Sunday, December 9, 2012

আগে বিশ্ববিদ্যালয়, পরে বিদ্যালয়

আমার দুই ছেলেমেয়েই বিদ্যালয়ে যাবার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছে!




বিয়ের আগে থেকেই একটা স্কুলে কাজ করতাম। আমার মেয়ের জন্মের আগের দিন পর্যন্ত কাজ করেছি। এরপর আশা করেছিলাম তিনমাস ছুটি পাব। কার্যত দেখা গেল একমাস যেতে না যেতেই আমার অনুপস্থিতির ফলে স্কুলের কাজকর্মে নানাবিধ অসুবিধা হচ্ছে। দেড়মাসের সময় ঠিক হোল প্রতিদিন দু’ঘন্টা করে হাজিরা দেব। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে নিজেই টের পেলাম আমি জয়েন না করলে আর চলছেনা। এর মধ্যেই আবার আমার মাস্টার্সের রেজাল্ট বের হয়, ইউনিভার্সিটিতে চাকরী হয়। নির্দিষ্ট একটা সময় আমাকে উভয় জায়গায় কাজ করতে হয় স্কুলের দায়িত্ব স্কুলের লোকজন বুঝে নেয়া পর্যন্ত। কি আর করা! উভয় প্রতিষ্ঠানে বলে দিলাম আমি বাচ্চা নিয়ে আসব- আমার শুধু একটা কামরার প্রয়োজন, বাকী সব দায়িত্ব আমার। উভয় কর্তৃপক্ষ রাদিয়ার জন্য রুমের ব্যবস্থা করেন। ওকে দেখার জন্য স্কুলের দারোয়ান লতিফের বৌ সাজেদাকে নিয়োগ দিলাম। তদারক করার জন্য সাথে ছিল আমার বহুবছরের বিশ্বস্ত সহকর্মী রুবি, সালেহা আর মোমেনা আপা। আমি ছাত্রী থাকা অবস্থায় যে স্কুলে চাকরী করতাম সেখানে ওরা পিয়ন ছিলেন। পরে আমি এই স্কুলে আছি শুনে ওরাও আগের স্কুলের চাকরী ছেড়ে এখানে চলে আসেন। রাদিয়া আমার সাথে স্কুলে আর ইউনিভার্সিটিতে মিলিয়ে থাকে। পরে দেখা গেল ইউনিভার্সিটিতে বড় বড় আপুরা ওকে আদর করার জন্য কম্পিটিশন লাগাচ্ছে। আমার বেরসিক মেয়ের এত আদর পছন্দ না। রাদিয়াকে স্কুলে রাখলেই বরং সে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে পারে। স্কুলের সব শিক্ষক কর্মচারী আমাদের বহুবছরের পরিচিত বিধায় আমার মেয়ের জন্য পরিবেশটা পরিবারের মতই ছিল। তাছাড়া ঐ স্কুলে ছিল ওর বাবা। তাই শেষপর্যন্ত ওকে স্কুলেই রাখার সিদ্ধান্ত হয়। উভয় প্রতিষ্ঠান কাছাকাছি হওয়ায় আমি যাতায়াত করে ওর দেখাশোনা, খাওয়াদাওয়া আর সাজেদার তদারকি করতে পারতাম। মাঝে মাঝে সে আমার সাথে ইউনিভার্সিটি যেত। একদিন গিয়ে দেখি সে দারোয়ানের চেয়ারে বসে সবাইকে লাঠি দিয়ে ডাইরেকশন দিচ্ছে! তখন ওর বয়স দেড় বছর। সাথে সাথে দিলাম স্কুলে ভর্তি করে। সে ক্লাসে বসে টিফিন খাওয়া ছাড়া আর কিছু করতনা। কিন্তু বসে বসে লাঠি ঘোরানোর চেয়ে ক্লাসে বসে টিফিন খাওয়া ভালো।

ইউনিভার্সিটির পিকনিকে, স্টাডি ট্যুরে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমার কন্যা স্পেশাল অতিথির ভূমিকা পালন করতেন। একবারের কথা খুব মনে পড়ে। মাস্টার্সের বিদায়ী ছাত্রীরা আমাদের ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকদের বাঁশখালীতে বামের ছড়া নামে ভারী সুন্দর এক জায়গায় বেড়াতে নিয়ে গেল। নানান আয়োজনের মধ্যে এক পর্যায়ে ছিল পিলোপাসিং। শিক্ষক ছাত্রী সব মিলে ৫০ জনের মধ্যে। প্রথমে ভাবলাম পুরোটা জগাখিচুড়ি হয়ে যাবে কিন্তু পরে বেশ মজাই হোল! আশ্চর্য ব্যাপার হোল শিক্ষকরা একনাগাড়ে সবাই আউট হতে থাকলেন। আমি শেষ চারজন পর্যন্ত টিকে থেকে আউট হয়ে গেলাম। রাদিয়া তখনো কিভাবে কিভাবে যেন ফাঁকফোঁকর গলে রয়ে গেছে। আমাদের ডিপার্টমেন্টের সব শিক্ষক ওকে উৎসাহিত করতে লাগলেন, ‘রাদিয়া, ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের ইজ্জত এখন তোমার হাতে, তোমাকে জিততেই হবে”! আমার ঐ পিচ্চি মেয়ে এই বিশাল দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সত্যি সত্যি ফার্স্ট হয়ে গেল! শিক্ষকমন্ডলী খুশীতে ওকে কোলে তুলে নিলেন! ঐ পুরস্কার আমার মেয়ের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিজয়ের স্বাক্ষর কেননা সেবারে সে ওর চেয়ে বড়, জ্ঞানী আর বুদ্ধিমান ৪৯ জনকে হারিয়ে এই পুরস্কার জিতেছিল! তার ওপর বাড়তি পাওনা ইংরেজী ডিপার্টমেন্টের ইজ্জত রক্ষাকারীর খেতাব!!

রাদিয়া বড় হয়ে গেলে সাজেদাকে স্কুলে চাকরী দিয়ে দিলাম। রাদিয়ার সাড়ে ছ’বছর পর যখন রিহাম এসে হাজির তখন খুব মুস্কিলে পড়ে গেলাম, আমার ক্লাস চলাকালীন ওকে কে দেখবে? বড় আপা (হাফিজ সাহেবের বড় বোন), আম্মা (হাফিজ সাহেবের মা) পর পর দু’জন মহিলা সংগ্রহ করে দিলেন। কিন্তু বাচ্চার কাউকে পছন্দ না, সে দুই মিনিটও তাদের কাছে থাকেনা। চিন্তায় পড়ে গেলাম কিভাবে চাকরী করব, নাকি দেব বিসমিল্লাহ বলে ছেড়ে?! কিন্তু আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী কথাটা যে কত সত্যি না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবেনা। রিহাম হবার আগে আমার কখনো কাজের লোক রাখা হয়নি। সেবার আর আমার পক্ষে দু’টো বাচ্চা, ফিমেল ক্যাম্পাসের দায়িত্ব, এক স্কুলে টিচার্স ট্রেনিং সব মিলিয়ে ঘরের সব কাজ সামাল দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তাই ঘর ঝাড়ু দেয়া মোছার জন্য একটা মেয়েকে রাখা হোল, নাম রোজিনা। কয়েকদিন আসার পর কথা বলে বুঝলাম সে গার্মেন্টসে চাকরী করতে চায় কিন্তু লেখাপড়া জানেনা বিধায় পছন্দমত কাজ পাচ্ছেনা। চার বাসায় ছুটা কাজ করে ওর আর গার্মেন্টসকর্মী দুই বোনের কোনক্রমে চলে কিন্তু লেখাপড়ার পেছনে খরচ করার মত পয়সা থাকেনা। ওকে বললাম, “আমি দু’মাস ছুটিতে আছি, ততদিন আমার কাছে পড়”। সে প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমার কাছে পড়তে আসে। একসময় লক্ষ্য করলাম রিহাম ওকে ভারী পছন্দ করে। রোজিনা আদর করে রিহামকে কোলে নিয়ে পড়তে বসত, ঐ সম্পূর্ণ সময় রিহাম কোন সাড়াশব্দ করতনা। একদিন সাহস করে বলেই ফেললাম, “তুমি চার বাসায় কাজ করে যা পাও আমি তোমাকে সেই পরিমাণ দেব। তুমি আমার সাথে প্রতিদিন সকালে ইউনিভার্সিটি যাবে, আমি বাসায় ফিরে এলে তোমার ছুটি। একটাই শর্ত, আমি যতক্ষণ ক্লাসে থাকব আমার বাচ্চা যেন হাসিখুশী থাকে”। এই রোজিনা থেকে গেল আমি ক্যানাডা চলে আসার দিন পর্যন্ত। সে এখন শুধু বাংলাই না কুর’আন পড়তে পারে, নামাজ পড়ে, পর্দা করে, গার্মেন্টসে কাজ করেও নামাজ মিস করেনা।

আমি প্রতিদিন সকালে দুই বাচ্চা আর রোজিনাকে নিয়ে বের হতাম। রাদিয়াকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে ইউনিভার্সিটি যেতাম। যতটুকু সময় ক্লাস থাকত রোজিনা রিহামকে দেখত। বাকী সময় আমি রিহামের সাথে কাটাতে পারতাম। বিকালে রাদিয়াকে স্কুল থেকে তুলে বাসায় ফিরে আসতাম। কিন্তু রোজিনা অধিকাংশই রাত ন’টা পর্যন্ত থেকে যেত, আমার কাজে হাত লাগাত, মাঝে মাঝে রাতেও থাকত তবে রাতটা সে ওর দুই বোনের সাথে কাটানোর জন্য বাসায় চলে যেতেই পছন্দ করত।

আজ আমাদের সেই ছোট্ট রিহাম স্কুলে ভর্তি হোল!

এভাবে আমার দুই ছেলেমেয়েই আগে ইউনিভার্সিটি যাত্রা করে, পরে স্কুলে ভর্তি হয়!!

1 comment: