে অনুরোধ করেন পাশে বসা অপরিচিত ভাই বা বোনটিকে সালাম দিয়ে জড়িয়ে ধরতে। সাদা কালো লাল হলুদ হরেক চামড়ার মাঝে সালাম বিনিময় আর কোলাকুলি যেন ঈদের আমেজ সৃষ্টি করে! তিনি আসলে আমাদের দেখাতে চাইছিলেন কত সহজেই আমরা আমাদের মুসলিম ভাই বা বোনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে পারি এবং এর মাধ্যমে কত আনন্দ পাওয়া যায়।
একটি উল্লেখযোগ্য বক্তব্য ছিল ম্যালকম এক্সের মেয়ে অ্যাম্বাসেডর শাবাজের। টিনেজের প্রথমপ্রান্তে ম্যালকম এক্স (মালিক শাবাজ) এর আত্মজীবনী পড়ে মোহিত হয়েছিলাম। সবাই তাঁকে black activist হিসেবে জানলেও তিনি বলেছেন তিনি তাবৎ নিপীড়িত মানবতার পক্ষে। তাঁর মত মেধাবী এবং উজ্জ্বল ব্যাক্তির কন্যা এমন জ্বাজল্যমান হওয়াটাই বাঞ্ছনীয় ছিল। তিনি মূলত তুলে ধরেন কিভাবে আমরা নিজেদের একটি ছোট গোত্রের অংশ মনে করে নিজেরাই নিজেদের corner করে ফেলি অথচ নিজেকে বৃহত্তর পরিসরে চিন্তা করলে আমাদের self identity বাড়ে বৈ কমেনা। যেমন তিনি বললেন তিনি নিজেকে ব্ল্যাক অ্যামেরিকান ভাবলে একটি ছোট্ট গোষ্ঠীর সদস্য হন, কিন্তু নিজেকে মুসলিম ভাবলে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সদস্যে পরিণত হন। তিনি বলেন আত্মপরিচয় লুকানো মানে নিজেকে ছোট করা, সুতরাং যার নাম পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষটির নামে সে কেন নিজেকে ‘মো’ বলে পরিচয় দেবে? অন্যরা মুহাম্মাদ উচ্চারণ করতে না পারলেও ক্ষতি নেই, সে তাদের শেখাবে কিভাবে তাকে ডাকতে হবে!
এবারের কনফারেন্সে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় ছিল মুসলিমদের প্রতি বর্তমান সরকারের বিমাতাসুলভ মনোভাব। এই বিষয়ে কথা বলেন আইনবিদ রাজ শর্মা। তিনি কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে দেখান কিভাবে ক্যানাডিয়ান সরকার আমেরিকার চাপে পড়ে সময় সময় মুসলিম ক্যানাডিয়ান নাগরিকদের অধিকার লঙ্ঘন করেছে এবং তারা যখনই সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে তখনই বিজয়ী হয়েছে। তিনি পরামর্শ দেন এই ধরনের পরিস্থিতিগুলোতে মুসলিমদের সম্মিলিতভাবে বেশি বেশি মামলা করা উচিত যেন সরকার ভাবতে না পারে যে মুসলিমরা অসহায় এবং তারা মুসলিমদের সাথে ঝামেলা করার আগে চিন্তা করতে বাধ্য হয় তাদের নাগরিক অধিকার নিয়ে।
পরিশেষে আসন্ন রামাদানে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ব্যাপারে ছোট্ট একটি reminder দিয়ে অনুষ্ঠান সমাপ্ত করেন ডঃ আবু আমিনা বিলাল ফিলিপস।

অনুষ্ঠানের শেষে আয়োজকরা তাঁদের স্ত্রীদের অবদান স্বীকার করেন এই কাজগুলিতে তাঁদের পাশে থাকার জন্য এবং অবশেষে যে ১০৫ জন কিশোর কিশোরী সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সমস্ত কাজে ভলান্টিয়ার করেছে তাদের সবার সামনে ডেকে নিয়ে তাদের অবদান স্বীকার করেন- ছেলেদের দেন স্টেজের সামনে আর মেয়েদের ওঠান স্টেজের ওপর যেহেতু এই মেয়েরাই ভবিষ্যতে মা হবে। এই সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রচ্ছন্নভাবে ইসলামে নারীর মর্যাদার বিষয়টি উদাহরণের মাধ্যমে উঠে আসে, কথায় নয়।
অনুষ্ঠান শেষে জয়া আমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে নিজের বাসায় ফিরে যায়। রাতে শুতে গিয়ে মনটা আনন্দ আর কষ্টের মাঝে দুলতে থাকে- আনন্দ কারণ এই অসাধারন অনুষ্ঠানটিতে আল্লাহ আমাকে উপস্থিত থাকার সুযোগ করে দেন আর দুঃখ কারণ স্বপ্নময় তিনটি দিন শেষ হয়ে গেল।
এবার যখন Power of Unity কনফারেন্সের খবর পেলাম এবং দেখলাম বক্তাদের তালিকায় আছেন ডঃ আবু আমিনা বিলাল ফিলিপস, ইয়াসির ফাজাগার মত পরিচিত মুখ এবং বিখ্যাত Activist, বক্তা এবং লেখক ম্যালকম এক্সের কন্যা অ্যাম্বাসেডর শাবাজ তখন চিন্তা করলাম এবার যে করেই হোক যেতেই হবে। টিকেট পাওয়া যাচ্ছিল আমাদের মসজিদে, অনলাইনে এবং আরো বহু জায়গায়। ছোটবোন জয়া বলল পরিচিত একজনের মাধ্যমে টিকেট নেবে, ভাবলাম এতে হয়ত টিকেটবিক্রেতার কিছু লাভ হতে পারে, তাই বললাম নিজের জন্য টিকেট নেয়ার সময় আমার জন্য একটা নিয়ে নিতে, আমি টাকা দিয়ে দেব। কিন্তু জয়া চালাকি করে অনলাইনে দু’খানা টিকেট কিনে একখানা আমাকে গিফট করে দিল সাওয়াবের আশায়। আমার কোন প্রতিবাদে কোন কাজ হোলনা।
অনুষ্ঠান সাজানো হয়েছিল ক্যানাডা দিবসের ছুটিসহ long weekend কে মাথায় রেখে শুক্রবার (২৯শে জুন) থেকে রবিবার (১লা জুলাই) যেন মঙ্গলবার কাজে ফিরে যাবার আগে সোমবার সবাই বিশ্রাম নিতে পারে। ভেন্যু ছিল তিনটি- আমাদের জুমা মসজিদ (আকরাম জুমা মসজিদ), কোস্ট প্লাজা হোটেল এবং আবু বাকর ইসলামিক সেন্টার। অনুষ্ঠান ছিল দিনব্যাপী। তিনদিনের জন্য টিকেটের শুভেচ্ছামূল্য ছিল মাত্র ২৫ টাকা। একই টিকেটে তিনদিনে যেকোন সময় যেকোন ভেন্যুতে যাওয়া যাবে। খাবার এবং বাচ্চাদের দেখাশোনাও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। বক্তা ছিলেন চারজন মহিলাসহ মোট একুশজন। বক্তাদের বক্তৃতার বিষয়সহ শিডিউল দেয়া ছিল অনলাইনে যেন শ্রোতারা নিজের পছন্দমত ভেন্যু এবং সময় বেছে নিতে পারেন। পাশাপাশি অনুষ্ঠান হলের বাইরে পাওয়া যাচ্ছিল শিডিউল এবং বক্তাদের পরিচিতি সম্বলিত বুকলেট।
শুক্রবার working day হওয়াতে অনুষ্ঠান হবার কথা ছিল সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত। ভাগ্যক্রমে তার আগেরদিন আমার দাদার ছোটভাই- আমার প্রিয় ছোটদাদা, যিনি আমার জ্ঞানের দিগন্ত প্রসারিত হবার পেছনে অনেক অবদান রেখেছেন- চারদিনের সফরে আমেরিকা থেকে ক্যাল্গেরী আসছিল। শনি রবি আমি কিছুতেই মিস করবনা তাই দাদাকে উপলক্ষ্য করে প্রায় ২০-২৫ জনকে দাওয়াত দেয়া হোল শুক্রবার রাতে। ঠিক করলাম অনুষ্ঠানে যেতে না পারলেও জুমা কিছুতেই মিস করবনা। দাদা স্বাভাবিক খাবার খেতে পারেনা, তাই বৃহস্পতিবার বাবাকে দিয়ে দাদার জন্য এবং দাওয়াতের জন্য মিলিয়ে তিনখানা আইটেম রান্না করিয়ে রাখলাম। উল্লেখ্য, প্রায় দু’মাস হোল বাবামা আমার বাসায় আছে। আমাদের পরিবারের বৈশিষ্ট্য হোল আমরা শুয়েবসে থাকতে পারিনা, উপরন্তু আমাদের বাসায় নারীপুরুষ সবাই সবধরনের কাজ করতে পারে, তদুপরি বাবার রান্না অসম্ভব মজাদার আর হাফিজ সাহেবের মত বাবাও সবাইকে রেঁধে খাইয়ে প্রশংসা কুড়াতে ভালবাসে, আমি এর সুযোগ নিলাম আর কি! হাফিজ সাহেব দ্বিবিধ মিষ্টি বানালেন- রসগোল্লা আর চমচম। আর শুক্রবার সকালে উঠে আমি বিরিয়ানি চাপিয়ে দিয়ে দ্রুত ঘর গুছিয়ে ফেললাম। দৌড়ের ওপর কাজ শেষ করে হাজির হলাম মসজিদে।
সেদিন ক্যাল্গেরীর সাতটি মসজিদে সাতজন বক্তা খুতবা দিচ্ছিলেন, তন্মধ্যে আমাদের মসজিদে খুতবা দিলেন ডঃ আবু আমিনা বিলাল ফিলিপস। আমাদের মসজিদে প্রতি শুক্রবারেই প্রচুর লোক হয়, অনেক সময় একহাজার লোকের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন মসজিদ, মসজিদসংলগ্ন gym সব ভর্তি হয়ে বাইরে রাস্তার ওপরেও লোক দাঁড়াতে হয়- সেদিনও মনে হোল মানুষের ঢল নেমেছে। সৌভাগ্যক্রমে সামনেই জায়গা পেয়ে গেলাম। আমরা দুই রাকাত নামায শেষ করতে না করতেই খুতবার সময় হয়ে এলো। ডঃ ফিলিপস প্রথমেই প্রশ্ন করলেন গত এক সপ্তাহে কে কে কোন না কোন একসময় শুকরিয়া করে সিজদা করেছে। হাত উঠল দশখানা। মহিলারা ওপরতলায় দৃষ্টির আড়ালে তাই এদিকে কি অবস্থা বোঝা গেলনা। তারপর তিনি শুকরিয়ার গুরুত্ব নিয়ে আধঘন্টাখানেক খুতবা দিলেন যার মূল কথা ছিল আমাদের শুকরিয়া আল্লাহর নিষ্প্রয়োজন, কিন্তু কৃতজ্ঞতাবোধ আমাদের মধ্যস্থিত অনেক ব্যাধির মহৌষধ, তাই এই অনুভূতি আমাদের নিজেদের স্বার্থেই জরুরী। কৃতজ্ঞতার সাথে লক্ষ্য করলাম আমার বারো বছর বয়সী কন্যা খুতবা গোগ্রাসে গিলছে যদিও অনেক সময় খুতবার প্রতি মনোযোগ আকৃষ্ট করার জন্য আমার ওকে তাগাদা দিতে হয়।
খুতবার পর জুমার নামায পড়ালেন ডঃ ফিলিপস। বিশুদ্ধ উচ্চারণে চমৎকার ক্বির’আতসহকারে নামায পড়ালেন তিনি। তখন চিন্তা করলাম কত নারীপুরুষ দেখি যারা মাস্টার্স পিএইচডি করে ফেলেছেন অথচ শুদ্ধভাবে কুর’আন পড়তে পারেন না। অন্যদিকে এই ভদ্রলোক যিনি জীবনের বৃহদাংশ ইসলাম সম্পর্কে জানতেন না অথচ ইসলাম গ্রহণ করার সাথে সাথে বিশুদ্ধভাবে কুর’আন পড়তে শিখে গেছেন, এমনকি লোকমুখে শোনার পরিবর্তে নিজেই ইসলাম সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞানলাভ করার জন্য তিনি এই বিষয়ে পিএইচডি করে ফেলেন! এ’থেকে বোঝা যায়, কিছু শেখার জন্য সদিচ্ছা এবং অধ্যাবসায়ই যথেষ্ট যদি আমরা তাকে যথাযথ গুরুত্ব দেই।
এর পর ছিল মুতাহ বীল নামে একজন নও মুসলিমের বক্তৃতা, তাঁর ইসলাম গ্রহণের কারণ নিয়ে। তিনি গায়ক টুপাক শাকুরের Outlaws দলের একজন সদস্য ছিলেন কিন্তু এই জগতের নোংরা দিকগুলো তাঁকে ভাবিয়ে তোলে, তিনি সত্যের অনুসন্ধানে ব্রতী হন এবং এক পর্যায়ে তিনি ইসলামের মাঝে উত্তম আদর্শ খুঁজে পেয়ে এই পথে চলে আসেন। বার বার ছোটভাই মুহাম্মদের শ্বশুরবাড়ী থেকে ফোন আসছিল, দুপুরে সবার দাওয়াত ঐ বাসায়, আমরা ছাড়া আর সবাই উপস্থিত। অনিচ্ছাসত্ত্বেও বক্তৃতা না শুনে ওখানে হাজিরা দিতে হোল। একমাত্র সান্তনা ছিল ছোটদাদার সাথে চারবছর পর দেখা হওয়া, গল্প করা আর দাওয়াতীর সংখ্যা আরো কিছু বৃদ্ধি পাওয়া। সন্ধ্যায় মেহমান আসার আগেই বাড়তি মেহমানদের জন্য আবার রান্না চড়াতে হবে। তাই আবার ছুট। বাসায় ফেরার পথে আল মদীনা হালাল মিট থেকে মুরগী নিয়ে বাসায় এসেই দিলাম চড়িয়ে আরো এক হাঁড়ি বিরিয়ানী। সন্ধ্যা সাতটা থেকে মেহমান আসতে শুরু করল, সবাই যেতে যেতে রাত সাড়ে বারোটা। বাচ্চাদের শুইয়ে দিয়ে গেলাম সব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে সামলে রাখতে কারণ পরদিন বাসায় থাকবনা। সব গুছিয়ে রাত দু’টোয় ভাবলাম এখন ঘুমালে দেড় ঘন্টা পর ফজরের নামায, ক্লান্ত শরীরে হয়ত উঠতে পারব না। তাই অপেক্ষা করতে লাগলাম। ঘুমালাম চারটায়।
সাড়ে সাতটায় হাফিজ সাহেব night duty থেকে ফিরে জাগাতে চেষ্টা করলে দিলাম এক বকা, ‘অনুষ্ঠান দশটায়, আমি আগে ঘুমাই!’ পৌনে দশটায় বান্ধবী মোনালিসা আপা ফোন করলেন উনি কোস্ট প্লাজা হোটেলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হচ্ছেন, আমি যাব কিনা। যাব কি’না মানে?! ওনাকে আসতে বললাম কিন্তু চোখ কিছুতেই খুলে রাখতে পারছিনা, গায়ে মাথায় পানি ঢেলে চোখ থেকে ঘুমের আঠা ছাড়ালাম। দশ মিনিটের ভেতর তৈরী হয়ে ওনার সাথে কনফারেন্স হলে পৌঁছলাম। শনিবার আকরাম জুমা, কোস্ট প্লাজা আর আবু বাকর সেন্টার সব জায়গাতেই অনুষ্ঠান চলছিল। কোস্ট প্লাজা আমার বাসা থেকে দেখা যায়, পাশাপাশি এখানে বক্তৃতার বিষয়গুলোও আমার খুব পছন্দের ছিল। গিয়ে দেখি গতদিন সবাই রাত এগারোটা পর্যন্ত বক্তব্য শুনে সকালে আর আসতে পারেনি। বক্তারা ঘুরাঘুরি করছেন কিন্তু শ্রোতারা অনু্পস্থিত, তাই দশটার পরিবর্তে অনুষ্ঠান শুরু হোল এগারোটায়। অনুষ্ঠানের শুরুতে আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেব একটা হাদিস বললেন যার মর্মার্থ হচ্ছে রাসূল (সা) বলতেন সেই অনুষ্ঠানে কোন বরকত হয়না যেখানে শ্রোতারা পরস্পর বাক্যালাপ করতে থাকে। মোনালিসা আপা এবং আমি দু’জনই অত্যন্ত খুশি হলাম এই হাদিসটি পেয়ে কারণ আমাদের জ্ঞানানুসন্ধানমূলক বৈঠকগুলিতে বান্ধবীরা অনেকসময় জ্ঞানের কথা বাদ দিয়ে গল্পগুজবে মেতে ওঠেন। এবার আমাদের হাতে রয়েছে শক্ত দলিল!
অনুষ্ঠান শুরু হোল ক্কারী মুহাম্মাদ আহমাদ ইউসুফের সুললিত কুর’আন পাঠের মাধ্যমে। দেখে ভাল লাগল যে অনুষ্ঠান দেরিতে শুরু হবার ফলে বক্তাদের বক্তৃতার সময় কমিয়ে দেয়ার পরিবর্তে আয়োজকরা তাদের নিজেদের বক্তৃতা বাদ দিয়ে দিলেন। উপস্থাপক প্রতিটি বক্তাকে আহ্বান জানানোর আগে এবং পরে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কুর’আনের একটি আয়াত বা একটি হাদিস বা কোন উক্তি ইত্যাদি দিয়ে অনুষ্ঠানকে গতিশীল এবং উপভোগ্য করে তুলছিলেন। আরো ভাল লাগল দেখে যে বক্তারা একই বক্তৃতায় তাদের তাবৎ জ্ঞানের প্রদর্শনী দিতে তৎপর হবার পরিবর্তে বক্তব্য নির্দিষ্ট বিষয়েই সীমাবদ্ধ রাখেন এবং আয়োজক কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতি দুই মিনিট অন্তর চিরকুট দিয়ে বিরক্ত করার পরিবর্তে সময় শেষ হবার পাঁচ মিনিট আগে একটি ছোট্ট বাতি জ্বালিয়ে দেন যেন তাঁরা নিজেদের বক্তব্য গুটিয়ে আনতে পারেন।
প্রথম বক্তা হিসেবে মঞ্চে এলেন শাইখ ইয়াসির ফাজাগা। তাঁর বক্তব্যের বিষয়বস্তু ছিল, Providing a roadmap for Muslim Community to be actively involved in Social Service. তিনি বলেন আমরা মুসলিমরা যদি আমাদের আদর্শ অন্যের সামনে তুলে ধরতে চাই তাহলে আমাদের বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রগুলোতে involved হতে হবে এবং সমাজের অন্যদের সুবিধা অসুবিধার প্রতি নজর রাখার মাধ্যমে একটি উত্তম উদাহরণ স্থাপন করতে হবে। কার্যত দেখা যায় অধিকাংশ মুসলিম social service বা volunteer service এর মত ক্ষেত্রগুলোতে involved হয়না। ফলে আমাদের ব্যাপারে লোকজনের একটা negative ধারণা জন্মায় যে আমরা শুধু নেয়ার বেলায় আছি, দেয়ার বেলায় নেই। অথচ আমাদেরই তো পরের জন্য করার আদর্শে উজ্জিবীত হয়ে এগিয়ে আসার ঐতিহ্য রয়েছে, তাহলে আমরা কিভাবে এত স্বার্থপর হয়ে গেলাম? তিনি আরো বলেন যে আমরা প্রায়ই ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধের পরিবর্তে আঞ্চলিকতাকে প্রাধান্য দেই যার কারণে অন্যান্য ধর্মের লোকজন দূরে থাক, অন্যান্যা দেশের মুসলিমরাও আমাদের কাছে ভিড়তে স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করেনা। যেমন তিনি বললেন বর্তমানে নর্থ আমেরিকার ৬০% মুসলিম স্থানীয়, ৪০% অভিবাসী। কিন্তু নও মুসলিমদের প্রতি অধিকাংশ জন্মগত মুসলিমদের সদাচরনের অভাব তাদের আমাদের কাছ থেকে দুরে সরিয়ে দেয়। এই বাঁধার প্রাচীর কাটিয়ে ওঠার প্রথম ধাপ হিসেবে তিনি পরিচিত অপরিচিত সবার মাঝে সালামের প্রচলন করার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন। তাঁর বক্তব্যের যে দিকটি আমাকে সবসময় আকর্ষন করত তা হোল তিনি অত্যন্ত নম্রভাব কথা বলেন, বক্তার মত নয় বন্ধুর মত। আরেকটি ব্যাপার হোল তিনি এত মজা করে কথা বলেন যে মনেই হবেনা তিনি একটি ভাবগম্ভীর বিষয়ে নিয়ে আলোচনা করছেন কিন্তু পরিশেষে তাঁর প্রতিটি কথা আনন্দদায়ক হবার কারণেই মনে গেঁথে যায়।
দ্বিতীয় বক্তা ছিলেন ডাক্তার আব্দুল্লাহ ইদ্রিস। ক্যানাডায় ইসলামের প্রচার এবং প্রসারে তাঁর অতুলনীয় অবদানের পরিপ্রেক্ষিতে ইমাম সাহেব তাঁর পরিচিতি দিতে গেলে এক মজার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ইমাম সাহেব যতই তাঁর ব্যাপারে বলার চেষ্টা করতে থাকেন তিনি ততই তাঁকে ঠেলে মাইক থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে থাকেন যতক্ষণ না ইমাম সাহেব পরিচিতি অসমাপ্ত রেখে মঞ্চ থেকে নেমে যান। নিজের প্রশংসায় তিনি এত লজ্জা পাচ্ছিলেন যেন কেউ তাঁর বদনাম করছে! তাঁর বক্তব্যের বিষয়বস্তু ছিল, How to develop Islamic personalities in secualr Canada. এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেননা অনেকেই এখানে এসে এখানকার সমাজে মিশে যেতে গিয়ে মাত্রাটা ঠিক বুঝে পান না। ফলে কেউ কেউ এই দেশে থেকেও এই দেশের সাথে সম্পর্কহীন থেকে যান যেমন ইয়াসির ফাজাগা সাহেব বলে গেলেন, আর কেউ কেউ এতটাই মিশে যান যে নিজের মুসলিম পরিচয়টা পর্যন্ত খুইয়ে বসেন। তিনি কিছু পরামর্শ দেন কিভাবে এবং কোথায় আমরা এই দেশের বা এই পরিবেশের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে পারি এবং কোথায় নিজের স্বাতন্ত্র বজায় রাখা জরুরী। তিনি পাচ পাঁচটি সন্তান এই দেশে মানুষ করেছেন উত্তম মুসলিম হিসেবে এবং অতঃপর তাদের পাঠিয়ে দিয়েছেন আফ্রিকায় জনসেবার্থে। অভিজ্ঞতার আলোকে যে জ্ঞান অর্জিত হয় তার বিকল্প কিছু হতে পারেনা। সুতরাং, ভাল লাগে তাঁর শিক্ষনীয় বক্তব্য।
পরবর্তীতে স্বরচিত কবিতা উপহার দেয় বুনা মুহাম্মাদ। ছেলেটি কি সুন্দর করে বলল, আমরা সবাই একই রক্তের ধারাবাহিকতায় এসেছি, একই মাঠে আবার মিলিত হব, এক আল্লাহর সামনে- তোমরা মুখে বল ‘তুমি আমার ভাই’ কিন্তু যখন আমি তোমার মেয়েকে বা বোনকে বিয়ে করতে চাই তখন তুমি কেবল আমার চামড়ার রংটাই দেখতে পাও কিংবা আমার জাতীয়তা ; তুমি বল তুমি তোমার সন্তানকে একটি ইসলামপ্রিয় মেয়ে বিয়ে করাতে চাও অথচ একটি মুসলিমা মেয়েকে তুমি তোমার ছেলের জন্য অনুপযুক্ত মনে কর কারণ তার ঠোঁট দু’টো তোমার অতিরিক্ত মোটা মনে হয়, এটা কবে থেকে বিয়ের criteria হোল? এইটুকু একটি ছেলের কবিতায় যে জীবনবোধ এবং ইসলামের মূলনীতির ব্যাপারে যে স্বচ্ছ ধারণা তা সকলের হৃদয় স্পর্শ করল। মোনালিসা আপা তাঁর মেয়েদের শোনানোর জন্য বুনার কবিতার সিডি কিনে নিলেন।
তারপর মঞ্চে এলেন ডাক্তার ইজ্জেলদিন আবুলেইশ, বক্তব্যের বিষয় Life changing stories in the Holy Land, a Canadian Perspective. বুঝতে পারছিলাম তিনি প্যালেস্টাইনের কথা বলবেন কিন্তু তিনি যা শোনালেন তাতে পাঁচ পাঁচটি রুমে যারা তাঁর বক্তব্য শুনেছেন কারো চোখ শুকনো ছিলোনা। তিনি কেবল তাঁর নিজের জীবনের গল্প বললেন। স্ত্রী মারা গেছেন কিছুদিন আগে। তিনি তাঁর চার মেয়ে এবং এক ভাগ্নীর সাথে তাদের রুমে বসে গল্প করছিলেন। কথা শেষ করে রুম থেকে বেরিয়ে যাবার পাঁচ সেকেন্ডের মাথায় প্রচন্ড বিস্ফোরণের শব্দে তিনি ছুটে যান তাঁর মেয়েদের রুমে। গিয়ে দেখেন ইসরাইলী কামানের বেপরোয়াভাবে ছুঁড়ে মারা গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে তাঁর তিন মেয়ে এবং ভাগ্নী। দালানের ধ্বংসাবশেষ আর চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মাংসপিন্ডের মাঝে বোঝার কোন উপায় নেই কোনটা তাঁর বড় মেয়ে বিসান (২০), কোনটা মায়ার (১৫), কোনটা আয়াহ (১৩), কোনটাই বা তাঁর ভাগ্নী নূর (১৪) এর লাশের টুকরো। একটি মেয়ে শাথাহ (১৬)আলৌকিকভাবে বেঁচে যায় যদিও তার একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়, ডানহাতের দু’টি আঙ্গুল পাওয়া যায়নি এবং extensive injury র কারণে তাকে বছরের পর বছর চিকিৎসাধীন থাকতে হয়। তিনি বার বার নিজেকে প্রশ্ন করতে থাকেন এদের কি দোষ ছিল? সেদিন ছিল জুমার দিন। মেয়েরা সকালে সবাই সুরাহ কাহফ পড়েছে, জুমার নামায আদায় করেছে, আসরের একটু আগে সবাই বসে নামাজের সময়ের অপেক্ষা করছিল। তিনি বার বার প্রশ্ন করতে থাকেন এরা তো ছিল মেয়ে, ওরা তো কখনোই ইসরাইলীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যেতনা, তাহলে ওদের এমন নির্মমভাবে হত্যা করল যে ইসরাইলী সে কিভাবে পারল এমন করতে, কি অন্যায়ের কারণে সে কেড়ে নিলো এতগুলো তাজা প্রাণ? তিনি চিন্তা করছিলেন তার ১২ বছর বয়সী ছেলেটি ক’দিন আগে মাকে হারিয়েছে, এখন মায়ের মত যত্ন নেয়া তিন তিনটি বোনকে একসাথে হারিয়ে সে কিভাবে স্বাভাবিক থাকবে? এই অবস্থায় তাঁর ছেলেটি এগিয়ে এসে বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘বাবা, তুমি ভাবছ কেন, ওরা তো শাহিদ হয়ে গিয়েছে! ওরা সবাই এখন মায়ের কাছে থাকবে, মা’র আর একাকী লাগবেনা!’ তিনি বর্ণনা করেন এই অবস্থায় তাঁর বেঁচে যাওয়া মেয়েটি পরীক্ষা দিয়ে ৯৬% মার্কস নিয়ে পাস করে। পরবর্তীতে অবশিষ্ট সন্তানদের মানুষ করার জন্য তিনি স্বদেশ ছেড়ে ক্যানাডায় পাড়ি জমান। এই ঘটনার পুনর্বিবেচনায় তিনি একটি বই লেখেন, I Shall Not Hate. বইটিতে তিনি পর্যালোচনা করেন কিভাবে জাবালিয়া রিফিউজি ক্যাম্পের মত জায়গা থেকে আল্লাহ তাঁকে এতবড় ডাক্তার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন; এত বড় মানসিক আঘাতের মাঝে আল্লাহ কিভাবে একটি ছোট্ট ছেলের মাধ্যমে তাকে সান্তনা দান করেন; যে প্রতিশোধ নয় নিজেকে গড়ে তোলাই এই যুদ্ধে জেতার উপায়; এবং যারা এই নরক থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছে তাদের সার্বিক প্রচেষ্টা থাকতে হবে নিজের জন্য কিছু করার আগে যারা পেছনে রয়ে গেছে তাদের কথা চিন্তা করা। তিনি জানান এই বই লেখার পর তাঁর মেয়েটি তাকে ইমেল করে জানায় সে কতটা অবাক হয়েছে যে ওর বাবা ওর বোনদের এতটা অনুভব করে। সেই প্রথম তিনি realize করেন যদিও তিনি ধরেই নিয়েছিলেন তাঁর সন্তানরা তাঁকে বোঝে, কিন্তু একই ঘরে থেকেও তারা কোনদিন তাঁর আবেগ বুঝতে পারেনি কারণ তিনি কখনো এর বঃহিপ্রকাশ ঘটাননি। তাই তিনি বাবামাদের পরামর্শ দেন তাদের অনুভূতিগুলো নিজের মাঝে লুকিয়ে না রেখে সন্তানদের সাথে খোলাখুলিভাবে শেয়ার করতে।
শেষ বক্তা ছিলেন ফাতিমা খামিসা, বক্তব্যের বিষয়, What would Khadijah (R) do today? How to use her as a model in our life today? তাঁর কথায় উঠে আসে খাদিজা (রা) কেবল তাঁর যুগেই নয়, সর্বযুগের সর্বাপেক্ষা স্মার্ট নারী ছিলেন। তাঁর মেধা এবং confidence আজকের যুগের নারীদের জন্যও একটি অনুকরণীয় আদর্শ কেননা তিনি ছিলেন একাধারে তুখোড় ব্যাবসায়ী, বুদ্ধিমতি এবং সাহসী নারী, উত্তম স্ত্রী, শ্বশুরকুলের প্রতি দায়িত্বশীলা বধু, আদর্শ মা, বিপদে ধৈর্য্যধারণকারী এবং উত্তম পরামর্শদানকারী বন্ধু। এমন বহুগুণে গুণান্বিতা দূরে থাক, এমন সাহসী মহিলা আজকের যুগেও পাওয়া যায়না যখন মেয়েরা দাবী করছে তারা পুরুষের সমকক্ষতা অর্জন করেছে। সুতরাং, আজকের কোন নারী নয় বরং খাদিজা (রা) ই হোক মুসলিম নারীদের আদর্শ।
এই অধিবেশনের সমাপ্তিতে এক ঘন্টার জন্য বাসায় এলাম আমরা, নামায পড়লাম এবং খাওয়াদাওয়া করে আবার রওয়ানা দিলাম।
বিকালে মহিলাদের জন্য আলাদা একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় কোস্ট প্লাজায়। দু’টি বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করেন কেনিয়ার একটি অঞ্চলের crown prince এর স্ত্রী ফওজিয়া মুহাম্মাদ। বিষয় দু’টি ছিল, Did Allah Almighty make a mistake in placing you where you are? এবং Even we can do it, empowering our sisters towards a successful community and civic engagement. তাঁর উপস্থাপনার স্টাইলটি ছিল মূলত interactive. তিনি বিভিন্ন বিষয়গুলো আমাদের সাথে আলোচনা আকারে উপস্থাপন করেন, কখনো তাঁর সাথে এবং কখনো নিজেদের মধ্যে। আলোচনায় যে ব্যাপারগুলো উঠে আসে তা হোল মুসলিম মহিলারা ইসলামকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে মুসলিম পুরুষদের মত সক্রিয় নয়। আমাদের ক্ষেত্রগুলো আলাদা হতে পারে কিন্তু নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ খুঁজে নেয়াটা আমাদের দায়িত্ব। যেমন তিনি উদাহরণ দেন, ক্যানাডায় প্রথম এসে তিনি যে অফিসে কাজ নেন সেখানে এক লোক তাঁকে দেখে অত্যন্ত কৌতুহলী হয়ে ওঠে। সে নানান সময় জিজ্ঞেস করত, ‘তুমি ছেলেদের সাথে হ্যান্ডশেক করনা কেন?’, ‘তোমার কি মাথায় চুল নেই? তাহলে তুমি মাথা ঢেকে রাখ কেন?’, ‘তুমি প্রতিদিন দুপুরে বাথরুমে গেলে হাত মুখ ভিজিয়ে কি কর?’, ‘তুমি এই মাসে খাবার পানি কিছু খাওনা কেন?’ ইত্যদি ইত্যাদি। তিনি বিরক্ত না হয়ে তাকে উত্তর দিতেন, বুঝিয়ে দিতেন। পরে সেই লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। আবার পরবর্তীতে তিনি অফিসের কাজ ছেড়ে একটি নতুন কাজ শুরু করেন। তিনি এখন ডঃ আবু আমিনা বিলাল ফিলিপসসহ পঁচিশজন বক্তার mail এর জবাব দেয়া থেকে তাদের শিডিউল ঠিক করা, তাদের travel arrangements তৈরী করা, তাদের হোটেল বুকিং করা ইত্যাদি যাবতীয় কাজ ঘরে বসেই করে থাকেন। তিনি বলেন এভাবে মহিলারা নানান দিকে ইসলামের কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারে। এই আলোচনা অনুষ্ঠানেরই এক পর্যায়ে আমার পরিচয় ঘটে ক্যানাডিয়ান নও মুসলিমা অ্যাশলীর সাথে যে ছোটবেলা থেকে খুঁজতে খুঁজতে বছর তিনেক আগে ইসলামের সন্ধান পায়। আর আমরা automatically পেয়েছি বলে হয়ত আমাদের কাছে এর কোন কদর নেই।
তাঁর বক্তব্যের পর ফাতিমা খামিসা, বুনা মুহাম্মাদ এবং মুসলেহ খান শ্রোতাদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। শনিবারের অধিবেশন এর মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়।
পরদিন ঘুমাচ্ছিলাম বেঘোরে। জানালা দিয়ে প্রবল আলো ঘরে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে দেখে বিরক্ত হয়ে ঘড়ির দিকে উঁকি দিলাম আর ঘুমটা গেল নষ্ট হয়ে। বাজে সাড়ে ন’টা। রবিবার আমার বান্ধবীরা সবাই সপরিবারে পিকনিকে গেল। পিকনিকের উদ্যোক্তা ছিলেন হাফিজ সাহেব। কিন্তু রবিবার কনফারেন্সের কথা শুনে উনি বললেন, ‘জীবনে অনেক পিকনিকে যাওয়া যাবে, তুমি কনফারেন্সে যাও, বাচ্চাদের আমি দেখব’। তারপর যদি ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করি! নিজে উঠে জয়াকে ফোন করে ঘুম থেকে জাগালাম। বেচারী টিকেট করেও গত দু’দিনের একদিনও যেতে পারেনি, ভয় পাচ্ছিল রাস্তা চিনবে কিনা। পথের ডাইরেকশন দিয়ে রেডি হয়ে বাসার সামনের স্টেশনে ট্রেনে উঠলাম। পরের স্টেশনে নেমে হাঁটা দিলাম কোস্ট প্লাজার উদ্দেশ্যে। আমার সামনেই হাঁটছিলো এক capri পরিহিতা নারী, বোঝাই যাচ্ছিল সে ছোট প্যান্ট পরা উপলক্ষ্যে সদ্য পায়ের লোম উৎপাটন করেছে, বেচারীর পাগুলো দেখাচ্ছিল ঠিক ছিলা মুরগীর চামড়ার মত। খুব দুঃখ পেলাম যে কতগুলো পরপুরুষ আমাদের dictate করছে আমাদের কি পরা উচিত, কিভাবে সাজগোজ করা উচিত, কোথায় লোম তোলা উচিত আর আমরা ঠিক সেই মত চলার জন্য জীবনপাত করে ফেলছি অথচ পুরুষগুলো ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি মাখেনা, রঙ মেখে সং সাজেনা, সাইজের তোয়াক্কা করেনা কিংবা ভুরুও তোলেনা!
যাই হোক, যদিও ঠিক করে রেখেছিলাম কোথায় বসব, শুধু কোস্ট প্লাজাতেই তখন একসাথে ছয়টা অনুষ্ঠান চলছে। তার একটা আরবী আর একটা উর্দু। এগুলো যদি বাদ দেই তবু বাকি চারটাতে হুলস্থুল কম্পিটিশন চলছে মনের ভেতর। শেষমেশ চোখমুখ বন্ধ করে বসে পড়লাম ডঃ আবু আমিনা বিলাল ফিলিপসের আসরে। তাঁর প্রথম বিষয় ছিল Dialogue with an Atheist. Does God exist and Who is God? আমার পরিবার এবং বন্ধুবান্ধবের মাঝে এদের সংখ্যা অনেক, তাই এই বিষয়ে আগ্রহ ছিল। দেখলাম আমি যা জানি তাই তিনি বললেন তাঁর বক্তব্যে। তবে তাঁর একটি কথায় আশ্বস্ত হলাম যে ওদের সংশোধন করা আমার এমনকি তাঁরও সাধ্যাতীত। তিনি বললেন এদের কোন যুক্ত তর্ক দিয়ে বোঝানো সম্ভব না কারণ আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে এদের বিন্দুমাত্র সন্দেহ বা সংশয় নেই, কিন্তু জীবনের কোন এক পর্যায়ে হয়ত তারা কিছু চেয়ে পায়নি, ব্যাস হয়ে গেল নাস্তিক। অথবা বিশ্বাস করতে তাদের আপত্তি নেই কিন্তু বিশ্বাস প্রমাণ করার জন্য যে কাজগুলো করতে বলা হয়েছে তা করতে তাদের অনীহা, তো বনে গেল নাস্তিক। যে বোঝেনা তাকে বোঝানো যায়, কিন্তু যে না বুঝতে বদ্ধপরিকর তাকে আপনি বোঝাবেন কোন যুক্তি দিয়ে? আধঘন্টার মত প্রশ্নোত্তর পর্বের পর তিনি মুসলেহ খানকে মঞ্চ ছেড়ে দিলেন। ততক্ষণে জয়া এসে পৌঁছেছে।
Multiculturalism vs Polyculturalism এর ওপর বক্তব্যটি আসলে দেয়ার কথা ছিল ডঃ মুনীর আল কাসিমের। কিন্তু তাঁকে সেদিন ভোরেই emergency টরোন্টো ফিরে যেতে হয় আর তিনি দায়িত্ব দিয়ে যান তাঁর ছাত্র মুসলেহ খানকে। মোনালিসা আপার কাছে তাঁর প্রশংসা শুনেছিলাম এবং গতদিন তাঁর প্রশ্নোত্তর পর্বেও উপস্থিত ছিলাম। তাঁর বক্তৃতার মূল বৈশিষ্ট্য যা অনেকের ভাল লাগে তা হোল তিনি খুব অল্প কথায় to the point আলোচনা করেন। মুসলেহ খান মূলত সমস্যাগ্রস্ত মুসলিমা বোনদের সমস্যা নিরসন করে থাকেন, তাই বলাবাহুল্য সেটাই তাঁর মূল আলোচনার বিষয়। এই দিন তিনি গতদিন ডাক্তার আবদুল্লাহ ইদ্রিস যা আলোচনা করেছিলেন অনেকটা সেই আদলেই আলোচনা করলেন। কিন্তু আমার যে বিষয়টি সবচেয়ে ভাল লাগল তা হোল তাঁর সরল স্বীকারোক্তি যে তাঁর শিক্ষকের বক্তব্যটি তাঁকে উপস্থাপন করতে হবে জেনেই তিনি ভীষণ মুষড়ে পড়েন এবং তাঁর মাথায় কিছুই ঢুকছিলোনা। তখন তাঁর স্ত্রী তাকে সাহস দেন যে তিনি চেষ্টা করলেই পারবেন ইনশাল্লাহ এবং তখন তিনি সাহস ফিরে পান। তিনি বলেন এমন স্ত্রী আল্লাহর পক্ষে থেকে উপহারস্বরূপ। পাশাপাশি তিনি বলেন অনেক সময় মহিলারা রেগে গিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করেন কারণ তাদের মনে হয় তাদের সংসারে যথেষ্ট মূল্যায়ন করা হচ্ছেনা। কিন্তু সে সময় যদি স্বামী রত্নটি চুপ করে থেকে ঝড় সামাল দিতে পারেন তাহলে প্রায়ই দেখা যায় কয়েকমিনিটের ভেতর স্ত্রীর আপনিই মাথা ঠান্ডা হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে এমন ধৈর্য্যশীল স্বামীটিকে তিনি জীবনের জন্য আঁকড়ে ধরার পরামর্শ দেন। আকরাম জুমায় তাঁর আরেকটি বক্তব্য থাকায় তিনি প্রশ্নোত্তর পর্ব বাদ দিয়েই ছুটতে বাধ্য হন। আমরা ছুট দেই নির্ধারিত কক্ষে যুহরের নামায পড়তে।
এবার আবার ডঃ ফিলিপস ফিরে আসেন বিদ’আতের ওপর একটি চমৎকার আলোচনা নিয়ে। এই আলোচনাটি সবার শোনা দরকার কেননা এটি এমন এক বিষয় যা নিয়ে আমাদের সমাজে প্রচুর ভুল ধারণার প্রচলন রয়েছে অথচ প্রতিটি জুমার খুতবায় বলা হয় প্রতিটি বিদ’আতই misguided এবং প্রত্যেক misguidance এর শেষফল জাহান্নাম। আমাদের সৌভাগ্য তাঁর পর আর কোন বক্তা ছিলোনা, কারো এই রুম প্রয়োজন ছিলোনা এবং সন্ধ্যা ছ’টা পর্যন্ত আর কোন অনুষ্ঠান ছিলোনা। তিনি সানন্দে আমাদের প্রশ্নোত্তর পর্বের শেষে আরো দেড়ঘন্টা সময় দেন- প্রশ্নোত্তরের বন্যা বয়ে যায়। এ’সময় তাঁর দু’টি জিনিস আমার খুব ভাল লাগে। একটি হোল তিনি খেয়াল করেন শ্রোতৃমন্ডলী তাঁর কথা বুঝতে পারছে কি’না এবং প্রয়োজনমত একাধিকবার বা অন্যভাবে বিষয়টি পুণরায় ব্যাখ্যা করেন। হলে লোকসংখ্যা বাড়ার এক পর্যায়ে অনেক মহিলাদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় যেহেতু মহিলাদের বসার জন্য কেবল একটি সারি নির্ধারিত ছিল, পুরুষদের দু’টি। তিনি বক্তৃতায় বিরতি দিয়ে ভাইদের অনুরোধ করেন সরে গিয়ে বোনদের জন্য কিছু সারি ছেড়ে দিতে। অনেক বক্তাই দেখা যায় নিজের মহিমায় এত মশগুল থাকেন যে তাঁদের শ্রোতাদের দিকে তাকানোরই সুযোগ হয়না।
প্রতিটি অনুষ্ঠানেই বেশ কিছু ক্যানাডিয়ান উপস্থিত ছিল। এই আসরে একটি পরিবার আসে যারা সম্ভবত ইসলাম কবুল করার পথে এবং খুঁটিনাটি অনেক বিষয় তারা জানতে চায়। পরিশেষে তারা ডঃ ফিলিপসের অনলাইন ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির তথ্য সংগ্রহ করে নেয়। এখানে ডিপ্লোমা এবং অনার্স উভয়প্রকার কোর্স আছে, মদীনা ইউনিভার্সিটি এবং এদের সিলেবাস একই কেবল এখানে পড়ানো হয় ইংরেজি মিডিয়ামে, রেজিস্ট্রেশন ফি ছাড়া কোর্স সম্পূর্ণ ফ্রি এবং পুরোপুরি অনলাইনে করা যায়। চারবছরে তাদের ডিপ্লোমা স্টুডেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে বিশ হাজার এবং অনার্সে ছাত্রসংখ্যা তিন হাজার।
বিকালে বিদায়ী অধিবেশনের জন্য সকালের ছয়টি কক্ষকে পার্টিশন সরিয়ে একত্রিত করে দেয়া হয়। বিদায়ী সেশন হওয়াতে প্রচুর বক্তা বক্তব্য রাখেন কিন্তু মজার বিষয় সবাই নির্ধারিত সময়ের মাঝেই বক্তব্য শেষ করেন যার ফলে মাগরিবের নামাজের আগেই (দশটা বাজে) অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়ে যায়। এই অধিবেশনের বেশ কয়েকটি হাইলাইট ছিল। একটি ছিল উপস্থাপকের একটি মজার কাজ। তিনি সবাইকে অনুরোধ করেন পাশে বসা অপরিচিত ভাই বা বোনটিকে সালাম দিয়ে জড়িয়ে ধরতে। সাদা কালো লাল হলুদ হরেক চামড়ার মাঝে সালাম বিনিময় আর কোলাকুলি যেন ঈদের আমেজ সৃষ্টি করে! তিনি আসলে আমাদের দেখাতে চাইছিলেন কত সহজেই আমরা আমাদের মুসলিম ভাই বা বোনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে পারি এবং এর মাধ্যমে কত আনন্দ পাওয়া যায়।
একটি উল্লেখযোগ্য বক্তব্য ছিল ম্যালকম এক্সের মেয়ে অ্যাম্বাসেডর শাবাজের। টিনেজের প্রথমপ্রান্তে ম্যালকম এক্স (মালিক শাবাজ) এর আত্মজীবনী পড়ে মোহিত হয়েছিলাম। সবাই তাঁকে black activist হিসেবে জানলেও তিনি বলেছেন তিনি তাবৎ নিপীড়িত মানবতার পক্ষে। তাঁর মত মেধাবী এবং উজ্জ্বল ব্যাক্তির কন্যা এমন জ্বাজল্যমান হওয়াটাই বাঞ্ছনীয় ছিল। তিনি মূলত তুলে ধরেন কিভাবে আমরা নিজেদের একটি ছোট গোত্রের অংশ মনে করে নিজেরাই নিজেদের corner করে ফেলি অথচ নিজেকে বৃহত্তর পরিসরে চিন্তা করলে আমাদের self identity বাড়ে বৈ কমেনা। যেমন তিনি বললেন তিনি নিজেকে ব্ল্যাক অ্যামেরিকান ভাবলে একটি ছোট্ট গোষ্ঠীর সদস্য হন, কিন্তু নিজেকে মুসলিম ভাবলে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সদস্যে পরিণত হন। তিনি বলেন আত্মপরিচয় লুকানো মানে নিজেকে ছোট করা, সুতরাং যার নাম পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষটির নামে সে কেন নিজেকে ‘মো’ বলে পরিচয় দেবে? অন্যরা মুহাম্মাদ উচ্চারণ করতে না পারলেও ক্ষতি নেই, সে তাদের শেখাবে কিভাবে তাকে ডাকতে হবে!
এবারের কনফারেন্সে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় ছিল মুসলিমদের প্রতি বর্তমান সরকারের বিমাতাসুলভ মনোভাব। এই বিষয়ে কথা বলেন আইনবিদ রাজ শর্মা। তিনি কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে দেখান কিভাবে ক্যানাডিয়ান সরকার আমেরিকার চাপে পড়ে সময় সময় মুসলিম ক্যানাডিয়ান নাগরিকদের অধিকার লঙ্ঘন করেছে এবং তারা যখনই সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে তখনই বিজয়ী হয়েছে। তিনি পরামর্শ দেন এই ধরনের পরিস্থিতিগুলোতে মুসলিমদের সম্মিলিতভাবে বেশি বেশি মামলা করা উচিত যেন সরকার ভাবতে না পারে যে মুসলিমরা অসহায় এবং তারা মুসলিমদের সাথে ঝামেলা করার আগে চিন্তা করতে বাধ্য হয় তাদের নাগরিক অধিকার নিয়ে।
পরিশেষে আসন্ন রামাদানে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ব্যাপারে ছোট্ট একটি reminder দিয়ে অনুষ্ঠান সমাপ্ত করেন ডঃ আবু আমিনা বিলাল ফিলিপস।
অনুষ্ঠানের শেষে আয়োজকরা তাঁদের স্ত্রীদের অবদান স্বীকার করেন এই কাজগুলিতে তাঁদের পাশে থাকার জন্য এবং অবশেষে যে ১০৫ জন কিশোর কিশোরী সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সমস্ত কাজে ভলান্টিয়ার করেছে তাদের সবার সামনে ডেকে নিয়ে তাদের অবদান স্বীকার করেন- ছেলেদের দেন স্টেজের সামনে আর মেয়েদের ওঠান স্টেজের ওপর যেহেতু এই মেয়েরাই ভবিষ্যতে মা হবে। এই সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রচ্ছন্নভাবে ইসলামে নারীর মর্যাদার বিষয়টি উদাহরণের মাধ্যমে উঠে আসে, কথায় নয়।
অনুষ্ঠান শেষে জয়া আমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে নিজের বাসায় ফিরে যায়। রাতে শুতে গিয়ে মনটা আনন্দ আর কষ্টের মাঝে দুলতে থাকে- আনন্দ কারণ এই অসাধারন অনুষ্ঠানটিতে আল্লাহ আমাকে উপস্থিত থাকার সুযোগ করে দেন আর দুঃখ কারণ স্বপ্নময় তিনটি দিন শেষ হয়ে গেল।
জীবনের সহজ পাঠ
গত শুক্রবার আমাদের মসজিদে খুতবা দিলেন প্রখ্যাত বক্তা এবং ইসলামী চিন্তাবিদ ডঃ আবু আমিনা বিলাল ফিলিপস। তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে প্রথমে প্রশ্ন করলেন, ‘গত এক সপ্তাহে যারা কোন না কোন সময় শুকরিয়া করে সিজদা করেছেন- একটিমাত্র সিজদা, কোন ওজুর প্রয়োজন নেই, কোন নির্দিষ্ট সময় বা দিকের প্রয়োজন নেই, শুধুই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে- তাঁরা হাত তুলুন’। সাতশতাধিক পুরুষের মাঝে গোনাগুনতি দশটি হাত উঠল। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম ওপরতলায় শ তিনেক মহিলার মাঝেও হয়ত এমন দশজন ছিলেন যারা দৃষ্টির আড়ালে থাকায় এই সংখ্যার অন্তর্ভুক্ত হননি। তা হলেও একহাজারের মাঝে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় বিশজন। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে , ‘এই এক সপ্তাহে কি বাকী নয়শ আশি জনের জীবনে এমন কোন ঘটনাই ঘটেনি যার জন্য তাঁরা আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারেন?’ উত্তরটা স্পষ্ট। আমরা সারাক্ষণ হিসেব করি আমার কি পাওয়ার কথা, আমার কি পাওয়া উচিত ছিল, আমি কি পাইনি, আরেকজন কি পেল, কেন পেল, আমি কেন পেলাম না ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আমি কি পেলাম, কিভাবে পেলাম, কেন পেলাম, কি যোগ্যতার বলে পেলাম এই হিসেবগুলো আমাদের করা হয়না। আমাদের ভাবার সময় নেই এই সুস্থ শরীর মন পাবার কি যোগ্যতা আমার ছিল বা আছে যেখানে পৃথিবীব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিবন্ধী, দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত বা হয়ত সাধারন রোগব্যাধিতেই কষ্ট পাচ্ছে। আমরা খাবার টেবিলে বসে ভেবে দেখিনা এই মূহূর্তে কতজন মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে অথবা ক’জন ডাস্টবিনে খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে অথচ আমি পাঁচরকম তরকারী দিয়ে খেয়েও ভাবছি পাশের বাসায় পনেরো রকম তরকারীর কথা। আমরা বুক ভরে নিশ্বাস নেয়ার সময় স্মরন করিনা এই বাতাসটুকু যে এমন অনায়াসে আমার ফুসফুসের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে তার জন্য সৃষ্টিকর্তাকে চুপটি করে একটা ধন্যবাদ দিয়ে দেয়া যায়। সহজ কথায় আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার মত কোন ঘটনা খুঁজে পাইনা কারণ আমরা অকৃতজ্ঞ।

পরিচিত জনেরা প্রায়ই নালিশ করেন জীবনের প্রতি আমার দৃষ্টিকোণ অতিমাত্রায় সরল যেটা হয়ত সহজ জীবনের বাইপ্রোডাক্ট। তাদের বলব, কষ্টগুলোকে হাইলাইট না করা আর কষ্টের অনুপস্থিতি এক জিনিস নয়। কষ্টগুলোকে যত হাইলাইট করা হয় ততই তা বদ্ধ জলাশয়ে ব্যাঙাচির মত অসংখ্য দুঃখের জন্ম দিতে থাকে, সমস্যাগুলোতে যত রঙ চড়ানো হয় ততই তা কচুরীপানার মত চারিদিক থেকে ছেঁকে ধরতে থাকে, জীবনকে যতই কমপ্লিকেটেড করে দেখা হয় ততই তা দুর্বিসহ বোধ হতে থাকে। আর একে সহজ করে নিলে রহস্যোপন্যাসের শেষাংশের মত সকল জট একসময় খুলেই যায়, সব হিসেব আপনিই মিলে যায় যদিও তা সহজবোধ্য বা আদৌ বোধ্য হবে এমন গ্যারান্টি কেউ দিতে বাধ্য নন। উভয়ক্ষেত্রেই জীবনকে বুঝতে চাওয়া বা জোরপূর্বক এর হিসেব মিলাতে যাওয়া এক নিষ্ফল প্রচেষ্টা। উপরন্তু জীবন ক্যালকুলেটরে হিসেব কষার বস্তু নয়, কাজে লাগাবার এবং উপভোগ করার জিনিস। তাহলে শুধু শুধু এত চিন্তা, এত আলোচনা পর্যালোচনা, এত হাহাকার, এত প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসেব মিলিয়ে কি হবে? তার চেয়ে যদি আজকের এই মূহূর্তটিকেই সকল চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু, সকল সফলতার উৎসমুখ ধরে নিয়ে কাজে নেমে পড়া যায় তাহলে কিছু ফলাফল আশা করা যেতে পারে। যা চাইলাম তাই পাওয়াই কিন্তু শুধু সফলতা নয় বরং অনেকক্ষেত্রে প্রচেষ্টাটাই সফলতার ইন্ডিকেটর, ফলাফল শুধু এর ক্ষুদ্রতম অংশমাত্র। এইটুকু বুঝে নিলেই জীবনের হিসেবটা অনেক সহজ হয়ে যায়। আর প্রচেষ্টার গতিধারা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে শেষতক সাফল্য পাওয়াটা নিশ্চিত করা যায়।
গতকাল ছিল এই বছরের সবচেয়ে অসহ্য উষ্ণ তপ্ত আবহাওয়ার দিন, তদুপরি ছিল দাওয়াত। দাওয়াতে যাওয়া আমার জন্য সবচেয়ে কষ্টদায়ক সামাজিক দায়িত্বগুলোর একটি, তবু নিষ্কৃতি নেই। ঠান্ডা পানি দিয়ে মাথা চুপচুপ করে ভিজিয়ে গরম আর সারাদিন ছাত্রছাত্রী পড়ানোর ফলে উদ্ভুত মাথাব্যাথাটাকে মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে এনে শুধু উপস্থিতি জানান দিয়ে চলে আসার উদ্দেশ্যে ও’বাসায় গেলাম। কিন্তু যাবার পর উৎসুক শ্রোতাগোষ্ঠীর প্রশ্নাবলি আটকে রাখল সন্ধ্যা পর্যন্ত। তন্মধ্যে এক ভাবী খুব দুঃখ করে বললেন তাঁর এক আত্মীয়া মারা যাবার কিছুদিনের ভেতর তাঁর স্বামী পুণর্বিবাহ করেন, এতে করে ভাবীর মনে প্রশ্নের উদয় হয়, ‘পুরুষের মনে ভালবাসা বলতে আদৌ কিছু কি আছে?’ ভাবীর ছেলেমানুষি প্রশ্নে হাসি পেয়ে গেল। তাঁকে বললাম, ‘যে দু’জন মানুষের মাঝে সম্পর্ক সম্পূর্ণ স্বার্থনির্ভর- যে স্বার্থের পরিমাপ হয় সম্পদের পরিমাণে, দেয়ার ক্ষমতার পরিমাপে, চুলের দৈর্ঘ্যে, চামড়ার রঙে কিংবা কাজ করার যোগ্যতায়- তাকে কি ভালবাসা বলা যায়? বিশুদ্ধ ভালবাসা তো শুধু সেক্ষেত্রেই হতে পারে যেখানে একজন শুধু দেবে, আরেকজন শুধু পাবে, এমন সম্পর্ক শুধুমাত্র সৃষ্টিকর্তার সাথেই সম্ভব। এর একটা প্রতিফলন দু’জন মানুষের মাঝে সৃষ্টি হতে পারে যদি দু’জনের বন্ধুত্ব সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে, যদি দু’জন ব্যাক্তি পরস্পরকে ভালবাসে কেবল তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই। সেক্ষেত্রে সম্পর্কটা কেবল পার্থিব চাওয়া পাওয়ার বলয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনা, তাই একে অপরের অনেক ত্রুটি সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ওভারলুক করে যেতে পারে, একজনের পার্থিব জীবন সময়ের সীমাবদ্ধতার কাছে হার মানলেও সে চায় অপরজন স্রষ্টাপ্রদত্ত সীমাবদ্ধতাগুলো মেনে চলে বাকী জীবন অতিবাহিত করুক অতঃপর অনন্ত জীবনে আবার উভয়ে নতুন সংসার পাতবে, তাই সে মারা গেলে তার স্বামী বা স্ত্রী বিয়ে করে স্বাভাবিক জীবনযাপন করবে এটা তার কাছে অস্বাভাবিক বা এমনকি কষ্ট পাবার মত কোন ব্যাপার মনে হয়না’। এভাবেই আমাদের যেকোন অ্যাকশন রি-অ্যাকশন যদি সৃষ্টিকর্তাপ্রদত্ত মূলনীতি দ্বারা বিচার করে জীবনকে পরিচালিত করা যায় তাহলে জীবনকে আমরা সহজ এবং আনকমপ্লিকেটেডরূপে দেখতে পারি।
তখন প্রশ্ন আসে- পৃথিবীতে এত কলুষতা, এত পঙ্কিলতা, এত আবিলতা, এত অরাজকতা- এর মাঝে কি করে ভাল থাকি? সেক্ষেত্রে পাল্টা প্রশ্ন করা যায়, এর জন্য দায়ী কে, এর সমাধান কোথায়? যেকোন পরিবর্তনেরই তো শুরু করতে হয় নিজেকে দিয়ে! আমি কি নিজেকে কলুষমুক্ত, পঙ্কমুক্ত, অনাবিল এবং সুশৃঙ্খল করার প্রয়াস নিয়েছি কিনা তার জবাব না দিয়ে কোন অধিকারে অন্যের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করি? আমি যদি কেবল আমাকে সুন্দর করতে পারি তাতে পৃথিবী থেকে একটি অসুন্দর তো কমে যায়! আমি যতই নিজেকে একক মনে করিনা কেন, আমার চারপাশে কতজন আমাকে অনুসরন করে তা জানতে পেলে আমরা হয়ত ভয়ে হার্টফেল করতাম। সুতরাং, শুদ্ধি অভিযানের শুরুটা হতে হবে আমাকে দিয়ে, বাকীটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঘটবে। কিন্তু আমাদের সমস্যা হোল আমরা নিজে করার চেয়ে অন্যকে করার নির্দেশ দিতে ভালবাসি। তাই নিজের তো পরিবর্তন হয়ইনা, অপরের পরিবর্তনের সূচনার প্রশ্নও উদয় হয়না কারণ আমার দ্বিমুখিতা তাকে বীতশ্রদ্ধ করে ফেলেছে- তাহলে পরিবর্তনের সম্ভাবনাটুকুই বা সৃষ্টি হবে কোথা থেকে? আমরা পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন না করেই পাওয়ার আশা করি, চুপ করে থেকে পরিবর্তনের আশা করি, নিজেকে ভুলের উর্দ্ধে মনে করে অন্যের দোষ খোঁজার চেষ্টা করি। ফলে তাই হয় যা হবার কথা। স্থবিরতা, হতাশা, নিরাশা, দুরাশা নামক নেগেটিভ শব্দগুলো আমাদের ভাইরাসের মত ছেঁকে ধরে। এর থেকে পরিত্রাণের সবচেয়ে সহজ উপায় হোল আমার পক্ষে যতটুকু করা সম্ভব তা সততার সাথে করে যাওয়া এবং বাকীটুকুর ব্যাপারে সৃষ্টিকর্তার ওপর আস্থা রাখা।

ছোটোবেলায় আমি ছিলাম এক ঘরকুণো বইপোকা, পৃথিবীর সাথে আমার কোনপ্রকার সম্পর্ক ছিলোনা। আবুধাবীতে ক্লাস সেভেনে ভর্তি পরীক্ষা দিতে গেলে এক ব্রিটিশ শিক্ষকের সাথে পরিচয় হয়। তিনি আমাকে হ্যান্স ক্রিশ্চান অ্যান্ডারসনের ‘দ্য আগলি ডাকলিং’ গল্পটি রিডিং পড়তে দেন এবং এর থেকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেন। এই শিশুতোষ গল্পটি তিনি যেভাবে বুঝিয়ে বলেন তাতে ঐ কয় মিনিটেই আমার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। আমরা সারাজীবন অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকি- অন্যের প্রতিভা, সাহস, সৌন্দর্য্য সবকিছু আমাদের নিজের যোগ্যতার ব্যাপারে উত্তরোত্তর সন্দিহান করে তোলে। কিন্তু আমরা নিজেদের ভেতরে সুপ্ত গুনাবলী শানিয়ে তুললে খুব সহজেই কদাকার হংসশাবক থেকে নিজেকে রাজহাঁসে রূপান্তরিত করতে পারি। পরবর্তীতে জানতে পারি স্যার যখন নিজ দেশে থাকতেন তখন তাঁর প্রতিবেশি ছিল এক বিদেশি পরিবার। তাঁরা প্রতিদিন দেখা হলে তাঁকে কি যেন বলত, তিনি বুঝতেন না তাই পাত্তাও দিতেন না। একদিন তাঁর দিনটি খুব খারাপ যাচ্ছিল, অথচ যার সাথেই দেখে হচ্ছে সে বলছে, ‘গুড মর্নিং’। মেজাজ তিরিক্ষি হতে হতে যখন প্রতিবেশির সাথে দেখে হোল আর তাঁরা সেই একই দুর্বোধ্য সম্ভাষনে তাঁকে অভিবাদন জানাল, তিনি রাগে ফেটে পড়লেন, ‘কি বলছেন ইংরেজিতে বলেন, কিছুই বুঝিনা আপনারা কি বলতে চাইছেন!’ প্রতিবেশি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, ‘আমি বলেছি আসসালামু আলাইকুম, এর অর্থ আল্লাহ আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত করুন’। এবার স্যারের থতমত খাবার পালা, উনি বললেন, 'আহ! শান্তি, একটু শান্তি। হ্যাঁ, এটাই তো আমার চাই! যে জাতির অভিবাদন এত সুন্দর, তার রীতিনিতি না জানি কত সুন্দর!’ তখন তিনি ঐ প্রতিবেশির সাথে কথাবার্তা বলে জানতে পারেন এটি কোন নির্দিষ্ট দেশের বা জাতির নয় বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সম্ভাষন। পরবর্তীতে তিনি লেখাপড়া করে, জেনে, বুঝে ইসলাম গ্রহন করেন। তিনি ছিলেন আমাদের সকল শিক্ষকের আদর্শ। কেন তা বুঝতে পারি যেদিন আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষক আমাদের তাঁর ঘর পরিদর্শন করতে নিয়ে যান। স্কুলের মাঠের অন্যপাশে ছিল তাঁর আর ভি যেখানে তিনি বসবাস করতেন। একজন ব্যাচেলরের বাসার পরিচ্ছন্নতা দেখে অবাক হলেও আমরা আরো বেশি অবাক হলাম যে তাঁর কোন খাট নেই, টেবিলও নেই। তিনি রাসূল (সা)এর জীবনী পড়ে নিজের জীবনকে ঠিক সেভাবেই সাজানোর সিদ্ধান্ত নেন। নরম বিছানায় শুয়েও যার ঘুম আসতনা তিনি এখন মাটিতে বিছানা পেতে মহা আরামে ঘুমাতেন, সারাজীবন দু’হাতে কাঁটাচামচ দিয়ে খেয়ে অভ্যস্ত এই ব্যাক্তি ডান হাতের তিন আঙ্গুল ব্যাবহার করে খেতেন, স্কুলে শার্টপ্যন্ট পরলেও স্কুলের বাইরে সবসময় আলখাল্লা পরতেন, প্রতিদিন কুর’আন এবং হাদিস পড়তেন এবং এই জ্ঞান ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর ফাঁকে আর বন্ধুদের আড্ডায় বিতরণ করতেন। তাঁর পরিবার তাঁকে পরিত্যাগ করে কিন্তু মানুষ তাঁকে বরণ করে নেয়। সবচেয়ে বড় কথা সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য তাঁকে সকল দুঃখ অনুযোগ ভুলিয়ে দেয়। এভাবেই মানুষ নিজেকে পরিবর্তন করার মাধ্যমে অপরকে পরিবর্তিত হতে অনুপ্রাণিত করতে পারে!

সুতরাং, আমার যে বন্ধুরা জীবনকে কঠিন অকাট্য বাঁধার শেকলে দেখতে অভ্যস্ত তাদের আহ্বান জানাই, পৃথিবীটাকে একবার আমার এবং আমাদের মত সাধারন মানুষগুলোর দৃষ্টি দিয়ে দেখুন, পরিবর্তনটা নিজেকে দিয়েই শুরু করুন, হয়ত হাঁটি হাঁটি পা পা করে আমরা পৌঁছে যাব আমাদের আকাঙ্খার স্বর্নশিখরে- সত্ত্বর না পৌঁছলেও ক্ষতি নেই, পথটা ভালই লাগবে, ভ্রমণটাও কঠিন মনে হবেনা।
পরিচিত জনেরা প্রায়ই নালিশ করেন জীবনের প্রতি আমার দৃষ্টিকোণ অতিমাত্রায় সরল যেটা হয়ত সহজ জীবনের বাইপ্রোডাক্ট। তাদের বলব, কষ্টগুলোকে হাইলাইট না করা আর কষ্টের অনুপস্থিতি এক জিনিস নয়। কষ্টগুলোকে যত হাইলাইট করা হয় ততই তা বদ্ধ জলাশয়ে ব্যাঙাচির মত অসংখ্য দুঃখের জন্ম দিতে থাকে, সমস্যাগুলোতে যত রঙ চড়ানো হয় ততই তা কচুরীপানার মত চারিদিক থেকে ছেঁকে ধরতে থাকে, জীবনকে যতই কমপ্লিকেটেড করে দেখা হয় ততই তা দুর্বিসহ বোধ হতে থাকে। আর একে সহজ করে নিলে রহস্যোপন্যাসের শেষাংশের মত সকল জট একসময় খুলেই যায়, সব হিসেব আপনিই মিলে যায় যদিও তা সহজবোধ্য বা আদৌ বোধ্য হবে এমন গ্যারান্টি কেউ দিতে বাধ্য নন। উভয়ক্ষেত্রেই জীবনকে বুঝতে চাওয়া বা জোরপূর্বক এর হিসেব মিলাতে যাওয়া এক নিষ্ফল প্রচেষ্টা। উপরন্তু জীবন ক্যালকুলেটরে হিসেব কষার বস্তু নয়, কাজে লাগাবার এবং উপভোগ করার জিনিস। তাহলে শুধু শুধু এত চিন্তা, এত আলোচনা পর্যালোচনা, এত হাহাকার, এত প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসেব মিলিয়ে কি হবে? তার চেয়ে যদি আজকের এই মূহূর্তটিকেই সকল চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু, সকল সফলতার উৎসমুখ ধরে নিয়ে কাজে নেমে পড়া যায় তাহলে কিছু ফলাফল আশা করা যেতে পারে। যা চাইলাম তাই পাওয়াই কিন্তু শুধু সফলতা নয় বরং অনেকক্ষেত্রে প্রচেষ্টাটাই সফলতার ইন্ডিকেটর, ফলাফল শুধু এর ক্ষুদ্রতম অংশমাত্র। এইটুকু বুঝে নিলেই জীবনের হিসেবটা অনেক সহজ হয়ে যায়। আর প্রচেষ্টার গতিধারা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে শেষতক সাফল্য পাওয়াটা নিশ্চিত করা যায়।
গতকাল ছিল এই বছরের সবচেয়ে অসহ্য উষ্ণ তপ্ত আবহাওয়ার দিন, তদুপরি ছিল দাওয়াত। দাওয়াতে যাওয়া আমার জন্য সবচেয়ে কষ্টদায়ক সামাজিক দায়িত্বগুলোর একটি, তবু নিষ্কৃতি নেই। ঠান্ডা পানি দিয়ে মাথা চুপচুপ করে ভিজিয়ে গরম আর সারাদিন ছাত্রছাত্রী পড়ানোর ফলে উদ্ভুত মাথাব্যাথাটাকে মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে এনে শুধু উপস্থিতি জানান দিয়ে চলে আসার উদ্দেশ্যে ও’বাসায় গেলাম। কিন্তু যাবার পর উৎসুক শ্রোতাগোষ্ঠীর প্রশ্নাবলি আটকে রাখল সন্ধ্যা পর্যন্ত। তন্মধ্যে এক ভাবী খুব দুঃখ করে বললেন তাঁর এক আত্মীয়া মারা যাবার কিছুদিনের ভেতর তাঁর স্বামী পুণর্বিবাহ করেন, এতে করে ভাবীর মনে প্রশ্নের উদয় হয়, ‘পুরুষের মনে ভালবাসা বলতে আদৌ কিছু কি আছে?’ ভাবীর ছেলেমানুষি প্রশ্নে হাসি পেয়ে গেল। তাঁকে বললাম, ‘যে দু’জন মানুষের মাঝে সম্পর্ক সম্পূর্ণ স্বার্থনির্ভর- যে স্বার্থের পরিমাপ হয় সম্পদের পরিমাণে, দেয়ার ক্ষমতার পরিমাপে, চুলের দৈর্ঘ্যে, চামড়ার রঙে কিংবা কাজ করার যোগ্যতায়- তাকে কি ভালবাসা বলা যায়? বিশুদ্ধ ভালবাসা তো শুধু সেক্ষেত্রেই হতে পারে যেখানে একজন শুধু দেবে, আরেকজন শুধু পাবে, এমন সম্পর্ক শুধুমাত্র সৃষ্টিকর্তার সাথেই সম্ভব। এর একটা প্রতিফলন দু’জন মানুষের মাঝে সৃষ্টি হতে পারে যদি দু’জনের বন্ধুত্ব সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে, যদি দু’জন ব্যাক্তি পরস্পরকে ভালবাসে কেবল তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই। সেক্ষেত্রে সম্পর্কটা কেবল পার্থিব চাওয়া পাওয়ার বলয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনা, তাই একে অপরের অনেক ত্রুটি সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ওভারলুক করে যেতে পারে, একজনের পার্থিব জীবন সময়ের সীমাবদ্ধতার কাছে হার মানলেও সে চায় অপরজন স্রষ্টাপ্রদত্ত সীমাবদ্ধতাগুলো মেনে চলে বাকী জীবন অতিবাহিত করুক অতঃপর অনন্ত জীবনে আবার উভয়ে নতুন সংসার পাতবে, তাই সে মারা গেলে তার স্বামী বা স্ত্রী বিয়ে করে স্বাভাবিক জীবনযাপন করবে এটা তার কাছে অস্বাভাবিক বা এমনকি কষ্ট পাবার মত কোন ব্যাপার মনে হয়না’। এভাবেই আমাদের যেকোন অ্যাকশন রি-অ্যাকশন যদি সৃষ্টিকর্তাপ্রদত্ত মূলনীতি দ্বারা বিচার করে জীবনকে পরিচালিত করা যায় তাহলে জীবনকে আমরা সহজ এবং আনকমপ্লিকেটেডরূপে দেখতে পারি।
তখন প্রশ্ন আসে- পৃথিবীতে এত কলুষতা, এত পঙ্কিলতা, এত আবিলতা, এত অরাজকতা- এর মাঝে কি করে ভাল থাকি? সেক্ষেত্রে পাল্টা প্রশ্ন করা যায়, এর জন্য দায়ী কে, এর সমাধান কোথায়? যেকোন পরিবর্তনেরই তো শুরু করতে হয় নিজেকে দিয়ে! আমি কি নিজেকে কলুষমুক্ত, পঙ্কমুক্ত, অনাবিল এবং সুশৃঙ্খল করার প্রয়াস নিয়েছি কিনা তার জবাব না দিয়ে কোন অধিকারে অন্যের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করি? আমি যদি কেবল আমাকে সুন্দর করতে পারি তাতে পৃথিবী থেকে একটি অসুন্দর তো কমে যায়! আমি যতই নিজেকে একক মনে করিনা কেন, আমার চারপাশে কতজন আমাকে অনুসরন করে তা জানতে পেলে আমরা হয়ত ভয়ে হার্টফেল করতাম। সুতরাং, শুদ্ধি অভিযানের শুরুটা হতে হবে আমাকে দিয়ে, বাকীটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঘটবে। কিন্তু আমাদের সমস্যা হোল আমরা নিজে করার চেয়ে অন্যকে করার নির্দেশ দিতে ভালবাসি। তাই নিজের তো পরিবর্তন হয়ইনা, অপরের পরিবর্তনের সূচনার প্রশ্নও উদয় হয়না কারণ আমার দ্বিমুখিতা তাকে বীতশ্রদ্ধ করে ফেলেছে- তাহলে পরিবর্তনের সম্ভাবনাটুকুই বা সৃষ্টি হবে কোথা থেকে? আমরা পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন না করেই পাওয়ার আশা করি, চুপ করে থেকে পরিবর্তনের আশা করি, নিজেকে ভুলের উর্দ্ধে মনে করে অন্যের দোষ খোঁজার চেষ্টা করি। ফলে তাই হয় যা হবার কথা। স্থবিরতা, হতাশা, নিরাশা, দুরাশা নামক নেগেটিভ শব্দগুলো আমাদের ভাইরাসের মত ছেঁকে ধরে। এর থেকে পরিত্রাণের সবচেয়ে সহজ উপায় হোল আমার পক্ষে যতটুকু করা সম্ভব তা সততার সাথে করে যাওয়া এবং বাকীটুকুর ব্যাপারে সৃষ্টিকর্তার ওপর আস্থা রাখা।
ছোটোবেলায় আমি ছিলাম এক ঘরকুণো বইপোকা, পৃথিবীর সাথে আমার কোনপ্রকার সম্পর্ক ছিলোনা। আবুধাবীতে ক্লাস সেভেনে ভর্তি পরীক্ষা দিতে গেলে এক ব্রিটিশ শিক্ষকের সাথে পরিচয় হয়। তিনি আমাকে হ্যান্স ক্রিশ্চান অ্যান্ডারসনের ‘দ্য আগলি ডাকলিং’ গল্পটি রিডিং পড়তে দেন এবং এর থেকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেন। এই শিশুতোষ গল্পটি তিনি যেভাবে বুঝিয়ে বলেন তাতে ঐ কয় মিনিটেই আমার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। আমরা সারাজীবন অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকি- অন্যের প্রতিভা, সাহস, সৌন্দর্য্য সবকিছু আমাদের নিজের যোগ্যতার ব্যাপারে উত্তরোত্তর সন্দিহান করে তোলে। কিন্তু আমরা নিজেদের ভেতরে সুপ্ত গুনাবলী শানিয়ে তুললে খুব সহজেই কদাকার হংসশাবক থেকে নিজেকে রাজহাঁসে রূপান্তরিত করতে পারি। পরবর্তীতে জানতে পারি স্যার যখন নিজ দেশে থাকতেন তখন তাঁর প্রতিবেশি ছিল এক বিদেশি পরিবার। তাঁরা প্রতিদিন দেখা হলে তাঁকে কি যেন বলত, তিনি বুঝতেন না তাই পাত্তাও দিতেন না। একদিন তাঁর দিনটি খুব খারাপ যাচ্ছিল, অথচ যার সাথেই দেখে হচ্ছে সে বলছে, ‘গুড মর্নিং’। মেজাজ তিরিক্ষি হতে হতে যখন প্রতিবেশির সাথে দেখে হোল আর তাঁরা সেই একই দুর্বোধ্য সম্ভাষনে তাঁকে অভিবাদন জানাল, তিনি রাগে ফেটে পড়লেন, ‘কি বলছেন ইংরেজিতে বলেন, কিছুই বুঝিনা আপনারা কি বলতে চাইছেন!’ প্রতিবেশি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, ‘আমি বলেছি আসসালামু আলাইকুম, এর অর্থ আল্লাহ আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত করুন’। এবার স্যারের থতমত খাবার পালা, উনি বললেন, 'আহ! শান্তি, একটু শান্তি। হ্যাঁ, এটাই তো আমার চাই! যে জাতির অভিবাদন এত সুন্দর, তার রীতিনিতি না জানি কত সুন্দর!’ তখন তিনি ঐ প্রতিবেশির সাথে কথাবার্তা বলে জানতে পারেন এটি কোন নির্দিষ্ট দেশের বা জাতির নয় বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সম্ভাষন। পরবর্তীতে তিনি লেখাপড়া করে, জেনে, বুঝে ইসলাম গ্রহন করেন। তিনি ছিলেন আমাদের সকল শিক্ষকের আদর্শ। কেন তা বুঝতে পারি যেদিন আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষক আমাদের তাঁর ঘর পরিদর্শন করতে নিয়ে যান। স্কুলের মাঠের অন্যপাশে ছিল তাঁর আর ভি যেখানে তিনি বসবাস করতেন। একজন ব্যাচেলরের বাসার পরিচ্ছন্নতা দেখে অবাক হলেও আমরা আরো বেশি অবাক হলাম যে তাঁর কোন খাট নেই, টেবিলও নেই। তিনি রাসূল (সা)এর জীবনী পড়ে নিজের জীবনকে ঠিক সেভাবেই সাজানোর সিদ্ধান্ত নেন। নরম বিছানায় শুয়েও যার ঘুম আসতনা তিনি এখন মাটিতে বিছানা পেতে মহা আরামে ঘুমাতেন, সারাজীবন দু’হাতে কাঁটাচামচ দিয়ে খেয়ে অভ্যস্ত এই ব্যাক্তি ডান হাতের তিন আঙ্গুল ব্যাবহার করে খেতেন, স্কুলে শার্টপ্যন্ট পরলেও স্কুলের বাইরে সবসময় আলখাল্লা পরতেন, প্রতিদিন কুর’আন এবং হাদিস পড়তেন এবং এই জ্ঞান ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর ফাঁকে আর বন্ধুদের আড্ডায় বিতরণ করতেন। তাঁর পরিবার তাঁকে পরিত্যাগ করে কিন্তু মানুষ তাঁকে বরণ করে নেয়। সবচেয়ে বড় কথা সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য তাঁকে সকল দুঃখ অনুযোগ ভুলিয়ে দেয়। এভাবেই মানুষ নিজেকে পরিবর্তন করার মাধ্যমে অপরকে পরিবর্তিত হতে অনুপ্রাণিত করতে পারে!
সুতরাং, আমার যে বন্ধুরা জীবনকে কঠিন অকাট্য বাঁধার শেকলে দেখতে অভ্যস্ত তাদের আহ্বান জানাই, পৃথিবীটাকে একবার আমার এবং আমাদের মত সাধারন মানুষগুলোর দৃষ্টি দিয়ে দেখুন, পরিবর্তনটা নিজেকে দিয়েই শুরু করুন, হয়ত হাঁটি হাঁটি পা পা করে আমরা পৌঁছে যাব আমাদের আকাঙ্খার স্বর্নশিখরে- সত্ত্বর না পৌঁছলেও ক্ষতি নেই, পথটা ভালই লাগবে, ভ্রমণটাও কঠিন মনে হবেনা।
বাতিঘর
কোণাচোখে তারিককে পাশের টেবিলে আরাম করে বসতে দেখে জামিল দ্রুত গলা নামিয়ে বলে, ‘শুনুন, আপনি কিন্তু কিছুতেই আমাকে বিয়ে করতে রাজি হবেননা’।
ঘটনার আকস্মিকতায় থতমত খেয়ে যায় ফারজানা। সে লোকটাকে চেনেনা, জানেনা, কোন সালাম নেই, সম্ভাষন নেই, হুট করে এই আচমকা অনুরোধ! তারিকের দিকে জামিলের চোরা চাহনি, ফিসফিস কথা বলার ভঙ্গি আর এই অদ্ভুত প্রস্তাব- সব মিলিয়ে কিম্ভুত এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ হাসি পেয়ে যায় ওর। হাসি চাপার চেষ্টা করতে করতে সে স্মিত হেসে বলে, ‘আসসালামু আলাইকুম’।
এবার নিজের অভদ্র আচরন স্মরন করে জামিল নিজেই একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে, লজ্জা লজ্জা চেহারায় টেবিলের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’।
‘আমার নাম ফারজানা’।
‘জ্বি, তারিক ভাই এইমাত্র বললেন। আমি জামিল’।
‘আপনার মত আমিও আসলে এখন বিয়ে করতে উৎসাহী নই। কিন্তু আমি যদি এই মূহূর্তে উঠে চলে যাই তাহলে বিয়ে করবনা বললে ভাইয়া কিছুতেই কনভিন্সড হবেনা। সুতরাং, আমাদের মনে হয় কিছুক্ষণ অন্তত কথা বলার অভিনয় করা উচিত’।
জামিল বুঝতে পারল কথায় যুক্তি আছে, কিন্তু সে কি বলবে? ওর তো এটুকুই শুধু বলার ছিল!
ফারজানাই এগিয়ে এলো, ‘আচ্ছা, আপনি বিয়ে করতে না চাইলে দেখা করতে চাইলেন কেন? আপনি তো মেয়ে না যে কেউ আপনাকে জোর করে বাধ্য করতে পারবে!’
জামিল ওর দিকে তাকালে দেখতে পেত ওর চোখের তারায় কৌতুক, কিন্তু টেবিলের দিকে তাকিয়ে থাকায় সে ফারজানার কথায় দুষ্টুমির ভাবটা ধরতে পারলনা। খুব অপরাধী, মাটির সাথে মিশে যেতে পারলে বাঁচে এমন চেহারা করে আমতা আমতা করে বলতে লাগল, ‘আসলে আমার বাবামা ভাইবোন কেউ নেই। চাচা চাচীর কাছে মানুষ। এখন শহরে থাকি বলে তাঁদের সাথেও তেমন যোগাযোগ হয়না। একা থাকি বলে তাঁদের চিন্তার অন্ত নেই। চাচা তাঁর এক বন্ধুকে বললেন আমার জন্য মেয়ে দেখতে। আমার নিজের কোন কুলকিনারা নেই, সাধারন একটা পেটেভাতে চাকরী করি, ছোট্ট একটা দু’কামরার ঘরে ভাড়া থাকি- এই জীবনে কাউকে জড়িয়ে কষ্টে ফেলে লাভ আছে? কিন্তু চাচা চাচী কিছুতেই বুঝতে চান না। চাচার এক বন্ধু আপনার ভাইকে চেনেন। ওঁরা আমাকে এমনভাবে ধরলেন যে মেয়ে না দেখে কোন সিদ্ধান্তই তারা শুনবেন না। তাই আপনাকে কষ্ট দিতে হোল। আপনাকে এখানে আসতে বাধ্য করা হয়ে থাকলে সেজন্য আমি অত্যন্ত দুঃখিত। প্লীজ আমাকে মাফ করে দেবেন’।
জামিলের হাবভাবে এবার ফারজানা কিছুতেই হাসি চেপে রাখতে পারলনা, খিক করে একটু হাসি দিয়েই মুখে হাত চেপে ধরল। এবার জামিল থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘আমি কি এমন কিছু বলেছি যা আপনার অস্বাভাবিক মনে হয়েছে?’
ফারজানা হাসি সংযত করার চেষ্টা করে বলে, ‘নাহ, তবে আপনার চেহারায় কেমন যেন একটা চোর চোর মার্কা দুঃখী দুঃখী ভাব আছে, হি হি...’
‘চোর চোর?’, কনফিউজড হয়ে যায় জামিল।
‘জ্বি, আদিব, আমার ভাইয়ের ছেলেটা বিস্কিট চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলে যেমন চেহারা বানায় আপনার চেহারাটা ঠিক তেমন লাগছে, হি হি হি...’
এবার জামিলও হেসে ফেলে।
‘আচ্ছা, আপনি কি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়েন?’
অপ্রত্যাশিত প্রসঙ্গ পরিবর্তনে আবার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় জামিল, শুধু উত্তর দিতে পারে, ‘জ্বি’।
‘আপনি কি লেখাপড়া করতে পছন্দ করেন? যেমন কুর’আন হাদিস পড়া, গল্পের বই পড়া, বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা ইত্যাদি?’
‘জ্বি, নিয়মিত পড়ি’।
‘আপনি কি সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করেন?’
‘জ্বি’, কথাবার্তা যে কোনদিকে যাচ্ছে কিছুই ঠাহর করতে পারেনা জামিল।
‘আপনি কি বিশ্বাস করেন যে সৃষ্টিকর্তা আপনাকে কোন বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন এবং তিনিই আপনাকে সেই উদ্দেশ্যের কাছে পৌঁছে দেবেন?’
‘জ্বি’।
‘তাহলে আপনার কি মনে হয় আপনার কথায় এই বিশ্বাস প্রতিফলিত হয়? নাকি আপনার মন বিশ্বাসের কথা বললেও মুখ অবিশ্বাসের সাক্ষ্য দেয়?’
বাক্যালাপ এখানে এসে ঠেকবে স্বপ্নেও কল্পনা করেনি জামিল। কিন্তু এই অপরিচিত মেয়েটি তাকে এমন এক রূঢ় সত্যের সম্মুখীন করে দিয়েছে যা সে কখনো ভেবেও দেখেনি। সময় তাকে এমন এক ব্যাক্তিতে রূপান্তরিত করে দিয়েছে যে বিশ্বাসের কথা বলে অথচ নিরাশায় ভোগে, যে আত্মীয়তার জন্য হাহাকার করে অথচ আত্মীয়তার বন্ধনের মূল্যায়ন করতে পারেনা, যে আল্লাহর ওপর নির্ভরতার কথা বলে অথচ কারো দায়িত্ব নেয়ার জন্য নিজেকে নির্ভরযোগ্য মনে করেনা। হা করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোন জবাব দিতে পারেনা সে।
ওদিকে তারিক উঠে দাঁড়ায়, ফারজানাও সালাম দিয়ে ভাইকে অনুসরন করে। তারিক আর ফারজানাকে বিদায় দিয়ে আবার রেস্টুরেন্টের বে-আরাম চেয়ারটাতে বসে ভাবতে থাকে জামিল, মেয়েটা তাকে কি বলে গেল?
দু’ঘন্টা পর, ফারজানার বাসায়ঃ
‘অ্যাই বলনা ছেলেটা দেখতে কেমন ছিল?’
‘সত্যি ভাবী, আমি খেয়াল করিনি। খুব বেশি খারাপ হলে হয়ত খেয়াল করতাম’।
‘তাহলে আমার যে ননদিনি এতদিন বিয়ে করতে রাজী হয়নি সে কি দেখে একঘণ্টায় বিয়ে করতে রাজী হয়ে গেল?’
‘ওহ, তুমি এটা জানতে চাও? বললেই তো হত!’, চোখ টিপে হেসে ফেলে ফারজানা।
‘জ্বি ফারজু বিবি, এটাই জানতে চাই’, গালে হাত দিয়ে কৌতুহল প্রকাশ করেন ভাবী।
‘শোন তাহলে- লোকটাকে দেখে মনে হোল আমি এই লোকটার জীবনে কিছু একটা অবদান রাখতে পারব, তার বিশ্বাসকে পূর্ণতা দান করতে সাহায্য করতে পারব, তার সাথী হতে পারব। অধিকাংশ পুরুষ বিয়ে করার সময় কাজের মেয়ে খোঁজে। ভাবী, আমার ঘরের কাজ আমি করব, তাতে আপত্তির কি আছে? কিন্তু সেটাই যদি বিয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য হয় সেটা আমি মেনে নিতে পারিনা’।
‘তা তো ঠিক আছে ফারজু বিবি। কিন্তু তোমার ভাইয়া বলল ছেলেটাকে দেখে বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহী মনে হয়নি, আমি ভাবছি তুমি তার জীবনে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে তা সে মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কিনা’, চিন্তিত মনে হয় ভাবীকে।
‘ভাবী, লোকটাকে দেখে মনে হোল খুব সরল আর লাজুক প্রকৃতির কিন্তু বোকা না। উনি নানা কারণে জীবনের প্রতি আশাহত কিন্ত এই আশা জাগিয়ে তোলার মত বিশ্বাস ওনার মনের কোণে কোথাও অবশিষ্ট আছে’।
‘তাহলে আশা করি তুমি তার সেই ভঙ্গুর আশালতায় কোথাও দোলা দিতে পেরেছ’, ফারজানার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকান ভাবী। বাপমা মরা এই মেয়েটাকে নিজের মেয়ের মত করেই বড় করেছে তিনি। কোনদিন ওর বিশ্বাসে এতটুকু চির ধরতে দেননি। এই আশার উজ্জ্বল প্রদীপ, এই বাতিঘর যদি সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া কোন নাবিককে পথ দেখাতে পারে, পারে আরেকটি ঘরকে আলোকিত করতে, তবে এর চেয়ে বেশি আর কি সাফল্য আশা করতে পারেন তিনি?
তিনদিন পর, নদীর ধারেঃ
‘মেয়েটা যে তোর জন্য perfect তা কি এখন তোর মাথায় ঢুকেছে না আরো সময় লাগবে?’, রোদের জন্য ভ্রূ কুঁচকে জামিলের দিকে তাকানোর চেষ্টা করে কামাল। জামিলের মুখটা ভারী উজ্জ্বল দেখাচ্ছে, ওটা কি রোদের আলো না আশার?
‘হিসেব করছি রে দোস্ত। কথায় কথায় ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদবে, বাচ্চাদের মত আবদার করে জীবন অতিষ্ঠ করে তুলবে এমন বৌয়ের ভীতি থেকেই বিয়ে করতে অনীহা বোধ করতাম। কিন্তু এই মেয়েটা প্র্যাক্টিকাল, সেন্সিবল, স্মার্ট, বুদ্ধিমতি এবং ঠিক আমার মত পরিস্থিতিতে বড় হয়েও ওর বিশ্বাসটা অত্যন্ত মজবুত। আমার জীবনের এক বিরাট সত্য সে আমাকে কি অবলীলায় বুঝিয়ে দিল মনে একটুও কষ্ট না দিয়ে! এই সাহচর্য আমার প্রয়োজন, ম্যাগ্নিফায়িং গ্লাস দিয়ে দুঃখগুলোকে দেখা বন্ধ করার জন্য ওর হাসির জোয়ার আমার জীবনে দরকার, সবচেয়ে বড় কথা ওর বিশ্বাসের শক্ত খুঁটিটা হতে পারে আমার জীবনের সে অবলম্বন যা আমি এতদিন খুঁজে খুঁজে হয়রান হচ্ছি’।
‘তাহলে তুই দেরি করছিস কিসের জন্য?’
‘মেয়েটা যে বলল সে বিয়ে করতে আগ্রহী না!’
‘তুই জিজ্ঞেস করেছিলি, কেন?’
‘নাহ’।
‘গাধা কোথাকার! জিজ্ঞেস করবিনা?’, ঈষৎ বিরক্ত হয় কামাল, পরক্ষণেই আবার আশাবাদী হয়ে ওঠে, ‘যাক, সে বুদ্ধিমতি মেয়ে, ঠিকই বুঝতে পারবে তোর জীবনে সে ফ্রেন্ড, গাইড অ্যান্ড ফিলোসফার হয়ে বিরাজ করতে পারবে। একজন বুদ্ধিমতি মেয়ের জন্য এটাই বড় প্রাপ্তি’।
‘কিন্তু ওর আমাকে পছন্দ হোল কি’না কিভাবে জানব?’
‘ওরে দোস্ত, ওর পরিবারের সাথে কথা বল, নাহলে জানবি কি করে?’
‘ওঁরা যদি না করে দেয়?’
‘হ্যাঁও তো বলতে পারে। তুই আগেই নিরাশ হলে মেয়েটা তোকে শেখালটা কি?’
মাথা নাড়ে জামিল, আজই কথা বলতে হবে।
‘তা মেয়েটা দেখতে কেমন রে?’
‘খেয়াল করিনি তো!’, নিজেই অবাক হয় জামিল, ‘কিন্তু খুব বেশি খারাপ না মনে হয়, তাহলে হয়ত খেয়াল করতাম’।
খুশি হয় কামাল, ‘যারা মানুষের অন্তর দেখে পছন্দ করে তারাই মেয়ে দেখে এসে বলতে পারে চেহারা খেয়াল করেনি। এই বিয়ে হলে তুই ঠকবি না দোস্ত’।
উঠে দাঁড়ায় দু’জনে, আনন্দের আতিশয্যে হঠাৎ স্লোগান ছাড়ে কামাল, ‘জামিল তুই এগিয়ে চল, আমরা আছি তোর সাথে’।
হো হো করে হেসে ফেলে দু’জনে।
ছয়মাস পরঃ
‘আজকে তোমার নতুন চাকরী, এত সুন্দর জামাকাপড় পরেছ অথচ চুলটা আঁচড়াওনি। একটু গেলাম রান্নাঘরে আর ব্যাস, তোমার ফাঁকিঝুঁকি শুরু! তোমাকে নিয়ে আমি কি করি বলত?’, ব্যাস্তসমস্ত হয়ে পাশের রুম থেকে চিরুনী হাতে দৌড়ে আসে ফারজানা।
টেবিলে ঠান্ডা হতে দিয়ে যাওয়া খাবারগুলো টিফিন ক্যারিয়ারে ভরতে ভরতে জামিল বলে, ‘আমি চুল আঁচড়ালে সকাবেলা আমার মাথায় তোমার হাতের স্পর্শ নিয়ে বেরোব কি করে বলত? তুমি সকালে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিলে আমার সারাদিন মাথা ঠান্ডা থাকে, একদম যেন তিব্বত কদুর তেলের বিজ্ঞাপনের মত!’
‘হি হি হি’, ওকে হাসতে দেখে জামিলের হাসিটাও ঠোঁটের একপাশ থেকে পুরো মুখে ছড়িয়ে পড়ে। জামিলকে শেষপর্যন্ত হাসতে শেখাতে পেরেছে ফারজানা, ওর দুষ্টুমিগুলো এখন সে কিছু কিছু বোঝে, নিজেও দুষ্টুমি করতে শুরু করেছে দেখে বেশ উৎফুল্ল হয় সে।
‘যাবার পথে চাচা চাচীকে ফোন করে জানিয়ো নতুন চাকরিতে যাচ্ছ’।
‘ওঁরা জানেন তো’।
‘তাতে কি হয়েছে? ফোন করে জানাও, খুশি হবেন। আর বিকালে ফিরলে চাচীর জন্য শাড়ি কিনব যেন আগামী বৃহস্পতিবার নিয়ে যেতে পারি। আগামী মাসে বেতন পেলে চাচাকে পাঞ্জাবী কিনে দেব’।
‘আর তুমি কি কিনবে?’
‘বাহ, তোমার মতন এমন একটা চমৎকার গিফট থাকতে আমার আর কি লাগবে?’
মনে মনে একই কথা ভাবে জামিল, কিন্তু ওর মত সাবলীলভাবে বলতে পারেনা। বেহেস্তের টুকরোর মত বৌটার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে।
‘তুমি কি চাও তোমার নতুন অফিসে প্রথমদিন লেট হোক?’
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে জুতো পায়ে দিতে দিতে আবার ফারজানার দিকে তাকায় জামিল।
‘যাআআআও’, বলে হাতে টিফিন ক্যারিয়ারটা হাতে গুঁজে দিয়ে দরজা খুলে ওকে প্রায় ঠেলে বের করে দেয় ফারজানা।
শেষ একবার পেছন ফিরে তাকালে ফারজানা মিষ্টি হেসে বলে, ‘আসসালামু আলাইকুম’।
এই স্বর্গীয় সম্ভাষন কানে নিয়েই প্রতিদিন পৃথিবীর বন্ধুর পথে যাত্রা শুরু হয় জামিলের, সে স্মিত হেসে জবাব দেয়, ‘ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’।
এখনো রিক্সা পেতে দেরী হয়, বাসে ভিড় ঠেলে উঠতে কষ্ট হয়, অফিসে ঝামেলা হয়, দোকানে দরদাম নিয়ে মন কষাকষি হয়, দু’কামরার ঘরটাতে চাপাচাপি হয়, কোন কোনদিন ভাল তরকারীও থাকেনা। তবু কেন যেন পৃথিবীটাকে আর আগের মত জটিল মনে হয়না। দিনের শেষে ওর জীবনে আছে এমন এক সাথী যে ওর সুখদুঃখ সব সমানভাবে ভাগাভাগি করে নেয়, যে ওর কষ্টগুলোকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারে, যে ওর বিশ্বাসকে এক আলোর তৈরী মিনারের মত উচ্চকিত করে তোলে। হাসি পায় এই ভেবে যে এই দুই শ্রেষ্ঠ বন্ধুর প্রথম বাক্যালাপ ছিল, ‘আপনি কিন্তু কিছুতেই আমাকে বিয়ে করতে রাজি হবেননা’!
আমরাই আগামী
বাবা তাঁর ক্লাস নাইন পড়ুয়া ছেলেকে বললেন, ‘যাও তো বাবা, ফ্রিজে যে মাখনের খন্ডটা আছে ওখান থেকে অল্প মাখন কেটে নিয়ে এসো’। মা শুনতে পেয়ে হা হা করে তেড়ে এলেন, ‘বল কি? তুমি কোন সাহসে ওকে মাখন কাটতে পাঠাচ্ছ? ও হাত কেটে ফেলবে!’
বাসায় মেহমান এসেছে, মা শুয়ে আছেন দেখে বাবা সপ্তম শ্রেণীতে পড়ুয়া মেয়েটিকে বললেন, ‘চাচার জন্য এক কাপ চা আর ক’টা বিস্কিট নিয়ে এসো’। মেয়ে গিয়ে বুয়াকে ধাক্কা দিয়ে শোয়া থেকে তুলে দিল, ‘বুয়া, চা বানাও, আক্কাস চাচা এসেছেন, তাঁকে নাস্তা দাও’। বুয়া তখন মাত্র সারাদিনের কাজ সেরে শুয়েছেন। ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে তুলে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে তিনি আক্কাস সাহেবের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে লাগলেন।
ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া মেয়ে ড্রয়িং রুমে বসে টিভি দেখছে, কলেজ পড়ুয়া ছেলে নিজের রুমে ল্যাপটপ নিয়ে বসে গান শুনছে। দরজায় কলিং বেলের শব্দ পেয়ে মেয়ে আওয়াজ দিল, ‘আম্মু, দরজায় কে এসেছে দেখ’! আম্মু রান্নাঘরে ঘর্মাক্ত ব্যাতিব্যাস্ত, শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে ছুটলেন দরজায় কে দেখতে। ওদিকে সারতে না সারতেই ফোন বাজতে শুরু করল, ছেলে রুম থেকে হাঁক দিয়ে বলল, ‘আম্মু, ফোন ধর, ফোন বাজছে’! আম্মু আঁচল দিয়ে গলা বেয়ে গড়িয়ে পড়া ঘাম মুছতে মুছতে ছেলের রুমের সামনে রাখা ফোনটা ধরতে দৌড় দিলেন।
চিত্রগুলো পরিচিত মনে হয়? এবার আর কয়েকটা চিত্র দেই।
ওহুদের যুদ্ধের জন্য সৈন্য বাছাই করা হচ্ছে, মদীনার ছেলেবুড়ো সবাই এসে লাইন দিয়েছে। রাসূল (সা) কমবয়সী ছেলেদের বাড়ী পাঠিয়ে দিচ্ছেন দেখতে পেয়ে কয়েকজন কিশোর ফন্দী আঁটল। ওরা পায়ের পাতার ওপর ভর দিয়ে নিজেদের উচ্চতা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করতে লাগল যাতে তাদের বয়সের তুলনায় বড় মনে হয়। ওদের বুদ্ধি দেখে হাসতে হাসতে রাসূল (সা) তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। ওরা ভীষণ দুঃখ নিয়ে বাড়ী ফিরে গেল।
রাসূল (সা)এর সবচেয়ে হিংস্র শত্রুদের একজন উকবা ইবন আবী মুইত। তার মেয়ে উম্মু কুলসুম বিন্ত উকবা (রা) ইসলাম গ্রহন করেন। অথচ কুমারী হওয়ায় এবং পিতা ও ভাইদের ইসলামবিদ্বেষের কারণে তিনি ঘরবন্দী হয়ে পড়েন। উকবা বদরের যুদ্ধে মুসলিমদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বন্দী এবং মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত হন। কিন্তু আল্লাহর দ্বীনের এই শত্রুর মৃত্যুতে তার মেয়ের চোখ থেকে একফোঁটা অশ্রুও ঝরেনি। হিজরতের সাত বছর পর একদিন তিনি সুযোগ বুঝে সম্পূর্ণ একা মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। তাঁর পরিবার তাঁকে ফেরত চেয়ে পাঠায়। কিন্তু আল্লাহ তাঁর সম্মানে তাঁকে ফেরত না দেয়ার নির্দেশ দিয়ে সুরাহ মুমতাহিনার দশম আয়াত নাজিল করেন।
রাসূল (সা)কে জিজ্ঞেস করা হোল, ‘কিয়ামত কবে হবে?’ তিনি বললেন, ‘এ বিষয়ে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ব্যাতীত আর কেউ জানেনা’। তখন তাঁকে অনুরোধ করা হোল কিয়ামত সমাগত হবার কিছু লক্ষণ বলে দেয়ার জন্য যেন আমরা সাবধান হতে পারি। তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন লক্ষণ সম্পর্কে বলেছেন, তার একটি হোল, ‘যখন দাসীরা তাদের মনিবদের জন্ম দেবে’, অর্থাৎ যখন সন্তানরা তাদের মায়েদের সাথে দাসীসদৃশ ব্যাবহার করবে। এই ঘটনা কি এখন অহরহ ঘটছেনা?
এবার আরেকটি গল্প বলি।
মক্কার অন্যতম সম্পদশালী পরিবারে জন্ম হয় মুসয়াব ইবন উমাইর (রা)র। মা খুনাস বিন্ত মালিক তাঁর বিশাল ধনভান্ডার তাঁর পরম আদরের এই পুত্রকে বিলাসিতার মধ্য দিয়ে বড় করার জন্য লুটিয়ে দেন। রাসূল (সা)এর বর্ণনা দিতে গিয়ে একজন সাহাবী বলেছেন, ‘তাঁকে দেখলে মনে হয় যেন সূর্য ছুটে চলেছে’। এমন যার সৌন্দর্য, তিনিই বলতেন, ‘মক্কায় মুসয়াবের চেয়ে সুদর্শন এবং উৎকৃষ্ট পোশাকধারী আর কেউ ছিলোনা’। তাঁর ব্যাপারে স্মৃতিচারন করতে গিয়ে রাসুল (সা) বলতেন, ‘আমি মুসয়াবের চেয়ে চমৎকার জুলফি, অধিকতর কোমল চাদরের অধিকারী এবং বেশি বিলাসী মক্কায় আর কাউকে দেখিনি’। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ‘তিনি ছিলেন মক্কার সর্বোৎকৃষ্ট সুগন্ধি ব্যাবহারকারী’। তাঁর এই সৌন্দর্য এবং সুরভি কেবল বাহ্যিক ছিলোনা, এই স্বচ্ছতা তাঁর অন্তরেও প্রতিফলিত হত। তাই ইসলামপ্রচারের শুরুতেই তিনি ইসলামের সৌন্দর্য এবং সুরভিতে মোহিত হয়ে একে মনেপ্রাণে গ্রহণ করে নেন। যে মা তাঁকে এতখানি ভালবাসতেন তিনিই তখন তাঁকে ঘরে শেকল দিয়ে বেঁধে মারধর, অত্যাচার করতে শুরু করে দেন। ফলশ্রুতিতে তিনি অন্যান্য অত্যাচারিতের মত হাবশায় হিজরত করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে মদীনায় একদিন মুসলিমদের একটি সমাবেশে তাঁকে দেখে কিছু সাহাবী চোখ নামিয়ে নেন, কারো কারো চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে কেননা তাঁর গায়ে তখন একটি শত তালি দেয়া জীর্ণ চামড়ার টুকরো, একবেলা খাবার জুটলে আরেকবেলা জোটেনা, চেহারায় দারিদ্রের ছাপ সুস্পষ্ট। রাসূল (সা) বললেন, ‘মক্কায় আমি এ মুসয়াবকে দেখেছি। তার চেয়ে পিতামাতার আদরের আর কোন যুবক মক্কায় ছিলোনা। আল্লাহ এবং রাসূলের ভালবাসায় সে সবকিছু ত্যাগ করেছে’।
মদীনা থেকে একটি দল রাসূল (সা)এর সাথে আকাবায় সাক্ষাত করার পর তিনি ইসলামের প্রথম দূত এবং দাঈ হিসেবে মুসয়াব (রা)কে মদীনায় পাঠান। তাঁর চরিত্রে তীক্ষ্ণ মেধা, প্রখর বুদ্ধিমত্তা, আকর্ষনীয় ব্যাক্তিত্বের সাথে কঠোর সাধনা, নিষ্ঠা ও মহত্বের সংযোগ ঘটায় অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ ও মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবীকে অতিক্রম করে রাসূল (সা) এই যুবককে নির্বাচন করেন। তিনি শীঘ্রই রাসূল (সা)এর দূরদর্শীতা প্রমাণ করেন। মুসয়াব (রা) মদীনায় যাবার আগে মদীনায় মুসলিমের সংখ্যা ছিল মাত্র বারো জন। পরবর্তী হজ্জ্ব মৌসুমে শুধু রাসূল (সা)এর সাথে মিলিত হতে আসা প্রতিনিধি দলের সদস্য সংখ্যাই ছিল বাহাত্তর জন!
রাসূল (সা)এর আগমনের জন্য মদীনাকে প্রস্তুত করতে শুধু পরিশ্রম এবং দৃঢ়সংকল্পই যথেষ্ট ছিলোনা, প্রয়োজন ছিল বুদ্ধিমত্তা এবং সদ্ব্যাবহারও। যেমন, একবার মদীনার এক গোত্রের নেতা উসাইদ ইবন হুদাইর রাগান্বিত এবং সশস্ত্র অবস্থায় এসে তাঁকে হুমকি দিলেন সঙ্গীসাথীসহ মদীনা ত্যাগ করে চলে যেতে। তিনি ভয় না পেয়ে হাসিমুখে তাঁকে স্বাগত জানালেন, আহ্বান জানালেন তাঁদের সাথে বসে কিছু কথাবার্তা শুনতে এবং বললেন, ‘ভালো লাগলে মানবেন, ভালো না লাগলে আমরা চলে যাব’। তাঁর বক্তব্য শেষ হবার আগেই উসাইদ এবং তাঁর সঙ্গী ইসলাম গ্রহণ করেন। এর ফলশ্রুতিতে যারা উশখুশ করছিলেন তাঁরাও পাল্লা দিয়ে এগিয়ে এসে ইসলাম গ্রহন করে নেন।
রাসুল (সা)এর হিজরতের পর ইসলামকে উৎখাত করার উদ্দেশ্যে ওহুদের প্রান্তরে যে যুদ্ধ হয় তাতে রাসূল (সা) পতাকা তুলে দেন মুসয়াব (রা)র হাতে। যুদ্ধের একপর্যায়ে বিজয় নিকটবর্তী দেখে মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনীর একাংশ রাসূল (সা)এর নির্দেশ অমান্য করে স্থানত্যাগ করলে মুসলিম বাহিনী চতুর্দিক থেকে শত্রুপরিবেষ্টিত হয়ে পড়ে। পলায়নপর মুসলিম বাহিনী বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ায় কুরাইশ বাহিনী রাসূল (সা)কে ঘিরে ফেলে। এসময় মুসয়াব (রা) প্রচন্ড হুংকার দিয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ উচ্চারণ করতে করতে একহাতে পতাকা ধরে আরেকহাতে তরবারী চালাতে শুরু করেন যেন শত্রুবাহিনীর দৃষ্টি রাসূল (সা)এর পরিবর্তে তাঁর দিকে নিবদ্ধ হয়। কুরাইশ বাহিনীর এক যোদ্ধা তাঁর ডান হাতটি তরবারীর আঘাতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। মুসয়াব (রা) বামহাতে পতাকা তুলে নিয়ে বলতে থাকেন, ‘মুহাম্মাদ একজন রাসূল ছাড়া আর কিছু নন। তাঁর পূর্বে আরো বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন’। ঐ পরিস্থিতিতে এই কথাটি কত সুন্দর ছিল! কেননা মুসলিম বাহিনীর অনেকেই মনে করছিল রাসূল (সা) শাহীদ হয়ে গিয়েছেন, তাহলে আর যুদ্ধ করে লাভ কি? কিন্তু মুসয়াব (রা) বোঝাতে চাইছিলেন রাসূল (সা) জীবিত থাকা জরুরী কিন্তু অপরিহার্য নয়, কেননা মুসলিম যুদ্ধ করে আল্লাহর দ্বীনের জন্য এবং রাসূল চলে গেলেও দ্বীনকে রক্ষা করার দায়িত্ব ফুরিয়ে যায়না। অশ্বারোহী তাঁর বাম হাতটিও বিচ্ছিন্ন করে দিল। তিনি আবার একই কথা বলে ছিন্ন দুই বাহু দিয়ে পতাকা তুলে ধরলেন। এবার তাঁকে বর্শার আঘাতে হত্যা করা হোল। মৃত্যুর মূহূর্তেও তিনি পতাকাটিকে নিজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে দিলেন না, পতাকা সাথে নিয়েই ঢলে পড়লেন। রাসূল (সা) যুদ্ধ শেষে তাঁর রক্ত এবং ধুলোবালি মাখা লাশ দেখে অঝোরে কেঁদে ফেললেন। খাব্বার ইবন আরাত (রা) বলেন, ‘আমাদের মধ্যে যারা আল্লাহর কাছ থেকে মোটেও প্রতিদান না নিয়ে বিদায় নিয়েছেন তাদের একজন মুসয়াব ইবন উমাইর’। অথচ আল্লাহ তাঁকে পৃথিবী যতদিন থাকবে ততদিন সম্মানিত করে রাখবেন ওহুদ যুদ্ধের পর পর অবতীর্ণ আয়াতের মাধ্যমে, কেননা এই আয়াত হুবহু সেই বাক্যটি যা তিনি বার বার উচ্চারণ করছিলেন জীবনের শেষ মূহূর্তগুলোতে, ‘মুহাম্মাদ একজন রাসূল ছাড়া আর কিছু নন। তাঁর পূর্বে আরো বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন’ (সূরা আলে ইমরানঃ আয়াত ১৪৪)।
তাঁর মৃত্যুর পর কাফনের জন্য একপ্রস্থ কাপড় ছাড়া আর কিছু পাওয়া গেলনা যা দিয়ে কিছুতেই তাঁর মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা সম্ভব হচ্ছিলনা। পরে তাঁর মাথার দিক চাদর দিয়ে ঢেকে পায়ের দিক ঘাস দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। রাসূল (সা) তাঁর লাশের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘মু’মিনদের এমন কিছু লোক আছে যারা আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার সত্যে পরিণত করেছে। আমি তোমাকে মক্কায় দেখেছি। সেখানে তোমার চেয়ে কোমল চাদর এবং সুন্দর জুলফি আর কারো ছিলোনা। আর আজ তুমি এখানে এই চাদরে ধুলি মলিন অবস্থায় পড়ে আছ’। কত সুন্দর এবং সার্থক ছিল তাঁর জীবন!
আমরা কেউ মুসয়াব (রা)র চেয়ে বেশী আদর বা বিলাসিতায় বড় হয়েছি বলে দাবী করতে পারিনা, অথচ ‘আমি কিছু পারিনা’ বলে আনন্দ পাই। আমরা কেউ আমাদের পিতামাতা উকবার মত ইসলামবিদ্বেষী বলে দাবী করতে পারিনা অথচ ইসলামের অনুসরণ করতে অলসতা করি। আমরা কেউ মদীনার ঐ ক্ষুদ্র কিশোরদের পরিমাণ বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্কতা ধারণ করিনা অথচ নিজের মত প্রতিষ্ঠা করার জন্য গালাগাল, হাতাহাতি, মারামারি থেকে হত্যা পর্যন্ত করে ফেলতে প্রস্তুত! তাহলে আমরা কিভাবে নিজেদের প্রস্তুত করব একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে? মা যদি আদর করে বলে, ‘ও এই কাজটা পারবেনা’, আমরা কেন হেসে তাঁকে আশ্বস্ত করিনা, ‘কেন পারবনা মা, একবার করতে দিয়েই দেখনা!’ বাবা বলার আগেই কেন লক্ষ্য করার চেষ্টা করিনা পরিবারের সদস্য হিসেবে আমি আমার পরিবারের জন্য কি করতে পারি? কেন ভাবিনা যে মানুষটা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমার পরিবারের জন্য কাজ করে তাকে একদিন চা বানিয়ে খাওয়াই? কেন আমাদের মাথায় আসেনা আমরা মাকে সেবা করে তাঁর পায়ের নীচে বেহেস্তের চাবিটা হস্তগত করি? কেন আমাদের জ্ঞান অর্জন এবং চর্চার প্রতি এত অনীহা? আজ আমাদের যে শক্তি, উদ্যম, উদ্দীপনা তা কিন্তু চিরস্থায়ী নয়। আমার দাদা একসময় জোয়ান সুপুরুষ ছিলেন, আমার দাদী একসময় সুন্দরী ষোড়শী তন্বি তরুণী ছিলেন। আজ তাদের দেখে কি আমরা তা কল্পনাও করতে পারি? আমাদের এই রঙ্গীন দিনগুলোও কিন্তু চিরকাল রইবেনা। সুতরাং আমাদের আজই নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে আগামী দিনের জন্য।
আমরা যারা আজকে কিশোর কিশোরী তারাই কিন্তু কাল মুসয়াব (রা)র মত যুবক, উম্মু কুলসুম বিন্ত উকবা (রা)র মত যুবতী হব। সুতরাং, আজই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা সিনেমা-টেলিভিশন, ফেসবুক-টুইটার, মোবাইল-চ্যাটিং, প্রেম-ফ্রেম জাতীয় ফলাফলশূন্য কাজে আজকের দিনটা ব্যায় করে কাল হায় হায় করব; নাকি লেখাপড়া, সৎকাজের অনুশীলন, চরিত্র গঠন, সামাজিক সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীলতার চর্চার মাধ্যমে আমার আজকে আমার আগামীর উত্তরণের জন্য সিঁড়ি হিসেবে ব্যাবহার করব।
বাসায় মেহমান এসেছে, মা শুয়ে আছেন দেখে বাবা সপ্তম শ্রেণীতে পড়ুয়া মেয়েটিকে বললেন, ‘চাচার জন্য এক কাপ চা আর ক’টা বিস্কিট নিয়ে এসো’। মেয়ে গিয়ে বুয়াকে ধাক্কা দিয়ে শোয়া থেকে তুলে দিল, ‘বুয়া, চা বানাও, আক্কাস চাচা এসেছেন, তাঁকে নাস্তা দাও’। বুয়া তখন মাত্র সারাদিনের কাজ সেরে শুয়েছেন। ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে তুলে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে তিনি আক্কাস সাহেবের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে লাগলেন।
ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া মেয়ে ড্রয়িং রুমে বসে টিভি দেখছে, কলেজ পড়ুয়া ছেলে নিজের রুমে ল্যাপটপ নিয়ে বসে গান শুনছে। দরজায় কলিং বেলের শব্দ পেয়ে মেয়ে আওয়াজ দিল, ‘আম্মু, দরজায় কে এসেছে দেখ’! আম্মু রান্নাঘরে ঘর্মাক্ত ব্যাতিব্যাস্ত, শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে ছুটলেন দরজায় কে দেখতে। ওদিকে সারতে না সারতেই ফোন বাজতে শুরু করল, ছেলে রুম থেকে হাঁক দিয়ে বলল, ‘আম্মু, ফোন ধর, ফোন বাজছে’! আম্মু আঁচল দিয়ে গলা বেয়ে গড়িয়ে পড়া ঘাম মুছতে মুছতে ছেলের রুমের সামনে রাখা ফোনটা ধরতে দৌড় দিলেন।
চিত্রগুলো পরিচিত মনে হয়? এবার আর কয়েকটা চিত্র দেই।
ওহুদের যুদ্ধের জন্য সৈন্য বাছাই করা হচ্ছে, মদীনার ছেলেবুড়ো সবাই এসে লাইন দিয়েছে। রাসূল (সা) কমবয়সী ছেলেদের বাড়ী পাঠিয়ে দিচ্ছেন দেখতে পেয়ে কয়েকজন কিশোর ফন্দী আঁটল। ওরা পায়ের পাতার ওপর ভর দিয়ে নিজেদের উচ্চতা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করতে লাগল যাতে তাদের বয়সের তুলনায় বড় মনে হয়। ওদের বুদ্ধি দেখে হাসতে হাসতে রাসূল (সা) তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। ওরা ভীষণ দুঃখ নিয়ে বাড়ী ফিরে গেল।
রাসূল (সা)এর সবচেয়ে হিংস্র শত্রুদের একজন উকবা ইবন আবী মুইত। তার মেয়ে উম্মু কুলসুম বিন্ত উকবা (রা) ইসলাম গ্রহন করেন। অথচ কুমারী হওয়ায় এবং পিতা ও ভাইদের ইসলামবিদ্বেষের কারণে তিনি ঘরবন্দী হয়ে পড়েন। উকবা বদরের যুদ্ধে মুসলিমদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বন্দী এবং মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত হন। কিন্তু আল্লাহর দ্বীনের এই শত্রুর মৃত্যুতে তার মেয়ের চোখ থেকে একফোঁটা অশ্রুও ঝরেনি। হিজরতের সাত বছর পর একদিন তিনি সুযোগ বুঝে সম্পূর্ণ একা মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। তাঁর পরিবার তাঁকে ফেরত চেয়ে পাঠায়। কিন্তু আল্লাহ তাঁর সম্মানে তাঁকে ফেরত না দেয়ার নির্দেশ দিয়ে সুরাহ মুমতাহিনার দশম আয়াত নাজিল করেন।
রাসূল (সা)কে জিজ্ঞেস করা হোল, ‘কিয়ামত কবে হবে?’ তিনি বললেন, ‘এ বিষয়ে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ব্যাতীত আর কেউ জানেনা’। তখন তাঁকে অনুরোধ করা হোল কিয়ামত সমাগত হবার কিছু লক্ষণ বলে দেয়ার জন্য যেন আমরা সাবধান হতে পারি। তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন লক্ষণ সম্পর্কে বলেছেন, তার একটি হোল, ‘যখন দাসীরা তাদের মনিবদের জন্ম দেবে’, অর্থাৎ যখন সন্তানরা তাদের মায়েদের সাথে দাসীসদৃশ ব্যাবহার করবে। এই ঘটনা কি এখন অহরহ ঘটছেনা?
এবার আরেকটি গল্প বলি।
মক্কার অন্যতম সম্পদশালী পরিবারে জন্ম হয় মুসয়াব ইবন উমাইর (রা)র। মা খুনাস বিন্ত মালিক তাঁর বিশাল ধনভান্ডার তাঁর পরম আদরের এই পুত্রকে বিলাসিতার মধ্য দিয়ে বড় করার জন্য লুটিয়ে দেন। রাসূল (সা)এর বর্ণনা দিতে গিয়ে একজন সাহাবী বলেছেন, ‘তাঁকে দেখলে মনে হয় যেন সূর্য ছুটে চলেছে’। এমন যার সৌন্দর্য, তিনিই বলতেন, ‘মক্কায় মুসয়াবের চেয়ে সুদর্শন এবং উৎকৃষ্ট পোশাকধারী আর কেউ ছিলোনা’। তাঁর ব্যাপারে স্মৃতিচারন করতে গিয়ে রাসুল (সা) বলতেন, ‘আমি মুসয়াবের চেয়ে চমৎকার জুলফি, অধিকতর কোমল চাদরের অধিকারী এবং বেশি বিলাসী মক্কায় আর কাউকে দেখিনি’। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ‘তিনি ছিলেন মক্কার সর্বোৎকৃষ্ট সুগন্ধি ব্যাবহারকারী’। তাঁর এই সৌন্দর্য এবং সুরভি কেবল বাহ্যিক ছিলোনা, এই স্বচ্ছতা তাঁর অন্তরেও প্রতিফলিত হত। তাই ইসলামপ্রচারের শুরুতেই তিনি ইসলামের সৌন্দর্য এবং সুরভিতে মোহিত হয়ে একে মনেপ্রাণে গ্রহণ করে নেন। যে মা তাঁকে এতখানি ভালবাসতেন তিনিই তখন তাঁকে ঘরে শেকল দিয়ে বেঁধে মারধর, অত্যাচার করতে শুরু করে দেন। ফলশ্রুতিতে তিনি অন্যান্য অত্যাচারিতের মত হাবশায় হিজরত করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে মদীনায় একদিন মুসলিমদের একটি সমাবেশে তাঁকে দেখে কিছু সাহাবী চোখ নামিয়ে নেন, কারো কারো চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে কেননা তাঁর গায়ে তখন একটি শত তালি দেয়া জীর্ণ চামড়ার টুকরো, একবেলা খাবার জুটলে আরেকবেলা জোটেনা, চেহারায় দারিদ্রের ছাপ সুস্পষ্ট। রাসূল (সা) বললেন, ‘মক্কায় আমি এ মুসয়াবকে দেখেছি। তার চেয়ে পিতামাতার আদরের আর কোন যুবক মক্কায় ছিলোনা। আল্লাহ এবং রাসূলের ভালবাসায় সে সবকিছু ত্যাগ করেছে’।
মদীনা থেকে একটি দল রাসূল (সা)এর সাথে আকাবায় সাক্ষাত করার পর তিনি ইসলামের প্রথম দূত এবং দাঈ হিসেবে মুসয়াব (রা)কে মদীনায় পাঠান। তাঁর চরিত্রে তীক্ষ্ণ মেধা, প্রখর বুদ্ধিমত্তা, আকর্ষনীয় ব্যাক্তিত্বের সাথে কঠোর সাধনা, নিষ্ঠা ও মহত্বের সংযোগ ঘটায় অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ ও মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবীকে অতিক্রম করে রাসূল (সা) এই যুবককে নির্বাচন করেন। তিনি শীঘ্রই রাসূল (সা)এর দূরদর্শীতা প্রমাণ করেন। মুসয়াব (রা) মদীনায় যাবার আগে মদীনায় মুসলিমের সংখ্যা ছিল মাত্র বারো জন। পরবর্তী হজ্জ্ব মৌসুমে শুধু রাসূল (সা)এর সাথে মিলিত হতে আসা প্রতিনিধি দলের সদস্য সংখ্যাই ছিল বাহাত্তর জন!
রাসূল (সা)এর আগমনের জন্য মদীনাকে প্রস্তুত করতে শুধু পরিশ্রম এবং দৃঢ়সংকল্পই যথেষ্ট ছিলোনা, প্রয়োজন ছিল বুদ্ধিমত্তা এবং সদ্ব্যাবহারও। যেমন, একবার মদীনার এক গোত্রের নেতা উসাইদ ইবন হুদাইর রাগান্বিত এবং সশস্ত্র অবস্থায় এসে তাঁকে হুমকি দিলেন সঙ্গীসাথীসহ মদীনা ত্যাগ করে চলে যেতে। তিনি ভয় না পেয়ে হাসিমুখে তাঁকে স্বাগত জানালেন, আহ্বান জানালেন তাঁদের সাথে বসে কিছু কথাবার্তা শুনতে এবং বললেন, ‘ভালো লাগলে মানবেন, ভালো না লাগলে আমরা চলে যাব’। তাঁর বক্তব্য শেষ হবার আগেই উসাইদ এবং তাঁর সঙ্গী ইসলাম গ্রহণ করেন। এর ফলশ্রুতিতে যারা উশখুশ করছিলেন তাঁরাও পাল্লা দিয়ে এগিয়ে এসে ইসলাম গ্রহন করে নেন।
রাসুল (সা)এর হিজরতের পর ইসলামকে উৎখাত করার উদ্দেশ্যে ওহুদের প্রান্তরে যে যুদ্ধ হয় তাতে রাসূল (সা) পতাকা তুলে দেন মুসয়াব (রা)র হাতে। যুদ্ধের একপর্যায়ে বিজয় নিকটবর্তী দেখে মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনীর একাংশ রাসূল (সা)এর নির্দেশ অমান্য করে স্থানত্যাগ করলে মুসলিম বাহিনী চতুর্দিক থেকে শত্রুপরিবেষ্টিত হয়ে পড়ে। পলায়নপর মুসলিম বাহিনী বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ায় কুরাইশ বাহিনী রাসূল (সা)কে ঘিরে ফেলে। এসময় মুসয়াব (রা) প্রচন্ড হুংকার দিয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ উচ্চারণ করতে করতে একহাতে পতাকা ধরে আরেকহাতে তরবারী চালাতে শুরু করেন যেন শত্রুবাহিনীর দৃষ্টি রাসূল (সা)এর পরিবর্তে তাঁর দিকে নিবদ্ধ হয়। কুরাইশ বাহিনীর এক যোদ্ধা তাঁর ডান হাতটি তরবারীর আঘাতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। মুসয়াব (রা) বামহাতে পতাকা তুলে নিয়ে বলতে থাকেন, ‘মুহাম্মাদ একজন রাসূল ছাড়া আর কিছু নন। তাঁর পূর্বে আরো বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন’। ঐ পরিস্থিতিতে এই কথাটি কত সুন্দর ছিল! কেননা মুসলিম বাহিনীর অনেকেই মনে করছিল রাসূল (সা) শাহীদ হয়ে গিয়েছেন, তাহলে আর যুদ্ধ করে লাভ কি? কিন্তু মুসয়াব (রা) বোঝাতে চাইছিলেন রাসূল (সা) জীবিত থাকা জরুরী কিন্তু অপরিহার্য নয়, কেননা মুসলিম যুদ্ধ করে আল্লাহর দ্বীনের জন্য এবং রাসূল চলে গেলেও দ্বীনকে রক্ষা করার দায়িত্ব ফুরিয়ে যায়না। অশ্বারোহী তাঁর বাম হাতটিও বিচ্ছিন্ন করে দিল। তিনি আবার একই কথা বলে ছিন্ন দুই বাহু দিয়ে পতাকা তুলে ধরলেন। এবার তাঁকে বর্শার আঘাতে হত্যা করা হোল। মৃত্যুর মূহূর্তেও তিনি পতাকাটিকে নিজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে দিলেন না, পতাকা সাথে নিয়েই ঢলে পড়লেন। রাসূল (সা) যুদ্ধ শেষে তাঁর রক্ত এবং ধুলোবালি মাখা লাশ দেখে অঝোরে কেঁদে ফেললেন। খাব্বার ইবন আরাত (রা) বলেন, ‘আমাদের মধ্যে যারা আল্লাহর কাছ থেকে মোটেও প্রতিদান না নিয়ে বিদায় নিয়েছেন তাদের একজন মুসয়াব ইবন উমাইর’। অথচ আল্লাহ তাঁকে পৃথিবী যতদিন থাকবে ততদিন সম্মানিত করে রাখবেন ওহুদ যুদ্ধের পর পর অবতীর্ণ আয়াতের মাধ্যমে, কেননা এই আয়াত হুবহু সেই বাক্যটি যা তিনি বার বার উচ্চারণ করছিলেন জীবনের শেষ মূহূর্তগুলোতে, ‘মুহাম্মাদ একজন রাসূল ছাড়া আর কিছু নন। তাঁর পূর্বে আরো বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন’ (সূরা আলে ইমরানঃ আয়াত ১৪৪)।
তাঁর মৃত্যুর পর কাফনের জন্য একপ্রস্থ কাপড় ছাড়া আর কিছু পাওয়া গেলনা যা দিয়ে কিছুতেই তাঁর মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা সম্ভব হচ্ছিলনা। পরে তাঁর মাথার দিক চাদর দিয়ে ঢেকে পায়ের দিক ঘাস দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। রাসূল (সা) তাঁর লাশের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘মু’মিনদের এমন কিছু লোক আছে যারা আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার সত্যে পরিণত করেছে। আমি তোমাকে মক্কায় দেখেছি। সেখানে তোমার চেয়ে কোমল চাদর এবং সুন্দর জুলফি আর কারো ছিলোনা। আর আজ তুমি এখানে এই চাদরে ধুলি মলিন অবস্থায় পড়ে আছ’। কত সুন্দর এবং সার্থক ছিল তাঁর জীবন!
আমরা কেউ মুসয়াব (রা)র চেয়ে বেশী আদর বা বিলাসিতায় বড় হয়েছি বলে দাবী করতে পারিনা, অথচ ‘আমি কিছু পারিনা’ বলে আনন্দ পাই। আমরা কেউ আমাদের পিতামাতা উকবার মত ইসলামবিদ্বেষী বলে দাবী করতে পারিনা অথচ ইসলামের অনুসরণ করতে অলসতা করি। আমরা কেউ মদীনার ঐ ক্ষুদ্র কিশোরদের পরিমাণ বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্কতা ধারণ করিনা অথচ নিজের মত প্রতিষ্ঠা করার জন্য গালাগাল, হাতাহাতি, মারামারি থেকে হত্যা পর্যন্ত করে ফেলতে প্রস্তুত! তাহলে আমরা কিভাবে নিজেদের প্রস্তুত করব একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে? মা যদি আদর করে বলে, ‘ও এই কাজটা পারবেনা’, আমরা কেন হেসে তাঁকে আশ্বস্ত করিনা, ‘কেন পারবনা মা, একবার করতে দিয়েই দেখনা!’ বাবা বলার আগেই কেন লক্ষ্য করার চেষ্টা করিনা পরিবারের সদস্য হিসেবে আমি আমার পরিবারের জন্য কি করতে পারি? কেন ভাবিনা যে মানুষটা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমার পরিবারের জন্য কাজ করে তাকে একদিন চা বানিয়ে খাওয়াই? কেন আমাদের মাথায় আসেনা আমরা মাকে সেবা করে তাঁর পায়ের নীচে বেহেস্তের চাবিটা হস্তগত করি? কেন আমাদের জ্ঞান অর্জন এবং চর্চার প্রতি এত অনীহা? আজ আমাদের যে শক্তি, উদ্যম, উদ্দীপনা তা কিন্তু চিরস্থায়ী নয়। আমার দাদা একসময় জোয়ান সুপুরুষ ছিলেন, আমার দাদী একসময় সুন্দরী ষোড়শী তন্বি তরুণী ছিলেন। আজ তাদের দেখে কি আমরা তা কল্পনাও করতে পারি? আমাদের এই রঙ্গীন দিনগুলোও কিন্তু চিরকাল রইবেনা। সুতরাং আমাদের আজই নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে আগামী দিনের জন্য।
আমরা যারা আজকে কিশোর কিশোরী তারাই কিন্তু কাল মুসয়াব (রা)র মত যুবক, উম্মু কুলসুম বিন্ত উকবা (রা)র মত যুবতী হব। সুতরাং, আজই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা সিনেমা-টেলিভিশন, ফেসবুক-টুইটার, মোবাইল-চ্যাটিং, প্রেম-ফ্রেম জাতীয় ফলাফলশূন্য কাজে আজকের দিনটা ব্যায় করে কাল হায় হায় করব; নাকি লেখাপড়া, সৎকাজের অনুশীলন, চরিত্র গঠন, সামাজিক সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীলতার চর্চার মাধ্যমে আমার আজকে আমার আগামীর উত্তরণের জন্য সিঁড়ি হিসেবে ব্যাবহার করব।
তুলনায় সুখ অসুখ
সময় সময় আমার মাথায় অদ্ভুত সব খেয়াল চাপে। যেমন আজ ভারতীয় সঙ্গীত শিল্পী সোনু নিগামের ভারী দরদমাখা একখানা গান শুনে ভাবছিলাম এই লোকটার গলায় আল্লাহ এত দরদ ঢেলে দিয়েছেন, এত সুন্দর স্পষ্ট উচ্চারণ মাশাল্লাহ! পরে মসজিদে জুমার নামাজের সময় ইমাম সাহেবের ভারী তাৎপর্যপূর্ণ অথচ ভাঙ্গা গলায় ভুল উচ্চারণে খুতবা শোনার সময় মনে হোল সোনু নিগাম যদি এই অসাধারন গলায় পার্ফেক্ট উচ্চারণে কুর’আন তিলাওয়াত করতেন বা খুতবা দিতেন কেমন হত? হাসি পেল? কল্পনার ডানায় ভর করে যেকোন জায়গায় উড়ে যাওয়া যায়, ভাগ্যিস কল্পনাতে কেউ শেকল পরিয়ে দিতে পারেনা!
এমনই সব বিচিত্র খেয়ালী ভাবনা বসবাস করে আমার এলোমেলো মাথাটায়। এমন সব জিনিসে হাসি পায় যেটা কেউ দেখতেই পায়নি বরং কাউকে বোঝাতে গেলে হাসির মজাটাই নষ্ট হয়ে যায়, এমন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সব ঘটনায় অনুভূতিতে ভারাক্রান্ত হই যেগুলো হয়ত স্বাভাবিকভাবে কারো মাঝে কোন অনুভূতির উদ্রেক করেনা, আবার এমন সব কঠিন পরিস্থিতিতে শক্ত এবং অনড় থাকি যেখানে অনেকেই স্থির থাকতে পারেনা। আমার ধারণা এই বিচিত্র ব্যাপারগুলো হয় দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে। একই বস্তুতে একজন খুশি এবং আরেকজন বিরক্ত হতে পারে, যেমন যে সিগারেট খায় সে নিশ্চয়ই এতে আনন্দদায়ক কিছু একটা খুঁজে পায় যদিও আমার মনে হয় পয়সা দিয়ে এমন বিষ কিনে খেয়ে লাভ কি যা ধুঁকে ধুঁকে মারে, একবারে মরে গেলে নাহয় একটা কথা ছিল। এটা কারো উদার বা সংকীর্ণ হবার ব্যাপার নয়, বড় বা ছোট হবার মত কোন কিছু নয়, এমনকি ভাল বা খারাপের কোন সংজ্ঞায়ও একে সংজ্ঞায়িত করার কোন কারণ নেই। এটা কেবল নিজের জীবনকে সহজ বা কঠিন করে দেখার বিষয়।
আজকাল ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের যখন বলতে শুনি সবকিছু ‘বোরিং’, ‘আগের দিনগুলো মিস করি’ বা ‘এমন হলে কতই না ভাল হত’; অথবা বন্ধুদের চিন্তা করতে দেখি ‘আহা, এমন যদি হত’, ‘এমন হলে কি হবে’ বা ‘কেন যে এমন হোলনা’ আমার খুব হাসি পায় আবার দুঃখও লাগে। আত্মসমালোচনা মানুষকে উত্তরোত্তর উন্নততর মানুষে রূপান্তরিত করে কিন্তু জীবনের সমালোচনা মানুষকে কেবল হতাশাই দেয়। জীবনের কোন এক পর্যায়ের বা ঘটনার সাথে আরেক পর্যায়ের বা ঘটনার তুলনা করা অসুখী হবার সবচেয়ে কার্যকর রেসিপি। যেমন অনেক মেয়েদেরই বলতে শোনা যায়, ‘আহারে, বিয়ের আগে এমন ছিল, আর বিয়ের পর আরেকরকম’। কিন্তু আমার কাছে ব্যাপারটা মনে হয় সবুজ আর লাল আপেলের মাঝে তুলনা করার মত- দু’টোই আপেল, কিন্তু চেহারা এবং স্বাদের দিক থেকে দু’টো অনেক আলাদা। তার মানে এই নয় যে একটি ভাল এবং অপরটি খারাপ, বরং দু’টো দু’রকম ভাল। এখানে তুলনা করাটাই অবান্তর এবং এই তুলনার শেষফল হতাশা। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ের স্বাদ আলাদা, চ্যালেঞ্জ আলাদা, তাৎপর্য আলাদা। সুতরাং, কোন পর্যায় কেমন তা তুলনা না করে বরং প্রতিটি পর্বকে যথাসম্ভব উপভোগ সহকারে কার্যকর করার মাঝেই সার্থকতা নিহিত।

অনেক সময় কাউকে আফসোস করতে দেখা যায়, 'কেন এমন না হয়ে তেমন হোল, এমন হলে কতই না ভাল হত!' এটা আমার কাছে একপ্রকার অকৃতজ্ঞতা মনে হয়। প্রথমত, আমরা জানিনা কি হলে কেমন হত এবং যিনি বিশ্বের সবকিছু সৃষ্টি এবং পরিচালনা করছেন তিনিই ভাল জানেন কি হলে কি হত, এতটুকু বিশ্বাস মনে হয় আমরা তাঁর ওপর রাখতে পারি। দ্বিতীয়ত, ব্যাপারটা অনেকটা এমন যে আমি এক বন্ধুর সাথে থাকি কিন্তু আমি কেবল তার দোষগুলোই দেখতে পাই; অথচ সে আমার প্রতি কতটা সহৃদয় বা সহানুভূতিশীল, সে আমার কতখানি উপকারী বন্ধু তা আমার চোখেই পড়েনা। সেক্ষেত্রে আমাদের মাঝে সম্পর্ক কতদিন ভাল থাকবে তা হিসেব কষে বের করতে খুব বেশি বেগ পেতে হবেনা। একইভাবে আমাদের ফোকাস করা উচিত এমন সব জিনিসের প্রতি যেগুলো আমরা পেয়েছি বা পাচ্ছি যা হয়ত অনেকের নেই, অথচ তাদের যোগ্যতা বা অধিকার কোনদিক থেকেই আমাদের চেয়ে কম নয়। সেক্ষেত্রে যতটুকু যা পেলাম তার সবই লাভ, সবই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উৎস মনে হবে। আর জীবনের খুঁত খুঁজতে গেলে স্বভাবতই প্রশ্ন আসবে, ‘আমার যা আছে তা পাবার মত কি যোগ্যতা আছে আমার, বা কি এমন মহৎ কাজ আমি করেছি যে লক্ষ লক্ষ মানুষের তা নেই যা আমার আছে? এগুলোর হিসেব না কষে কি পাইনি তার হিসেব করতে বসার কি অধিকার আছে আমার?’
সৃষ্টিকর্তা কাউকে কম বেশি দেননা, তিনি সুবিবেচক তাই বিবেচনা করে যার যেটা প্রয়োজন তাকে সেটাই দেন। আবার লাল আর সবুজ আপেলের তুলনায় ফিরে যেতে হয়। তিনি কাউকে ধনসম্পদ দেন, কাউকে জ্ঞানবুদ্ধি দেন, কাউকে দেন শারীরিক সৌন্দর্য, কাউকে দেন সুন্দর স্বভাব- সবাইকে সব দেয়া নিষ্প্রয়োজন আবার যাকে যেটা দেন সেটা তার জন্য পরীক্ষার নিমিত্তও বটে। যার যেটা নেই সেটা নিয়ে সে কতটা ধৈর্য্যশীল থাকে সেটা যেমন তার জন্য পরীক্ষা, একইভাবে যার যেটা আছে সেটা সে কতটা কাজে লাগায় সেটা তার জন্য আরো বড় পরীক্ষা। যেমন, কেউ একজন জীবনে অনেক প্রতিকুলতা এবং সংঘর্ষের সম্মুখীন হোল- ধৈর্য্য এবং সাহসের সাথে এই পরিস্থিতির মুকাবিলা করা তার জন্য একপ্রকার পরীক্ষা। কিন্তু সে যদি ভাল বুঝতে এবং বুঝাতে পারে সেক্ষেত্রে সে এই মেধা অন্যের উপকারে ব্যাবহার করল কিনা, নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে অন্যকে একই পরিস্থিতির মুকাবিলার জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করল কিনা, নাকি মর্মাহত হৃদয়ের খোরাক জুগিয়ে নিজের প্রতি করুণায় মূর্চ্ছা যেয়ে জীবন কাটিয়ে দিল এবং অন্যের সহযোগিতার চেষ্টাকে দায়িত্ব মনে করলনা এটাও তার জন্য পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় কার প্রশ্নপত্রে কি আছে তা খুঁজে বের করার চেয়ে নিজের প্রশ্নে কি আছে এবং এর উত্তর কিভাবে দিলে বেশি মার্কস পাওয়া যেতে পারে এই পদ্ধতি অবলম্বন করাই অধিকতর কার্যকর। সেক্ষেত্রে নিজের সীমাবদ্ধতাকে উত্তরণ করা যেমন সহজ হয় তেমনি অন্যের যোগ্যতাকে সম্মান করার মানসিকতা সৃষ্টি হয়।
আজ এমন একজনের কথা খুব মনে পড়ছে যার কথা মনে হলেই অনুভূতিগুলো গলায় দলা পাকিয়ে যায়। ছোটবেলায় আবুধাবীতে ছিলাম। সকালের অধিবেশন শুরু হবার আগেই আমরা টিভি ছেড়ে বসে যেতাম যেন কার্টুন মিস না হয়। প্রতিদিন অধিবেশন শুরু হত কুর’আন তিলাওয়াত দিয়ে। একেকদিন একেকজন ক্কির’আত করতেন। এক ব্যাক্তি প্রায়ই কুর’আন তিলাওয়াত করতেন গাঢ় কালো চশমা পরে। আমরা ভাইবোনরা এই মডার্ন ক্কারীকে দেখে খুব মজা পেতাম। পরে একদিন বুঝতে পারলাম তিনি স্টাইলের জন্য চশমা পরেন না, চশমা পরেন কারণ তিনি অন্ধ। তাঁকে দেখে হঠাৎ নিজের প্রতি করুণা উৎলে উঠল। হ্যাঁ, তাঁর প্রতি নয়, নিজের প্রতি। কেউ দেখে দৃষ্টি দিয়ে, আর কেউ দেখে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে। আল্লাহ তাঁকে দৃষ্টি দেননি কিন্তু তাঁর অন্তর এতখানি প্রশস্ত করে দিয়েছেন যে পৃথিবীর সবচেয়ে আলোকিত কিতাবটি তিনি দৃষ্টিহীন হয়েও হৃদয়ে ধারণ করে আছেন। অথচ আল্লাহ আমাকে সুস্থ সবল করে তৈরী করেছেন, চোখে কোনদিন চশমা লাগেনি, হাজার হাজার বই পড়েছি দিনরাত বসে অথচ আল্লাহর বইটি পড়ার সময় হয়নি। তাহলে আমি এই চোখের কি কৃতজ্ঞতা আদায় করলাম?
এভাবে দৈনন্দিন জীবনের এক একটি উপহার নিয়ে যদি এক একটি মূহূর্তও চিন্তা করি আমরা- কৃতজ্ঞতার জোয়ারে ভেসে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকবেনা, আর কিছু চিন্তা করার সময় থাকবেনা, জীবনের প্রতি কোনপ্রকার অসন্তুষ্টি অনুভব করার উপায় থাকবেনা।
তাই জীবনে যতই হতাশা আসুক বা কঠিন মূহূর্ত, আমরা ঐ মূহূর্তটিকে যদি যথার্থ সম্মান করতে পারি, ঐ মূহূর্তের চ্যালেঞ্জটিকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে মুকাবিলা করতে পারি, ঐ সময়টিই যে আমার জীবনের সুন্দর সময়গুলোর সৌন্দর্য আমার কাছে সম্যকরূপে তুলে ধরে তা অনুধাবন করতে পারি- তাহলে শেলীর মত আমরাও বলতে পারব- ‘Our sweetest songs are those that tell of saddest thought’. তখন আমাদের হৃদয়ে ঘাসফুলের মোহনীয় গন্ধ, রংধনুর মনকাড়া রঙ, মেঘের আকারের সতত পরিবর্তনশীলতা, তেঁতুলের স্বাদ, বৃষ্টির ঝরঝর শব্দ, বন্ধুর হাসি, শিশুর পেলব ত্বকের ছোঁয়া- সবই আনন্দের উৎস হয়ে ব্যাথাবিনাশকরূপে আবির্ভূত হবে; এই ভগ্ন অন্তকরণকে প্রতিদিন রিচার্জ করে তাকে সজীব করে তুলবে। তখন আমরা চোখে অশ্রু নিয়েও মন খুলে হাসতে পারব, মনে কষ্ট নিয়েও জীবনের মর্মার্থ খুঁজে পাব, জীবনের বন্ধুর পথ সাহসের সাথে পাড়ি দিতে পারব, কেউ পাশে না থাকলেও সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধুর হাত ধরে এগিয়ে যেতে পারব। চাই শুধু দৃষ্টিভঙ্গির একটু পরিবর্তন আর সর্বক্ষণ পাশে থাকা বন্ধুর ওপর বিশ্বাস।
এমনই সব বিচিত্র খেয়ালী ভাবনা বসবাস করে আমার এলোমেলো মাথাটায়। এমন সব জিনিসে হাসি পায় যেটা কেউ দেখতেই পায়নি বরং কাউকে বোঝাতে গেলে হাসির মজাটাই নষ্ট হয়ে যায়, এমন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সব ঘটনায় অনুভূতিতে ভারাক্রান্ত হই যেগুলো হয়ত স্বাভাবিকভাবে কারো মাঝে কোন অনুভূতির উদ্রেক করেনা, আবার এমন সব কঠিন পরিস্থিতিতে শক্ত এবং অনড় থাকি যেখানে অনেকেই স্থির থাকতে পারেনা। আমার ধারণা এই বিচিত্র ব্যাপারগুলো হয় দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে। একই বস্তুতে একজন খুশি এবং আরেকজন বিরক্ত হতে পারে, যেমন যে সিগারেট খায় সে নিশ্চয়ই এতে আনন্দদায়ক কিছু একটা খুঁজে পায় যদিও আমার মনে হয় পয়সা দিয়ে এমন বিষ কিনে খেয়ে লাভ কি যা ধুঁকে ধুঁকে মারে, একবারে মরে গেলে নাহয় একটা কথা ছিল। এটা কারো উদার বা সংকীর্ণ হবার ব্যাপার নয়, বড় বা ছোট হবার মত কোন কিছু নয়, এমনকি ভাল বা খারাপের কোন সংজ্ঞায়ও একে সংজ্ঞায়িত করার কোন কারণ নেই। এটা কেবল নিজের জীবনকে সহজ বা কঠিন করে দেখার বিষয়।
আজকাল ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের যখন বলতে শুনি সবকিছু ‘বোরিং’, ‘আগের দিনগুলো মিস করি’ বা ‘এমন হলে কতই না ভাল হত’; অথবা বন্ধুদের চিন্তা করতে দেখি ‘আহা, এমন যদি হত’, ‘এমন হলে কি হবে’ বা ‘কেন যে এমন হোলনা’ আমার খুব হাসি পায় আবার দুঃখও লাগে। আত্মসমালোচনা মানুষকে উত্তরোত্তর উন্নততর মানুষে রূপান্তরিত করে কিন্তু জীবনের সমালোচনা মানুষকে কেবল হতাশাই দেয়। জীবনের কোন এক পর্যায়ের বা ঘটনার সাথে আরেক পর্যায়ের বা ঘটনার তুলনা করা অসুখী হবার সবচেয়ে কার্যকর রেসিপি। যেমন অনেক মেয়েদেরই বলতে শোনা যায়, ‘আহারে, বিয়ের আগে এমন ছিল, আর বিয়ের পর আরেকরকম’। কিন্তু আমার কাছে ব্যাপারটা মনে হয় সবুজ আর লাল আপেলের মাঝে তুলনা করার মত- দু’টোই আপেল, কিন্তু চেহারা এবং স্বাদের দিক থেকে দু’টো অনেক আলাদা। তার মানে এই নয় যে একটি ভাল এবং অপরটি খারাপ, বরং দু’টো দু’রকম ভাল। এখানে তুলনা করাটাই অবান্তর এবং এই তুলনার শেষফল হতাশা। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ের স্বাদ আলাদা, চ্যালেঞ্জ আলাদা, তাৎপর্য আলাদা। সুতরাং, কোন পর্যায় কেমন তা তুলনা না করে বরং প্রতিটি পর্বকে যথাসম্ভব উপভোগ সহকারে কার্যকর করার মাঝেই সার্থকতা নিহিত।
অনেক সময় কাউকে আফসোস করতে দেখা যায়, 'কেন এমন না হয়ে তেমন হোল, এমন হলে কতই না ভাল হত!' এটা আমার কাছে একপ্রকার অকৃতজ্ঞতা মনে হয়। প্রথমত, আমরা জানিনা কি হলে কেমন হত এবং যিনি বিশ্বের সবকিছু সৃষ্টি এবং পরিচালনা করছেন তিনিই ভাল জানেন কি হলে কি হত, এতটুকু বিশ্বাস মনে হয় আমরা তাঁর ওপর রাখতে পারি। দ্বিতীয়ত, ব্যাপারটা অনেকটা এমন যে আমি এক বন্ধুর সাথে থাকি কিন্তু আমি কেবল তার দোষগুলোই দেখতে পাই; অথচ সে আমার প্রতি কতটা সহৃদয় বা সহানুভূতিশীল, সে আমার কতখানি উপকারী বন্ধু তা আমার চোখেই পড়েনা। সেক্ষেত্রে আমাদের মাঝে সম্পর্ক কতদিন ভাল থাকবে তা হিসেব কষে বের করতে খুব বেশি বেগ পেতে হবেনা। একইভাবে আমাদের ফোকাস করা উচিত এমন সব জিনিসের প্রতি যেগুলো আমরা পেয়েছি বা পাচ্ছি যা হয়ত অনেকের নেই, অথচ তাদের যোগ্যতা বা অধিকার কোনদিক থেকেই আমাদের চেয়ে কম নয়। সেক্ষেত্রে যতটুকু যা পেলাম তার সবই লাভ, সবই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উৎস মনে হবে। আর জীবনের খুঁত খুঁজতে গেলে স্বভাবতই প্রশ্ন আসবে, ‘আমার যা আছে তা পাবার মত কি যোগ্যতা আছে আমার, বা কি এমন মহৎ কাজ আমি করেছি যে লক্ষ লক্ষ মানুষের তা নেই যা আমার আছে? এগুলোর হিসেব না কষে কি পাইনি তার হিসেব করতে বসার কি অধিকার আছে আমার?’
সৃষ্টিকর্তা কাউকে কম বেশি দেননা, তিনি সুবিবেচক তাই বিবেচনা করে যার যেটা প্রয়োজন তাকে সেটাই দেন। আবার লাল আর সবুজ আপেলের তুলনায় ফিরে যেতে হয়। তিনি কাউকে ধনসম্পদ দেন, কাউকে জ্ঞানবুদ্ধি দেন, কাউকে দেন শারীরিক সৌন্দর্য, কাউকে দেন সুন্দর স্বভাব- সবাইকে সব দেয়া নিষ্প্রয়োজন আবার যাকে যেটা দেন সেটা তার জন্য পরীক্ষার নিমিত্তও বটে। যার যেটা নেই সেটা নিয়ে সে কতটা ধৈর্য্যশীল থাকে সেটা যেমন তার জন্য পরীক্ষা, একইভাবে যার যেটা আছে সেটা সে কতটা কাজে লাগায় সেটা তার জন্য আরো বড় পরীক্ষা। যেমন, কেউ একজন জীবনে অনেক প্রতিকুলতা এবং সংঘর্ষের সম্মুখীন হোল- ধৈর্য্য এবং সাহসের সাথে এই পরিস্থিতির মুকাবিলা করা তার জন্য একপ্রকার পরীক্ষা। কিন্তু সে যদি ভাল বুঝতে এবং বুঝাতে পারে সেক্ষেত্রে সে এই মেধা অন্যের উপকারে ব্যাবহার করল কিনা, নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে অন্যকে একই পরিস্থিতির মুকাবিলার জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করল কিনা, নাকি মর্মাহত হৃদয়ের খোরাক জুগিয়ে নিজের প্রতি করুণায় মূর্চ্ছা যেয়ে জীবন কাটিয়ে দিল এবং অন্যের সহযোগিতার চেষ্টাকে দায়িত্ব মনে করলনা এটাও তার জন্য পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় কার প্রশ্নপত্রে কি আছে তা খুঁজে বের করার চেয়ে নিজের প্রশ্নে কি আছে এবং এর উত্তর কিভাবে দিলে বেশি মার্কস পাওয়া যেতে পারে এই পদ্ধতি অবলম্বন করাই অধিকতর কার্যকর। সেক্ষেত্রে নিজের সীমাবদ্ধতাকে উত্তরণ করা যেমন সহজ হয় তেমনি অন্যের যোগ্যতাকে সম্মান করার মানসিকতা সৃষ্টি হয়।
আজ এমন একজনের কথা খুব মনে পড়ছে যার কথা মনে হলেই অনুভূতিগুলো গলায় দলা পাকিয়ে যায়। ছোটবেলায় আবুধাবীতে ছিলাম। সকালের অধিবেশন শুরু হবার আগেই আমরা টিভি ছেড়ে বসে যেতাম যেন কার্টুন মিস না হয়। প্রতিদিন অধিবেশন শুরু হত কুর’আন তিলাওয়াত দিয়ে। একেকদিন একেকজন ক্কির’আত করতেন। এক ব্যাক্তি প্রায়ই কুর’আন তিলাওয়াত করতেন গাঢ় কালো চশমা পরে। আমরা ভাইবোনরা এই মডার্ন ক্কারীকে দেখে খুব মজা পেতাম। পরে একদিন বুঝতে পারলাম তিনি স্টাইলের জন্য চশমা পরেন না, চশমা পরেন কারণ তিনি অন্ধ। তাঁকে দেখে হঠাৎ নিজের প্রতি করুণা উৎলে উঠল। হ্যাঁ, তাঁর প্রতি নয়, নিজের প্রতি। কেউ দেখে দৃষ্টি দিয়ে, আর কেউ দেখে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে। আল্লাহ তাঁকে দৃষ্টি দেননি কিন্তু তাঁর অন্তর এতখানি প্রশস্ত করে দিয়েছেন যে পৃথিবীর সবচেয়ে আলোকিত কিতাবটি তিনি দৃষ্টিহীন হয়েও হৃদয়ে ধারণ করে আছেন। অথচ আল্লাহ আমাকে সুস্থ সবল করে তৈরী করেছেন, চোখে কোনদিন চশমা লাগেনি, হাজার হাজার বই পড়েছি দিনরাত বসে অথচ আল্লাহর বইটি পড়ার সময় হয়নি। তাহলে আমি এই চোখের কি কৃতজ্ঞতা আদায় করলাম?
এভাবে দৈনন্দিন জীবনের এক একটি উপহার নিয়ে যদি এক একটি মূহূর্তও চিন্তা করি আমরা- কৃতজ্ঞতার জোয়ারে ভেসে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকবেনা, আর কিছু চিন্তা করার সময় থাকবেনা, জীবনের প্রতি কোনপ্রকার অসন্তুষ্টি অনুভব করার উপায় থাকবেনা।
তাই জীবনে যতই হতাশা আসুক বা কঠিন মূহূর্ত, আমরা ঐ মূহূর্তটিকে যদি যথার্থ সম্মান করতে পারি, ঐ মূহূর্তের চ্যালেঞ্জটিকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে মুকাবিলা করতে পারি, ঐ সময়টিই যে আমার জীবনের সুন্দর সময়গুলোর সৌন্দর্য আমার কাছে সম্যকরূপে তুলে ধরে তা অনুধাবন করতে পারি- তাহলে শেলীর মত আমরাও বলতে পারব- ‘Our sweetest songs are those that tell of saddest thought’. তখন আমাদের হৃদয়ে ঘাসফুলের মোহনীয় গন্ধ, রংধনুর মনকাড়া রঙ, মেঘের আকারের সতত পরিবর্তনশীলতা, তেঁতুলের স্বাদ, বৃষ্টির ঝরঝর শব্দ, বন্ধুর হাসি, শিশুর পেলব ত্বকের ছোঁয়া- সবই আনন্দের উৎস হয়ে ব্যাথাবিনাশকরূপে আবির্ভূত হবে; এই ভগ্ন অন্তকরণকে প্রতিদিন রিচার্জ করে তাকে সজীব করে তুলবে। তখন আমরা চোখে অশ্রু নিয়েও মন খুলে হাসতে পারব, মনে কষ্ট নিয়েও জীবনের মর্মার্থ খুঁজে পাব, জীবনের বন্ধুর পথ সাহসের সাথে পাড়ি দিতে পারব, কেউ পাশে না থাকলেও সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধুর হাত ধরে এগিয়ে যেতে পারব। চাই শুধু দৃষ্টিভঙ্গির একটু পরিবর্তন আর সর্বক্ষণ পাশে থাকা বন্ধুর ওপর বিশ্বাস।
শেকড়
এক দাওয়াতে উপস্থিত নারীগোষ্ঠির কথোপকথনের এক পর্যায়ে একজন বললেন, ‘কাল আমাদের দোকানে এক বাংলাদেশী পরিবার এসে অনেক কেনাকাটা করে নিয়ে গেল’। শুনে আরেকজন অত্যন্ত উৎসাহের সাথে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি পরিচয় দেননি যে আপনি বাংলাদেশী?’ তিনি নাক কুঁচকে বললেন, ‘নাহ! কি বলব? ‘আমি বাংলাদেশী’? কেমন ক্ষেত ক্ষেত লাগে!’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাওয়াতে উপস্থিতির বিরক্তির মত এটাও গলাধঃকরণ করলাম। জীবনের অর্ধেকের বেশি দেশের বাইরে থেকেও আমি আমার গায়ে ক্ষেতের গন্ধটা বড় উপভোগ করি, কোথাও কাউকে ফোনে বাংলা বলতে শুনলেও দাঁড়িয়ে তাদের সাথে কথা বলি, CELTA ক্লাস নিতে গিয়ে একজন বাংলাদেশী ছাত্র পেয়ে আমার সেকি আনন্দ! অথচ আমাদের এই ‘দেশী’ ভাইবোনরা গ্রাম থেকে ক্যানাডা এসে কয়েকমাসের ভেতর ক্ষেতের গন্ধ ঝেড়ে ফেলেন এমনভাবে যে তাতে পাকা ধানের সুঘ্রান, আমের বোলের সুবাস, ঘাসফুলের মাতাল করা গন্ধ সব এক ঝটকায় দূর হয়ে যায়। পরিচয় না দিলে তাদের পোশাক আশাক চালচলন থেকে কথাবার্তায় চেনার কোন উপায় থাকেনা যে তারা বাংলাদেশী। আর পরিচয় তারা দেননা।
এই যেমন ক’দিন আগে এক দু’আ মাহফিলে এক মহিলাকে দেখে বান্ধবী তানজিন (ব্লগার সুলতানা) বলল, ‘এই মহিলা তো অমুক দোকানে কাজ করেন, যেখানে অফিসের ফাঁকে আপনি আপনার চাইনীজ বান্ধবীদের নিয়ে ঘুরতে যেতেন, যেখান থেকে আমি নিয়মিত আমার বাচ্চাদের কাপড় কিনতাম। কতবার জিজ্ঞেস করেছি, ‘আপনি কি বাংলাদেশী?’ উনি গা ঝাড়া দিয়ে বলতেন, ‘No, I’m Indian!’ উনি মিথ্যা বললেন কেন?’ সরল সহজ বান্ধবীটিকে বোঝাতে পারলাম না এক্ষেত্রে নীরবতা পালনই শ্রেষ্ঠ পন্থা, উনি তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি বাংলাদেশী?’ সবার সামনে উনি স্বীকার করতে বাধ্য হলেন। তখন তানজিন বলল, ‘রেহনুমা, এই মহিলা হাতাকাটা টিশার্ট আর টাইট জিন্স পরে দোকানে কাজ করেন, আর এখানে তিনি একেবারে মাথায় স্কার্ফ বেঁধে চলে এসেছেন! আমার সাথে এই কপটতা করে ওনার কি লাভ? উনি আমাকে সত্য বললে ওনার কি ক্ষতি হত?’ কি উত্তর দেব বেচারীকে? এই একই প্রশ্ন তো আমারও! গতকাল এই প্রশ্ন আবার উত্থাপন করলেন আমার এক ছাত্রীর মা। তাকে বললাম, ‘আসলে আমি নিজেই বুঝিনা, হয়ত যেহেতু আমি নিজেই মাটির টান উপেক্ষা করতে পারিনা তাই। কিন্তু যখন দেখি ক্যানাডিয়ানরা আট দশ পুরুষ আগে ইউরোপের মাটি থেকে উপড়ে আসা দাদা পর দাদাদের কথা বলে নিজেদের পরিচয় দেয়, ‘আমি অর্ধেক ফ্রেঞ্চ এক চতুর্থাংশ জার্মান, এক চতুর্থাংশ হাঙ্গেরিয়ান ক্যানাডিয়ান। আমার অষ্টম পুরুষে দাদা দাদী ফ্রান্স থেকে এসেছিলেন, নানা ছিলেন জার্মান এবং নানু ছিলেন হাঙ্গেরি থেকে আগত রিফিউজি’, তখন চিন্তা করি আমাদের কেন এক পুরুষ পেরোবার আগেই শেকড় কেটে দেয়ার এত তাড়া? আর শেকড়বিচ্ছিন্ন হলে আমাদের সন্তানরা কিভাবে তাদের পরিচয় দেবে? জানিনা। একুশে ফেব্রুয়ারী আর পহেলা বৈশাখে শাড়ি পরে গান গেয়ে বছরের বাকী দিনগুলো জিন্স আর টিশার্ট পরে ইংরেজী চর্চা করলেই কি আমরা স্বদেশের প্রতি দায়িত্ব পালন করে ফেলতে পারব না ক্ষেতের গন্ধ মুছে ফেলে পুরোদস্তুর ক্যানাডিয়ান হয়ে যেতে পারব? এদেরই ছেলেমেয়েরা বলে, ‘I hate Bangladesh’, এরাই বাংলাদেশের আলোহাওয়া গন্ধ লোকজন সব অপাংক্তেয় ভাবে। ওরা rice খায়, grocery করে, mallএ যায় আর দেশের সব আত্মীয়স্বজনকে uneducated unsophisticated brutes মনে করে কারণ ওরা English বলতে পারেনা। পাশাপাশি আমরা যারা এখনো ভাত খাই, বাজার করি, বাজারে যাই এবং নির্দিষ্ট দিনগুলো ছাড়াও বাংলা বলি তারাও তাদের কাছে ক্ষেত। ক’দিন আগে এক ভাই দুঃখ করে বললেন, ‘বুঝলেন ভাবী, আমি দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলাম ক্যানাডিয়ানদের মধ্যেও স্বজনপ্রীতি আছে!’ আমি ওনার আশ্চর্য হওয়া দেখে আশ্চর্য হলাম! শত শত বছর ধরে পৃথিবীব্যাপী শুধুমাত্র শ্বেতচর্মকে পুঁজি করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে কারা, কাদের বিরুদ্ধে লড়েছেন গান্ধী আর ম্যান্ডেলারা? কাদের বিরুদ্ধে এখনো লড়ে চলেছে কৃষ্ণচর্ম, হিস্পানিক থেকে বাকী বিশ্বের লোকজন? তাহলে ওদের দেবতা মনে করার কি কারণ থাকতে পারে? ওদের সাথে আমাদের সম্পর্ক একটাই- আমাদের দেশে খাবারের অভাব, ওদের দেশে লোকবলের অভাব- আমরা ওদের প্রয়োজন পূরণ করব, ওরা আমাদের প্রয়োজন পূরণ করবে। ওরা কখনো আমাদের buddy হবেনা, আমরা কখনো ওদের friend হবনা। সুতরাং, আমরা যতই শেকড় কেটে মাটির গন্ধটা দূর করার চেষ্টা করিনা কেন তাতে আমাদের একুল ওকুল দুকুল যাবে, এছাড়া আর কোন লাভ হবেনা। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হোল, এখানকার সংস্কৃতির সাথে মিলে যাবার জন্য এখানে সরকারের দিক থেকে কোন চাপ নেই। দিব্যি মেয়েরা লম্বা কালো বোরকা পরে ব্যাঙ্কে অফিসে ডেকায়ারে কাজ করছে; শিখরা মাথায় বিশাল পাগড়ী বেঁধে অফিসে যাচ্ছে, দোকানে কাজ করছে; সালোয়ার কামিজ পরা মহিলারা সরকারী অফিসে কাজ করছে। যেকোন সময় মলে গেলে এক জায়গায় অন্তত জনা বিশেক হিজাবপরা মহিলা দেখতে পাওয়া যায়- সেলসম্যান এবং ক্রেতা উভয় গ্রুপে। প্রচুর শ্বেতচর্ম ক্যানাডিয়ান আছে যারা মদ এবং শুকরের মাংস স্পর্শ করেনা, নারীপুরুষ হ্যান্ডশেক করেনা, মেয়েরা আদিকালের মত হাতেবোনা লম্বা ম্যাক্সি আর স্কার্ফ পরে চলে- কিন্তু অনেক বাংলাদেশী আছেন যারা এসব restrictions মেনে চলাকে ক্ষেত মনে করেন। এখানে শিখ মহিলারা সালোয়ার কামিজের সাথে মাথায় বিশাল ওড়না দিয়ে সর্বত্র চলাফেরা করে- কাজ থেকে বাজার, সর্বত্র; আরবী মহিলারা বোরকা পরে বিরাট বিরাট গাড়ি চালায়; আফগান মহিলারা নিকাব দিয়ে পাঁচছ’টা বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে একাই বাজার সাজার সারে; সোমালী মহিলারা তাদের ট্রেডিশনাল রংবেরঙের জামা পরে প্রজাপ্রতির মত অফিস বিল্ডিংগুলো রাঙ্গিয়ে দেয়। সমস্যা কেবল আমাদের, আমরাই কেবল identity crisisএ ভুগি যেন কেউ বুঝতে না পারে আমরা বাংলাদেশী, যদিও আমাদের চামড়া যত ফর্সা হোক না কেন ওদের চোখে আমরা ‘কালোচামড়া’ ছাড়া আর কিছুই নই, হওয়া সম্ভবও নয়। আমার যেটা দুঃখ লাগে তা হোল আমরা কেন ওদের কাছ থেকে এই জিনিসগুলো নিতে পারিনা যে ওরা অসম্ভব ভদ্র, ওরা পরিচিত অপরিচিত সবার সাথে হেসে কথা বলে, ওরা যেকোন দরজা খুললে পরবর্তী অন্তত আধাডজন মানুষের জন্য দরজা খুলে ধরে রাখে, যেকোন জায়গা দেখিয়ে দিতে বললে নিজের কাজ বাদ দিয়ে ঐ জায়গা পর্যন্ত আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসে, বরফের ভেতর উলটো পথে ঘুরে আপনার বাজার আপনার বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে নিজের কাজে যায় যদিও সে কোনদিন আপনাকে দেখেনি বা চেনেনা... । আমরা কেবল তাদের টাইট জিন্স, মিনি স্কার্ট আর ক্ষুদ্র টপটাই দেখি কিন্তু বুঝিনা এটা তাদের জন্য choice নয় availabilityর ব্যাপার, cultureএর প্রশ্ন- তাই দেখা যায় মাইক্রোমিনিস্কার্ট পরা মেয়েটা ট্রেনে সম্পূর্ণ পথ দাঁড়িয়ে যায় কিন্তু পাশে খালি সীটটাতে কোন অপরিচিত পুরুষের পাশে বসেনা, সর্বত্র মেয়েগুলো জামাকাপড় একটু পর পর একবার নীচে একবার ওপরে টানাটানি করে অস্বস্তি জানান দেয়, কিন্তু তাদের সামনে আর কোন বিকল্প নেই এবং বিকল্প পেলে ওরা তাকে গ্রহণ করতে এক মূহূর্তের জন্যও দ্বিধা করেনা। আমি ইন্ডিয়াতে থাকাকালীন বা চট্টগ্রামেও দেখেছি এরা কত দ্রুত সালোয়ার কামিজের সুন্দর কালেকশন গড়ে তোলে। আর আমরা সুযোগ পেলেই নিজের শেকড় উপরে ফেলে দেয়ার চেষ্টায় লিপ্ত থাকি! হা কপাল! বিদেশে মানুষ নানাকারণেই থাকে বা থাকতে বাধ্য হয়, (আমার প্রবাস জীবন) অনেকে হয়ত সারাজীবনই থেকে যেতে বাধ্য হন। একসময় তারা সেদেশের অধিবাসী হয়ে যান এমন ইতিহাসে অনেকেই হয়েছে। যেমন আমাদের রাসূল (সা.) স্বয়ং স্বদেশবাসীর অত্যাচারে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন এবং সেদেশেই কবরস্থ হয়েছেন কিন্তু তাই বলে নিজের জন্মস্থানকে অস্বীকার করেননি। তাহলে আমরা কেন এত তৎপর আমাদের শেকড়ের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে মাটির সাথে প্রাণের অদৃশ্য সুতোর টানটা কেটে দিতে? মানুষ একে জিইয়ে রাখার জন্য কি প্রাণান্তকর কষ্টটাই না করে! তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ অ্যালেক্স হেইলির ‘রুটস’ উপাখ্যানটি। আর আমরা যদি একে অপ্রয়োজনীয় মনে করে ছুঁড়ে ফেলে দেই, হয়ত একসময় আমাদের আর কোন পরিচয়ই থাকবেনা! থাকবেনা পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার মাটিটুকুও! | |
Subscribe to:
Posts (Atom)