Sunday, December 9, 2012

অপেক্ষা

১।
আমার ছোট দু’ভাইকে স্কুলে দিয়ে এসে গেট বন্ধ করেছি, সাথে সাথে দরজায় করাঘাত শুনে গেট খুলে দেখি আমার খালাত ভাই, সে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন আমি এক অদ্ভুত প্রাণী! সে আমার সাথে কোন কথা বলল না, সোজা ঘরে ঢুকে মাকে বলল, ‘খালা, কি এক আশ্চর্য মেয়ে তোমার! ও যখন আহমাদ মুহাম্মদকে স্কুলে দিতে যাচ্ছে তখন আমি এদিকে আসছি। পথে ওদের দেখে সালাম দিলাম। ও কিছু বললনা দেখে ভাবলাম ওদের স্কুলে দেরি হয়ে যাচ্ছে তাই কথা বলেনি। পথের ধারে দাঁড়িয়ে রইলাম ও আসার সময় একসাথে আসব। আসার সময় দেখি ও আমার আগে আগে হেঁটে চলে আসছে। আমরা তো জানি ও তেমন একটা কথা বলেনা। তাই ভাবলাম চুপচাপ হাঁটছে। কিন্তু ও যখন ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল তখন বুঝলাম ও আমাকে আদতেই দেখেনি! আধাঘন্টা পেছনে পেছনে থাকার পরেও সে কিছু বুঝতে পারেনি! এভাবে মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটলে কোনদিন দেখ কিছু হয়ে যাবে...’
মা হেসে বলল, ‘যাক,অন্তত গর্তে পড়ে মরবেনা, তাই বা কম কি?’

২।
একটিমাত্র পদের জন্য ইন্টারভিউ দিতে সারি সারি লোকজন বসে আছে, আমিই একমাত্র মহিলা। বাইরের রুমে জায়গায় সংকুলান হচ্ছেনা দেখে ভেতরের একটা রুমে জায়গা পেলাম বসার। ভেতরে বসে শুনতে পাচ্ছি কারো উচ্ছাস, কারো উৎকন্ঠা, কারো উদ্বেগ আর সবকিছু ছাপিয়ে আড্ডাবাজ হাফিজ সাহেবের গপ্প করার পুঞ্জীভূত শব্দমালা। কিছুক্ষণ পর অনার্স মাস্টার্সে আমার সহপাঠী আতিককে রুমে ঢুকতে দেখে খুব আশ্চর্য হলাম। ‘কেমন আছ, ভাল আছি’ টাইপ কথাবার্তার পর সে সামনের চেয়ারটাতে বসে বলল, ‘বাইরে একজন ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় হোল...’।
আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না এতে ও কি বোঝাল বা আমার কি বলা উচিত, তাই বললাম, ‘তো?’
সে বলল, ‘উনি বললেন উনি নাকি তোমার হাজব্যান্ড!’
হাসি পেয়ে গেল, ‘তোমার কি মনে হয় উনি মিথ্যা বলেছেন?’
‘না, আমি কথাটা ঠিক বিশ্বাস করতে পারিনি তাই তোমার কাছে সত্যতা যাচাই করতে এলাম’।
এবার আমি সত্যিই অবাক হলাম, ‘মানে?’
‘দেখ, আমরা একসাথে ছয় বছর পড়াশোনা করেছি। এই ছয় বছরে তুমি আমার সাথে কথা বলেছ চারবার আর তানভীরের সাথে দুইবার, তাও নেহায়েত প্রয়োজনে। ক্লাসের আর কোন ছেলের সাথে কখনো কথা বলেছ বলে জানা নেই। সিনিয়র ভাইদের অনেককেই তুমি অনুষ্ঠানের সময় নিজে না খেয়ে বিরিয়ানি প্যাকেট দিয়ে দিয়েছ ওদের ক্ষুধা দেখে, তাই ওরা তোমাকে পছন্দ করেন। কিন্তু তাদের সাথেও তুমি তেমন কথা বলেছ বলে শুনিনি। হ্যাঁ, জুনিয়র ছেলেরা তোমাকে আপু হিসাবে খুব পছন্দ করে কারণ তুমি ওদের সবসময় বইখাতা পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতে। কিন্তু ওদের সাথেও তোমার কথাবার্তা ছিল নিয়ন্ত্রিত। তাই সত্যি বলতে কি আমরা সবাই তোমাকে খুব ভয় পেতাম। আমাদের ধারণা ছিল তোমাকে কেউ কোনদিন বিয়ে করতে সাহস করবেনা’।
আমি কি বলব বুঝতে না পেরে চুপ করে রইলাম।
কিছুক্ষণ গভীর চিন্তায় ডুবে থাকার পর আতিক অবিশ্বাসের স্বরে বলল, ‘হাফিজ সাহেব কি আসলেই তোমাকে বিয়ে করেছেন?’
আমি হেসে ফেললাম, ‘হ্যাঁ, আমার বিয়ে হোল মাস্টার্স পরীক্ষার মধ্যখানে, তাই সবাইকে বলার সুযোগ হয়নি। বান্ধবীদের কয়েকজন গিয়েছিল। কেন, বর্ণালি তো গিয়েছিল! ও তো তোমার পাশের বাসায়ই থাকে, আমার ধারণা ছিল তুমি ওর কাছে শুনেছ। আমার একটা মেয়েও আছে, আজ ওর বয়স চল্লিশ দিন হোল’।
ও মাথা ঝাড়া দিয়ে পরিষ্কার করে বলল, ‘হাফিজ ভাই অনেক সাহসী মানুষ!’
হাসতে হাসতে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে ওকে জিজ্ঞেস করলাম ইন্টারভিউ কেমন হোল। টুকটাক কিছু প্রশ্ন যেগুলোর উত্তরের ব্যাপারে ও নিশ্চিত ছিলোনা সেগুলো আলাপ করে জেনে নিলো। বুঝলাম ইন্টারভিউ সহজ হবেনা।
যাবার সময় সে আবার মন্তব্য করে গেল, ‘হাফিজ ভাই খুব ভাল মানুষ। যেমন হাসিখুশি তেমনি আড্ডাবাজ। আমার মনে হয় উনি খুব কেয়ারিং, তোমাকে সাহস দেয়ার জন্য উনি কাজ ফেলে এখানে এসে বসে আছেন, তাই এমন মনে হোল’।

আমার ইন্টারভিউ বরাবর ভাল হয় যেহেতু আমি চ্যালেঞ্জ ভালোবাসি। এবারের ইন্টারভিউও খুব ভাল হয়েছিল। চাকরীটা পেয়েছিলাম। পরে যখন জেনেছি ওদের একটামাত্র পদ ছিল, তাও কোন পুরুষের জন্য, তখন অর্জনটাকে একটু বেশিই মনে হয়েছিল!

৩।
স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্স ডিভিশনের মাহমুদ ভাই একবার কথাপ্রসঙ্গে স্বীকার করে ফেললেন, ‘আপা, আমরা আপনাকে দূর থেকে দেখলে ‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতম মিনাজ জালিমিন’ পড়ি’।
বলতে বলতে পুরো দুয়া পড়ে ফেলায় ভীষণ হাসি পেয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন ভাই, আমি কি এতই ভয়ানক?’
নিজের অপ্রত্যাশিত স্বীকারোক্তিতে মাহমুদ ভাই একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, ‘আসলে তা না আপা। আপনি অনিয়ম পছন্দ করেন না, অন্যায় দেখলে সাথে সাথে প্রতিবাদ করেন, স্বাভাবিক মহিলাদের মত চুপ থাকেন না...’
এবার মেজাজটা খিঁচড়ে গেল, ‘স্বাভাবিক? তার মানে মহিলারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে এটা অস্বাভাবিক? নাকি মহিলারা সব অন্যায় মুখ বুজে মেনে নেবে এটা স্বাভাবিক?’
উনি ভড়কে গিয়ে বললেন, ‘সেটা বলিনি আপা, আমরা আমাদের আশেপাশে এমন মহিলা দেখে অভ্যস্ত না। তাই...’
বুঝলাম আমার বোনেরা ছাড় দিতে দিতে নিজেদের এমন অবস্থানে নামিয়ে ফেলেছেন যে একজন মহিলা ন্যায়ের কথা বললে, অধিকারের কথা বললে, ন্যায্য কথা বললে কিংবা অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে আমাদের ভাইদের সেটা এক ভয়াবহ অস্বাভাবিকতা মনে হয়!

৪।
আমার বন্ধুরা বলতেন, ‘আপনার সাথে কথা বললে মনেই হয়না আমরা কোন মহিলার সাথে কথা বলছি’।
বান্ধবী শিমু বলত, ‘এই গুণটি অর্জন করা আমার স্বপ্ন’।

কিন্তু আসলে এটা খুব কঠিন কিছু না। একবার টিভিতে একজন । অ্যামেরিকান বাস্কেটবল খেলোয়ারের সাক্ষাতকার দেখেছিলাম যার বক্তব্য ছিল, ‘abstention, not safe sex, is the answer’. অ্যামেরিকায় বাস্কেটবল খেলোয়ারদের প্রভাব এবং ইমেজ সম্পর্কে অনেকেই জানেন। মেয়েরা সর্বস্ব লুটিয়ে দেয় এদের সান্নিধ্য পাবার জন্য। সেক্ষেত্রে তিনি কিভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখেন জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, ‘আমি তাদের সাথে প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি কথাও বলিনা এবং কথা বলার সময় তাদের দিকে না তাকিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকি’। ছয় ফুটাধিক একজন ব্যক্তির জন্য নীচের দিকে তাকিয়ে থাকা, এমনভাবে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকা যেন চোখের সামনে যা আছে তা চোখে না পড়ে, কত কঠিন তা আমাদের মত স্বাভাবিক উচ্চতার মানুষের পক্ষেও আন্দাজ করা সম্ভব যাদের দীর্ঘসময় ঘাড় নীচু করে রাখলে ঘাড় ধরে যায়। কিন্তু তিনি বললেন না তাকানোই সবচেয়ে সহজ উপায় কারণ চাহিদার সৃষ্টি চোখ থেকেই শুরু হয়। তারপর তিনি ব্যাখ্যা করলেন কিভাবে দু’একটা কথা থেকেই শুরু হয়ে এক পর্যায়ে আর নিজের ওপর নিজের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকেনা, তখন চাহিদাটাই হয়ে যায় মুখ্য, সমস্ত বিবেক বিবেচনা লোপ পায়, এভাবেই ঘটে অনেক উজ্জ্বল ক্যারিয়ারের অকাল মৃত্যু কিংবা চুনকালি মাখা পরিসমাপ্তি। সুতরাং, নিজেকে নিরাপদ রাখার জন্য কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণের কোন বিকল্প নেই। আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার শ্রেষ্ঠ উপায় চোখ এবং কথাবার্তা নিয়ন্ত্রণ করা।

আমি ভাবতাম অ্যামেরিকার মত উন্মুক্ত পরিবেশে একজন বাস্কেটবল স্টার, সারা পৃথিবী যেখানে তার হাতের মুঠোয় নিজেকে জলাঞ্জলি দেয়ার অপেক্ষায়, নিজেকে সাধারন দু’টো পদ্ধতি ব্যাবহার করে নিরাপদ রাখতে পারেন, নিজের ভবিষ্যতকে ধুলিস্যাত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারেন- আমি কেন পারবনা? সুতরাং, আমি এমন কোন মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করিনি যা পৃথিবীতে আর কোনদিন ঘটেনি। বরং তাঁর এই দৃষ্টান্ত অনুসরন করার ফলে আমি কোনদিন কোন ঈভটিজারের অস্তিত্ব টের পাইনি; আমার সহপাঠীরা যখন প্রেম করে সময় নষ্ট করেছে তখন আমি লেখাপড়া করে নিজেকে গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছি; ওরা যখন লুকিয়ে লুকিয়ে পার্কে আর নদীর ধারে ঘুরেছে তখন আমি দেশবিদেশে ঘুরে বেরিয়েছি কারণ আমার বাবামার বিশ্বাস ছিল আমি কোন অন্যায় করবনা, কোথাও পছন্দ হলে তাদের জানাব; বন্ধুরা নারী হিসেবে দেখার কথা ভাবেনি তাই মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন পেয়েছি; পরিচিতজনদের কাছে সম্মান পেয়েছি, অপরিচিতজনদের কাছ থেকে সম্মান আদায় করতে পেরেছি; সবচেয়ে বড় কথা এমন একজন সাথী পেয়েছি যার বন্ধুত্ব আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

আজকাল যখন পুঁচকে পুঁচকে ছেলেমেয়েদের দেখি একদিকে ভিডিও গেম খেলে আরেকদিকে খেলার মতই হাল্কা মুডে প্রেম করে, যাদের না আছে দায়িত্ব নেয়ার যোগ্যতা আর না আছে প্রেমের ক্ষেত্রে দায়িত্ব সম্পর্কে ধারণা, তখন খুব অবাক লাগে। জীবনে কিছু অর্জন করার জন্য কিছু যোগ্যতার প্রয়োজন হয়। যোগ্যতা অর্জনের আগেই যে প্রাপ্তি তাতে ফাঁকি থাকবেই যেমন স্বল্পমূল্যে কেনা জিনিস টেকসই হয়না। সবচেয়ে বড় কথা আমি নিজে সৎ না হয়ে আরেকজনের কাছে কিভাবে সততা আশা করতে পারি? এমন হয়না, হতে পারেনা।

নারীপুরুষের সামাজিক সম্পর্ক স্বচ্ছ এবং ক্লেদমুক্ত রাখার জন্য স্বল্প এবং প্রয়োজনীয় কথায় কথাবার্তা সীমাবদ্ধ রাখার কোন বিকল্প নেই। সুতরাং, আমরা যদি সামাজিক বিশৃংখলা বন্ধ করতে চাই তাহলে সবার আগে নারীপুরুষ নির্বিশেষে আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আজকের ‘আমি’কে চিন্তা করতে হবে আগামিকালের ‘আমি’র কথা যে একদিন কারো স্ত্রী হবে, কারো মা হবে, কারো দাদী বা নানী হবে। সময় কাউকে ছেড়ে কথা কয়না। আমি যদি আজ অন্যায় করি, কাল আমার সন্তানকে আমি অন্যায় করতে দেখে বাঁধা দিতে পারবনা, কারণ সেই অধিকার আমি সেদিনই হারিয়েছি যেদিন আমি চাহিদাকে বিবেকের ওপরে স্থান দিয়েছি। সুতরাং, চাহিদার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই নির্ধারণ করবে আমার অদূর থেকে সুদূর সর্বপ্রকার ভবিষ্যত। আজকের একটু ধৈর্য্য আগামিকাল এনে দেবে অতুল বৈভব যার কাছে সব কষ্ট মলিন হয়ে যাবে। এই বিশ্বাস নিয়ে যদি আমাদের ছেলেমেয়েরা দিন গুনত তাহলে কি এমন পঙ্গপালের মত ছুটে চলত অর্থহীন পথে কিংবা হতে পারত অন্যের বিরক্তির কারণ? তখন তাদের নিয়ে আমরা সোনালী ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারতাম, ওদের স্বপ্নগুলোও পূরণ হত কারণ all good things come to those who wait.

No comments:

Post a Comment